গন্তব্য । বড় গল্প । মোল্লা মোঃ রাশিদুল হক

  •  
  •  
  •  
  •  

 220 views

প্রথম পর্ব:
১৯৯৭ সালের জানুয়ারী মাসের এক রাত। স্থান কুমিল্লার দাউদকান্দি গোমতী ব্রীজের (অনেকে দ্বিতীয় মেঘনা ব্রীজও বলেন) নীচে ট্রলার বা নৌকা ঘাট। দিনে তাপমাত্রা ঠিক থাকলেও, এখন বেশ শীত পড়েছে। চারদিকে কুয়াশার কারনে একটু দূরেও কিছু দেখা যাচ্ছে না।
ডাঃ শরিফুল ইসলাম (এমবিবিএস, এফসিপিএস (মেডিসিন), বিসিএস হেলথ, এমডি (নিউরোলোজি)) সাহেব একা ঘাটে দাঁড়িয়ে। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন রেজিস্ট্রার ডাক্তার। বিকেলে হঠাৎ বাড়ি থেকে ফোন আসে। মায়ের শরীর ভালো নেই। জেনে তাড়াতাড়ি রওনা দিয়েছেন রাতের মধ্যেই বাড়ি পৌঁছুবেন আশা করে। গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার মতলব থানার দশপাড়ায়। কিন্তু রাস্তায় মাত্রাতিরিক্ত যানজটের কবলে পড়ে দাউদকান্দি পৌছুতেই তার রাত হয়ে গেছে, তবে এখনও বেশী রাত হয়নি। এখন ভরসা ট্রলার বা নৌকা। এটা দিয়ে কালিরবাজার ঘাটে পৌঁছুলেই মতলবগামী লঞ্চ পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। তবে শেষ লঞ্চ চলে গেছে কিনা বলা যাচ্ছে না।
ছোট একটা টং চায়ের দোকানে হারিকেন জ্বলছে। বাকি সব দোকান বন্ধ। দোকানের লোক দোকান বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

শরিফুল ইসলাম সাহেব তার দিকে এগিয়ে গেলেন।
“ভাই, আমি কালিরবাজার যেতে চাচ্ছিলাম। নৌকা বা ট্রলার কিচ্ছু দেখছি না?”
দোকানদার মাথা ঝাকিয়ে বললো, “শীতকালে এইসময় নৌকা পাওয়ন যায় না। আপনের সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হইবো”।
দেখতে দেখতে দোকানদার দোকান বন্ধ কর চলে গেলো। একটা খাম্বার মাথায় একটা বাতি জ্বলছে, এছাড়া কাউকে বা কিছু দেখা যাচ্ছে না। শরীফুল ইসলাম এখন কি করবেন কিছু বুঝতে পারছেন না। কি মনে করে আরেকবার উনি নৌকা ঘাটে এলেন। হঠাৎ দূরে নদীতে একটা বাতি জ্বলতে দেখা গেলো। বাতিটা ক্রমেই ঘাটের দিকে আসছে। শরীফুল ইসলাম আশান্বিত মনে ঘাটের দিকে এগিয়ে গেলেন। এখান থেকে ৩-৩.৫ কিমি দুরের কালিরবাজার যাওয়ার জন্যে যদি কোন নৌকা পাওয়া যায় !
কিছুক্ষন পর একটা নৌকা ঘাটে এসে ভিড়ল। শরীফুল ইসলাম গিয়ে মাঝিকে জিজ্ঞেস করলেন, ভাই কালীরবাজার যাবেন? মাঝি হ্যাঁ সুচক মাথা নাড়ালে উনি নৌকায় উঠে বসলেন। নৌকা চলতে শুরু করলো। নদী শান্ত, কুল কুল করে পানি সরে সরে যাচ্ছে নৌকার দুই পাশ দিয়ে। ঠান্ডায় শরিফুল ইসলাম সাহেব বেশ জবুথবু হয়ে বসে আছেন। উনি মাঝির সাথে কথা বলার চেস্টা করলেন। মাঝি তেমন কোন আগ্রহ না দেখানোয় উনি এখন চুপচাপ বসে আছেন। ঠান্ডা বাতাসে এক ধরনের ফিসফাস – নদীর বাতাসে কেমন যেন কুয়াশা ঘেরা রহস্য। শরীফুল সাহেব চিন্তিত মনে আজকের দিনের ঘটনা নিয়ে ভাবছেন। প্রায় ২৫-৩০ মিনিট পর কালিরবাজার ঘাটের লঞ্চঘাটের বাতি দূর থেকে দেখা গেলো। লঞ্চঘাটের পাশে নৌকাঘাটে নামিয়ে দিয়ে মাঝি চলে যাচ্ছিল। শরীফ সাহেব টাকা দিতে চাইতেই মাঝি নিতে অস্বীকার করলো।

শরিফুল সাহেব খুব অবাক হলেন, টাকা দেওয়ন লাগবো না। আপনেরে এইখানে নিয়া আসতে আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আমিতো সন্ধায় ঘুমায়ে পড়ছিলাম। ঘুমে স্বপ্ন দেখলাম, আপনে ঘাটে দাঁড়িয়ে আছেন। আপনার সাহায্য লাগবো। তাই আবার নৌকা নিয়ে আসছি। শরীফ সাহেব আরো কিছু জিজ্ঞেস করবেন তার আগেই মাঝি নৌকা ছেড়ে চলে গেল। ধীরে ধীরে তার হারিকেনের বাতির আলো আস্তে আস্তে দূরে  কুয়াশায় মিলিয়ে গেল। শরীফুল সাহেব খুবই অবাক হলেন। এর মানে কি? অলৌকিকতা নিয়ে অবিশ্বাসী শরিফুল সাহেবের জীবনে যুক্তির বাইরে কখনো কিছু ঘটেনি। তিনি ভ্রু কুচকে চিন্তিত মনে লঞ্চ ঘাটে উঠে এলেন।

চাঁদপুর জেলার মতলব থানার কালীর বাজার লঞ্চ ঘাট। গভীর রাত; চারদিকে শুনশান নিরবতা। কোথাও কাউকে দেখা যাচ্ছে না। কয়েকটি দোকান আছে তবে সবই বন্ধ। শরিফুল ইসলাম সাহেব অসহায়ের মতো ডানে-বায়ে তাকালেন। শেষ লঞ্চ কি চলে গেছে? একটু দূরে রাস্তায় এসে দেখার চেস্টা করলেন কেউ আছে কিনা। না, কোথাও কেউ নেই।
হঠাৎ দূরে একটা বাতির আলো লক্ষ করলেন। বাতিটা এদিকেই এগিয়ে আসছে। দেখলেন একটা রিক্সা এগিয়ে আসছে। উনি হাত দেখাতে রিক্সা থেমে গেল। উনি জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন যে শেষ লঞ্চ আরো এক ঘন্টা আগেই চলে গেছে। পরের লঞ্চ আগামীকাল সকাল ১০টায়। উনি মতলব সদরে যাবেন শুনে রিক্সাওয়ালার অনাগ্রহ আরো বেড়ে গেল কেননা সাধারনত কোন রিক্সাওয়ালা প্রায় ৩৫ কিমি দুরের ভাড়া নেয় না। তাছাড়া এতো রাতে কোন বেবী টেক্সিও (থ্রি হুইলার) পাওয়া যাবে না। রিক্সাওয়ালা তার বাড়ির উদ্দেশ্যে চলে গেল।

শরীফ সাহেব এখন কি করবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। উনাকে তাহলে আজকের রাতটা এই লঞ্চঘাটেই বসে বসে কাটাতে হবে? সারাদিনের ক্লান্তিতে শরীর আর সায় দিচ্ছে না। পারলে উনি সেখানেই বসে পড়েন।
উনি দেখার চেস্টা করলেন আসে পাশে কোন বাড়ি আছে কিনা যেখানে রাতটা কাটানো যায়। লঞ্চ ঘাটের একটি দোকানের সামনে কাউকে বিবর্ন এবং কয়েক জায়গায় ছেড়া একটি কাথা গায়ে দিয়ে শুয়ে থাকতে দেখা গেল। শরিফ সাহেব কাছে গিয়ে দাড়াতেই কাথা থেকে মুখ বের করলো দাড়ি-গোফ মন্ডিত এক চেহারা। বয়স বোঝা মুশকিল তবে চল্লিশোর্ধ তো হবেই।
“ভাই, আজ রাতে কি কোনভাবে মতলব যাওয়া সম্ভব?”
“মনে অইতাছে না। … আপনেরে এখানেই রাত কাটাইতে হইবো। …এটাই নিয়তি। এটাই উনার ইচ্ছা”  বলে উপরের দিকে ইশারা করেই লোকটা কাথার ভিতরে মুখ ঢুকিয়ে দিলো।
কথা বার্তায় অনাগ্রহী বাস্তু ভিটাবিহীন লোকটাকে রেখে শরিফুল সাহেব আবার রাস্তায় এসে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষন হাটাহাটির পর উনি দেখতে পেলেন দূর থেকে দুটো জ্বলজ্বলে চোখ আসছে। কাছে আসতেই উনি দেখলেন এটা আসলে একটা কুকুর। দেখতে অন্যান্য দেশী কুকুরের মতো হলেও কি যেন একটা বিশেষ কারণে কুকুরের চোখে উনার চোখ আটকে গেল। কুকুরটা ঠিক উনার চোখের দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে দাড়িয়ে আছে।

একটু পর ঘুরে দাঁড়িয়ে কুকুরটা রাস্তা ধরে কয়েকপা এগুলো, ফিরে তাকালো আবার কয়েক পা এগুলো। যেন অপেক্ষা করছে শরিফুল ইসলাম সাহেবের জন্যে। কি এক অজানা কারনে শরিফ সাহেব ও অনুভব করলেন উনার কুকুরটাকে অনুসরন করা দরকার।
অন্ধকার রাত, কুয়াশায় দূরে তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না। অনেক ক্ষণ পর হয়তো দূরে কোন একটা দোকানের বা রাস্তায় ছোট বাল্বের আলো দেখা যাচ্ছে। কুকুরটা কিছুদূর গিয়ে উনার জন্যে অপেক্ষা করেন, উনি আসলে আবার চলা শুরু করে। ২০-২৫ মিনিট হাটার পর কুকুরটা গ্রামের মেঠো পথ ধরলো। উনি অনুসরন করলেন। আরো প্রায় ২০-২৫ মিনিট হাটার পর কুকুরটা একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেল। যেন বলছে ভিতরে যেতে।
বাড়িটা টিনের তৈরী, এক চিলতে বারান্দায় বাড়ির ভিতর থেকে চুইয়ে আসা আলোয় বোঝা যাচ্ছে বাড়িতে লোকজন জেগে আছে। ভিতরে কারো কাতর কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। কেউ একজন সান্ত্বনা দিচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে।
শরীফ সাহেব বাড়ির দরজায় নাড়া দিয়ে পিছন ফিরে তাকাতেই আর কুকুরটাকে দেখতে পেলেন না। কুকুরটা যেন কুয়াশায় মিলিয়ে গেছে।
কিছুক্ষন পর দরজা খুলে গেলো …।

চলবে।

মোল্লা মোঃ রাশিদুল হক
মেলবোর্ন প্রবাসী শিক্ষক, গবেষক, রাজনীতিবিদ, লেখক ও কবি।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments