অন্তহীন-সাকিনা আক্তার

394


অবাক করে দেয়ার মতো অদ্ভুত সব কাণ্ড ঘটাতে আমার বাবার কোন জুড়ি নেই। সেদিন ভোরবেলায় হাঁক ডাক শুনে মনে হলো নিশ্চয়ই কিছু একটা ঘটেছে।
আমরা দেখলাম বাবার সাথে কেউ একজন। একি ! বাবা তুমি আবার এ কাকে ধরে নিয়ে এলে ? বাবা আমাদের সবার দিকে চেয়ে এমনভাবে হাসছেন যেনো, খুব একটা রহস্যময় আনন্দ যেনো আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। শেষটায় জানা গেলো এই নির্লিপ্ত, ভাবলেশহীন  সুদর্শন অদ্ভুত চেহারার মানুষটি সাত দিন হলো অন্য গ্রহ থেকে এসেছেন। এই লোকের সাথে কথা বলার পর বাবার সিদ্ধান্ত এই যে, সে ‘অসাধারণ’ এবং দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত এই যে আজ এক রাতের জন্যই এর সাথে হবে আমার বিয়ে।

আমি চিৎকার করে কাঁদছি কিন্তু কেউ আমার কোন কথাই শুনছে না। কোনরকম ঘনঘটা ছাড়াই সে রাতে আমার বিয়ে হয়ে গেলো ‘অসাধারণ’ লোকটির সাথে। আমি অব্যক্ত এক ব্যথা নিয়ে অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ালাম।

আমাদের বাসরঘর, দুদিকে বসে আছি দু’জন। অসাধারণ বরটি জানালার পাশে বিছানায় আধাশোয়া পা নাচাচ্ছে আর কি যেনো একটা বই পড়ছে গভীর মনোযোগ দিয়ে। মাঝে মাঝে আড়চোখে আমাকে দেখছে আর মিটিমিটি হাসছে। যতোবার সে আমার দিকে তাকাচ্ছে, ততোবার আমি চিৎকার করে কাঁদছি, রাগে দু:খে বেদনায়। এক রাতের জন্য বিয়ে আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিনা। অসহ্য লাগছে তার অসাধারণ সুন্দর হাসিও। কেনো এমন হলো আমার ?

আমি তন্ময় হয়ে দেখছিলাম করুণ কোমল স্নিগ্ধ চাঁদের আলো। জানালা দিয়ে উদাস দৃষ্টি মেলে হঠাৎ মনে হলো, আজকের এই রাতটা এতো সুন্দর হবে যে, শুধুমাত্র এই রাতের কথা স্মরণ করার জন্যই আমি বেঁচে থাকতে চাইব আজীবন। সত্যিই কি তাই ?

ওমা একি কাণ্ড ! লোকটা বই পড়া বন্ধ করে উঠে বসে কি যেনো সব গল্প বলতে শুরু করেছে। এমন সুন্দর করে যে কেউ কথা বলতে পারে আমার ধারনাই ছিল না। শুনতে শুনতে আমি যেনো একটু ভালোবাসতে শুরু করেছি তাকে। একসময় নিজেকে অবাক করে দিয়ে আমি ওর সামনে গিয়ে বসলাম টলমল চোখে ছোট্ট শিশুর মতো। অবাক হয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওর কথা শুনছি আমি। একদিকে হাসি উচ্ছ্বাসে আবার অন্যদিকে চোখের জল আটকে রাখতে পারছি না কিছুতেই। এ এক অদ্ভুত অনুভূতি। কাউকে বুঝিয়ে বলার মতো কোন শক্তি বা ভাষা বা অবকাশ আমার নেই। এ আনন্দ স্বর্গীয় এ বেদনা অপার্থিব। আমার কেবলি মনে হলো এ অসাধারণ লোকটি যদি এলোই, মাত্র এক দিনের জন্য কেনো ? আমাকে শান্ত করতে সে তার চোখে মুখে এক উজ্জ্বল দীপ্তি ছড়িয়ে, আমার হাত ধরে মিটিমিটি হাসতে হাসতে বলল , আমি চলে যাবো বলেই কি তুমি কাঁদছো? শোন তোমার ভালোবাসা দিয়ে আমাকে জয় করে নিয়েছো। তাই আশ্চর্য এক উপায়ে আমি এই রাতকে আটকে ফেলেছি এক অদৃশ্য জালে। এ রাত আর কখনো ফুরোবেনা। এরাত অনন্ত নক্ষত্রবীথির মতো চির অম্লান, চির সত্য।

আচ্ছা, এতোক্ষণ যা কিছু ঘটল সবই কি সত্য ছিলো ? কিন্তু তা কি করে হয়। প্রতিটি নি:শ্বাস, ছোঁয়া এসব কিছুই আমি অনুভব করতে পারছি আমার সমস্ত অস্তিত্বে। গতরাতে তার দেয়া তারা ফুলটা এখনও আমার ভেজা বালিশের পাশে পড়ে আছে রূপালী ঝিলিক নিয়ে। এসবই কি মিথ্যে ? সবই কি স্বপ্ন ? আমি জানিনা। এ মুহূর্তে এক ধরনের ভালো লাগা আমাকে ঘিরে রেখেছে। আজীবন বেঁচে থাকার সাধ বড় হচ্ছে। অনুভবে ওর স্পর্শ পাচ্ছি। তবে হয়তো আমি পৌঁছে গেছি সেখানে, যেখানে মিশে আছে স্বপ্ন আর সত্যি। মনে হয় আমি পৌঁছে গেছি স্বপ্ন আর সত্যের মিলন বাস্তবতায়। মনে হয় আমি পৌঁছে গেছি, যেখানে স্বপ্ন আর সত্য এক হয়ে মিলে যায়।