অন্ধকার – শিমুল শিকদার

  •  
  •  
  •  
  •  

বিবর্তনবাদ তত্ত্ব নিয়ে ডারউইনের আগে অনেক বিজ্ঞানীই অনেক কথা বলেছেন। লেমার্ক বলেছিলেন, প্রতিটি প্রাণীই জন্ম নেয় পুরোপুরিভাবে তার বাবা মায়ের আকার, আকৃতি আর চরিত্র নিয়ে। পিতামাতা তাদের জীবদ্দশায় যে অভিজ্ঞতা অর্জন করে তা তাদের সন্তানদের মধ্যে প্রবাহিত হয়। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলে, মানুষের জীবদ্দশার অভিজ্ঞতার সবকিছু তাদের ডিএনএ তে সংরক্ষিত হয় না। তাই তাদের সন্তানদের মধ্যে পিতামাতার সবকিছুই প্রবাহিত হওয়ার সুযোগ নাই।

ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্ব প্রকাশিত হওয়ার পর লেমার্কের মতবাদ বাতিল হয়ে যায়। ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্ব অনুসারে, মানুষের শরীরের DNA-এর সাম্পলিং হয় একেবারেই র‍্যান্ডমভাবে। প্রতিটি মানুষের শারীরিক গঠন ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট তৈরি হয় তার পূর্বপুরুষদের থেকে ধার করে। যেমন একজন মানুষের মুখমণ্ডল হয়তো তার নানার ফুপুর মতো, কিন্তু চোখ হয়তো তার দাদির বাবার মতো। সে হয়তো নানীর মায়ের মতো বুদ্ধিমান, অথচ বাবার দাদার মতো হিংস্র। প্রতিটি মানুষের শারীরিক, চারিত্রিক গঠন, আচার-আচরণ তার পূর্বপুরুষ থেকে DNA এর মাধ্যমে র‍্যান্ডমভাবে প্রবাহিত হয়ে মানুষের শরীরে আসে। শারীরিক ও মানসিক গঠনের সাথে সাথে DNA মানুষের পূর্বপুরুষদের পুরনো অনেক স্মৃতিও বহন করে নিয়ে আসে। অনেক সময় দেখা যায়, কোন শিশুর হাইড্রোফোবিয়া আছে, পানি দেখলে সে প্রচন্ড ভয় পায়। শিশুটির পূর্বপুরুষের কারো হয়তো পুরো পরিবার বানের জলে ভেসে গেছে। ঘটনাক্রমে বেঁচে গিয়েছে সেই মানুষটি। পরিবারের একমাত্র বেঁচে থাকা সেই সদস্যটি প্রিয়জন হারানোর দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে তার বাকী জীবন পার করেছে। সে স্মৃতি DNA এর মাধ্যমে অনেক প্রজন্ম পাড়ি দিয়ে সেই শিশুটির মধ্যে চলে এসেছে। শিশুটি ঘুমের মধ্যে দেখে তার পরিবারের সমস্ত মানুষ, ঘর বাড়ি বানের প্রবল স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। ভয়ে শিশুটি চিৎকার করে ঘুমের মধ্যে কেঁদে ওঠে। একইভাবে আরেক শিশু হয়তো আগুন দেখলে প্রচন্ড ভয়ে শিহরিত হয়ে ওঠে। তার পূর্বপুরুষের কারো হয়তো আগুনে পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে। সেই ভয়াবহ স্মৃতি এই শিশুটির DNA এর মধ্যে চলে এসেছে গেছে।

বিবর্তনবাদ মতে, মানুষের পূর্বপুরুষদের কিছু কিছু দুঃসহ ঘটনা, ভয়াবহ স্মৃতি আছে যা তাদের DNA তে চিরস্থায়ী হয়ে গেছে। প্রতিটি মানুষের DNA-তেই জন্মগতভাবে সেই স্মৃতি ফিরে আসে। আমাদের আধুনিক মানুষদের মনে অন্ধকার ভীতি, সেরকমই এক উদাহরন। অন্ধকারের প্রতি এই ভীতি আমাদের DNA-তে এসেছে আমাদের আদি পুরুষ থেকে।
আমাদের আদিম গুহাবাসী পূর্বপুরুষদের কাছে রাতের কালো অন্ধকার ছিল বিভীষিকাময়। রাতের আঁধারে পশুরা শিকারের খোঁজে ঘর ছেড়ে বের হয়। অন্ধকারে পশুরা মানুষদের চেয়ে ভালো দেখতে পারে। ঝোপের অন্ধকারে বসে থাকা হিংস্র সে সব পশুরা মানুষদের কায়দা মতো পেলেই আক্রমন করে বসতো। ঝাঁপিয়ে পড়ে টেনে নিয়ে যেতো। গুহাবাসী মানুষেরা তাই সন্ধ্যার আঁধার নামার সাথে সাথেই নিরাপত্তার প্রয়োজনে গুহার ভিতর ঢুকে পড়তো। তখনো হয়তো আগুনের আবিস্কারই হয়নি। রাতের আঁধারে চাঁদ তারার মৃদু আলো ছাড়া আর কোন আলোর সাথে তাদের পরিচয় ছিল না। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে তারা তাই অসহায় হয়ে পড়তো। বন্য প্রাণীর আক্রমন ছাড়াও ছিল ঝড়, বন্যা, প্লাবন, শীতের ঠাণ্ডা, তুষারপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। সূর্যাস্ত থেকে শুরু করে সূর্যোদয় পর্যন্ত এই দীর্ঘ রাতে ঘুম ছাড়া বাকি সময়টুকুতে গুটিসুটি মেরে বসে কালো অন্ধকারের দিতে তাকিয়ে ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। ভোরের আলো ফোটার অপেক্ষা করে করে আমাদের পূর্বপুরুষরা তাদের জীবনের শীতল, ঘন অন্ধকার রাতগুলো জড়সড়ভাবে দলবদ্ধ হয়ে পার করতো। এভাবে কেটেছে লক্ষ লক্ষ বছর। রাতের ঘোর এই কালো অন্ধকার থেকেই গুহাবাসী সেই মানুষগুলোর মনে কালো রংটার প্রতি প্রচণ্ড ভীতি জন্ম নিয়েছে।

আমাদের অসহায় সে পূর্বপুরুষরা কালো অন্ধকার রাতের নানান দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে দীর্ঘ যে সময়টা কাটিয়েছে, সে স্মৃতি অস্ট্রালোপেথিক্যাস এ্যাফারেন্সিস, হোমো হিবিলিস, হোমো এরিকটাস, নিয়ান্ডারথাল হয়ে হোমো স্যাপিয়েন্স নামের আধুনিক এই মানুষ প্রজাতির DNA এর মধ্যে চলে এসেছে। আমরা সভ্য জগতের মানুষদেরও তাই এখনো কালো অন্ধকার দেখলে কি এক অজানা আশঙ্কায় গা ছমছম করে ওঠে। অন্ধকারের প্রতি আমাদের এই ভয় আর কিছু না, আমাদের সেই আদিম পূর্বপুরুষদের DANতে জমে থাকা অন্ধকারের ভয়াবহ স্মৃতিগুলো ফিরে ফিরে আসে।

কালো অন্ধকারের কারণে আমাদের প্রাচীন মানুষের কাছে কালো রংটাই ছিল অশুভ’র প্রতীক। তারা কালো রংকে শয়তানের রূপ হিসেবে ভাবতো। কালো রংকে তারা তাই এড়িয়ে চলতো। এ কালেও কোন কোন মানুষ মনে করে কালো প্রাণীরা সমস্ত অশুভ, অমঙ্গল বয়ে নিয়ে আসে। শিশুরা এখনো কালো কুকুর, কালো বিড়াল ভয় পায়। অশুভ রং দিয়ে অমঙ্গল ঠেকাতে শিশুদের কপালে কালো টিপ দেয়া হয়। একালে এসেও কালো নিসঙ্গতা, কুশিক্ষা, ভয়, মৃত্যুর প্রতীক হিসেবে ভাবা হয়।

আজ বিজ্ঞান অন্ধকারকে জয় করেছে। আমাদের পূর্বপুরুষদের দুঃসহ স্মৃতি জড়িত অন্ধকারের কালো রং আজ অন্ধকার ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। মানুষ জেনে গিয়েছে অন্ধকারের কালোর পিছনে ভয়ংকর কোন হাতছানি নেই। সে সব শুধুই মনের কল্পনা। এখন মানুষ কালো অন্ধকার আকাশ রঙিন ঝলমলে আলোর ফানুশ দিয়ে সাজায়। অন্ধকার তারা ভরা রাতে পৃথিবীর সমস্ত শিল্পীদের মনে সৃষ্টিশীল কর্মের জন্ম নেয়। কালো আজ সবচেয়ে জনপ্রিয় বর্ণ। ফ্রেঞ্চ চিত্রকর রেনোয়ার যেমন বলেছেন, কালো রং হচ্ছে বর্ণ রাজ্যের রানী। আজকের ফ্যাসনের দুনিয়ায় কালো বর্ণের কাপড় সবচেয়ে জনপ্রিয়। কালো পোশাক এখন আভিজাত্যের প্রতীক। কালো রাতের আঁধারে জোস্নায় যখন ভেসে যায় সমস্ত বিশ্ব, তখন পৃথিবীর প্রেমিক পুরুষরা তাদের প্রেমিকাদের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে-
“আমরা দুজনে ভাসিয়া এসেছি যুগলপ্রেমের স্রোতে,
অনাদি কালের হৃদয়-উৎস হতে।” ।

আমাদের প্রাচীন যে পূর্বপুরুষেরা তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অন্ধকার গুহায় লক্ষ লক্ষ বছর ধরে আলোর যে মশাল জ্বেলে প্রতীক্ষায় কাটিয়েছে, সে মশালের আলো নিভে যায়নি। তাদের সন্তানেরা সে মশাল এতোটা দীর্ঘ পথ বহন করে এনে তাতে সভ্যতার শিখা জ্বালিয়ে দিয়েছে। পৃথিবীর প্রতিটি গুহার বাঁকে লক্ষ বছর ধরে জমে থাকা বিষাদাচ্ছন্ন অন্ধকার দূর করছে, দূর করে চলেছে। পূর্বপুরুষেরা সময়ের গর্ভে হারিয়ে গেছে, চিরতরে হারিয়ে যাবো আমরাও। কিন্তু সভ্যতার আলোয় এই মশাল আর কোনদিনই নিভবে না। আমাদের হাত থেকে ভবিষ্যতের অনাগত সন্তানরা সে মশাল ঠিকই তুলে নিবে। ছুটতে থাকবে নয়া নয়া দিগন্তের দিকে। পৃথিবীর প্রতিটি কোনায় কোনায় সে আলো পৌঁছে দিবে। তাই দেখে লক্ষ কোটি বছরের সাক্ষী ওই দূর আকাশের গ্রহ নক্ষত্ররা হয়তো একদিন বলে উঠবে –
“মশাল তাদের রুদ্রজ্বালায় উঠলো জ্ব’লে,—
অন্ধকারের উৰ্দ্ধতলে
বহ্নিদলের রক্তকমল ফুটলো প্রবল দম্ভভরে
দূর-গগনের স্তব্ধ তারা মুগ্ধ ভ্রমর তাহার পরে ।
ভাবলো পথিক, এই যে তাদের মশাল-শিখা, নয়
সে কেবল দণ্ড-পলের মরীচিকা ।”