একাত্তরের ঘাতকদের প্রতি কেন এখনো সমর্থন । নিঝুম মজুমদার

  •  
  •  
  •  
  •  

 920 views

সাম্প্রতিক সময়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে খুন হওয়া বুদ্ধিজীবিদের হত্যাকান্ড নিয়ে নানাবিধ প্রোপাগান্ডা, মিথ্যাচার, আজগুবি সব ন্যারেটিভ নিয়ে আলোচনা শুরু হতে গিয়েই আমার মনে হলো এসব করছে কারা। এসব করছে কিংবা বলছে কিংবা লিখছে কারা। এইসবের সলুক সন্ধান করতে গিয়েই দেখা গেলো এই দেশে তো এখনো স্বাধীনতাবিরোধী কিংবা মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের প্রতি এক ধরনের প্রচ্ছন্ন সমর্থন এই বাংলাদেশে রয়ে গেছে। ফলে কেন রাজাকারদের প্রতি সমর্থন রয়ে গেছে এইটার অনুসন্ধান আসলে সবচাইতে জরুরী।

মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের শিউরে উঠা নৃশংসতা আর অভিজ্ঞতার পরেও একাত্তরের ঘাতকদের পক্ষে এই বাংলাদেশে একজন হলেও যদি সহমর্মিতা দেখায় তবে ভাববার প্রয়োজন রয়েছে যে কেন সেটি হচ্ছে। সাময়িকভাবে আপনার হয়ত ক্ষোভ হতে পারে কিংবা ক্রোধে ক্রোধান্বিত হয়ে সেটি প্রকাশও করতে পারেন। সেটি করাই স্বাভাবিক কিন্তু কেন এটি হচ্ছে বা হোলো এগুলো নিয়ে কিছুটা হলেও গভীর ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে। আমি হয়ত সেই গভীর ভাবনা কিংবা দূর্দান্ত এনালিটিকাল একটা লেখা লিখবার জন্য যোগ্য নই বা সে ক্ষমতাও রাখিনা কিন্তু সামান্য ভাবনার খোরাক আমি আমার পাঠক/পাঠিকাদের জন্য হয়ত যোগাতে পারি। এই ভাবনার খোরাক নিয়েই হয়ত তাঁরা আরো সুগভীরভাবে ভেবে দেখবেন পুরো ব্যাপারটি।

আমি আমার পূর্বের অনেক লেখাতেই ১৯৭২ সালে যখন সর্ব প্রথম দালাল আইনে রাজাকার-আলবদরদের বিচার হয়েছিলো সে বিচারের নানা প্রাসঙ্গিক কথন আপনাদের সামনে হাজির করেছিলাম। সে সময়কার বিচারটা ছিলো এমন একটা সময়ে যখন মুক্তিযুদ্ধের দগদগে স্মৃতি আর ভয়াবহতার কথা শরীরে আরো তাজা হয়ে লেগে ছিলো। তার মানে এই নয় যে এখন আর সেটি তাজা নয়, কিন্তু সময়ের ক্রম বিবেচনা করলেও সে সময়কার স্মৃতি অনেক বেশী কাছাকাছি ও নৃশংসতাকে আরো বেশী স্পস্ট করে তোলে।

মুক্তিযুদ্ধের ঠিক পর পর এই দালাল আইনে বিচারের সময় জামাতী ইসলামী, নেজামী পার্টি, কনভেনশন মুসলিম লীগ সহ আরো অন্য সমস্ত যে যে দলের মধ্য থেকে রাজাকার, আলবদর। আল-শামস ইত্যাদি তথা ঘাতকেরা মূলত উঠে এসেছিলো সেসব দল কিংবা দলের সদস্যরা পলাতক অবস্থার মধ্যেই ছিলো। মূলত সাড়ে সাত কোটি বাংলাদেশীদের মধ্যে অধিকাংশ বাংলাদেশী এই বিচারের পক্ষে ছিলো এবং এটাই সে সময় স্বাভাবিক ছিলো। স্বাভাবিকের থেকে সবচাইতে বড় ব্যাপার ছিলো যে কোনো অপরাধ রাষ্ট্রের ভূ-খন্ডে হলে এটা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের উপরেই গিয়ে বর্তায় সে অপরাধের ন্যায্য বিচার করবার জন্য।

লক্ষ্য করে দেখবেন আমি উপরে একটি শব্দ ব্যবহার করেছি। শব্দটা হচ্ছে “অধিকাংশ”। আমি বলেছি অধিকাংশ বাংলাদেশী-ই এই বিচারের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু অধিকাংশ শব্দটা ব্যবহার করবার ফলে যে ব্যাপারটি প্রশ্ন হয়ে আপনার সামনে দাঁড়াবে এইভাবে যে, তাহলে কি এই অধিক-অংশের বিপরীতে যে কম অংশ থেকে গেলো তারা এই বিচার সমর্থন করেনি? দুঃখজনক হলেও সত্য যে, উত্তর হচ্ছে হ্যাঁ। করেনি। ১৯৭২ সালে দালাল আইনে বিচার শুরু হলেও এই সময় বাংলাদেশের একটা অংশ, সেটি সংখ্যায় কম হলেও বিচারকে সমর্থন করেনি।

আপনার মাথাতে প্রশ্ন এখন আসবেই কিংবা আপনি হয়ত খুব বিষ্মিত হবেন এবং বলবেন কেন সমর্থন করেনি? আপনার এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে এখন আমাকে দর্শনের লাইনে যেতে হবে। কিন্তু দর্শনের লাইনে না গিয়েও একেবারে সাধারণ একজন নাগরিকের চোখেও এটির উত্তর দেয়া যেতে পারে।

মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগে আগে যে সাধারণ নির্বাচন হয়েছিলো তৎকালীন পাকিস্তানে, সে নির্বাচনে আওয়ামীলীগ নিরংকুশ ভাবে দুই পাকিস্তানের মধ্যে জয়ী হলেও এই বাংলাদেশ ভু-খন্ডে কিন্তু দুইটা নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামীলীগ জিততে পারেনি। আবার যেগুলোতে জিতেছে সেই নির্বাচনী আসনে আওয়ামীলীগ যে প্রত্যেকটা ভোট পেয়ে জয় লাভ করেছে, তাও নয়। প্রতিটি সিটেই আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে ভোট ছিলো। আবার এগুলোর সাথে সাথে সে সময়ে জামাত, নেজামে পার্টি, মুসলিম লীগ, পিডিবি সহ নানাবিধ রাজনৈতিক দলএর কিছুটা হলেও কর্মী বা সমর্থক ছিলো যারা সে সময়ে আওয়ামীলীগের পক্ষে ছিলোনা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই আওয়ামীলীগের পক্ষে না থাকলেই কি একাত্তরের ওই নৃশংস হত্যাকান্ডকে সবাই সমর্থন করেছে? এই কথার উত্তরও হচ্ছে, না, ব্যাপারটা সে রকমও নয়। কিন্তু উপরে উল্লেখিত ওই রাজনৈতিক দলের মূলত সবাই এবং সেই ভোট না দেয়া অংশের একটা বৃহৎ অংশ সেই হত্যাকান্ডের পক্ষে ছিলো। এদের মধ্যে কেউ সরাসরি কিংবা পরোক্ষ ভাবে জড়িত ছিলো এবং বাকীরা সমর্থন করলেও প্রত্যক্ষ্য বা পরোক্ষভাবে একাত্তরের হত্যাকান্ডে হয়ত জড়িত ছিলোনা।

এখন ১৯৭২ সালে যখন দালাল আইনে বিচার শুরু হোলো তখন প্রাক মুক্তিযুদ্ধকালীন সেইসব বিরোধী ব্যাক্তিরা ও তাদের পরিবার এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন রাজাকার-আলবদর ও তাদের পরিবার তো বাংলাদেশেই অবস্থান করছিলো। তাহলে এই লেখার এই পর্যন্ত এসে একটা রেখা টানা গেলো যে, পোস্ট মুক্তিযুদ্ধের পরেও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী একটা শক্তি, সেটা সংখ্যায় নগন্য হলেও বাংলাদেশে ছিলো। সুতরাং বিচার যখন সেই ১৯৭২ সালেই শুরু হলো তখন এই নগন্য অংশটাই কিন্তু মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো।

যে কোনো অপরাধী-ই তার অপরাধকে তার নিজের পক্ষ থেকে সঠিক মনে করে। একজন খুনী খুন করবার পর তার যুক্তি থাকতে পারে যে তার সে সময় মাথা গরম হয়ে গিয়েছিলো কিংবা অমুক কারনে সে খুন করেছে, তমুক কারনে করেছে। খুনী তার ডিফেন্স দিতে গিয়ে নানা ধুরনের যুক্তি হাজির করবে, এটাই হচ্ছে স্বাভাবিক। কিন্তু নৈর্ব্যত্তিক চোখে একজন রিজেনেবল মানুষ কিভাবে এই অপরাধকে সূচিত করবে এটাই আসলে শেষ পর্যন্ত বিবেচ্য। আজকের প্রসঙ্গ যদিও সেটি নয় কিন্তু এটাও সত্য যে এই যে অপরাধীরা তাদের পক্ষে যুক্তি দিয়েছে সেটা কিন্তু সেই অপরাধীদের পরিবারও সমর্থন দিয়েছে এবং এই হত্যার পক্ষে একটা সমর্থন কিন্তু লক্ষ্য করে দেখেন দাঁড়িয়ে গেলো।

ঠিক মুক্তিযুদ্ধের পর পর এই দালাল আইনে বিচারের সময়েও যে প্রারম্ভিকভাবে এক লক্ষ লোকের মত ধরা হোলো তারা কিন্তু বাংলাদেশেরই সন্তান। এই দেশেই জন্ম। এখন লক্ষ্য করে দেখেন যে, যেই এক লক্ষ লোককে গ্রেফতার করা হোলো সেই এক লক্ষ লোকের পক্ষে নুন্যতম যদি দুইটা ফ্যামিলি মেম্বারও থাকে তাহলে এই অপরাধীদের পক্ষে সাফাই দেবার জন্য কতজন দাঁড়িয়ে যায়? সংখ্যাটি দাঁড়ায় দুই লক্ষ। আমি তো কম করে ধরেছি, সত্যিকার হিসেব আসলে সংখ্যাটি আরো বেশী হতে পারে। এবার এই দুই লক্ষের বাইরে আরো কিছু আছে যারা একাত্তরে রাজাকারদের পক্ষে সমর্থন দিয়েছে কিন্তু অপরাধের সাথে যুক্ত ছিলোনা। এই অংশের সংখ্যা কেমন? যদি ধরি আরো এক লক্ষ তাহলে সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় তিন লক্ষে।

একটা দেশের একটা ন্যায্য বিচার চলাকালীন সময়ে যদি ৩ লক্ষ লোক তাদের রাজনৈতিক কারনে ও পারিবারিক কারনে অন্যায্যভাবে একটা বিচারের বিরোধীতা করে কিংবা অসন্তোষ প্রকাশ করে তবে সেটি কিন্তু আপনার নজরে আসবেই। সুতরাং এই প্রেক্ষিতে একটা সিচুয়েশন আপনারা বুঝতে পারলেন।

এইবার আমি আসি এই যে সমর্থকের কথা বলেছি উপরে সেটির বাইরেও দেশের সে সময়কার কিছু বুদ্ধিজীবি, রাজনীতিবীদ তাদের ভূমিকা কি ছিলো। সে সময়ে খান এ সবুর, সাকার বাবা ফকা, শাহ আজিজ, এম এ মালিক সহ আরো অনেক ব্যাক্তির বিচার চলছিলো। প্রাক মুক্তিযুদ্ধ মানে জাস্ট দুইটা বছর আগেও কিন্তু তারা বাংলাদেশের ভূখন্ডে রাজনীতি করেছে, তাদের একটা সমর্থক গোষ্ঠী ছিলো। সুতরাং এদেরও একটা সমর্থক কিন্তু এই বিচারের বিরুদ্ধে ছিলো। যারা সেই তখনই ধোঁয়া উঠিয়েছিলো যে বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করবার জন্য এই খান এ সবুর, মালেক, ফকাদের বিচার করছে।

দালাল আইনে গ্রেফতার হওয়া অনেকেই যেমন একেবারেই অশিক্ষিত, নিম্নবিত্ত কিংবা পয়সার লোভে রাজাকার হয়েছিলো ঠিক একই দিকে গ্রেফতার হওয়া অসংখ্য ব্যাক্তিরা ছিলো সমাজের বেশ প্রভাবশালী মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তের প্রতিনিধি। যেমন বড় বড় শিল্পপতি, মন্ত্রী, সরকারী আমলা, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষক, ব্যবসায়ী, বড় বড় প্রতিষ্ঠানের চাকুরীজীবি, প্রভাবশালী স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিবীদ ইত্যাদি। দেখা গেলো এদের একটা বড় অংশের পলিটিকাল কানেকশান, অর্থ কড়ির ব্যাপ্তি সুবিশাল। এই ধৃত প্রভাবশালী একটা অংশ একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক ভাবে লবিং করবার ক্ষমতা রাখত, ঠিক তেমনি খোদ আওয়ামীলীগ সরকারের একটা তীব্র ডান পন্থী অংশের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রাখত।
আরেকটা ব্যাপারও এখানে খুব উল্লেখ্য যে, ৭২ পূর্ব রাজনীতিবিদের অনেকেই তীব্র পাকিস্তানপন্থী থাকলেও এদের সাথে পাকিস্তান বিরোধী রাজনীতিবিদদের একটা সখ্যতা কিংবা পলিটিকালি কার্টেসি মেইন্টেন করবার একটা প্রবণতা ছিলো। রাজনীতির ময়দানে এদের একটা ভূমিকা ছিলো। প্রাক মুক্তিযুদ্ধ অবস্থায় এইসব রাজনীতিবিদ দেশীয় বিভিন্ন দাবি দাওয়ার সংগ্রামে এক সাথেই রাজপথে ছিলো। যেমন খান এ সবুর খান কিংবা ফজলুল কাদের চৌধুরীর সাথে বঙ্গবন্ধু পরিবারের ভালো সম্পর্ক ছিলো মুক্তিযুদ্ধের আগের রাজনৈতিক অবস্থায়।
কিন্তু স্বাভাবিক ভাবেই যখন তারা মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন ঘৃণ্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করলো তখন এইসব রাজনীতিবিদদের ডেস্টিনি মূলত পুরোপুরিই ঘুরে গেলো। তথাপিও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময় তারা যখন গ্রেফতার হোলো তখন দেখা গেলো বঙ্গবন্ধু সরকারের ভেতর ডানপন্থী যে এলায়েন্স ছিলো এরা বঙ্গবন্ধুর কাছে এসে লবিং কুখ্যাত রাজাকার-আলবদরদের ছেড়ে দেবার তদবির করে। এই অংশটাই দেখা গেলো বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকান্ডের পেছনে অন্যতম বড় ষড়যন্ত্রকারী। খন্দকার মোশতাকের মত এমন অনেক আওয়ামীলীগ নেতা সে সময় বঙ্গবন্ধু সরকারের ভেতর উদার বামপন্থী অংশকে কোনঠাসা করে ফেলেছিলো। সেটির চিত্র আমরা বুঝতে পারি যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদকে পরে করা হয় অর্থমন্ত্রী, তাঁর সম্পর্কে নানাবিধ কথা বলে বঙ্গবন্ধুর কান ভারী করা হয়, বঙ্গবন্ধুর কাছে বিরাগভাজন করা হয় তাজ উদ্দিন আহমেদ এবং তাঁর চিন্তার অনুসারী নেতাদের।

আমার উপরের এই সব কথারই প্রমাণ মেলে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে নৃশংস ভাবে হত্যা করবার পরবর্তী প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আনলে। সে সময় আওয়ামীলীগের বড় বড় নেতারা বিশ্বাস ঘাতকতা করে বড় বেঈমান খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রী সভায় ঢুকে পড়ে এবং ধীরে ধীরে এই প্ররিক্রমায় দালাল আইনে আসামীদের বিচারের প্রক্রিয়া অস্তমিত হতে থাকে। যেমন আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন-১৯৭৩ তৈরীতে যিনি মূল ভূমিকা রেখেছিলেন, তৎকালীন আইনমন্ত্রী মোনোরঞ্জন ধর, ফনীভূষন মজুমদার সহ অনেকেই তখন মোশতাক মন্ত্রী সভায় শপথ নেন। সুতরাং সে সময়ে প্রভাবশালী আসামী, আওয়ামীলীগের ভেতর ষড়যন্ত্রকারী ডানপন্থী অংশ এই দালাল আইনে বিচারকে সুষ্ঠু ভাবে হতে না দেবার পেছনে একটা বড় ভূমিকা রেখেছে। তা বলাই বাহুল্য মাত্র।

সেই সময়ে মাওলানা ভাসানীর ন্যাপের অনেকেই দালাল আইনে কারাগারে আটক ছিলো। মাওলানা ভাসানী তো রীতিমত বিচার বন্ধ করার জন্য আলটিমেটাম দিয়েছিলেন।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডঃ আবু মোঃ দেলোয়ার হোসেন “স্বাধীনতাত্তোর দালালদের বিচার প্রক্রিয়াঃ একটি পর্যালোচনা” শীর্ষক তাঁর লেখা একটি প্রবন্ধে লিখেন – “যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশ পুনর্গঠনে আওয়ামীলীগ সরকারের দূর্বলতার সুযোগে পাকিস্তান আমলই ভালো ছিলো এই প্রচার চালানো হয় এবং এ পর্যায়ে “মুসলিম বাংলা আন্দোলন” নামে একটি আন্দোলন বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলাদেশ-বিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত হয় । ধর্ম ভিত্তিক দলগুলো পিকিংপন্থী দলগুলোর সঙ্গে একত্রিত হয়ে দালালদের মুক্তির দাবী তোলে।

১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে নির্বাচনের প্রাক্কালে দালাল ও স্বাধীনতা বিরোধীদের সমর্থন পেতে ন্যাপ (ভাসানী) এবং আতাউর রহমানের জাতীয় লীগসহ আওয়ামী বিরোধী পিকিংপন্থী জোট নির্বাচনের আগেই দালালদের মুক্তি দাবী করে । এ সময় মাওলানা ভাসানী হুমকি দেন যে, ১৯৭২ সালের ৩১ শে ডিসেম্বরের মধ্যে দালাল আইন বাতিল না করলে তিনি দূর্বার আন্দলোন গড়ে তুলবেন”। শুধু এখানেই ভাষানী ক্ষান্ত হননি, একের পর এক তিনি কর্মসূচি দিয়ে গিয়েছিলেন এই বিচার বন্ধ করবার জন্য। এই বিচারকে তিনি অভিহিত করেছিলেন প্রহসন হিসেবে। উল্লেখ্য যে এই দালাল আইনে তখন ভাষানীর দলের অনেক নেতা কর্মী মুক্তিযুদ্ধকালীন নানা অপকর্মে আটক ছিলো।

আবার সে সময়ে আইন শৃংখলা বাহিনীর ভূমিকা কি ছিলো সেগুলো নিয়েও আমাদের একটু কথা বলা দরকার। দালাল আইনের বিচারের ক্ষেত্রে একটা বড় ভূমিকা ছিলো পুলিশের। একজন পুলিশ অফিসারের রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে একটি মামলায় আসামীর জামিন হওয়া কিংবা না হওয়া থেকে শুরু করে মামলার একটা বড় অংশ নির্ভর করত পুলিশের ওপরেই। সাধারণত দালাল আইনে আটকদের ৬ মাসের ভেতর জামিন দেবার ব্যাবস্থা ছিলো না কিন্তু এই ব্যাবস্থার মধ্যেও যদি পজিটিভ পুলিশ রিপোর্ট আনা যেতো তাহলে সেটির উপর ভিত্তি করেও জামিনের ব্যাবস্থা ছিলো। সুতরাং এই সময়ে একজন পুলিশ অফিসার যদি তার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অসৎ ভাবে আসামী থেকে ঘুষ খেয়ে মিথ্যে তথ্য দেয় কিংবা আসামীর পক্ষে কাজ করে সেক্ষেত্রে আইন অসহায় হয়ে পড়ে।
একটা তথ্য দেই- ২১ শে জুলাই ১৯৭২ সালে দৈনিক বাংলার একটি খবরের দিকে নজর দেয়া যাক। এই সংবাদের শিরোনাম ছিলো এমন – “পুলিশ রিপোর্ট এর ফাঁক দিয়ে দালালরা বেরিয়ে আসছে”। এই রিপোর্টটির মূল বক্তব্য দাঁড়ায় এমন যে ১৯৭২ সালে দালাল আইনে বিচার চলাকালীন সময়ে কিছু অসৎ পুলিশ অফিসারের ব্যাপারে তীব্র প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। এদের অনেকেই দালালদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলো, কেউ কেউ ব্যাক্তিগত পরিচয়ের সূত্র ধরে সুযোগ নিচ্ছিলো এবং এই অসৎ পুলিশ অফিসারদের মধ্যে বেশীরভাগ অর্থের বিনিময়ে দালালদের পুলিশ রিপোর্টে এমন ফাঁক ফোকর রেখে দিত এবং সেক্ষেত্রে মামলা দূর্বল হয়ে পড়ত। ১৯৭২ সালে দালাল আইনে খোদ ঢাকা থেকেই ১০০০ জনের মত গ্রেফতার করা হলেও শেষ পর্যন্ত পুলিশ রিপোর্ট দেয় মাত্র ১৯ জনের।

অনেকের ক্ষেত্রে রিপোর্ট দিলেও সেই রিপোর্টটি দিত এমন ভাবে যাতে করে পরে গিয়ে দেখা যায় যে অপরাধটি অত্যন্ত মাইনর কিংবা অপরাধের ধরন সুনির্দিষ্ট নয়। স্বাভাবিক ভাবেই দেখা যেতো এই রিপোর্টের উপর ভর করে আসামী জামিন পেয়ে যাচ্ছে কিংবা তার মামলা আসলে খারিজ হয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যেতো পুলিশ বলছে যে আসামীর অপরাধ সুনির্দিষ্ট নয়। স্বাভাবিক ভাবেই খালাশ পেয়ে যেতো আসামী। বন্ধ হয়ে যেতো তার মামলা।

উদাহরণ হিসেবে ঢাকা জেলার কুখ্যাত দালাল, ফকিরাপুলের ফিরোজের কথাই ধরা যাক। পাক বাহিনীকে সাহায্য সহযোগিতা করবার অভিযোগে ফিরোজকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে তার জামিনের আবেদন করা হলে বিচারক ফিরোজের পুলিশ রিপোর্ট এবং ফাইল চেয়ে পাঠান। দেখা যায়, পুলিশ রিপোর্ট অনুযায়ী ফিরোজের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই। সুতরাং জামিন পেয়ে যায় সে। কিন্তু পরের দিন-ই যখন পত্র-পত্রিকাতে তাকে নিয়ে, তার অপরাধ নিয়ে তুমুল ভাবে লেখালিখি হয় তখন পুলিশ আবার তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়। এসময়ে যখন বিচারক আবার ফিরোজের ফাইলটি চেয়ে পাঠায় তখন দেখা গেলো ফিরোজের বিরুদ্ধে দেয়া পুলিশের রিপোর্টটিই নেই আর। জামিন পুন;র্বিবেচনার কথা উঠবার সাথে সাথেই রিপোর্ট গায়েব হয়ে গেছে। এটা শুধু একটা উদাহরণ দিলাম। ১৯৭২ সালের যেই সময়ে সারা দেশ থেকে এভাবে দালালদের গ্রেফতার করা হচ্ছিলো তখন এমন অনেক অসৎ পুলিশ অফিসার এমন ভূমিকা রেখেছিলো এই পুরো ব্যাপারটিতে। [সূত্রঃ একাত্তরের ঘাতক দালালদের বিচার, প্রথম প্রকাশ ১৯৯০, লেখকঃ মোশতাক হোসেন]

এই ছাড়াও কিছু বুদ্ধিজীবি যেমন নির্মল সেন, আবুল মনসুর আহমদ এই দালাল আইনের বিরোধীতা করেছিলেন দেশকে বিভক্তিতে ঠেলে দেয়া হচ্ছে এই কথাটা বলে। সে সময়ে তারা এই নিয়ে একের পর এক পত্রিকায় কলাম লিখতে থাকেন আর বিচার বন্ধে চাপ দিতে থাকেন। আবুল মনসুর তার লেখা বই আমার দেখা রাজনীতির ৫০ বছর গ্রন্থেও এই বিচার নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন।  ১৯৭২ আইনে দালাল আইনে দালালদের বিচারের সরাসরি বিরোধিতা করে এই বিচারের পক্ষে তিনি যে ছিলেন না সেটা স্পস্ট ভাবেই প্রকাশ করেছেন। এই প্রেক্ষিতে আমি রেফার করছি আবুল মনসুর আহমদের “আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর” বইটির ৬০৭ নাম্বার পৃষ্ঠা। যে অংশের শিরোনাম হচ্ছে “চাঁদে কলংক”। এই অংশটি যদি আমরা পাঠ করি তবে জানতে পারব যে আবুল মনসুর আহমদ খুবই স্পস্ট ভাবে এই মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী সময়ে একাত্তরের ঘাতক দালালদের বিচারের পক্ষে ছিলেন না। ইনফ্যাক্ট এই আইন করে বিচার করাকে তিনই অভিহিত করেছেন সর্বগ্রাসী ও মারাত্নক হিসেবে। দালাল আইনে বিচারটাই যেখানে তিনই চান নি সেখানে তিনি আবার এই আইনের সমালোচনা করতে গিয়ে বলেছেন দালাল আইনে ফাঁক ছিলো অপঃপ্রয়োগের।

মুক্তিযুদ্ধের পরের ঠিক মাত্র কয়েক মাসের মাথাতেই যদি এই ক্ষুদ্র একটা অংশ সেই সময়েই বিচারের এই রকমের নানাবিধ বিরোধিতা করতে পারে তাহলে প্রায় ৩৯ বছর পরে (১৯৭২ এর পর ২০১০ সালে বিচার শুরু হয়েছে বিবেচনায়) তো সেই বিরোধিতা আরো প্রকট হবেই। কেন প্রকট হবে?

কেননা এই ৪ দশকে এইসব বিরোধীতাকারীরা তাদের রাজনৈতিক দলকে সু-সংহত করেছে, তাদের ছেলে মেয়েদের বাংলাদেশের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় স্থানে, চাকুরীতে তথা প্রতিটি স্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাদের একটা বড় সমর্থক গোষ্ঠী আস্তে আস্তে গড়ে তুলেছে, বাংলাদেশের মূল রাজনীতিতে ধর্মের নাম দিয়ে কিছু মানুষের কাছে চলে এসেছে, তরুন আর যুবকদের ভুল শিখিয়েছে। তাদের বুঝিয়েছে যে একাত্তরের ভূমিকা ছিলো কেবল মুসলিম বিশ্বকে কিংবা ইসলামকে টিকিয়ে রাখার জন্য। অন্য কিছু নয়।

আবার এই এতসব কিছুর পর গোদের উপর বিষফোঁড়া হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বি এন পি। রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রয়োজনে বাংলাদেশের একটা বড় রাজনৈতিক দল এই রাজাকার-আলবদরদের পরিপূর্ণভাবে সহায়তা করেছে ঠিক যেভাবে করেছিলো ৭৫ পরবর্তী সময়ে জিয়া এবং তারপরে এরশাদ। এইভাবে একটা বড় রাজনৈতিক দলের সমর্থনে আর প্রশ্রয়ে খুব স্বাভাবিকভাবেই এই বিচারের বিরোধীর সংখ্যা বাড়বেই। ১৯৭২ সালে যদি অমন অবস্থা হতে পারে তাহলে ২০১৫ সালে তো সেটা চক্রবৃদ্ধিহারে বাড়বেই। এই সময়ে কি এই ঘাতকেরা বসে ছিলো? তারা তো নিজেদের অপকর্মকে লুকোবার জন্য ধর্ম, রাজনীতি, অর্থের একটা বর্ম তাদের আশে পাশে তৈরী করে রাখবেই।

আর উপরে যা কিছু বর্ণনা করেছি তার প্রতিটি বিষয়ে একটা প্রভাব পড়বেই তাদেরই গড়া নতুন প্রজন্মের প্রতি। এরা শুরু থেকেই জেনে এসেছে যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এই লোকগুলো ঘাতক নয়, এরা অপরাধ করেনি। ফেসবুকের এই প্রজন্মে এই কিছু অংশ বই পড়েনা, ইতিহাসের প্রতি তাদের আগ্রহ নেই। এখন এই দায় কার সেটি নিরূপন আমি করব না, সেটি করতে গেলে অনেক বড় আরো একটি লেখা লিখতে হবে। কিন্তু এটা বলা অনস্বীকার্য যে এই বিভ্রান্ত প্রজন্মটি এখন শাহবাগের মত একটি ন্যায্য আন্দলোনকে ঘৃণা করছে বাপ দাদাদের যোগ্য উত্তরসুরী হিসেবে, শহীদ জননীর গণ আন্দলোনকে তারা ঘৃণা করে, তারা আমাদের এই বিচারের দাবীকে অস্বীকার আর বাতিল বলে মনে করে। তারা এই পুরো ব্যাপারটাকেই রাজনৈতিক প্রহসন মনে করে।

এই প্রহসন শব্দটিও তারা অনুধাবন করবার প্রয়াস পেয়ছে এই বিচার নিয়ে পশ্চিমাদের একটা বড় প্রোপাগান্ডার কবলে পড়ে। আগেই বলেছি এই অভিযুক্তরা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী। সুতরাং ১০ কোটি বা ৫০ কোটি টাকা খরচ করে দুইটা লবিস্ট কিনা, ১০ টা লবিস্ট কিনে ফেলা আসলে ডাল আর ভাতের ব্যাপার। আমি ১ কোটি টাকা যদি আজকে একতা লবিস্টকে দেই, কালকে থেকে সে আমাকে আমেরিকার সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষনা করে দেবে। একটার পর একটা লেখা লিখবে আমার পক্ষে। একটা সময় আপনি হয়ত বিশ্বাস করেই বসবেন যে নিঝুম মজুমদারই হচ্ছে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হবার জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। এটা অনেকটা গোয়েবলসীয় প্রচারের মতন। একটা মিথ্যাকে আপনি ৫০ বার বিভিন্ন ভাবে প্রচার করেন, দেখবেন আপনার মাথায় সেই মিথ্যেটাই সত্য হয়ে বাসা বাঁধবে। সুতরাং কেন এই তরুন অংশটি এই বিচারের বিপক্ষে গেলো বা এই বিচারের বিরুদ্ধে বলছে সেগুলো একটার সাথে আরেকতা কানেকটেড।

রাজাকারদের প্রতি কেন এই দরদ কিছু মানুষের, সেটি ভাবতে ভাবতে এই লেখার সূত্রপাত। কিন্তু এতসব কিছুর পরেও সবচাইতে আশার কথা হচ্ছে, এই অংশটি একেবারেই আইসোলেটেড। বাংলাদেশের এই ট্রাইবুনাল নিয়ে বাংলাদেশের ১৭ কোটির মধ্যে ধরেন ১ কোটি বিরোধীতা করে সর্বসাকুল্যে। কিন্তু বাকী ১৬ কোটি লোক এক বাক্যে এই বিচারের পক্ষে। ৫ তারিখে লক্ষ লক্ষ জনতা ঐ শাহবাগে গিয়ে কিংবা দেশের অন্যান্য অঞ্চলে গিয়ে ২০১৩ সালেই সেটি জানিয়ে দিয়ে এসেছে।

বাংলাদেশের সাধারণ জনতা সারাদিন বাংলাদেশ নিয়ে কিংবা তাদের দেশ প্রেম নিয়ে কথা বলেনা। আমি দেশ প্রেমিক, আমি দেশকে ভালোবাসি এগুলো সারাক্ষণ বলে বেড়ায় না। কিন্তু তারা তাদের সুক্ষ্ণ ইন্দ্রিয় ঠিকই সেট করে রেখেছে এই বিচারের পক্ষে, এই দেশের পক্ষে। সময় আসলেই তারা আগলে রাখবে এই দেশকে।
শাহবাগ আন্দোলনের সময় একজন ভিক্ষুক তার সারাদিনের ভিক্ষার টাকা দিয়ে দিয়েছিলেন সারাদিন স্লোগান দেয়া এক তরুনকে এক বেলা খাইয়ে দেবার জন্য, একজন রিকশাওয়ালা বিনামূল্যে আন্দোলনরত তরুনদের পৌঁছে দিয়েছেন শাহবাগে, বাসওয়ালা টাকা নেয়নি বাসের সেই স্লোগানে মুখর শিক্ষার্থীর জন্য, বাবা মা ঘর থেকে বের করে দিয়ে নিজের সন্তান্দের পাঠিয়েছেন শাহবাগে।
এমন একটা বাংলাদেশে হতাশ হবার আসলেই কি কিছু রয়েছে? উত্তর হচ্ছে, না। হতাশ হবার কিছু নেই।

নিঝুম মজুমদার: লেখক, কলামিস্ট ও আইনবিদ।
ব্যারিস্টার এন্ড সলিসিটর, সুপ্রিম কোর্ট অব নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া;
 এনরোল্ড ব্যারিস্টার এন্ড সলিসিটর, হাইকোর্ট অব নিউজিল্যান্ড।
বসবাস: লন্ডন, যুক্তরাজ্য।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments