দেবী দর্শন-মা অন্নপূর্ণা (প্রথম পর্ব)- তানিম হায়াত খান রাজিত

  •  
  •  
  •  
  •  

তানিম হায়াত খান রাজিত

(প্রথম পর্ব)

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সুর সম্রাট উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের কন্যা অন্নপূর্ণা দেবী। সুরসম্রাজ্ঞী অন্নপূর্ণা একসময় সহধর্মিনী ছিলেন পণ্ডিত রবিশঙ্করের। ১৩ অক্টোবর অন্নপূর্ণা শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন।তাঁকে নিয়ে দেবী দর্শন লেখাটি লিখেছেন তাঁর ভাইপো এবং বাংলাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ মোবারক হোসেন খান ও সঙ্গীত শিল্পী ফওজিয়া ইয়াসমিনের কনিষ্ঠ সন্তান তানিম হায়াত খান রাজিত। অন্নপূর্ণার জীবদ্দশায় এই লেখাটি প্রকাশের বারণ ছিলো। তার অন্তর্ধানের পর পরই রাজিত প্রশান্তিকায় লিখলেন এই মূল্যবান লেখাটি।

আমাদের পরিবারের ইতিহাস কিন্তু বড়, অনেক বড়। আমি অবশ্য সেই ইতিহাস লেখার জন্য আজকে বসিনি, বরং আজকে আমার লেখাটা যেন ইতিহাস হয়ে থাকে, সেই চেষ্টাই করব। এই লেখাটা ২০ বছর আগে লিখেছিলাম। কিন্তু পিসিমা অন্নপূর্ণার মৃত্যুর আগে এই লেখা কোথাও প্রকাশিত হবে না, ওনার কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলাম আমি। ১৩ অক্টোবর ২০১৮ পিসিমা চলে গেলেন , আজ লেখাটা প্রকাশ করা শুরু করলাম। অনেক বড় লেখা, ছোট করে শুরু করলাম, বাকিটা ক্রমশ প্রকাশ্য।
ঘটনার সূত্রপাত অনেকটা কাকতালীয় ভাবেই। আমার চাচাত/ জ্যাঠাতো ভাই বাংলাদেশের তথা উপমহাদেশের প্রখ্যাত সরোদ শিল্পী উস্তাদ শাহাদাত হোসেন খান। তিনি অনুষ্ঠানের প্রয়োজনে প্রায়শ: কলকাতা যান। তেমনি ভাবে ১৯৯৭ সালের মে মাসে উনি কলকাতা গেলেন আর ফিরে এলেন হাতে দুই খানা বই নিয়ে। বই দুটির নাম “উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ও আমরা” – প্রথম খন্ড এবং দিতীয় খন্ড। লিখেছেন পন্ডিত যতীন ভট্টাচার্য্য। পন্ডিত যতীন ভট্টাচার্য্য ছিলেন উস্তাদ বাবা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের সরাসরি শিষ্য , মাইহারে ৭ বছর থেকে বাজনা শেখা মানুষ। বই দুটি ভাইয়া কে দেবার উদ্দেশ্য যেন তিনি সেই বই দুটি পন্ডিত যতীন ভট্টাচার্যের নির্দেশ মতো আমার বাবাকে পৌছে দেন। উল্লেখ্য, আমার বাবা বাংলাদেশের প্রখ্যাত সংগীত গবেষক মোবারক হোসেন খান (ভ্রাতষ্পুত্র উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব আর উস্তাদ আয়েত আলী খাঁ সাহেব -এর ছেলে) এবং যিনি ৪ বছরের অধিক কাল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক পদে নিয়োজিত থেকে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
যে কথা বলছিলাম। বই দুটি আমাদের বাসাতে এসে পৌঁছালো। প্রথমেই সে দুটোর দখল নিলেন আমার মা, যাঁর সঙ্গীত সম্বন্ধে উৎসাহ অপরিসীম, যেহেতু তিনি নিজেও একজন উঁচু সারির সংগীত শিল্পী, তিনি আর কেউ নন ফওজিয়া ইয়াসমিন (খান)। বই দুটো মা পড়তে লাগলেন আর মাঝে মাঝে ছোট খাটো ঘটনা আমাদের তিন ভাইবোন কে বলতে লাগলেন। আস্তে আস্তে বাড়তে লাগলো আমার কৌতুহল, কি ছিল আলাউদ্দিন দাদুর জীবনে? কি ছিল অন্নপূর্ণা পিসিমার জীবনে ?
পিসিমার আসল নাম ছিল রওশন আরা। ওনার জন্মের সময়ে মাইহারে দুর্ভিক্ষ চলছিল। ওনার জন্মের আশীর্বাদে যেন মাইহারের দুর্ভিক্ষ কেটে যায় সেজন্য মাইহারের মহারাজা ব্রিজনাথ ওনার নাম রেখেছিলেন অন্নপূর্ণা (অন্নদাতা)।
ফিরে আসি আমার কথায়। আমি তখন ঢাকা ইউনিভার্সিটির ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। সেকেন্ড ইয়ার ফার্স্ট টার্ম ফাইনাল পরীক্ষা একদম সামনে জুলাই মাসে (১৯৯৭)। আমার তখন সবকিছু বাদ দিয়ে পড়াশুনা নিয়ে থাকবার কথা। কিন্তু আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। সব ভুলে গিয়ে আমি গোগ্রাসে গিলতে লাগলাম ১ম খন্ডের প্রতিটা পৃষ্ঠা , তারপর দিতীয় খন্ড।
বই দুইটার মূল সারমর্ম ছিল উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের জীবনী এবং তার সাথে ছিল ওনার সর্ব কনিষ্ঠ কন্যা সন্তান অন্নপূর্ণা দেবীর অনেক কথা। পন্ডিত রবি শঙ্করের সাথে পিসিমা অন্নপূর্ণার বিয়ে হয় ১৯৪১ সালে , ১৪ বছর বয়সে যখন রবিশঙ্করের বয়স ছিল ১৯। বিয়ের পরে ওনারা কিছু ডুয়েট পারফরমেন্স করেছিলেন। কিন্তু পিসিমার পারফরম্যান্সের কাছে রবিশঙ্করের বাজনা ম্লান হয়ে যাচ্ছিলো বলে রবিশঙ্করের আপত্তির কারণে উনি নিজেকে গুটিয়ে নিলেন। এ ব্যাপারে রবিশঙ্কর বাবা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের কাছে অভিযোগ করলে তখন পিসিমার বাবা (আমার দাদুর বড় ভাই) উস্তাদ বাবা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব মেয়েকে ডেকে বললেন, মা তুমি বাজালে রবির কিরণ ঢেকে যাবে।
পিসিমা এমনি গুটিয়ে নিলেন যে কারো সাথে দেখা করা, ফোন ধরা, চিঠি লেখা সব বন্ধ করে দিয়ে মুম্বাই এর আকাশ গঙ্গা ফ্ল্যাটে চুপ করে অন্তরালে থেকে শিষ্যদের শেখাতে শুরু করলেন। পিসিমা শেষ পাবলিক শো তে বাজিয়েছিলেন ১৯৫৬ সালে আলী আকবর কলেজ অফ মিউজিক কলকাতা ব্র্যাঞ্চের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। সেই পারফরম্যান্স লুকিয়ে রেকর্ড করে সেটা বিকৃত করে বাজারে ছেড়ে পিসিমার বাজনাকে হেয় করবার প্রয়াস রবিশঙ্করের ছিল , যদিও সেটা সাফল্যের মুখ দেখেনি।
সে যাই হোক , আবার বইয়ের কথায় আসি। বই দুইটা পড়ার পর আমার একটা অন্যরকমের অনুভূতি হলো। সেই অনুভূতির সবটুকু জুড়ে ছিল পিসিমা অন্নপূর্ণার কথা। দিনে দিনে সেই অনুভূতি অস্বস্তিতে পরিণত হলো। সারাক্ষণ মনে হতে থাকলো কি যেন একটা বাকি থেকে গেল, মাথাটা পুরো ফাঁকা ফাঁকা লাগতো ! ভার্সিটির ক্লাসে গেলেও টিচারদের lecture যেন মাথায় ঢুকতোনা। হঠাৎ একদিন উপলব্ধি করলাম সেই অনুভূতি আর কিছুই না – পিসিমার সান্নিধ্য লাভের অনুভূতি। কেন জানি মনে হতে লাগলো পিসিমার দেখা না পেলে আমার আর কিছুই পাওয়া হবে না।
শুরু হলো এক অবিশ্বাস্য পথে যাত্রার কাহিনী। ১৯৯৭ সালে কিন্তু টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা এখনকার মত ছিল না। আর থাকলেই বা কি, পিসিমা কারো ফোন ধরেন না, কারো সাথে দেখা করেন না। শেষ বাড়ি থেকে বের হয়েছেন কবে কেউ জানে না Iতারপরেও কোনো এক অজানা শক্তির কারণে মনের অজান্তে কাউকে কিছু না বলে টাকা জমাতে শুরু করলাম। গন্তব্য হবে বম্বে (মুম্বাই) – পিসীমার আবাস। ইউনিভার্সিটিতে প্রতিদিন কষ্ট করে বাসে আসা যাওয়া শুরু করলাম। রিকসা যে কি ভুলেই গেলাম অত্যাধিক খরচ হয় বলে। এমনকি ভার্সিটি থেকে বাড়িতে ফিরেও কোথাও যেতাম না খরচের ভয়ে। অথচ বোকার মত ভেবে বসেছিলাম পিসিমা যেন আমার জন্য দরজা খুলে বসে আছেন – যেন গেলেই দেখা করবেন।
আসলে পিসিমা কিন্তু কারো সাথে দেখা করেন না আজ ২০ বছরের বেশি হয়ে গেল (১৯৯৮ সালের কথা বলছি আমি এখানে)। কিন্তু আমি এক আচ্ছন্নের মধ্যে ছিলাম যে এত কিছু চিন্তাও করতে পারছিলাম না।
এরপরের বিষয় ছিল বাসা থেকে অনুমতি নেয়া। কয়েকদিন পর পরই খালি মার কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করতাম “ইন্ডিয়া যাব” , “ইন্ডিয়া যাব “। আর মা খালি বকা দিত মাত্র সেদিন (১৯৯৭ সালে) ঘুরে আসলি দার্জিলিং থেকে আর এর মধ্যেই আবার শুরু হয়ে গেছে। আমি কিন্তু তখনও কাউকে আমার মিশনের কথা কিছুই বলিনি I খালি ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করছিলাম।
আস্তে আস্তে সময় যেতে লাগলো। ডিসেম্বর শেষ হয়ে জানুয়ারী শুরু হল। শুরু হলো ১৯৯৮ সাল। আর আমার ছটফটানি বেড়ে গেলো। কারণ সেকেন্ড ইয়ার সেকেন্ড টার্ম পরীক্ষার তারিখ হয়ে গেছে। পরীক্ষা শেষ হবে মার্চ মাসে, আমার সব পরিকল্পনা ঠিক করে নিলাম। আমার সফর সঙ্গী হবার কথা ছিল অনেকেরই। কিন্তু একমাত্র বাল্য বন্ধু আমান ছাড়া শেষ পর্যন্ত আর কেউই সঙ্গী হল না। আর একমাত্র আমানই জানত আমার আসল মিশনের কথা। এবার শুরু হলো আসল কাজ – সেই অনিশ্চয়তার দিকে এগানো। প্রথম কাজ পিসিমাকে চিঠি লিখে তাঁর সাথে দেখা করবার অনুমতি প্রার্থনা। ঠিকানা নিয়ে চিঠি লিখলাম পিসিমার কাছে। সাথে লিখলাম নিজের পরিচয় , বাবার নাম, দাদুর নাম। বাবাকে যেহেতু চিনতেন , দেখাও হয়েছে বাবার সাথে ১৯৭৪ সালে, তাই এটাই আমাকে দারুন শক্তি দিয়েছিলো।
সম্পূর্ণ আন্দাজের উপর চিঠিটা ডাকে ফেললাম ২৩ জানুয়ারী ১৯৯৮। তখন কিন্তু বাড়ির কেউই জানেনা সেই চিঠির কথা। ঠিক করলাম সবাইকে বলবো সেই চিঠির কথা যখন আমি উত্তরটা হাতে পাবো, পাবো কি ?
চলবে।
তানিম হায়াত খান রাজিত
সরোদ আর্টিস্ট, শিল্পী ও সুরকার
ভাইপো- অন্নপূর্ণা দেবী
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments