অভ্যাস,অধ্যাস এবং অদৃষ্টের দৃশ্যমানতা-দীন মোহাম্মদ মনির

  •  
  •  
  •  
  •  

 151 views

অস্তিত্বকে অনুভব করার জন্য চিন্তার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করা জরুরী । মাঝে মাঝে তাই কল্পলোকে থাকা ভালো । কল্পনার রাজ্যে বিচিত্র স্বপ্নের, বাহারি রংয়ের, নানাবিধ কর্মকান্ডের নায়ক চৈতন্য ফিরে পায় যখন রূঢ় বাস্তবতাটি জাগ্রত করনের নিমিত্তে চেতনাপ্রদায়ক হিসাবে আবির্ভূত হয়। ইন্দ্রিয়ের কর্মতৎপরতা ও কর্মক্ষমতার ব্যাপ্তি প্রানের ধারক ব্যক্তিকে স্থাপন করে দৈনন্দিন অভ্যাস দ্বারা তাড়িত কর্তব্যবোধ ও প্রতিযোগিতাপূ্র্ণ রাজ্যের সিংহাসনে । এ রাজ্যের সংবিধান ও নীতিমালা ব্যক্তির অভ্যাস এবং অধ্যাসের সাথে সংগতিপূর্ণ চক্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। পান থেকে চুন খসে পড়াটা তথাকথিত স্বাভাবিক জীবনধারণের বিচ্যুতি হিসাবেই গন্য হয় ।
অভ্যাসের প্রকৃতি ও ব্যাপ্তি কালব্যাপী সর্বদাই প্রজন্মের উপর তাদেরকে সমাজ-সংসার টিকিয়ে রাখার যোগ্য পাত্র বিবেচনায় পূর্বপুসুরীদের দ্বারা অর্পিত কতগুলি গতানুগতিক কর্মকান্ডের সমষ্টি ।
অর্জিত চর্বিত চর্বণ সম অভ্যাসগুলির ফলে সৃষ্ট অধ্যাসের পরিসীমা ভেদ করে চিরন্তন অবলোকন ও অবগাহন অসম্ভব রূপেই অবস্থান করে। সহায়ক যান্ত্রিক আর্বিভাব যেমন- আতশী কাঁচ, দূরবীন ও অনুবীক্ষণ যন্ত্র অধ্যাস রূপ অদৃষ্টকে কিছুমাত্রায় দৃশ্যমান করে। কর্ণকুহরে প্রবেশের জন্য এরূপ সহায়ক যন্ত্র হয়তো অাপাত নিঃশব্দ
বা অশ্রুত শব্দজগতে বিচরন করাতে সক্ষম। অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলিকেও হয়তো তদ্রূপ অস্পৃশ্যকে স্পর্শ করার ক্ষমতা এবং অপরিচিতকে পরিচিতি দানের সাথে সম্পৃক্ত করা সম্ভব।
ধারনা ও উদ্দেশ্যগুলি পরিস্কার না থাকার কারনে প্রায়শই অকারণে মানসিক দ্বন্দ ও চাপ নির্মল জীবনকে কলঙ্কিত করে। যা দেখে অভ্যস্ত এরূপ ধারনা, যা দেখে অভ্যস্ত নয় সেটাকে সহজে স্বীকৃতি না দিয়ে বরং অসংগত বা অলৌকিক আখ্যা দিয়ে স্বীয় অপারগতাকে ঢেকে রাখার অপচেষ্টা চলে নিরন্তর।
তথ্যের ক্ষেত্র, তথ্য দানকারী, তথ্যের উৎস, তথ্য আহরনে ব্যক্তিগত চেষ্টা ও অভিজ্ঞতা, মস্তিষ্কের গঠন ও সীমাবদ্ধতা এবং পারিপার্শ্বিক প্রাকৃতিক ও মানবিক ঘটনাসমূহের উপস্হিতি , প্রকাশ ও বিস্তার, এই সকল নিয়ামকগুলিই সাধারণত কোন একটি বা একাধিক ঘটনা ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে উপসংহার টানতে প্রধান ভূমিকা পালন করে ।
মানুষ মাত্রই যখন অভ্যাসের দাস, সেক্ষেত্রে অভ্যাস দ্বারা মানুষ চালিত হবেই; এটাই স্বাভাবিক । তবে, অভ্যাসের চক্রে থেকে ব্যক্তিস্বত্তা যদি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভাবে কোন বিষয় কিংবা ঘটনার প্রকৃত ও উপযুক্ত ব্যাখ্যা প্রদানে অপারগ হয়, তা হবে প্রকৃত অর্থেই দাসত্ববরন; যেখানে মুক্তচিন্তার সমাধি রচিত হবে সর্বক্ষনই। অভ্যাসের শিকার দাস মানুষ অধ্যাসের অন্ধকার গৃহে কারাবরণ করবে অচিরেই । অধ্যাসে আক্রান্ত হওয়ার কারনে ব্যক্তিকল্যাণ তথা মানবকল্যাণের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়গুলি উপেক্ষিত হয় প্রতিনিয়তই।
অদৃশ্য ও অনাবিস্কৃত চিরন্তন এবং যৌক্তিক সত্যগুলি দৃশ্যমান হয় না কখনোই।
ধারনা করা খুবই স্বাভাবিক যে, আমরা যাতে অভ্যস্ত , তা নিয়েই জীবন কাটিয়ে দিলে ক্ষতি কি? আপাতদৃষ্টে ক্ষতি সনাক্ত করা কঠিন হতে পারে; তাই বলে সনাক্তহীনতায় ক্ষতির অনুপস্থিতি নিশ্চিত করে না। যেমন, রোগ সনাক্তকরনে ব্যার্থতা রোগহীনতা প্রমান করে না। অনেক ক্ষেত্রেই কতটা বঞ্চিত হলে তাকে ক্ষতির সমতুল্য বিবেচনা করা যায়, তা বঞ্চনা সম্পর্কে ধারনা না থাকলে নির্নয় করা কঠিন। অব্যাহত মন্দের চর্চায় এবং ভালোর দীর্ঘ সময়ব্যাপি অনুপস্থিতির কারনে ও মন্দকে মন্দ বিবেচনা করার তুলনামূলক মাপকাঠির অভাবে
এটাই বোধদয় হয় ‘এটা তো এমনই’।
ক্ষনকালের জীবদ্দশার প্রতিটি মূহুর্ত কতটা অর্থবহ ও উপভোগ্য এ বিষয়টি যাদের কাছে গুরুত্ব বহন করে, তাদের জন্যই মূলত এ আলোচনার অবতারনা। একই রকম জীবনধারা, একই রকম দৃষ্টিভঙ্গি, একই রকম উপলব্ধি এবং একই রকম আচরন যেন ছকে বাঁধা অবশ্য করনীয় কর্ম। অথচ, এই ছকে বাঁধা চক্রের বাইরে রয়েছে জীবনবোধের বিশাল ও বিস্তৃত ক্ষেত্র, যেখানে যে কেউ চাইলে অবাধে বিচরণ করতে পারে; সংজ্ঞায়িত করতে পারে সকল আপাত জটিল ও অস্বস্থিকর বিষয়গুলি এবং নতুন রংয়ে রাংঙাতে পারে পরিত্যক্ত ও অবহেলিত ক্ষেত্রগুলি।
ঝামেলা, এত বুঝতে গেলে অনেক ঝামেলা; এত ভাবার সময় নেই –
এ সবই গতানুগতিক ও অসংজ্ঞায়িত বর্নহীন জীবনের অভ্যস্ততায় শিকার বঞ্চিত মানবের নতুনকে জয় না করতে পেরে ব্যার্থ আত্মার কাপুরুষোচিত উক্তি। ধর্মীয় মূল্যবোধকে শুধুমাত্র কয়েকটি নির্দিষ্ট কর্তব্য পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখাও তদ্রূপ একই দোষে দুষ্ট। বিশ্বাস স্খাপনে দোষের কিছু নাই বরং মানষিক স্থিরতা ও প্রশান্তির জন্য এটি ঔষধের ভূমিকা পালন করে। ধর্মীয় অনুভূতিকে প্রসারিত করে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলির যৌক্তিক ব্যাখ্য প্রদানে সচেষ্ট হলে শান্তিময় পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়ক হবে।
বক্তব্যটির উদ্দেশ্য কখনোই মানুষের গতানুগতিক অভ্যাসকে সম্পূর্ন ত্যাগ করার পরামর্শের পক্ষে নয় বরং অভ্যাসের ধুম্রজালে সৃষ্ট অধ্যাস যেন মানুষকে অন্ধ করে না রাখে। যা করছি তার উদ্দেশ্য সমূহ যেন জানা থাকে এবং উদ্দেশ্যগুলির রশ্মি যেন প্রজন্মের জীবন আলোকিত করে। কুসংস্কারচ্ছন্নতা, চরমপন্থি মনোভাব, মৌলবাদী ধারনা ইত্যাদি চরম ঘৃনিত ও মানবসম্প্রদায়ের জন্য সর্বকালের হুমকি সমূহ শুধুমাত্র প্রাপ্ত ধারনা ও অভ্যাসগুলিকে কষ্টিপাথরে যাচাই না করে উপুর্যুপরি ব্যবহারেরই ফল। এটাই করতে হবে, এরকমই বুঝতে হবে – এরূপ চর্চা কখনোই বিবেক-বুদ্ধির নিরপেক্ষ চেতনাকে নাড়া দিয়ে পরম সার্বজনীন ভারসাম্যের দিকে পৌঁছায় না।
সূক্ষ্মতা ও গভীরতার বিচারে উপস্থাপিত বিষয়টি এতই সূক্ষ্ম যে, তা উপলব্ধি করার মানসিক প্রস্তুতি অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের থাকে না।পক্ষান্তরে বিষয়ের বোধগম্যতাকে দূর্বোদ্ধতার দোষে কলঙ্কিত করে তা থেকে নিজেকে মুক্ত করার প্রয়াসে গতানুগতিক সহজ চিন্তায় আবারো মগ্ন হয়ে অতি মৌলিক লালসায় নিমজ্জিত হয় প্রতিনিয়ত । অনুকরণে সামাজিক মর্যাদার দাড়ি-পাল্লায় ভারসাম্য লাভ হয় ঠিকই কিন্তু স্বকীয় ইচ্ছা ও নিজ মনের রংতুলির ব্যবহারটি অব্যবহৃত থেকেই যায়।
জনম জনম লালনের দর্শন লক্ষ-হাজার প্রানকে অর্থবহ জীবনের সন্ধান দিচ্ছে ঠিকই কিন্তু লালনকে যারা জানে না, তাদের জীবনতো থেমে থাকে না কখনোই। তাহলে লালন কেন? অর্থবহ জীবনের তাগিদ কেন ? এসব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হয়তো কাউকে সন্তুষ্ট করতে পারবে না, তবে এসবের অভাবে সৃষ্ট সংকীর্ন মানসিকতার প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধ্বংস করতে সক্ষম।
অন্তর্দৃষ্টি, কারন খোঁজার মানসিকতা, বৃত্তের বাইরে মাঝে মাঝে নিজেকে স্থাপন ইত্যাদি চর্চাগুলি মানুষকে উদারতা দান করে। উদার মানুষ আর যাই হোক, ক্ষতিকর প্রানী নয়। উদারতা পোঁছে দেয় সেখানে যথায় সচরাচর পদক্ষেপ পড়ে না করোও; দান করে দৃষ্টির প্রসারতা এবং অদৃশ্যকে দেখার ক্ষমতা, সুযোগ দেয় স্পর্শ করার যা কখনো পায়নি ছোঁয়া।
0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments