অন্তহীন মেঠো পথে (পর্ব ১) -অনীলা পারভীন

  •  
  •  
  •  
  •  

সমরেশ মজুমদারের ‘সাতকাহন’ উপন্যাসের দীপাবলি হতে চাইতাম। দীপাবলির মত সরকারি অফিসার হয়ে, চাকরির সুবাদে বিভিন্ন জায়গার যাব। আবার কখনো, শওকত আলীর ত্রয়ী উপন্যাস, ‘দক্ষিণায়নের দিন’এর রাখী হতে ইচ্ছে হত। যে কিনা বিভিন্ন গ্রামে-গঞ্জে গিয়ে গিয়ে গবেষণার কাজ করে। এসবই স্বপ্ন থেকে গিয়েছিল। কারণ, আমার জন্মস্থান ঢাকার অদূরে, আধা-মফস্বল শহর, কেরাণীগঞ্জে। যা কোনোভাবেই গ্রাম নয়। ওখানে বেড়াতে গেলে, আমরা কাজিনরা আয়োজন করে ঘুরতে বের হতাম।  একটু ভেতরের দিকের এলাকাগুলিতে যেতাম। ধানক্ষেত, সরিষাক্ষেত দেখে ভাবতাম, গ্রাম দেখা হয়ে গেল। কিন্তু সত্যিকার অর্থে গ্রাম কেমন? গ্রামের মানুষগুলো কেমন? তাদের জীবনের গল্পগুলো কেমন?

ঢাকার বাসিন্দা হবার কারণে, সেসব গল্প জানা-বোঝার সুযোগটা হয়ে উঠেনি কখনো, কোনোভাবেই। বাংলাদেশটাকে আমরা ক’জনে কাছে থেকে দেখেছি? কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সুন্দরবন, সিলেটের চা বাগান কিংবা রাঙামাটি আমাদের অনেকেরই দেখা। কিন্তু এগুলো দেখলেই কি বাংলাদেশ দেখা হয়ে যায়? সত্যিকারের বাংলাদেশ তো পুরোপুরি তা নয়। গ্রামবাংলাকে, গ্রামের মানুষের জীবন-জীবিকাকে অর্থাৎ দেশের মানুষকে তৃনমূল পর্যায় থেকে দেখা এক ভিন্ন ব্যাপার।

২০০০ সালে প্রশিকার গবেষণা বিভাগে কাজ শুরু করলাম। ২০০১ এ, Englandএর East Anglia University এর সাথে Collaborationএ, “Livelihood of the Extreme Poor in Bangladesh” নামে একটি প্রজেক্টে কাজ শুরু করতে গিয়ে, দেশটাকে দেখার সুযোগটা যেন হাতের মুঠোয় চলে এল।


প্রফেসর ড. জ্যানেট শেলি এবং ড. ইকবাল আলম খান ছিলেন আমাদের সুপারভাইজর। আমরা এক ঝাঁক তরুণ ছেলেমেয়ে গবেষক হিসেবে নিযুক্ত হলাম। প্রশিকাতে যে কোনো উর্ধতন কর্মকর্তাকে স্যার নয়, বরং ভাই বা আপা ডাকার প্রচলন ছিল। যে কারণে বসদের সাথে সম্পর্কটাও খুব সহজ ছিল।

যেহেতু হতদরিদ্র নিয়ে কাজ, তাই গ্রাম-গঞ্জের মানুষ নিয়েই কাজ হবে, এটাই স্বাভাবিক। কাজের শুরুতে চৌষট্টিটা জেলাকে, প্রথমে আটটি ভাগে ভাগ করে, যাচাই বাছাই শেষে তেত্রিশটা দরিদ্র জেলা নির্ধারণ করা হলো। সেখান থেকে আবার তেরোটা উপজেলাকে গবেষণার জন্য বেছে নেয়া হলো। যত সহজে কথাগুলি বলে ফেললাম, কাজটা তত সহজ ছিল না। একেকটা বাছাই পর্বের জন্য নানা তথ্য-উপাত্ত এবং কয়েকদফা ফিল্ড ভিজিট করতে হলো। গবেষণার শুরুতে প্রথম ছয় মাস দলের অন্যান্যরা ফিল্ড ভিজিটে যেত। এক পর্যায়ে আমি লক্ষ্য করলাম, আমাকে ফিল্ডে পাঠানো হচ্ছে না। যদিও বলা হয়েছিল, রোটেসন করে সবাইকেই ফিল্ডে পাঠানো হবে। কিন্তু আমার পালা তো আর আসে না। ওদিকে আমি ফিল্ডে যাবার জন্য মুখিয়ে আছি। এক সময় আর ধৈর্য্য ধরে রাখতে না পেরে, ইকবাল ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলাম, আমি কবে ফিল্ডে যাব। ইকবাল ভাই একটু আমতা আমতা করে বললেন,
-দেখো তুমি খুব ভাল কাজ করছো। জ্যানেটও তোমার কাজে খুশি। কিন্তু তোমাকে আমি ফিল্ডে পাঠাতে চাই না।
আমি তো শুনে থ!
– কেন ইকবাল ভাই?
– দেখো, তোমাকে আমি যতটুকু জেনেছি, তুমি পুরোপুরি শহুরে মেয়ে। গ্রাম কি তা জানো না। কোনোদিন গ্রামে যাওনি। গ্রামের পথে কোনোদিন হাঁটনি। তুমি গ্রামের মানুষের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয়, তা জানো না। তাই আমি সেই রিস্কে যেতে চাচ্ছি না। তুমি অফিসের কাজগুলিই করো।
কথাগুলি শুনে খুবই মুষড়ে পড়লাম। আমার কত শখ ফিল্ডে গিয়ে কাজ করার। বললাম,
– ইকবাল ভাই, আমি কি একটা সুযোগ পেতে পারি? একবার আমাকে পাঠিয়ে দেখেন, যদি Performance ভালো না হয়, তাহলে office based কাজ করতে আমার কোনো আপত্তি থাকবে না।
-আচ্ছা, আমি একটু ভেবে দেখি। ইকবাল ভাই উত্তর দিলেন।

খুব মন খারাপ হলো। ঢাকার মেয়ে হওয়াটাই যেন আমার জন্য পাপ হয়ে গেল। আমার সহকর্মীরা বিভিন্ন জায়গা থেকে কাজ সেরে ফিরে আসে। তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলে। ওদের কষ্টকর, অথচ চাঞ্চল্যকর ও মজার সব কাহিনী আমি শুনি আর বিষণ্ণ হয়ে পড়ি।  কিভাবে সবাইকে বোঝাই যে আমি ওদের সাথে যেতে চাই? আমিও গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে কাজ করতে চাই।

কয়েকদিন পর ইকবাল ভাই জানালেন আমাকে ফিল্ডে পাঠাবেন, তবে সেটা পরীক্ষামূলকভাবে পাঠানো হবে। আমাদের সিনিয়র গবেষকদের সাথে যাব, ফিরে এসে তারা যদি আমার কাজের ভাল রিপোর্ট দেন, তাহলেই মূল কাজে পাঠানো হবে। আমি তাতেই মহাখুশি। আমার বিশ্বাস ছিল, ইকবাল ভাই আমার কাজে নিরাশ হবেন না। জায়গা নির্ধারিত হল টাঙ্গাইলের পাথরঘাটা।
শীতের এক কুয়াশা ঢাকা ভোরে, আমরা পাথরঘাটার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

প্রতিটা জেলায় প্রশিকার নিজস্ব অফিস ছিল, যাকে বলা হয় ADC- Area Development Centre। ওখানে থাকা খাওয়ার সুবন্দোবস্তও ছিল। আমরা যথারীতি পাথরঘাটার ADCতে উঠলাম। আমার সাথে আরও পাঁচজন ছেলেমেয়ে। আমরা ভোরে বেড়িয়ে যেতাম। সারাদিন FGD (Focus Group Discussion) চলতো। জীবনে প্রথমবারের মতো আমি কাছে থেকে গ্রাম ও গ্রামের মানুষ দেখার সুযোগ পেলাম। তখন আমরা এক একটা গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারকে বাছাই করার কাজ করছিলাম। প্রথমে আমাকে ডিসকাশনের নোট নেয়ার কাজটা দেয়া হলো। আমার নোট নেয়ার দক্ষতা দেখে, শেষ দিন আমাকে ডিসকাশন পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হলো। প্রথমে খুব ভয় পেলেও ডিসকাশন শুরু করার পরপরই ভয় কেটে গেল। আমি গ্রামের লোকজনের সাথে খুব সহজ ভাবে মিশে গেলাম এবং সফলতার সাথে শেষ করলাম।


কাজের শেষদিন সূর্য উঠার আগে আমরা হাঁটতে বের হলাম। কুশায়ায় ঘেরা গ্রামের পথ ধরে হাঁটছি। দু’পাশে ধানক্ষেত।কেমন স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল সব কিছু। বার বার কানে বাঁজছিল,
“গ্রাম ছাড়া ওই রাঙ্গামাটির পথ…”
আমরা গেলাম গুড় তৈরীর আখড়ায়। গুড় কিভাবে তৈরি হয় জীবনে প্রথম দেখলাম। বিশাল বড় বড় মাটির ডেকচিতে আখের রস জ্বাল দিয়ে গুড় বানাচ্ছে। যা দেখি তাই ভালো লাগে। আমার কাছে এসবই নতুন, রোমাঞ্চকর!
ঢাকায় ফিরে সিনিয়ররা আমার ব্যাপারে ভাল রিপোর্ট দিলেন। এবার ইকবাল ভাই কিছুটা আশ্বস্ত হলেন। তবে তাঁর মুখ দেখে বুঝলাম শঙ্কা পুরোপুরি কাঁটেনি।

ক’দিন পর আমাদের বারজনকে নিয়ে চারজন করে তিনটা দল তৈরী করা হলো। প্রত্যেক দলকে মাসে দুইবার ফিল্ডে যেতে হবে। আমাদের দলটির ভাগে প্রথমে পড়লো কোটালিপাড়া, গোপালগঞ্জ। শুরু হলো জীবনের ভিন্নধর্মী একটি অধ্যায়।
(চলবে)

অনীলা পারভীন: কর্মকর্তা, ইউনিভার্সিটি অফ সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।