কথাসাহিত্যিক ইসহাক খানের মুক্তিযোদ্ধা পুরস্কার প্রত্যাখ্যান

  •  
  •  
  •  
  •  

 1,367 views

প্রশান্তিকা ডেস্ক: মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান, জয়বাংলা এবং বঙ্গবন্ধু’র নাম উচ্চারিত না হওয়ায় একটি আড়ম্বরপূর্ণ সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান থেকে নিজেকে অপসারণ করে তাঁকে দেয়া পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা কথাসাহিত্যিক ইসহাক খান। গত ১ মার্চ ঢাকা প্রেসক্লাবে ভাসানি অনুসারি পরিষদ, ছাত্র পরিষদ, গণ সংহতি আন্দোলন এবং রাষ্ট্রচিন্তা আয়োজিত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে তাঁর প্রত্যাখ্যানকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়। ইসহাক খানের বক্তব্যের পরে বেশ কয়েকজন তাঁর দিকে ক্ষেপেও আসেন বলে সময় টিভির একটি ভিডিও রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে। এসময় তিনি মঞ্চ ত্যাগ করেন। পরে বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা তাঁর বক্তব্যের সাথে সংহতি প্রকাশ করেন।

মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা প্রত্যাখ্যান করে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন বীরমুক্তিযোদ্ধা কথাসাহিত্যিক ইসহাক খান। ছবি: সময় টিভি

প্রশান্তিকার সাথে তাঁর অভিমত ব্যক্ত করে ইসহাক খান বলেন, “ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং যুদ্ধদিনের শ্লোগান ‘জয় বাংলা’ কে অপমান আমি সহ্য করতে পারিনি। তাই জাঁকজমক সেই অনুষ্ঠানে আমি আমার অভিমত ব্যক্ত করে সম্বর্ধনা প্রত্যাখ্যান করেছি।” তিনি আরও বলেন, “সাবেক ডাকসু ভিপি নুরুর রহমান নূরও এই অনুষ্ঠানের একজন বিশেষ অতিথি ছিলেন। আমরা জানি এই নূর যখন মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের দেওয়া কোটা বাতিলের আন্দোলন করছিলেন তখন তার সমাবেশ থেকে শ্লোগান দেওয়া হয়েছে ‘মুক্তিযোদ্ধাদের দুই গালে জুতা মারো তালে তালে’।”

বীর মুক্তিযোদ্ধা ইসহাক খান তাঁর বক্তব্যে পুরস্কার ও সম্মাননা প্রত্যাখান করছেন। ভিডিও কৃতজ্ঞতা: সময় টিভি

অনুষ্ঠান শেষে সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানের অন্যতম আয়োজক গণ সংহতি আন্দোলনের প্রধান জুনায়েদ সাকি বলেন, জয় বাংলা যুদ্ধদিনের শ্লোগান হলেও এখন এটি একটি রাজনৈতিক দলের শ্লোগান। তবে তিনি দাবি করেন, বঙ্গবন্ধুর নাম নেয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানে সম্বর্ধনা গ্রহণ করেন গণস্বাস্থ হাসপাতালের ট্রাস্টি ডা. জাফরউল্লাহ চৌধুরী সহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা।

বীরমুক্তিযোদ্ধা ইসহাক খান অনুষ্ঠান ত্যাগ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেন,
“ স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর শুরুতেই প্রচণ্ড ধাক্কা এসে লাগলো বুকে। এক বড়ভাই মুক্তিযোদ্ধা ফোন করে বললেন, ১ মার্চ স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্বর্ধনা দেবে। আমি আপনার নাম দিয়েছি। আপনি থাকবেনতো?
বললাম, আপনি যখন বলছেন তখন থাকবো। অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা কারা? উনি উদ্যোক্তাদের নাম বললেন না। বললেন, তিন/চারটি সংগঠন মিলে এই সম্বর্ধনার আয়োজন করেছে।
বড়ভাইকে আমি ভীষণ শ্রদ্ধা করি। উনি নিশ্চয়ই আমাকে কোন বিতর্কিত জায়গায় নিয়ে যাবেন না। গিয়েতো আমার আক্কেল গুড়ুম। ব্যানারের নিচে উদ্যোক্তাদের নাম দেখে আমার চোখ কপালে উঠে গেল।
কি করবো বসে বসে ভাবছিলাম। রাষ্ট্রচিন্তার সাধারণ সম্পাদক নইম জাহাঙ্গির নামের একজন মুক্তিযোদ্ধা দীর্ঘ একটি লেখা পড়ে শোনালেন। আল জাজিরার ভাষায় তিনি বর্তমান সরকারকে মাফিয়া আরও যত খারাপ বিশেষণ আছে সব বললেন। তার এই মন্তব্য নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। সরকারের ভুল থাকলে তার সমালোচনা করার অধিকার সব নাগরিকের আছে। সরকারের সমালোচনা আমিও করি। ভুল করলে ভবিষ্যতেও করবো। কিন্তু তার দীর্ঘ প্রবন্ধে কোথাও বঙ্গবন্ধুর নাম নেই।
একটু পর সেখানে আসলেন বাম নেতা জুনাইদ সাকি এবং সাবেক ডাকসু ভিপি নুরুর রহমান নূর। এই নূর যখন মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের দেওয়া কোটা বাতিলের আন্দোলন করছিলেন তখন তার সমাবেশ থেকে শ্লোগান দেওয়া হয়েছে ‘মুক্তিযোদ্ধাদের দুই গালে জুতা মারো তালে তালে’। শরীরে ‘আমি রাজাকার’ লিখেও গর্বিত ভঙ্গিতে প্রদর্শন করেছে কেউ কেউ। সেই নূরের দেওয়া সম্বর্ধনা আমি কিভাবে নেব? এতই কি পচে গেছি?
বসে বসে অস্থির হয়ে আকাশ পাতাল ভাবছিলাম। একসময় আমার নাম ডাকা হলো। আমি মঞ্চে উঠে সোজা মাইকের সামনে চলে গেলাম। মাইক নিতে চাইলাম। বললো, উপস্থাপক বললেন, যা বলার পরে বলবেন। আমি বললাম, আমি এখনই বলবো।
মাইক নিয়ে শুরু করলাম ‘জয়বাংলা’ দিয়ে। বললাম, ‘জয়বাংলা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাহসী মন্ত্র। আমরা যুদ্ধ করেছি জয়বাংলা শ্লোগান দিয়ে। অথচ দীর্ঘ সময় ধরে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান চলছে এখন পর্যন্ত একবারও জয়বাংলা শ্লোগান উচ্চারিত হয়নি। আমরা যুদ্ধ করেছি আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ডাকে। এখন পর্যন্ত এই নামটি একবারও অনুষ্ঠানে উচ্চারিত হয়নি। একজন ছাত্রনেতা কোটা বিরোধী আন্দোলন করে আমাদের সন্তানরা যাতে চাকরি না পায় তার সবরকম চেষ্টা করেছেন। আমি তার এই সম্বর্ধনা প্রত্যাখান করছি। অনুষ্ঠানে ব্যাপক হৈচৈ শুরু হয়। কয়েকজন আমাকে তেড়ে মারতে আসেন। আমি অনড়। একজনকে বললাম, মারবেন, মারেন আমাকে। তারপর আমি অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করি। সেই থেকে মনটা বিষণ্ণ হয়ে আছে।”

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments