অদৃশ্য ছায়া নিয়ে ক্ষুদে লেখিকা আরিয়ানা খন্দকার

 অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯ এ প্রকাশিত আরিয়ানা খন্দকারের দ্বিতীয় গল্প গ্রন্থ ‘‘Invisible Shadow” ‘‘অদৃশ্য ছায়া’’

শুরুর গল্প:  ছোট বেলা থেকেই, সবার থেকে একটু আলাদ আরিয়ানা। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময়, পথ শিশু, রিকশাচালক, ফুল বিক্রেতা, ভিক্ষুক ইত্যাদি পেশায় জড়িত, মানুষদের দিকে, এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আরিয়ানা। পরক্ষণেই তাদেরকে নিয়ে নিজের ভাবনায় সাজিয়ে ফেলেন, ছোট ছোট গল্প। যে গল্পে উঠে আসে, একটি পথ শিশুর ভবিষ্যত কিংবা একজন রিকশাচালকের কষ্ট। রিকশায় করে কোথাও যাওয়ার পর, তার বাবা-মা যখন রিকশাচালককে ভাড়া দিতেন, তখন তিনি অর্থের মূল্য বুঝে। কিছুতেই হিসেব মিলাতে পারে না। তার ভাবনা, একজন মানুষ রিকশা চালাবে, আর আমরা সেই মানুষ হয়ে, আরামে বসে থাকবো? কেন এই ব্যাবধান। আর এই অল্প কিছু টাকা দিয়ে, সে কি করবে? নানা ভাবনায় আচ্ছন্ন থাকে তার মন।

রাতে ঘুমের ঘোরেও অদ্ভুদ সব স্বপ্ন দেখেন। এবং ঘুম থেকে উঠেই তাকে একটি কাজ করতে দেখা যায়, তা হলো, একটি ডাইরিতে, সে তার স্বপ্নগুলো লিখে রাখতো, নিজের মতো করে। অতঃপর একদিন তার বাবা-মা তার ডাইরিটা খুলে, ছোট ছোট গল্পগুলো দেখে অবাক হয়ে যায়। এতটুকু মেয়ে, কি ভয়ঙ্কর সব স্বপ্ন, আর কি গভীর তার চিন্তাধারা, ভাবনা। আরিয়ানার পরিবার সিদ্ধান্ত নেয়, এই ছোট ছোট স্বপ্ন এবং ভাবনায় লেখা গল্পগুলো দিয়ে, একটি বই বের করবে। অতঃপর, একজন প্রকাশক রাজি হয়ে যায়, আরিয়ানার বই ছাপাতে। অমর একুশে গ্রন্থমেলায় ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয়, তার প্রথম বই, “An Ant Climbed A Hill To Die’’ এবং সবাই অবাক হয়ে যায়, বইটির রেকর্ড সংখ্যক বিক্রিতে। মাত্র ৪ ঘন্টায় প্রায় ৭০ কপির উপরে বই বিক্রি হয়ে যায়।

 অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৮ এ প্রকাশিত আরিয়ানা খন্দকারের প্রথম গল্প গ্রন্থ ‘‘An Ant Climbed A Hill To Die” 

এই পুরো বিষয়টি আরিয়ানাকে আরো আগ্রহী করে তুলে। বন্ধু-বান্ধব, পরিবারের সদস্যরা সবাই তাকে অনুপ্রেরণা দেয়। প্রতিদিনিই সে বিভিন্ন বিষয়ে লিখে। প্রস্তুত হয়, পরবর্তী গ্রন্থ মেলার জন্য। আরিয়ানা ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্রী বলে, তার প্রথম বইয়ের গল্পগুলো সব ইংরেজীতেই ছিলো। তবে সবার পরামর্শে সে বাংলাতেও লিখা শুরু করে।

অবশেষে এ বছর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয়, তার দ্বিতীয় গল্পের বই ‘‘Invisible Shadow’’ বা ‘‘অদৃশ্য ছায়া’’। বইটি প্রকাশিত হয়, বর্ণপ্রকাশ লিমিটেড এর ব্যানারে। বইটির পরিবেশনায় আছে, পারিজাত পাবলিকেশন। অমর একুশে গ্রন্থ মেলায় ২০৬-২০৭ নং স্টলে আরিয়ানার বইটি পাওয়া যাচ্ছে।

পরিবার ও পড়াশোনা: আরিয়ানা ২০০৬ সালে, ২১ জুলাই ঢাকায় জন্মগ্রহণ করে। তার বর্তমান বয়স ১৩ বছর। তার বাবা খন্দকার এনামুল হক, মা মেরিনা জাহান। বাবা-মা দু’জনেই চাকুরীজীবী হওয়ায়, আরিয়ানার শৈশবকালটি কেটেছে, তার নানুর সাথে, গাজীপুর শহরে। সপ্তাহে একদিন দেখা হতো মা’র সাথে। বাবার সাথে হয়তো ১৫ দিনে একবার। বাবা-মাকে ছেড়ে একাকী নানুর কাছে বেড়ে ওঠাও তার ভাবনার জগৎকে প্রসারিত করে। অতঃপর একটু বড় হওয়ার পর, ঢাকায় চলে আসা, বাবা-মা’র সাথে। এখানেও তাকে পুরোটি দিন, একাকী কাটাতে হয়েছে। বাবা-মা অফিসে যাওয়ার পর, ছোট্ট মেয়েটি পুরো বাড়িতে  একাকী বড় হয়েছে। তার প্রথম স্কুল, লাইসিয়াম ইন্টারন্যাশনাল  স্কুল এন্ড কলেজ। পরবর্তীতে কার্ডিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল। বর্তমানে সেন্ট পিটারস স্কুল অফ লন্ডনের গ্রেড- ফোর এর ছাত্রী।

আরিয়ানার কথা: আরিয়ানা তার বন্ধু মহলে, একটি বিষয় লক্ষ্য করেছে, যে, বর্তমান সময়ে তার বয়সী বেশিরভাগ ছেলে-মেয়ে, মোবাইল, ট্যাব ল্যাপটপে বেশি সময় কাটাচ্ছে। তাদের জ্ঞানের পরিধি ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে আসছে। আরিয়ানা তার সব বন্ধুদের নিজের প্রকাশিত বই উপহার স্বরূপ দেয়। এবং সবাইকে অনুরোধ করে, গল্পগুলো পড়ে, তাকে জানাতে। তারপর থেকে তার বন্ধুরা তাকে আরো নতুন নতুন গল্প লেখার জন্য অনুরোধ করে। যা আরিয়ানাকে বেশ অনুপ্রাণিত করে। আরিয়ানা বলে, তার বন্ধুরা এখন আর মোবাইল কিংবা ট্যাব নিয়ে অতটা সময় ব্যায় করে না। সবার মাঝে আস্তে আস্তে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছে। এভাবে আরিয়ানা তার বন্ধুদের দল বড় করতে থাকে।

আরিয়ানা মনে করে, সমাজের সব ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যদি তার বই হাতে পায়, তারা গল্পগুলো অবশ্যই পড়বে। আর পড়লে তাদের ভালো লাগবে। এভাবে ধীরে ধীরে ছোটদের মাঝে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠবে।

আরিয়ানা প্রতিবছর একটি করে বই বের করার জন্য ইচ্ছে পোষণ করে।