নিজেই যখন নিজের শত্রু -শরীফা তাসমীম টুলটুলী 

726

ম্যালাদিন পর কিবোর্ডের সামনে। মোটামুটি একটা ভালো খবর আছে। খবরটা হলো নেশাটেশা অনেকটা বাদ দিতে পেরেছি, নিজেই নিজেকে পাঠিয়েছি রিহাভ সেন্টারে। ফেসবুকিও নেশার কথা বলছিলাম আর আরকি।
এবার একটা ঘটনা বলি, মাস দুয়েক আগে ভিক্টোরিয়া পার্ক শপিং সেন্টারে একটা বেঞ্চে কিছুক্ষণের জন্য বসেছিলাম।একজন মহিলা বয়স ৭০ অথবা ৭৫ অথবা এরচাইতেও বেশী হতে পারে।বয়সের ভারে দেহটা কিছুটা নুইয়ে পড়েছে, একটা লং গাউন পড়া, একটা স্কার্ফ হিজাবের মতো করে মাথায় বাঁধা, একটু রোগাটে। লেবানীজ মহিলা তবে ইংরেজি বলার ভঙ্গী অত্যন্ত স্পষ্ট ও সাবলীল মানে অজি ইংলিশ আরকি।

হ্যালো হাই পর্ব শেষ করে তিনি, আমার মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “বই পড়বে, বই সবচেয়ে বড় নিরব অথচ উপকারী বন্ধু,তবে তোমাকে অবশ্যই ভালো বই বেছে নিতে হবে বন্ধু হিসাবে।” পড়ালেখায় মোটামুটি ফাঁকিবাজ মেয়েকে এহেন উপদেশ দেওয়ায় আমি বেশ খুশী হলাম মনে মনে। এবার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, নিজের, নিজের সন্তানের, নিজের স্বামীর, নিজের পরিবারের খুব ভালো থাকার কথা সব সময় সবাইকে বলবে না, কেননা মানুষের চোখ বা মনের মধ্যে ইভেল আই বাস করে। মেয়েকে উদ্দেশ্য করে যেই উপদেশটা তিনি দিয়েছিলেন, তাতে আমি খুশীতে গদগদ হলেও, আমাকে যে উপদেশটা দিলেন তা খুব বেশী মেনে নিতে পারলাম না।চেনা নাই, জানা নাই হুট করে এসে টুপ করে দুখানা সিম্পল উপদেশ দিয়ে বয়স্কা ভদ্রমহিলা চলে গেলেন।
বাসায় আসার পর আমি আমাকে দেওয়া বয়স্কা ভদ্র মহিলার উপদেশটা নিয়ে ভেবেছি অনেক। একজন মানুষের ভালো থাকায় আরেকজন মানুষের মাঝে ইভেল আইয়ের দৃষ্টি অথবা কুনজর থাকে কিনা এ বিষয়ে আমার সঠিক তথ্য জানা নেই। তবে খুব খুব ভেবে যে বিষয়টা আমার মনে হল, আমরা নিজেরা নিজেদের জন্য শত্রু মানে আমি নিজেই আমার নিজের জীবনের জন্য শত্রু হতে পারি। আবার আমি নিজেই আমার নিজের জীবনের মিত্র হতে পারি।
খুব ভাল করে মনে করে দেখলাম, মেয়ে স্কুলে যখন ম্যারিট সার্টিফিকেট পেতো,  তখন সেই ছবি তুলে ফেসবুকে যখন দিলাম, তখন একটার পর একটা কমেন্টস আসতে শুরু হল। আর আমি আনন্দে থাঙ্কু থাঙ্কু লিখতে লিখতে সেই সন্ধ্যায় মেয়েকে ভালো করে পড়াচ্ছি না, তার পরের দিনের হোমওয়ার্ক সে প্রপারলী না করার কারণে, তাকে বকাঝকা দিচ্ছি, আবার বকাটকা খেয়ে সে যখন ঘুমাতে গেলো তখন খুব কষ্ট পাচ্ছি।তাহলে আমার তখনকার এই কষ্টের জন্য কে দায়ী থাকলো,  আমার মেয়ে না যারা অভিনন্দন জানাচ্ছে তারা ?উঁহু, এরা কেউ নয় আমার ওই সময়কার কষ্টের জন্য আমিই দায়ী।
আব্বা মা কে খুব মনে পড়ছে, লিখলাম খুব আবেগ নিয়ে কিছু ফেসবুকে।মনের খারাপ লাগা অনেকটা দূর হলেও সেই রাতে কমেন্ট, লাইক গুনতে, গুনতে আব্বা মায়ের সাথে ফোনে কথা বলার আর টাইমই পেলাম না। ওই যে ওই দিন রাতে আব্বা মায়ের সাথে কথা না বলেই ঘুমিয়ে গেলাম এরজন্য দায়ী কিন্তু অবশ্যই আমি এবং আমার ফেসবুকীও নেশা।
স্বামীর সাথে সুন্দর ফকফকা ছবি ফেসবুকে দিলাম …কিন্তু সেই ওয়াও, জোস, দারুণ, হ্যাপি কাপল এসব কমেন্টসের ভিড়ে কখন আমার বেচারা স্বামী একা একাই ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে গরম করে খেলেন তা টেরই পেলাম না।এই যে তিনি একা একা একটা তরকারি দিয়ে খেয়ে নিলেন, তিনি যে শালগম ভেজে মসলা দিয়ে সুন্দর করে ভুনা তরকারী খেতে খুব পছন্দ করেন তা ফ্রিজের কোন এক তাকে এক কোনায় পড়েছিল তা তিনি দেখলেন না। দেখলেন না কাজরী মাছের সরিষা দিয়ে রান্না করা বাটিটা।তিনি যে সে রাতে তার বৌয়ের সাথে খাবার টেবিলে বসে বসে রাতের খাবার খেলেন না, এরজন্য দায়ী কে ? দায়ী তার বৌ মানে এই আমি।
ফেসবুকের নেশায় বুদ হয়ে এই টাইপের কাজ আমি বহুবার করেছি।
এরপর আসেন, দেশ, সমাজ, কাল রাজনীতি, প্রেম, বিরহ, গাছ, লতাপাতা প্রসঙ্গে।কম তো লিখলাম না ফেসবুকে।কী লাভ ? নাথিং। বিদেশ বসে দেশ, কাল রাজনীতি নিয়ে লিখতে যান, দেখবেন  ভ্রু কুচকাইনা মানুষের অভাব নেই। তারপরে দেশে থাকা বাপ ভাইয়ের নিরাপত্তা ইস্যু তো আছেই।
আমি যে হারে ফেসবু্ক খোর ছিলাম, সেখান থেকে নিজেকে নিজে টেনে হিঁচড়ে সরিয়ে আনা একদম সহজ ছিল না। গত দুইমাস ধরে
নিজেকে নিজে ফেসবুক রিহাভ সেন্টারে পাঠিয়েছি মনে মনে অনেকবার, একটা কিছু লিখতে  ইচ্ছা হল,  লিখি, লিখে আবার অনলি মি করে রাখি। ছবি আপলোড করলাম আবার ঘণ্টা খানেক বাদে আবার ডিলিট অথবা অনলি মী। এভাবে ধীরেধীরে সরে এসেছি।
খুব চরম ফেসবুক নেশা নিয়ে …দু দুখানা উপন্যাস লিখেছি, আমার ধারণা ফেসবুকের নেশা না থাকলে আমার লেখা উপন্যাস দুইখানা চমৎকার হতে পারতো।
এখানে এসে পড়াশোনা করেছি, কোর্স করেছি, জব করেছি, সংসার ভালমতো দেখভাল করতে চেষ্টা করেছি, উপন্যাস লিখেছি, কীন্তু ফেসবুকের নেশাসহ এসব সব যখন করতে গিয়েছি, তখন আমাকে রাত জাগতে হতো প্রচুর, মানে সব কাজ শেষে সবাই ঘুমানোর পর ফেসবুক স্কল করার নেশায় বুদ হয়ে থাতাম, রোজ ঘুমাতে যেতাম প্রায় ভোর রাতে।টানা প্রায় দুই বছর এই রুটিন ছিল। এর ফলাফল হল, খিটখিটে মেজাজ আর শরীরে অবসাদ, এই যে শরীরে অবসাদ অথবা খিটখিটে মেজাজ এসবের জন্য দায়ী কে ? দায়ী এই আমি নিজে।
ফেসবুক অবশ্যই একটা উপকারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।তবে অতিরিক্ত সবকিছুই খারাপ।আমার নেশাটা ছিল, অস্বাভাবিক রকমের অতিরিক্ত।গত দুই মাসে আমি ফেসবুক ব্যবহার করেছি খুব কম তবে বই পড়েছি বেশী,আমার সাথে আমার কন্যাও বই পড়েছে বেশী, ইউটিউব দেখেছে কম।ঘুমাতে যাচ্ছি গত দুইমাস ধরে রাত ১১ টার মধ্যে বেশীরভাগ সময়।ইবাদত করতে পারছি অনেকটা নিয়মিত। ঘুম থেকে উঠতে পারছি নিয়মিত, মেয়েকে স্কুলে পাঠানো বা নিজে জবে যাওয়ার সময় আগের মতো তাড়াহুড়া হচ্ছে না।দুইটা গল্প লিখছি খাতায়, পরে এম এস ওয়ার্ডে লেখা শুরু করবো। এই বছর বই পাবলিশ করতে পারবো কিনা জানি না। একসময় স্বপ্ন দেখতাম এমন একটা জায়গায় নতুন চাকরি শুরু করেছি, প্রবেসনাল পিরিয়ডে তাই সিরিয়াস থাকতে চাই।

এই জীবনে মানুষ ও জগত সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম বহু, বিশেষ করে প্রবাস জীবনে এসে।মানব মনের থাকে স্বার্থপরতা,অকৃতজ্ঞতা, পরনিন্দা, হীপক্রেসী আবার এই মানব মনের মধ্যেই থাকে কতো ত্যাগ, তিতিক্ষা, বিশালতা,মহত্ত্ব।সব লিখতে চাই গল্পাকারে।
আবারো বলছি ফেসবুক একটা খুব ভালো যোগাযোগ মাধ্যম। মাসে এক দুইবার ফেসবুকে টুকটাক লিখবো, তবে নিত্যদিন নয়, ঘুরতে গেলে সুন্দর সুন্দর গাছ প্রকৃতি লতাপাতার ছবি দিবো, তবে রোজকার নয়।আমি অনলাইনে না থাকলেও আমাকে অনলাইনে দেখা যায়, কারণ আমার জীওলজীসটকে এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানে ন্যাশনাল জিওগ্রাফী চ্যানেলের ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ডের মতো জায়গায় বা অঞ্চলে থাকতে হয় মাসের পনেরো দিন, সেখান থেকে তিনি আমার সাথে মাসেঞ্জারে যোগাযোগ করেন, তাছাড়া বাড়ী থেকেও মাসেঞ্জারে কল আসে।
ফেসবুক থেকে পুরোপুরি নেশামুক্ত আমি নিজেও হতে চাই না, তবে অতিরিক্ত নেশাটা বাদ দিয়ে থাকতে চাই।এ জীবন বড় সুন্দর, নেশার ঘোরে সুন্দর জীবনে অবসাদ আনা অন্যায়। এই নেশার ঘোর কাটানোর জন্য ওই সেই লেবানীজ ভদ্রমহিলার উপদেশের ভূমিকা অসীম।যদিও তার যুক্তিতে আমি পুরোপুরি বিশ্বাস না করলেও তার উপদেশ আমাকে ভাবিয়েছে পজেটিভলী।

শরীফা তাসমীম টুলটুলী
লেখক, শিক্ষক ও কমিউনিটি ওয়ার্কার
পার্থ, অস্ট্রেলিয়া।