অভাজনে অশ্রু – মোল্লা মোঃ রাশিদুল হক (প্রশান্তিকার ঈদ আনন্দ আয়োজন)

  •  
  •  
  •  
  •  

 164 views

ঈদ আসছে। আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, আপনাদের প্রিয় প্রশান্ত পাড়ের বাঙলা কাগজ ‘প্রশান্তিকা’ ঈদ আনন্দ আয়োজন করেছে। দেশে বিদেশের লেখক ছাড়াও একঝাঁক নবীন লেখকেরা এই আয়োজন সমৃদ্ধ করছেন। সবাইকে অগ্রিম ঈদ মোবারক।

 

আজকের গল্প

অভাজনে অশ্রু – মোল্লা মোঃ রাশিদুল হক

 

মইনুলের আজ মন ভালো নেই। আকাশের অবস্থাও ভালো না। থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে, সাথে তীব্র আলোর ঝলকানি। আকাশের অবস্থা নাকি মইনুলের মন, কোনটা বেশী খারাপ তা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। হাতে ব্যাগ নিয়ে মইনুল রিকসার খোঁজে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কিন্তু একটা রিকসাও পাওয়া যাচ্ছে না। একজনকে যাও বা পাওয়া গেলো তার সাথে কথাবার্তা বেশীদুর এগোলো না। মইনুল কোথায় যাবে বলার পর রিকসাওয়ালার খুব একটা আগ্রহ দেখা গেলো না। কোন জবাব না দিয়েই রিকসাওয়ালা প্রস্থান করলো। অগত্যা মইনুল হেটেই রওনা দিলো। আজ মনে হয়  মহাজাগতিক কান্না দিবস আর পৃথিবীর সব কান্না বৃষ্টি হয়ে ঝরছে মইনুলের উপর।
হাটতে হাটতে মইনুল ভাবছে সে কি আসলেই আছে নাকি সে কারও ব্রেনের সিমুলেশনে একটা চরিত্র মাত্র? যেমনটা দেখা গিয়েছিল বিখ্যাত চলচ্চিত্র Matrix এ। যেখানে দেখানো হয়েছিল আমাদের জীবন এক সিমুলেশন ছাড়া আর কিছু না। প্রায়ই তার মনে হয় চাইনিজ দার্শনিক ঝুয়াংজির কথা। তিনি আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ সালে একটা প্যারাডক্সের ভিতর দিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ভেবে বের করেন যে বাস্তবতা এক ধরনের ভ্রম (reality is an illusion)। তিনি ভাবতেন এমনো হতে পারে আমাদের পুরো জীবনটাই একটা প্রজাপতির স্বপ্নে ঘটছে। আমরা সেখানে কিছু চরিত্র মাত্র।
ভাবতে ভাবতেই মইনুল কাকভেজা হয়ে পৌঁছে গেলো তার গন্তব্যে। বাইরে থেকে শুধু একচিলতে উঠান সর্বস্ব একটা পুরনো একতলা বাড়ি দেখা যাচ্ছে। ঢুকবে কি ঢুকবে না চিন্তা করতে করতে শেষমেশ মইনুল ঢুকেই পড়লো। ভিতর থেকে বেশ হই-হুল্লোড় আর হাসির আওয়াজ শোনা গেলো। কয়েক ঘন্টা পর মইনুলকে সেখান থেকে বেরুতে দেখা গেলো। মইনুল বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।

প্রতি বৃহস্পতিবার মইনুল অফিস থেকে একটু আগেই বের হয়। কিন্তু প্রতি বৃহস্পতিবারই তার বাড়িতে ফিরতে দেরী হয়। এই নিয়ে প্রায়ই তার স্ত্রীর কাছ থেকে কথা শুনতে হয়। যানজটের কথা বলে মাঝে মাঝে পার পাওয়া গেলেও বেশীর ভাগ সময়ই পার পাওয়া যায় না – আজও তার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। মইনুল মুখ গোমরা করে দাঁড়িয়ে থেকে বউয়ের বকা শুনছে। এসময় সে অন্য চিন্তায় মগ্ন থাকে বলে কথাগুলি গায়ে লাগে না। এখন সে ভাবছে পৃথিবী সৃষ্টিতে স্রষ্টার কৃতিত্ব অসাধারন। প্রতিটা ব্যাক্টেরিয়া-ভাইরাসের যেমন রোল আছে, তিমির মতো বিশাল প্রানীরও যেমন রোল আছে, তেমনি অগনিত তারায় ভরা অগনিত গ্যালাক্সিরও রোল রয়েছে। অযথাই মানুষ নিজেকে বড় মনে করে। সে নিতান্তই এক সৃষ্টি। সে শুধু তার রোল প্লে করছে –একটা পিপড়ার রোল কোন অংশেই মানুষের রোলের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ না। মইনুল ভাবে এই সংসারে সে তার রোল প্লে করছে আর তার স্ত্রী করছে তার। তাই কারও রোলে তার হস্তক্ষেপ না করাই ভালো !
মইনুল ডেমরা হাসমত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের অংকের শিক্ষক। মৃদুভাষী ও আত্মমগ্ন বলে তার বেশ বদনাম আছে। কেউ কেউ তাকে দার্শনিক বলে ঠাট্টা করে। বেসরকারী বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন এমনিতেই কম, তার উপর ইদানিং জিনিসপত্রের দাম যে হারে বেড়েই চলেছে তাতে মাস শেষে সংসার চালাতে মইনুল চোখে অন্ধকার দেখে। তার উপর কোন একটা গোপন কারনে মইনুলের বেতন পুরোটা বাসায় আসেনা। প্রতি মাসেই ৪-৫ হাজার টাকার হিসাব মেলেনা। মইনুল আমতা আমতা করে জবাব দেয়ার চেস্টা করে কিন্তু এ নিয়ে কথা খুব একটা আগায় না। এ নিয়ে তার বউ মিলির কটাক্ষের শেষ নেই। মিলির সন্দেহ মইনুল এক হলে নেশাগ্রস্ত, না হয় জুয়ারী। তাছাড়া প্রতি বৃহস্পতিবার রাত করে বাড়ি ফেরে বলে মইনুল এখন পরকীয়ায় জড়িত কিনা তা নিয়ে মিলির মনে ক্ষীন সন্দেহ দেখা দিয়েছে। লোকে বলে মধ্যবয়সে নাকি পুরুষ মানুষকে ভীমরতিতে ধরে। মইনুলের তো বয়স চল্লিশ পেরিয়ে গেছে।
নিজের মনের সাথে অনেক যুদ্ধ করে মিলি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছে। মিলি তার ছোট ভাই জামিলকে ডেকে এনেছে। সে এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স (সন্মান) পরীক্ষা দিয়েছে। তার কাছে তার দুলাভাই সম্পর্কে সব বলার পর জামিল হেসেই সব উড়িয়ে দিল। “কি যে বলো আপা?” – বলে হাঁসতে হাঁসতে সে গড়িয়ে পরে যাচ্ছে – “দুলাভাই করবে পরকীয়া? – তুমি আর লোক খুজে পেলে না?। শোন তুমি বরং দুলাভাইকে জিজ্ঞেস করো “নেভিয়ার-স্টোকস ইকুয়েশন” নাকি “হজ কঞ্জেকচার” – এই দুইটার মধ্যে কোন “মিলেনিয়াম প্রাইজ প্রবলেম” আগে সলভ হবে।”। মিলির রুদ্রমূর্তি দেখে জামিল নিজেকে সামলে নেয়। অনেক কথাবার্তার পর জামিল রাজি হয় যে তার দুলাভাই প্রতি বৃহস্পতিবার কোথায় যায়, সে তার খবর নেবে।
ইতিমধ্যে জামিল তার দুলাভাইকে ফলো করে ঠিকানা বের করে এনেছে। কিন্তু সে বেশী কিছু ঘাটাতে চায়নি। কি যেন একটা বলতে চেয়েও সে বললো না। ব্যাস্ত থাকায় সে ঠিকানা দিয়েই কেটে পড়লো । প্রতি বৃহস্পতিবার মইনুল একটা বাড়ীতে যায় শুনে মিলি যা বোঝার বুঝে নিয়েছে। মিলি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে সামনের বৃহস্পতিবার সে মইনুলকে হাতে নাতে ধরে ফেলবে। মনে মনে সে বলছে “তুমি ঘুঘু দেখেছো, ঘুঘুর ফাঁদ দেখোনি”।

আজ আরেক বৃহস্পতিবার। কয়েকদিন পরেই ঈদ। বাসায় এতো কাজ – তারপরও আজ মিলি সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে সে দেখবে তার স্বামী প্রতি বৃহস্পতিবার কোথায় যায়। আজ তাকে হাতেনাতেই ধরে ফেলতে হবে। তাই সে বোরকা পড়ে বিকেল নাগাদ তার স্বামীর স্কুলের সামনে পৌঁছে গেলো। দিন চুক্তি এক রিকসা সে আগেই নিয়ে রেখেছে। ঠিকানা তার আগেই জানা, তবু সে দেখতে চায় ওখানে যাওয়ার আগে মইনুল আর কি কি করে।
আজ মইনুলকে খুব খুশী খুশী লাগছে। আজ সে অফিস থেকে বেতন পেয়েছে, সাথে বোনাসও। সে অফিস থেকে বের হয়েই কাছাকাছি একটা স্থানীয় বাজারে গেলো। সেখান থেকে একগাদা কেনাকাটা করে সে রওনা দিয়েছে তার গন্তব্যে। আজ সময়মতোই রিকসা পাওয়া গেলো। দরদামও তেমন করতে হলো না। তাছাড়া আজ আবহাওয়াও বেশ ভালো। দিনে প্রচন্ড গরম থাকলেও এখন একটু মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। সে ঘুনাক্ষরেও টের পেল না, এক বোরকাওয়ালী তাকে অনুসরন করছে।
মইনুল একচিলতে উঠান সর্বস্ব একটা পুরনো একতলা বাড়িতেঁ পৌঁছে গেলো। সে বাজারের ব্যাগগুলা নিয়ে ঐ বাসায় ঢুকতেই অনেকগুলা বাচ্চার বিশাল হই-হুল্লোড় আর হাসির আওয়াজ পাওয়া গেলো। মিলির রাগ মাথায় উঠে গেলো? উনি তাহলে শুধুমাত্র পরকীয়ায় আটকে নেই – বাচ্চা-কাচ্চাও আছে দেখি। পরের মুহূর্তেই মনে হলো – হায়, আল্লাহ, আমার জীবনে এটা কি হলো? এখন আমার কি হবে?
প্রচন্ড রাগ থাকাতে অত্যন্ত পুরনো একটা ছোট্ট সাইনবোর্ড তার চোখ এড়িয়ে গেলো। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই মিলি দেখলো উঠানে একগাদা ছেলে-মেয়ে জড়ো হয়েছে। ওদের বয়স বেশী হবে না – তিন-চার বছর থেকে আট-দশ বছর বয়স হবে। তাদের মাঝখানে মইনুল। সে তার বাজারের ব্যাগ থেকে একটা একটা জামা বের করে দিচ্ছে আর একেকটা বাচ্চা তা নিয়ে যাচ্ছে। যাওয়ার সময় মইনুলকে জড়িয়ে ধরে গালে একটা করে চুমু দিয়ে যাচ্ছে। পাশে দাঁড়িয়ে একজন হুজুর টাইপের লোক হাসিমুখে সব দেখছে। বাচ্চাদের এই ভালোবাসা দেখে মইনুলের চোখে পানি চলে এলো। ও চোখের পানি লুকানোর জন্যে হাতের আস্তিন দিয়ে মাথার ঘাম মোছার ভান করলো। সে এক অন্যরকম অনুভূতি। এই অনুভূতির উৎস পৃথিবীতে না, অন্য কোন খানে। সমস্ত পৃথিবীর বিনিময়েও এই ভালোবাসা পাওয়া যাবে না !
বোরকাওয়ালী একজনকে দরজায় দেখে হুজুর এগিয়ে এলেন। উনি কিছু বলার আগেই মিলি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো “আপনি কি আমাকে বলতে পারেন এখানে কি হচ্ছে?”। মিলির এই প্রশ্নের জবাবে হুজুর যা শোনালেন তাতে মিলির মাথা হঠাৎ করে ফাঁকা হয়ে গেলো। মনে হলো এটা কি আসলেই সত্যি হতে পারে?
হুজুর যা বললেন তার সারমর্ম হচ্ছে – এটা একটা এতীমখানা। ছোট ছোট এই বাচ্চাদের দুনিয়াতে কেউ নেই। মইনুল প্রতি সপ্তাহের শেষে (প্রতি বৃহস্পতিবার) এই বাচ্চাদের জন্যে খাবার, বইখাতা, কলম, খেলনা ইত্যাদি নিয়ে আসে। কিছু সময় বাচ্চাদের সাথে থাকে – ওদের নিজের হাতে খাওয়ায়। বাচ্চারা ওর জন্যে পথ চেয়ে বসে থাকে। আজ মইনুল ওদের জন্যে ঈদের জামা নিয়ে এসেছে। তাই উচ্ছাসে-খুশীতে ওদের এই হই-হুল্লোড়।

মিলির নিজের উপর রাগ হতে লাগলো আর সে ভাবা শুরু করলো এখনো দুনিয়ায় এমন মানুষ আছে যে অন্যের এতো উপকার করেও সমাজের কাউকে তো দুরের কথা, নিজের বউকে পর্যন্ত বলেনা? আর সেই মানুষ কিনা তারই স্বামী? সে এতো সৌভাগ্যবান? মৃদুভাষী ও আত্মমগ্ন বলে হয়তো তার আবেগ প্রকাশ করতে পারেনা, কিন্তু মানুষতো সেই বিশাল মনের।

মিলি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো আজ থেকে আর কখনই সে মইনুলকে গালমন্দ করবে না। আজকের পর থেকে মইনুলের সাত খুন মাফ। কাউকে কিছু না বলেই মিলি ওখান থেকে দ্রুত বাসায় চলে আসলো। মইনুল জানলোই না তার কঠিন হৃদয় বউয়ের চোখ থেকে ক্রমাগত ভালোবাসার পানি ঝরছে মইনুলের মতো অভাজনের জন্যে।

এতীমখানার বাইরে চায়ের দোকানে রেডিওতে চিরকূটের গান বাজছে “যা দেখছ তা তানা, সব দেখা জানা না, এক দুনিয়া ফানা ফানা, আরেক দুনিয়া যাওয়া মানা”।

মোল্লা মোঃ রাশিদুল হক
রিসার্চ ফেলো, মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়, খন্ডকালীন শিক্ষক, মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়
কবি ও লেখক।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments