প্রকাশের ইতিকথা, গভীরতা ও ব্যাপ্তি । দীন মোহাম্মদ মনির

  •  
  •  
  •  
  •  

 364 views

কথায় যা প্রকাশিত, হাসিতে যা প্রকাশিত, চোখের জলে যা প্রকাশিত এবং মুখাবয়বে যা প্রকাশিত, এর অন্তরালে কতটুকু অনুভূতি বা প্রাণের অন্তরে ঘটে যাওয়া ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া অপ্রকাশিত, তার খবর অনেকেই রাখি না। ফলে, মানুষ সম্পর্কে তথা মানুষের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সর্বদাই একটি অসম্পূর্ণ অনুভব সৃষ্টি হয়। অনুভবটি ধারনা সৃষ্টির প্রাথমিক উপাদান, আর ধারনাটি উপসংহার তথা সমাধানের দিকনির্দেশক। সুতরাং, অনুভবের অসম্পূর্ণ আদান-প্রদানে মানবসংশ্লিষ্ট অবকাঠামোটির বিশৃংখলা অনিবার্য। সামাজিক বিশৃংখলা, মানবিক অন্যায়, সম্পর্কের ভাঙ্গন বা দূরত্ব তৈরীর নেপথ্যে রয়েছে ঐ অপ্রকাশিত এবং অনাবিস্কৃত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার বিস্তারিত ও সম্পূর্ণ রূপটি সম্পর্কে অবগত হওয়ার ব্যর্থতা। শব্দহীন এক ফোটা চোখের নোনা জলে যে বৈষম্য, অন্যায়, অবমাননা বা অবমূল্যায়ন লুকায়িত, তার কারন উদঘাটনে অল্পসংখ্যকই সচেষ্ট ও সফল। দানব তুল্য এ সমস্তের নির্মম ঝড়ে, মন মহাসমুদ্রে সৃষ্ট ঢেউয়ের আঘাতে, আপন সততার নি:স্বার্থ উপাদানে তৈরী, আশা-মায়া-ভালবাসার উষ্ণতা লাভ ও প্রসারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ঘরটিতে ফাটলের কারনে, চোখ দিয়ে ঐ নোনা জল গড়িয়ে পড়ার এ নেপথ্য কাহিনী খুব অল্পসংখ্যকই বুঝে। প্রকাশটি একফোটা জল হলেও এর গভীরতা সমুদ্র তুল্য। তথ্যটি প্রকাশ, আর গভীরতায় রয়েছে তত্ত্বটি। তত্ত্বটির খোঁজ না পেলে, প্রকাশটি গুরুত্বহীন। প্রকাশটি প্রকাশকের ঘটনা প্রতিক্রিয়ার বাহ্যিক রূপ আর প্রকাশ পঠনের সুনিপুণ দক্ষতাটি পাঠক ভূমিকায় থাকা স্বজনের। স্বজন বিবেচিত হতে পারাটি কৃতিত্ব এবং এটি প্রশংসনীয়। স্বজনের মুকুট রাজমুকুট তুল্য যা অর্জিত হলেই পরিধেয়। অতএব, প্রকাশিত তথ্যের সঠিক ও বিস্তারিত তত্ত্ব উদঘাটনে স্বজন ব্যর্থ হলে স্বজন পদচ্যুত হয়ে সাধারন জনে পরিনত হবে। হাসির খোরাক যোগান দেয়া, বেদনার কারন উদঘাটন করে তা প্রশমিত করা, কথার যথাযথ মূল্যায়ন করা স্বজনের কর্তব্য। একই ভাবে প্রকাশটি যেন সততার বহি:প্রকাশ হয়, তার দায়ভার প্রকাশকের। সুতরাং অযথা কথা, মেকি হাসি, মাছের মায়ের পুত্রশোক তুল্য মায়া কান্না ও অভিনয়টি প্রকাশককে গুরুত্বহীন করে এবং পরিশেষে স্বজনহারা করে। সততাটি প্রকাশকের মূলধন আর বিচক্ষনতাটি স্বজনের স্বজন দাবী করার পূর্বশর্ত।

প্রকাশ এবং তার প্রক্ষিতে স্বজনদের যথাযথ আচরন ও কর্মযজ্ঞের চর্চা ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে সামষ্টিক ও রাষ্ট্রিয় পর্যায়ে অনুশীলনযোগ্য। একজন শিক্ষকের অবমূল্যায়ন আর বঞ্চনা ভারাক্রান্ত মুখাবয়বে যা প্রকাশিত, একজন ধর্ষনের শিকার মানুষের চাহনিতে যা প্রকাশিত, একজন আঘাতগ্রস্থের নীরবতায় যা প্রকাশিত তা যথাযথ ভাবে পড়তে না পারলে, স্বজন দাবী অযৌক্তিক । একই সীমারেখায় বসবাসরত, একই জাতীয় সঙ্গীতের সুর মূর্ছনায় আন্দোলিত ও একই পতাকাতলে থাকার অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়ে একে অপরের স্বজন না হওয়া যুক্তিবিরুদ্ধ। সুতরাং, প্রকাশটি যেখানে, যেভাবে ও যার মাধ্যমেই হোক, তার যথাযথ প্রতিক্রিয়ায় সব স্বজনেরা সাড়া দেবে এবং স্বজনেরা বা তাদের প্রতিনিধিরা প্রকাশটির প্রতিক্রিয়া অনুকূল সমাধানে সমাপ্ত করবে এটিই স্বাভাবিক পদক্ষেপ। এ পদক্ষেপে নীরবতা বা না বুঝার অভিনয়টি উত্তাপ সৃষ্টির সহায়ক, যা বিন্দু বিন্দু বাস্প তৈরীর মাধ্যমে ঘনীভূত কালো মেঘে রূপান্তরিত হয় এবং পরবর্তীতে ঝড়ের রূপে আবির্ভূত হয়।

প্রকাশ সমূহ ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় তথা আন্তর্জাতিক পরিমল্ডলে যথাক্রমে ব্যক্তিগত সম্পর্কের, পারিবারিক ন্যায়-অন্যায়ের, সামাজিক অসংগতির, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক জুলুম-নির্যাতনের বাহ্যিক রূপ। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যা সত্যিকারে ঘটছে তা সম্পূ্র্ণ রূপে প্রকাশিত হচ্ছে কি না, কিংবা প্রকাশের ক্ষেত্রে কোন প্রকার বাঁধা বা প্রভাব সংযুক্ত হচ্ছে কি না, অথবা প্রকাশ সাবলীল ভাবে হলেও ন্যায়সংগত ভাবে তার সমাধান হচ্ছে কি না। সৎ প্রকাশ যেমনি গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিষয়টি কতটুকু আমলে আনা হয়, সেটি। প্রকাশের স্বাধীনতা, প্রকাশের স্বচ্ছতা ও প্রকাশের সাহসিকতা বাঁধা ও প্রভাবমুক্ত প্রকাশের পূর্ব শর্ত। একটি প্রকাশমাধ্যম হিসাবে সংবাদপত্রের ভূমিকা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক মাধ্যম গুলিও ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ মাধ্যমে রূপান্তরিত হয়েছে। প্রযুক্তির কল্যানে সামাজিক প্রকাশমাধ্যম গুলি গনমাধ্যমে রূপান্তরিত হচ্ছে, কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য যে, এগুলিও গোষ্ঠী বা দলীয় স্বার্থ সাপেক্ষে নিয়ন্ত্রিত। পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ঘটে যাওয়া ঘটনাসমূহ যেভাবে প্রকাশিত, তাতে কতটুকু বাস্তবিকতা রয়েছে কিংবা আদৌ প্রকাশিত হচ্ছে কিনা, তা সর্বদাই সন্দেহযুক্ত। ফলাফল হলো- বিভ্রান্তি, অব্যাহত অন্যায়-জুলুম-নির্যাতন ও অন্যায় ভাবে স্বার্থ হাসিল। ভূক্তভোগীর দীর্ঘশ্বাস সৃষ্ট ধুম্রজাল ভেদ করে কখনোই সহানুভূতি লাভের জন্য সচেতনে পৌঁছে না। প্রকাশকে সঠিক রূপে প্রস্ফুটিত হতে না দেয়ায় এ সংস্কৃতি রাষ্ট্র, সমাজ, পারিবার ও ব্যক্তি পরিসীমায় চলমান। সৎ ও নির্ভীক সাংবাদিকতা বহুল কাংখিত একটি কর্ম যার উপর নির্ভর করে সংবাদ প্রকাশ মাধ্যম ও অন্যান্য গনমাধ্যম গুলির গুনগত মান টিকে থাকে। এ সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গদের রক্ষা করা ও তাদের সময়কে উপযুক্ত ভাবে মূল্যায়ন করা নির্মল প্রকাশ সংস্কৃতির জন্য সহায়ক। প্রকাশ মাধ্যমে যেন উঠে আসে গনমানুষের আত্মার করা, বঞ্চনার কথা, অন্যায়ের কথা, খুশির কথা, মানুষের সাফল্যের কথা; অর্থাৎ, প্রকাশ মাধ্যমটি সত্যিকার অর্থে যেন মানুষের কন্ঠ হিসাবেই বিবেচিত হয়। শুধু ভাষা কেড়ে নেয়া হবে বলে গর্জে উঠেছিল সমগ্র জাতি এবং তা রক্ষার্থে প্রান দিয়ে শহীদ হয়েছিল কতিপয় মহাপ্রাণ। অন্যদিকে, সমগ্র জাতির কন্ঠ রোধ বা নিয়ন্ত্রন করে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনটি যেন শুধুই হাস্যকর এক তামাশা। প্রকাশ মাধ্যম বা সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা যুক্তিযুক্ত ভাবেই অতি প্রয়োজনীয় একটি মৌলিক মানবকল্যাণসংশ্লিষ্ট উপাদান যা নিশ্চিত না হলে জাতির পরিচালকবৃন্দের লজ্জিত হওয়াই উচিৎ। তদ্রূপ, মত প্রকাশে বাঁধা, মত প্রকাশে হুমকি কিংবা মতামত চুরি জঘন্য অপরাধ বলেই গন্য হয়।

প্রজন্ম পরিবর্তনের সাথে সাথে ধারনার পরিবর্তন হচ্ছে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই ধীরে ধীরে আত্মনির্ভরশীল হচ্ছে। বাস্তবতার আঙ্গিকে প্রায় সকলেই এখন অকার্যকর পুরোনো ধারনায় অবগাহন করছে না। অকপটে প্রকাশ করছে মনের কথা। অন্তরের আন্দোলন, অন্তরের চাহিদা ও অন্তরের বাসনাকে দিনের পর দিন চাপা রাখলে মানবাত্মা সম্পূর্ণরূপে পরিতৃপ্ত হয় না, এ ব্যাপারটি প্রজন্ম ভালভাবেই উপলব্ধি করছে। মনের গহীনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সমূহ শুধুমাত্র সামাজিক বিধি-নিষেধের কারনে অপ্রকাশিত রাখার সংস্কৃতি স্থায়ী বঞ্চনা সৃষ্টি করে। সাধারন বিচারে সামাজিক বিধি-নিষেধ মেনে চলা কর্তব্য, যেহেতু এতে সামাজিক বিশৃংখলার সম্ভাবনা কম; কিন্তু যে সমাজে বিধি-নিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে মানবসংশ্লিষ্ট বিষয় গুলি অবহেলিত হয়, সেখানে প্রকাশহীন, নিশ্চুপ ও সহনশীল ভূমিকা অক্ষমতার পরিচায়ক। সাধারন মানুষ বোধ-বুদ্ধিহীন নয়। শুধুমাত্র নির্ভেজাল ও সহজ-সরল জীবনের ব্যাঘাত ঘটবে এ আশংকায় প্রকাশবিমুখ থাকতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে, যদিও এ স্বাচ্ছন্দ বোধের আড়ালে হাজারো প্রাপ্তি যা মানবরূপের সম্পূর্ণতায় জরুরী, তা অজানাই রয়ে যায়। ক্ষমতাবান শিক্ষিত মানুষদের কাজ সমাজের বিধি-নিষেধ সমূহের যথার্থতা নিরীক্ষণ করে অসংগতি সমূহ প্রকাশ করা। শিক্ষিত হয়ে এ ক্ষমতাটি অর্জিত না হলে, শিক্ষিত বলে দাবী করা যুক্তিহীন, আর যুক্তিহীনটি অসত্য বা মিথ্যা। শিক্ষা, অগ্রসরতা ও প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা করা। সাম্যবাদ এ অর্থে যে, যার যা প্রাপ্য তা নিশ্চিত করা। প্রাপ্য বন্টনে সহায়ক অপ্রীতিকর সত্যটি প্রতিষ্ঠায়, সৎ প্রকাশটি এজন্যই জরুরী। প্রাপ্যটি এক্ষেত্রে অর্থ-সম্পত্তি, স্বাধীনতা, ক্ষমতা ও সম্মান।

নির্ভেজাল সমালোচনা ও সৎ মতামত আদান-প্রদানের সংস্কৃতি প্রচলিত হিসাবে প্রতিষ্ঠিত নয় বলেই ভেজাল আর অসততার জয় জয়কার চারিদিকে। নির্ভেজাল সমালোচনা মানে, যে সমালোচনায় ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, লোভ ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট নয়; বরং, সেখানে শুধুই গঠনমূলক ও সার্বজনীন প্রাপ্তি আকাংখা বিদ্যমান থাকবে। তদ্রূপ, সৎ মতামতটিও গঠনমূলক ও সার্বজনীন অলংকারে সমৃদ্ধ হবে, যা ব্যক্তিগত স্বার্থ বিবর্জিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। একটু ভাবলেই বুঝা যায় যে, ব্যক্তির আচরণ ও কার্যক্রম সেই ব্যক্তিপরিবেষ্টিত পরিচিতজনদের প্রতিক্রিয়া নির্ভর বা প্রভাবিত। কারন, পরিচিতজনদের স্বীকৃতি ধনাত্মক প্রভাবক হিসাবে কাজ করে আর অস্বীকৃতিটি ঋনাত্মক প্রভাবকের ভূমিকায় আপত্তিকর আচরণ বা কার্যক্রম সম্পাদনে ব্যক্তিকে নিরুৎসাহিত করে। সুতরাং, গঠনমূলক সমালোচনা গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকাশ প্রতিক্রিয়া যা আমূল সংশোধনে সহায়ক হতে পারে। অনেকের ধারনা, সমালোচনা ভাল কাজ নয়। যারা এ ধারনা পোষন করেন, তারা সমালোচনা বলতে পরচর্চা বা গীবত বুঝেন। পরচর্চা বা গীবত গ্রহনযোগ্য নয়, অন্যদিকে সমালোচনা একটি কর্তব্য যা হতে হবে প্রকাশ্যে এবং যা সার্বজনীন কল্যান বহনে সক্ষম। প্রকাশের পূর্বে এ পার্থক্যসূচক বিচারবোধ থাকা একান্তই জরুরী। বৃহত্তর স্বার্থে এক বা একাধিক ব্যক্তি আহত হলেও তাতে অনুতাপ বোধ সমীচীন নয়।

বর্নহীন জীবন এবং অসম্মানিত ও মূল্যহীন ব্যক্তিসত্তা থেকে নিজেকে উত্তোরণ করলেই প্রাপ্তিগুলি সাবলীল হয়। প্রকাশের যথাযথ আদান-প্রদান ব্যতীত এ সাবলীল ধারা অক্ষুন্ন রাখা অসম্ভব। উপকার বা আনুকূল্য প্রাপ্তির বিনিময়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করলে, এ লেন-দেন এর সাম্যাবস্থা নষ্ট হয়। আনুকূল্য দানকারী যদিও মানবিক বোধ কিংবা কর্তব্যবোধে তাড়িত হয়েই দানটি করে, তথাপি, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ প্রাপ্তিটি তাকে আবারও কর্মটি করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং পাশাপাশি প্রকাশকারী ব্যক্তিটির প্রতি তার হৃদয় আরো সদয় হয়। সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে বিশ্বাসীগন তদ্রূপ একই বিনিময়ের বোধে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ স্বরূপ প্রার্থনামগ্ন থাকেন। তবে, এ প্রকাশে সর্বদাই মৌখিক ভাষা ব্যবহার অপরিহার্য নয়। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ স্বরূপ- মুখের হাসি, চোখের বিনয়ী চাহনি অথবা অন্যান্য অনুকূল ব্যবহার মৌখিক সেই প্রকাশের প্রতিস্থাপক হতে পারে। এ প্রকাশ প্রদান যেমন উপকার গ্রহনকারীর কর্তব্য, তেমনি ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ ভাষা পড়তে পারাটিও দানকারীর বিচক্ষনতার পরিচায়ক। আবার, স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনায় প্রকাশের যথাযথ ব্যবহারও অপরিহার্য । সহজ ভাষায় কোথায়, কখন এবং কার নিকট কি প্রকাশযোগ্য তা বুঝতে পারা জরুরী। অরণ্যে রোদন সেজন্যই অর্থহীন। সর্বজনস্বীকৃত প্রকাশের রূপটিও মাঝে মাঝে ব্যক্তিভেদে ভিন্ন অর্থে বাহিত হতে পারে। একক ব্যক্তির ব্যক্তিগত পটভূমি, তার দ্বারা গৃহিত বার্তাটির প্রেক্ষিতে প্রতিক্রিয়া, ব্যক্তির নিরপেক্ষতায় সীমাবদ্ধতা ও পরিশেষে প্রকাশকারীর সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্কের অনুপযুক্ত বিশ্লেষনে প্রকাশটি ভিন্ন অর্থে গৃহিত হতে পারে। সুতরাং, প্রকাশকারীকে পাত্র বিবেচনাপূর্বক উপস্থাপনার কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। তবে, মনে রাখা জরুরী যে, প্রকাশটির বার্তাটি যেন মূল অর্থ থেকে বিচ্যুত না হয়। সে জন্যই, একই বার্তা কখনো কখনো গানের সুরে, কখনো কবিতার ছন্দে, মাঝে মাঝে কৌতুক রসে প্রকাশের কৌশল বেছে নেয়া হয়। ‘যেথায় যা প্রযোজ্য’- এ কারনেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা।

প্রকাশ জগতের পুংখানুপুংখ ধারনা এবং এর ব্যাপ্তি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারনা থাকলে, ব্যক্তি তার নিজস্ব অবস্থানে থেকে করনীয় সম্পর্কে পরিস্কার থাকতে পারে। মতামত প্রকাশ করার পূর্বে লাভ-ক্ষতির পর্যালোচনা দূরে রেখে প্রকাশ করাই নৈতিক। এ ক্ষেত্রে নীতি-বোধ বিবর্জিত হলে মানুষ প্রজাতির অন্তর্ভূক্ত বলে দাবী করাটি যুক্তিযুক্ত ভাবেই অযৌক্তিক । বিশেষ করে অন্যায় ও অসংগতিপূর্ণ বিষয়াদি নিয়ে প্রতিটি মানুষেরই কন্ঠ নি:সৃত প্রতিবাদ বা ক্ষোভ প্রকাশ একটি অবশ্য কর্তব্য কর্ম। এটিকে বলা হয় ভাল অনুশীলন যা করতে করতে এক সময়ে অভ্যস্ততায় পরিণত হয় এবং একসময় সকলের অভ্যাসে অন্তর্ভূক্তে হলে সামগ্রিক কল্যান সাধিত হয়। সৎ মতামত এ জন্যই দরকার। ‘এসব বলে কি হবে?’- এ উক্তি একদিকে যেমন অন্যায়কারীকে অন্যায় করতে প্রশ্রয় দেয়, অন্যদিকে এ প্রকাশ একক ব্যক্তির দায়িত্বহীনতারও পরিচায়ক। বিন্দু বিন্দু পানি যদি সমুদ্র সৃষ্টির কারন হয়, তাহলে বিন্দু বিন্দু প্রকাশ ভূমিকাও মহাগর্জন তৈরীতে সক্ষম। মহাগর্জনে অনেক কিছুই অর্জন সম্ভব, যা কালান্তরে উৎসাহব্যঞ্জক জয়সূচক হিসাবে প্রজন্মের মধ্যে স্থায়ীরূপে প্রোথিত রয়। পক্ষান্তরে প্রকাশহীনতা বা প্রকাশবিমুখতা আস্তে আস্তে একটি স্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী বঞ্চনার ক্ষেত্র তৈরী করে, আর যেহেতু এ ক্ষেত্রেই আমার আবাদ, সেহেতু বঞ্চনার কারনে সৃষ্ট অনুর্বরতা আমাকেই একজন ফসলহীন দরিদ্রে পরিনত করবে।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments