আমাদের শাহীন ভাইয়া, উস্তাদ শাহাদত হোসেন খান । তানিম হায়াত খান রাজিত

  •  
  •  
  •  
  •  

 599 views

[ বরেণ্য সরোদ শিল্পী ওস্তাদ শাহাদত হোসেন খান গত ২৯ নভেম্বর এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ শাহাদত হোসেন খান সঙ্গীতাঙ্গনে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। জীবদ্দশায় বেশ কয়েকবার তিনি অস্ট্রেলিয়া এসেছেন। দেশে ও বিদেশে অসংখ্যবার তাকে সঙ্গদ করেছেন তাঁর চাচাত ভাই ও শিস্য সিডনি প্রবাসী সরোদ শিল্পী তানিম হায়াত খান রাজিত। প্রয়াত ওস্তাদ শাহাদত হোসেন খানকে নিয়েই রাজিতের এই স্মৃতিচারণ।]

ওস্তাদ শাহাদত হোসেন খান

ওনার সাথে আমার পরিচয় কবে? জানিনা, কারণ আমার জন্মের সময় থেকেই তো ওনার সাথে আমার দেখা। আমার থেকে ১৭/১৮ বছরের বড়ভাই উনি আমার। উস্তাদ শাহাদত হোসেন খান, আমাদের শাহীন ভাইয়া, সেজো ভাইয়া। সবার বড় ছিলেন উস্তাদ বিদ্যুৎ খান (বড় ভাইয়া), তারপর উস্তাদ কিরীট খান (মেজ ভাইয়া)। ওনারা দুজন উস্তাদ বাহাদুর খান সাহেবের ছেলে। তারপর ভাইদের মাঝে তৃতীয় হলেন শাহীন ভাইয়া। যখন থেকে জ্ঞান হয়েছে তখন থেকেই আমি আমাকে আবিষ্কার করতাম  ভাইয়ার মোটর সাইকেলের পিছনে। আমার যখন থেকে জ্ঞান হয় তখন থেকেই ভাইয়া পুরোদস্তুর চাকরিজীবী, BJMC তে। আমি তখন ক্লাস ওয়ানে পড়ি। আমরা আর বড়চাচা উস্তাদ আবেদ হোসেন খান সারাটা জীবন পাশাপাশি থেকেছি। মতিঝিল কলোনী থেকে রামপুরা। তো তখন আমরা মতিঝিল কলোনীতে থাকতাম। আমরা ১৪ নম্বর বিল্ডিঙে আর শাহীন ভাইয়ারা ১৬ নম্বর বিল্ডিঙে । ভাইয়াদের বাসার ঠিক সাথেই কলোনী থেকে বের হবার একটা গেট থাকলেও ভাইয়া প্রতিদিন অফিস যাবার সময়ে মোটর সাইকেল নিয়ে ঘুরে আমাদের বাসার সামনে দিয়ে গিয়ে আমাদের বাসার সামনের গেটটা দিয়ে বের হতেন।
প্রতিদিন যাবার সময় একটু দাঁড়িয়ে যেতেন আমাদের বাসার সামনে। আব্বার সাথে একটু কথা , নাহলে আমাকে একটু মোটর সাইকেলে করে ঘুরানো। অফিস থেকে ফেরার সময় একই রুটিন। একটু থেমে যাওয়া, আমাকে একটু মোটর সাইকেলে ঘুরানো। আমি ভাইয়ার পেট ধরে বসে থাকতাম বাইকের পিছনে আর কত গল্প করতাম । আর ভাইয়া আমার থেকে এতো বড়, কিন্তু দিব্বি আমার সাথে গল্প করে যেতেন। আমার বয়স ৬/৭ বছর তখন!

সিডনিতে ওস্তাদ শাহাদত হোসেন খানের সঙ্গে সরোদে সঙ্গদ করছেন লেখক

ভাইয়া ছিলেন আমাদের কাছে এক বিস্ময়! মাল্টিট্যালেন্টেড। যদিও তখনও ভাইয়ার স্বর্গীয় সরোদ বাজনা কিছুই বোঝার বয়স হয়নি আমার। যেটা বুঝতে পারতাম সেটা হলো ভাইয়া আমাদের যুগের থেকে অনেক এগিয়ে। ওনার ফ্যাশন সচেতনতা, সিগেরেটের ব্র্যান্ড সব কিছুই ছিল সবার থেকে আলাদা। তখন উনি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়তেন। সেই সময়, মানে ১৯৭৭-৭৮ সালে নিজের গাড়ি চালিয়ে ভার্সিটিতে যাওয়া মানুষগুলো আসলেই সবার থেকে এগুনো ছিল। তার উপরে ভাইয়ার এই গাড়ি নিজের উপার্জন দিয়ে কেনা। ততদিনে সরোদ বাজিয়ে ভারত সফর, রাশিয়া সফর করে এসেছেন।

কিন্তু আমাদের কাছে ভাইয়া ছিলেন আমাদের ভাইয়া। এতো বড় আর্টিস্ট হয়েও একদম কাছের মানুষ, ঘরের মানুষ। ঈদের নামাজ শেষ করে প্রথমে বড় চাচা আর ভাইয়া আমাদের বাসাতে আসতেন। একদম নিয়ম করা ছিল এইটা।

একবারের কথা বলি। আমাদের তিন ভাই বোনের সিনেমার দেখার খুব শখ হলো। কিন্তু সাধারণ সিনেমা হলে আব্বা আম্মা যেতে দিবেন না, পরিবেশ ভালো না বলে। তখন ইন্ডিয়ান হাই কমিশন-এ ইন্ডিয়ান সিনেমা দেখানো হতো। শুধু সিলেক্টেড মানুষেরা যেতে পারতো সেখানে। বাবা সেখানে আমাদের সিনেমা দেখার ব্যবস্থা করে দিলেন, আর শাহীন ভাইয়ার কাছে দায়িত্ব পড়লো আমাদের তিনজনকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাবার। আমার বাকি দুই ভাই বোন কিছুটা বড়, তাই তাদেরকে নিয়ে কোনো চিন্তা নাই। চিন্তা হলো আমাকে নিয়ে। তো ভাইয়া আমাকে পাশে নিয়ে মুভি দেখতে বসলেন। আমি তখন ছিলাম বংশে সবার ছোট ছেলে, তাই আমার আহ্লাদ ছিল আকাশ ছোঁয়া। আমি ভাইয়াকে আবদার করলাম ভাইয়ার কোলে বসে মুভি দেখবো। ভাইয়াও আদর করে কোলে বসালেন। আর বসিয়েই মনে হয় চরম ভুল করলেন। পুরো সিনেমা (তিন ঘন্টা) ওনার কোলে বসে মুভি দেখলাম, নামার নাম গন্ধও ছিল না আমার। ভাইয়া বাসায় এসে আম্মাকে বলেন, ‘সেজো মা রাজিত করছে কি শোনেন আজকে…..।”  ১৯৮৪/৮৫ সালের কথা।

“সময়ের পরিক্রমায় আমি বড় হওয়ার সময় জানলাম শাহীন ভাইয়া ছিলেন বড় সেলিব্রেটি।” যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানাপোলিসের একটি অনুষ্ঠানে ব্যাকস্টেজে শাহাদত হোসেন খানের সাথে লেখক।

ভাইয়া ১৯৮৫ সালে ৬ মাসের জন্য আমেরিকা চলে গেলেন আমাদের জ্যাঠামশাই আলী আকবর খান সাহেবের কাছে। সেখানে তিনি কিছু কোর্স করলেন, আলী আকবর কলেজ অফ মিউজিকে শিক্ষকতা করলেন। তারপর ছয় মাস পরে যখন ফিরলেন, ফিরেই আমাদের বাসায় আর আমি যথারীতি ভাইয়ার বাইকের পিছনে। আর আমার দুনিয়ার যত গল্প! ছয় মাসের জমে থাকা কথা  – ‘ভাইয়া বিকল্প ট্যাক্সি এসেছে এর মাঝে জানেন? “ভাইয়া বিকল্প বাস-ও আছে!” মনে হচ্ছিলো বিশাল বিশাল সব খবর দিচ্ছি আমি ভাইয়াকে। আমি তখন ক্লাস ফাইভ-এর ছাত্র!

সময়ের পরিক্রমায় আমি বড় হতে লাগলাম, আর জানতে শুরু করলাম ভাইয়া আসলে একজন বিগ শট! সেলেব্রেটি। আমি মোটামুটি ১৯৮৭ সালের দিক থেকে সরোদ সেতার শোনা শুরু করি ভালো মতন। সে সময়ই দেখেছি বড়চাচা উস্তাদ আবেদ হোসেন খানের সাথে ভাইয়ার কিছু ডুয়েট। বাংলা একাডেমিতে একবার ওনারা রাগ *মিয়াঁ কি মালিহার বাজিয়ে বাইরে অঝোর ধারায় বৃস্টি নামিয়েছিলেন! বাজনা শেষ হবার পর আমরা বাইরে গিয়ে দেখি সব বৃষ্টির পানিতে সয়লাব!

তখন বিটিভি-তে মাঝে মাঝে উচাঙ্গ সংগীত লাইভ হতো! এরকমই একটা দুর্দান্ত লাইভ দেখেছিলাম ভাইয়া আর আমাদের মেজো চাচা উস্তাদ বাহাদুর খানের ডুয়েট! এতো অসাধারণ বাজিয়ে ছিলেন ভাইয়া ওনার বাহাদুর কাকুর সাথে তাল মিলিয়ে যে বাজনার মাঝখানে মাঝখানে মেজো চাচা বাহ্ বাহ্ বলে উঠছিলেন! কিন্তু তখনও আমি সামনাসামনি ভাইয়ার বাজনা দেখিনি। আমি যতবার গেছি বড়চাচার বাসায় সে সময় গুলো রেয়াজের সময় ছিলোনা, তাছাড়া তখন ওই বয়সে রেয়াজ আমি কিছুই বুঝতাম না।

এবার ১৯৯০ সালের কথা। ব্রিটিশ রাজকবি টেড হিউজ এসেছেন বাংলাদেশে। ওনার জন্য একটা ঘরোয়া প্রোগ্রাম আয়োজন করা হলো আমাদের সেজো খালাম্মা ডক্টর নাজমা ইয়াসমিন হকের বাসায়। ভাইয়ার সেদিন আরেকটা প্রোগ্রাম আছে, সেটা শেষ করে উনি রাতে দেরি করে আসবেন। তো আমার উপর দায়িত্ব পড়লো উত্তরা থেকে টেড হিউজের জন্য বরাদ্দ গাড়ি খানা নিয়ে ভাইয়াকে বাসা থেকে তুলে আনতে হবে! রাজকবির জন্য বরাদ্দ গাড়ি, রাজকীয় ব্যাপার! লাক্সারির চূড়ান্ত রাষ্ট্রীয় গাড়ি! ভাইয়ার কারণে এমন একখানা রাজকীয় গাড়িতে চড়াও হয়ে গিয়েছিলো আমার! সেবারই জীবনের প্রথম ভাইয়ার প্রোগ্রাম দেখলাম সামনাসামনি বসে। তবলায় ছিলেন কিরীটিদা, কিরীটি ভূষণ অধিকারী।

এরপর ১৯৯২ সালে ভাইয়া কলোনির বাসা ছেড়ে রামপুরায় নিজেদের বাসায় চলে যান। তার আগে ১৯৯০ সালে ভাইয়া গাধার মতন খেটে ওনাদের রামপুরার বাসার পাশে আমাদের বাসার ফাউন্ডেশন আর দোতালা নিজের হাতে তৈরী করে দেন। আমার কিছুই বুঝিনি কিভাবে একটা বিল্ডিং তৈরী হয়ে গেলো! ভাইয়া সকাল বেলা পাগলায় চলে যেতেন, তারপর ট্রাকে ইঁট বোঝাই করে সেই ইঁটের উপর বসে ট্রাকে চড়ে রামপুরা চলে যেতেন! প্রতিদিন অফিস শেষ করে আগে রামপুরায় গিয়ে সব কাজ তদারকি করে মতিঝিল কলোনিতে ফিরতেন। তো যা বলছিলাম, ভাইয়া ১৯৯২ সালে রামপুরায় বড়চাচার সাথে চলে গেলেন থাকতে, আর আমরাও মতিঝিল ছেড়ে ইস্কাটন গার্ডেনে। এই প্রথম বারের মতন আমরা আর ভাইয়ারা দূরে দূরে থাকলাম ৪টা বছর। ১৯৯৬ তে আমরাও রামপুরা চলে আসি। যদিও আমাদের বাসা বানানোর কথা ছিল মিরপুরে। কিন্তু বড়চাচা আব্বাকে বললেন যে শেষ বয়সেই বরং সবার আরও কাছাকাছি থাকা দরকার। বড়চাচার এই কথাটা যে কি ভীষণ দামি ছিল সময়ের সাথে ঠিক বুঝেছি। বড়চাচার এক কথায় আব্বা মিরপুরের জমি বিক্রি করে ১৯৯০ তে রামপুরাতে বাসা বানানোর কাজে হাত দিয়েছিলেন। এই সময়টায় আমার তখন একা একা রিকশায় চলার অনুমতি ছিল শুধু বাসা থেকে কোচিং আর কোচিং থেকে বাসা। ১৯৯৩ সালের কথা। কিন্তু যেহেতু ভাইয়ার সাথে দেখা হয়না তখন রেগুলার, আমি মৌচাকের কোচিং থেকে হেঁটে রামপুরা ওয়াপদা রোডে চলে যেতাম ভাইয়ার সাথে গল্প করবার জন্য। আবার বলতাম কাউকে যেন না বলেন! কি টান যে ছিল আমার ওনার জন্য! একটা অদ্ভুত আকর্ষণ! সেই সময়েই জীবনের প্রথমবারের মতন নিজেদের বাসার বাইরে রাত কাটালাম, ভাইয়ার বাসাতেই, রামপুরাতে। ১৯৯৫ সালের কথা। ভাইয়া তখন নিজেই ডিশ এন্টেনা লাগিয়েছেন, তাই রাতভর ক্রিকেট খেলা দেখার জন্য থেকে গেলাম ওনার বাসায়। ডিশ এন্টেনার কথা যেহেতু বললামই, তাই এটাও আবার বলি, ভাইয়া সব সময়ই সব কিছুতে পাইওনিয়ার ছিলেন এবং সৌখিনও বটে। ডিশ এন্টেনা, কম্পিউটার, মোবাইল, ফটো প্রিন্টিং ডার্ক রুম –  যখন যেটা প্রথম এসেছে, ভাইয়ার কাছে সেটা এসে যেত নিমিষে। সর্বোচ্চ দাম দিয়ে কিনতে হতো ওনাকে, যেহেতু প্রোডাক্ট গুলো একদম নতুন থাকতো।

১৯৯৪ সালে প্রথম নিজেদের আদিভূমি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যাই, সেটাও ভাইয়ার সাথেই। দারুন এক এডভেঞ্চার ছিল! আর এরপর আমাদের যেখান থেকে সব কিছুর শুরু, সেই শিবপুরের সাথে পুনর্যোগাযোগ শুরু করেন ভাইয়াই। ভাইয়ার কারণেই আমরা দলবল বেঁধে আবার শিবপুর আসা যাওয়া শুরু করি। এরমাঝে একবার তো ভাইয়া আমাদের পরিবারের ২৫ জনের বিশাল দল নিয়ে ঐতিহাসিক ট্যুর করেন শিবপুরে।

নিউ ইয়র্কে ধ্যানমগ্ন সরোদ বাজাচ্ছেন ওস্তাদ শাহাদত হোসেন খান, সঙ্গে লেখক।

আমরা যখন রামপুরা চলে আসি ১৯৯৬ সালে, তখন আমার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হলো! শুরু হলো মিউজিক্যাল জার্নি। সেটার গল্প নাহয় অন্য একসময় বলা যাবে। কারণ সেটাও একটা বিরাট গল্প! ওই সময়ে আমরা বছরে দুইটা বড় বড় ক্লাসিকাল নাইট করতাম, যেগুলোতে আমি ছিলাম ভাইয়ার ডান হাত। আর সাথে ছিল ভাইয়ার বড় বোন দিপু আপার ছেলে সোহেল। এভাবে ১৯৯৭ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত টানা প্রোগ্রাম করলাম। এর মাঝে ২০০১ সালে আমি বিয়ে করলাম। আমার হলুদের সময় আমি আমার হাতে রাখি বাঁধতে বলেছিলাম পূরবী ভাবীকে, কারণ আমার কাছে শাহীন ভাইয়া মানে নিজের বড় ভাইয়ের থেকেও বেশি! ২০০৩ এ যখন আমি অস্ট্রেলিয়াতে চলে আসবার সিদ্ধান্ত নেই, তখন এয়ারপোর্টের departure -এর সময়ে  আমার কানে কানে ভাইয়ার শেষ কথা, “রাজিত আমার অনুষ্ঠানে আমার স্টেজটা কে করে দিবে এখন থেকে? ” আমি চোখের পানি গড়িয়ে পড়ার আগেই দৌড়িয়ে পালালাম ভাইয়ার সামনে থেকে।

অস্ট্রেলিয়া চলে আসবার কারণে আমার সরোদ বাজনার দীর্ঘ বিরতি পড়ে। কিন্তু ভাইয়া সবসময় বলতেন অন্তত যন্ত্রটা একবার করে হলেও যেন ধরি প্রতিদিন। ওনার সবসময় দেয়া উৎসাহেই আমি আবার ফিরে আসি সরোদ নিয়ে। আমি বলতেই পারি এখন যে আমি যতটুকুই বাজাই বা যাই বাজাই আমার মূল প্রফেশনের পাশাপাশি, এর সবটুকুর কৃতিত্ব ভাইয়ার, আর আমিই খুব সম্ভবত ভাইয়ার দুই মেয়ে আফসানা আর রুখসানার পরে একমাত্র রেগুলার পারফর্মিং সরোদ আর্টিস্ট – ভাইয়ার শিষ্যদের মধ্যে। ১৯৯৮ থেকে শিখছি ভাইয়ার কাছে, কিছুটা হয়তো বাজ পেয়েছি গুরুজীর। তবে উনি যেরকম আদর আর স্নেহ করে বাজনা শিখিয়েছেন আমাকে, আমার মনে হয় না এতো আদর আর আহ্লাদে কোনো শিষ্য গুরুর কাছ থেকে বাজনা শিখে। এরকম গুরু পরম্পরায় আমার ফুফাতো ভাই উস্তাদ খুরশিদ খানকে দেখছিলাম আমার বড় বোন প্রফেসর রীনাত ফওজিয়াকে শেখাতে।
পরে যখন ভাইয়ার যমজ মেয়ে সোহিনী আর সাবনী হয়, তখন ভাইয়া ওদেরকে নিয়ে মোটর সাইকেল নিয়ে কলোনিতে ঘুরে বেড়াতেন। আমি তখন অনেক বড়, ক্লাস টেনে পড়ি। কি দারুণ ভাবে ভালোবাসা গুলো ট্রান্সফার করে চলেছিলেন ভাইয়া! আসলে ভালোবাসা হয় নিম্নমুখী। ভাইয়া পেতেন বাবার কাছ থেকে, সেখান থেকে আমাকে দিতেন আর আমি দেয়া শুরু করলাম সোহিনী সাবনিকে অসম্ভব বেশি আদর করে! ওদের দুজনকে একসাথে কোলে নিতাম। আমি! আরও কতশত স্মৃতি।
আরেকবার আমার ভাগ্নে তুরিনের খুব শখ হলো মামাদের সাথে থাকবে, নানা নানুর সাথে থাকবে। সেই মোতাবেক আপু ওকে আমাদের মতিঝিল কলোনির বাসায় রেখে ইস্কাটনে নিজের বাসাতে চলে গেল! রাত ১০টা বাজতেই শুরু হলো তুরিনের কান্না, মায়ের কাছে যাবে! থাকবেইনা কোনোভাবে! এদিকে এতো রাতে অফিসের গাড়িও পাবার কোনো উপায় নাই! বিপদের সময় সবসময় তো আমাদের আছেনই একজন! শাহীন ভাইয়া ! রাত ১১টায় ভাইয়া আসলেন, কারণ ওনার নিজের গাড়ি ছিল সবসময়ই। তুরিনকে নিয়ে চলে গেলেন ইস্কাটনে, মায়ের কাছে দিয়ে আসলেন!
আসলে ভাইয়াকে নিয়ে আমাদের এতো বেশি স্মৃতি, লিখে শেষ করা যাবেনা। আমার সৌভাগ্য আমি এমন একজন অসাধারণ গুরু পেয়েছি, অসাধারণ ভাইয়া পেয়েছি। পৃথিবীর কোনো কিছুই এর জায়গা নিতে পারবেনা। ভাইয়া আছেন আমার উপর ছায়া হয়ে, আমাকে আগলে ধরে।
উস্তাদ শাহাদত হোসেন খান সংগীতে ওনার অসামান্য অবদান নিয়ে বেঁচে থাকবেন আজীবন। তবে শাহীন ভাইয়াকে আমরা ভীষণ ভাবে মিস করবো আজীবন, এটাই সবচাইতে কষ্টকর। বড্ড আগে চলে গেলেন ভাইয়া, বড্ড বেশি আগে।

তানিম হায়াত খান রাজিত
সরোদ শিল্পী, মিউজিশিয়ান, লেখক
শিষ্য ও চাচাতো ভাই উস্তাদ শাহাদত হোসেন খান।
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments