স্মৃতি যত বেদনার হোক সতত মূল্যবান । পিয়ারা বেগম

  •  
  •  
  •  
  •  

 1,114 views

সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, মিলন-বিরহ জীবনের স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনা। তবুও আমরা দুঃখে কাতর হই, শোকে মূহ্যমান হই, বেদনায় ভারাক্রান্ত হই। আবার আনন্দে উল্লসিত হই, উৎফুল্লে আত্মহারা হই। তবে কোথাও নেই নিরবিচ্ছিন্ন সুখ।
জীবনে না পাওয়ার বেদনা অনেক। আবার পেয়ে হারানোর বেদনা আরও করুণ ও মর্মান্তিক। তবে কোন বেদনাই কোনোটার চেয়ে কম নয়। পার্থক্য শুধু অনুভবে, উপলব্ধিতে। আসলে চোখের পানি যে ফেলে সে-ই জানে তার ব্যথা- যে দেখে সে জানে না। দুঃখ-বেদনা বা শোকের কারণ যাই হোক, যারা দুঃখ-বিলাসী তারা বেদনাকে স্মৃতি বানিয়ে ফেলে। এতে তাদের পুরো জীবনটারই ছন্দপতন ঘটে। আবার কারো ক্ষেত্রে শোক- তাপ, দুঃখ-বেদনা তাদেরকে নতুনভাবে সত্যকে উপলব্ধি করতে সহায়তা করে। কষ্ট, দুঃখ-বেদনার প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। এতে ভেতরে নতুন প্রত্যয় সৃষ্টি করে। এই প্রত্যয়ই শোক, দুঃখ-বেদনাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে নতুন করে বাঁচার আশা জাগায়।

পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক বিখ্যাত সৃষ্টি, কীর্তি-স্থাপনা, সাহিত্য-কাব্য, গান আছে যা শোক বেদনার সৃষ্টিশীল প্রকাশ। আসলে, যার জীবনে অপ্রাপ্তি বা দুঃখ বেদনার পরিমাণ যত বেশি তার জীবনে অর্জনও তত বেশি। মূলত প্রকৃতি কারো কাছ থেকে কিছু কেড়ে নিলে তার বদলে তাকে অবশ্যই কিছু দিয়ে থাকে।
আমরা যদি পৃথিবীর বড় বড় সাহিত্যিক, শিল্পী  এবং বিজ্ঞানীদের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাব তাদের জীবনে অপ্রাপ্তি ছিল, গভীর শোক ছিল, বেদনাবোধ ছিল। যাকে তারা পরিণত করেছেন সৃজনশক্তিতে। বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম মাত্র আট বছর বয়সে পিতৃহারা হন। প্রচন্ড অর্থ কষ্টের মধ্য দিয়ে তিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। প্রেমের ক্ষেত্রেও তার ব্যর্থতা ছিল, বেদনা ছিল, ছিল পুত্র শোকও। কিন্তু সব শোককে তিনি রূপ দিয়েছেন তার সাহিত্য কর্মে। শ্রেষ্ঠ দুটি মহাকাব্যের রচয়িতা অন্ধ এবং ভিক্ষুক এক গায়ক কবি নিজের জীবনের অপ্রাপ্তিকে, বেদনাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে কালজয়ী সাহিত্য কর্মের জন্য জগদ্বিখ্যাত হয়ে আছেন, তিনি হলেন মহাকবি হোমার।

আরেকজন যার জীবনে কখনো স্কুলে পড়ার সুযোগই হয়নি। তিনি বিশ্বের কালজয়ী উপন্যাস ‘মা’ এর রচয়িতা। তার বেদনাবোধ আর অপ্রাপ্তি ভরা অবাঞ্ছিত জীবনের রূঢ় বাস্তবতাই তাকে ম্যাক্সিমভিচ থেকে ম্যক্সিম গোর্কি করে গড়ে তুলেছিল। মহীয়সী নারী হেলেন কেলার জন্মান্ধ এবং শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী ছিলেন। গভীর প্রচেষ্টায় তিনি কথা বলা শেখেন। কলেজ থেকে ডিগ্রিও লাভ করেন। লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। সফল বক্তা হিসেবে খ্যাতি পান। জীবনের সব অপ্রাপ্তিকে তিনি সাহিত্যে রূপ দিয়েছেন।

ভারতের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট বিখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী এপিজে আবদুল কালাম ছিলেন একজন খেয়া নৌকার মাঝির ছেলে। অবস্থা বিপাকে তাকে হকারি করে পড়ার খরচ চালাতে হতো। অথচ তার বেদনাবোধই তাকে পরমাণু বিজ্ঞানী করে গড়ে তুলেছিল। তিনি বহু গ্রন্থও রচনা করেছেন। ভালোবাসা বা প্রেমে ব্যর্থতা অনেকের হৃদয়-মন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। কখনো এমন মনে হয় যে, সে বিহনে তার জীবন-জগৎ অন্ধকার। সে মানুষটির অভাব অন্য কাউকে দিয়ে পূরণ হবার নয়। অর্থাৎ জীবনের এর পরিপূরক তার কেউ হতে পারবে না। তেমনি একজন চার্লস ডিকেন্স, যার লেখার পারিশ্রমিক প্রতি শব্দের জন্য ছিল পনের ডলার। চার্লস ডিকেন্স ‘মারিয়া বীডনেল’ নামে এক মেয়ের প্রেমে পড়েন কিন্তু তার প্রেমের দুঃখজনক পরিণতি ঘটেছিল। কারণ বিয়ের ঠিক আগ মুহূর্তে না করে বসে মেয়েটি। বিয়ে আর হল না। প্রচন্ড মানসিক আঘাতে তিনি বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেন। অথচ তিনি তার ভালোবাসাকে লেখার মধ্যে সঞ্চার করে দিলেন। ফলে তার ভাঙা-মনের গভীর ক্ষত থেকে উঠে আসে আবেগ। এতে মারিয়ার চরিত্রটিকেই তিনি পরবর্তী সময়ে তার বিখ্যাত ‘ডেভিড কপার ফিল্ড’ উপন্যাসে ‘ডোরা কপার ফিল্ড’ চরিত্র হিসেবে রূপায়িত করেছেন। এই উপন্যাসে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।

আরেকজন ছিলেন নরওয়ের নোট হামসুন নামের একজন ভদ্রলোক। জীবনটাই ছিল তার আগাগোড়া ব্যর্থতায় ভরা। জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে তিনি তার জীবন সংগ্রামের ব্যর্থতার ঘটনাগুলো গল্পের আকারে লিখবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। তার লেখা সেই ‘হাঙ্গার’ নামক বইটি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিল। হামসুনের ভয়ংকর অভিজ্ঞতাগুলোই শেষ পর্যন্ত তাকে ধনী এবং বিখ্যাত করে তুলেছিল।
আইজাক নিউটন এক অন্তরঙ্গ মুহূর্তে তার প্রেমিকার হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়েছিলেন। হঠাৎ বিজ্ঞানের একটা গভীর তত্ত্বের কথা মনে আসলে তিনি এমনই আত্মমগ্ন হলেন যে, মেয়েটির হাতের আঙ্গুলকে সিগারেট ভেবে তাতে আগুন ধরিয়ে দিলেন। মেয়েটি ভয়ে চিৎকার করে উঠলো। বিয়ে ভেঙে গেল। নিউটনও ওই নারীকে ভুলতে পারেনি বলে জীবনে আর বিয়েই করেনি। তার বিরহ ও অনুশোচনা তাকে জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী করে গড়ে তুলেছিল। কিছু কিছু বেদনা মানুষের জীবন-ভাবনাটাকে একেবারেই পাল্টে দেয়। এমনি বহুমাত্রিক প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব, শিল্পের সারথি মুর্তজা বশীর। ১৯৫৪ সালের ঘটনা। তখন রমনাপার্কে আন্তর্জাতিক বানিজ্যমেলা চলছিল। মুর্তজা বশীর তাঁর প্রিয় বন্ধু কাইয়ুম চৌধুরীকে নিয়ে মেলায় ঘুরতে যান।। মুর্তজা বশীরের উচ্চতা ছিল ৫ ফুট। বিপরীতে কাইয়ুম চৌধুরী বেশ লম্বা- ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি। দুজনেই টগবগে তরুণ। একজন বেশী লম্বা আরেকজন খাটো। ফলে দুজনকে একসাথে নজরে পড়ার মতোই। অথচ সেই মুহূর্তে গায়ের রং শ্যামলা, চোখে কাজলপরা এক মেয়েকে ভালো লেগে গেল মুর্তজা বশীরের। তিনি মেয়েটির পিছু নেন, এ দোকান থেকে সে দোকানে। তখনি মেয়েটির বান্ধবী বলে, দেখ দেখ ছেলেটি আবার এসেছে। বান্ধবীর কথা শুনে মেয়েটি মুর্তজা বশীরের দিকে তাকিয়ে মাটিতে থুথু ফেলে। চোখ-মুখ বাঁকা করে বলে, বেটে কোথাকার। মুর্তজা বশীর একসময় সেই স্মৃতিচারণ করে বলেন, “এই প্রথম দেখলাম, একটি রমণীর চেহারা ঘৃণায় কতটুকু কুৎসিত হতে পারে। প্রতিজ্ঞা করলাম, আমি আমার এই অসৌন্দর্য শিল্পের গরিমা দিয়ে ঢেকে দিব।”
হ্যাঁ, এটাই তাঁর শিল্পী জীবনের বড় প্রেরণা হিসাবে পরবর্তী সময়ে ভূমিকা রেখেছে। আর তিনি সারা জীবন জেদটাকে বহাল রেখেছেন। সে জেদ আরো এবং আরো নতুন কিছু সৃষ্টির। তাই তো তিনি একাধারে চিত্রকর, কবি, শিক্ষক, লেখক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, শিল্প নির্দেশক, গবেষক ও মুদ্রাবিশারদ। এত পরিচয় নিয়েই মূর্তজা বশীর বাংলাদেশের শিল্পকলার আকাশে উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। আসলে মানুষের মধ্যে উচ্চতর স্পৃহা তখনি আসে যখন তার মধ্যে কোনকিছু নিয়ে বড় কোন বেদনার জন্ম ঘটে। আর বেদনায় জেগে ওঠাটাই আসল শক্তি। এতে ভেঙ্গে-চুরা বিধ্বস্ত মনটাকে ঘুরে দাঁড়াতে উদ্যোম সৃষ্টি করে। তেমনি আব্রাহাম লিংকন, লিয়োতলস্তয়, শেক্সপীয়ারও এমনি করে জীবন সংগ্রামে জয়ী হয়েছিলেন। তারা ব্যর্থতাকে, শোককে শক্তিতে পরিণত করেছিলেন।

মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমীর লিখেছিলেন ‘Wound is the place where the light enters’ অর্থাৎ ‘কষ্ট হচ্ছে সেই জায়গা যেখান দিয়ে আলো তোমার ভিতর প্রবেশ করবে’। মহামানবরা নিজেদের কষ্ট আর বেদনাবোধকে সৃজনশীলতায় রূপ দিয়েছিলেন। আসলে দুঃখ-কষ্ট ছাড়া মানুষ কখনো মহৎ হতে পারে না। আগুন যেমন সোনার খাদকে নষ্ট করে তাকে খাঁটি সোনায় পরিণত করে তেমনি পোড় খাওয়া মানুষগুলো আরো দক্ষ, চৌকস এবং শক্ত পোক্ত হয়ে জীবনে বিজয়ী হন। মূলত বেদনাই সৃষ্টির উৎস। বেদনার মধ্য দিয়েই সৃষ্টি সফল হয়। তাই স্মৃতি যত বেদনারই হোক না কেন তা অতি মূল্যবান। তাই তো রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘এমন দুঃখ আছে যাকে ভোলার মত দুঃখ আর নেই।’

পিয়ারা বেগম
কবি, কথাসাহিত্যিক  ও প্রাবন্ধিক
নারায়ণগঞ্জ, বাংলাদেশ।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments