নারী হয়ে জন্ম নেয়াটাই কি পাপ? । নাসরিন সুলতানা

  •  
  •  
  •  
  •  

 974 views

অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রকাশিত নান্দনিক কাগজ প্রশান্তিকায় এটি আমার প্রথম লেখা। সুপ্রিয় পাঠক আপনাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে একটা ভয়াবহ পরিসংখ্যান দিয়েই আমার প্রথম লেখাটি শুরু করছি। পরিসংখ্যানটি এরকম: ২০২০ সালে বাংলাদেশে মোট ৩৪৪০ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এরমধ্যে ১০৭৪ জন ধর্ষণ, ২৩৬ জন গনধর্ষণ ও ৩৩ জন ধর্ষণের পর হত্যা ও ৩ জন ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা সহ মোট ১৩৪৬ জন নারী ও কন্যা শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এছাড়া ২০০ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।

নারী হয়ে জন্ম নেয়াটাই কি আমাদের পাপ? অথচ আজকাল নারীরা সকল কাজে এগিয়ে আছে। পুরুষের চেয়ে কোন অংশে কম কি? তবুও কেন কন্যা শিশু বা নারী আপনাদের কাছে বোঝা মনে হয়? আজকাল কন্যার বাবা হওয়াটাকে সবাই মনে করে বিপদের সংকেত।অথচ আল্লাহর বিধান অনুযায়ী রাসূল( সঃ) বলেছেন যে ঘরে কন্যা সন্তান আসবে সেই বাবা মায়ের বেহেস্তের একটা দরজা খুললেন।

নারীরা সমাজে অবহেলিত হয় নানা ভাবে।তারা কাজের ক্ষেত্রে যেমন অবহেলিত তেমনি ঘরের মধ্যেও অবহেলিত। কখনো বাবার কাছে কখনো ভাইয়ের কাছে আবার কখনো স্বামীর কাছে। খোলা চোখে যে নারী নির্যাতন দেখা যায় তার চেয়ে একটু ভিন্ন রকম নিরব নারী নির্যাতনও রয়েছে। একটু উদাহরণ দিলেই বুঝতে পারবেন। যেমন:

কন্যা সন্তান যখন হয় তখন অসংখ্য বাবার কাছে সে হয়ে ওঠে গলার কাঁটা। কারণ তাকে বড় করে বিয়ে দিতে হবে, অঢেল যৌতুকের যোগান দিতে হবে। সেরকম বাবারা ভাবেন টাকা পয়সা খরচ করে পড়াশোনা করিয়ে কি লাভ?মেয়েতো একদিন শ্বশুর বাড়ি চলে যাবে। সেরকম বাবার তখন মনে হবে আহারে সব টাকা জলে গেলো!

ভাইয়ের কাছে নারী বোনও অবহেলিত হয় আরও ভিন্নভাবে। বড় হওয়ার সময়েই যেন তার দিকে আড় চোখে দেখা হয়। ভাই ভাবে আমি বাবার ছেলে তুই মেয়ে। খাবারের থেকে শুরু করে কাপড়, চলার স্বাধীনতা, স্কুলে পড়া সবকিছুতেই যেন মেয়েদের অবহেলা। বিয়ের পর বাবার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়। তারা ভাবে বিয়ের পর মেয়েরা বাবার সম্পত্তি নিবে কেন? যদি কেউ নিজের দারিদ্রের কারণে সম্পত্তি নিতেও চায় তাহলে সারা জীবনের জন্য বাবা- মা, ভাইবোনের সম্পর্ক ছিন্ন করতে হয়।
স্বামীর বেলায় বিয়ের দিন থেকেই শুরু হয়ে যায় তার জন্য অন্যরকম নিয়ম নীতি। দাদীরা শিখিয়ে দেবে দেখিস বাসর ঘরে স্বামীকে সালাম করে তার যত পাওনা মিটিয়ে দিবি।কোন দাবি দাবা রাখবিনা। কিন্তু ইসলাম কি বলে?
“দেনমোহর আদায় না করে স্ত্রীর সংস্পর্শে আসা যাবেনা”। প্রথম স্ত্রীর স্পর্শ পেতে হলে তার কাবিন পরিশোধ করে তারপর স্পর্শ করতে হয়। অথচ কতজন ধার্মিক স্বামী সেটা মেনে চলেন? যৌতুক কি জিনিস সেসব স্বামীর বুঝেন না। কিন্তু ভড়ি ভড়ি গহনা আর ফার্নিচার তাদের চাই। এটা আবার বলতে হয় নাকি?
বাবা নামক যন্ত্রটার তখন বেহাল দশা। নারীরা এভাবে ঘরে যেমন নির্যাতনের শিকার কর্মক্ষেত্রেও তাই। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় একই সময় একই রকম পরিশ্রম করেও তারা পুরুষ সহকর্মীর সমান বেতন পান না।

এবার আসা যাক শারিরীক নির্যাতনের কথায়।
সময়ের ব্যবধানে নারীরা নানা জায়গায় নানা ভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হচ্ছে তার সহপাঠি বা শিক্ষকের কাছে। কখনও স্বামীর কাছে হচ্ছে অথবা কাছের কোন পার্টনার দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে।
আজকাল মোবাইল ফোনে খুব বেশি প্রতারিত হচ্ছে মেয়েরা। মেসেন্জার, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ নামক বিভিন্ন সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে নারীদের জন্য নানাভাবে ফাঁদ পেতে বসে আছে ধর্ষণকামী পুরুষেরা। এক গবেষণায় দেখা গেছে ২০১৭ সালে বিশ্বে গড়ে ৮৭ হাজার নারী এরকম নির্যাতনের শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন।

নারীদের প্রতি নির্যাতনের মাত্রা এভাবে বাড়তে থাকলে আমাদের সমাজ ও মানুষের মানবতা আর থাকবে না। প্রতিটা নারী অথবা পুরুষকে তাদের মনুষ্যত্ব জাগিয়ে তুলতে হবে। কারণ নারীরা পুরুষের কোন না কোন ভাবে নিজের কাছের কেউ। কখনো মা, কখনো জীবন সঙ্গী, কখনো বোন, কখনো মেয়ে, কখনো সহপাঠি। নারী হয়ে জন্ম নেয়াটা কখনো পাপ নয়, আশীর্বাদ।

নাসরিন সুলতানা
লেখক ও সংগঠক
সহ সভাপতি, বঙ্গবন্ধু সাহিত্য পরিষদ
সহ সভাপতি, মায়ের আঁচল সাহিত্য সামাজিক পরিষদ।
ঢাকা, বাংলাদেশ।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments