অস্ট্রেলিয়ায় যতটা শিখেছি, তারচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত হয়েছি: তাসলিমা মিজি

  •  
  •  
  •  
  •  

তাসলিমা মিজি বাংলাদেশী সামাজিক উদ্যোক্তা। তিনি তাঁর ব্যবসায়িক উদ্যোগের মাধ্যমে নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের মাঝে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে চলেছেন নিরন্তর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাস্টার্স সমাপ্তির পর তিনি সাংবাদিকতায় কর্মজীবন শুরু করেন। বিভিন্ন পত্রিকা ও টেলিভিশনে রিপোর্টার হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করার পর আবির্ভূত হয়েছিলেন আইটি উদ্যোক্তা হিসেবে। সর্বশেষে পাকাপোক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন বাংলাদেশের লেদার বা চামড়া শিল্পে। এ বিষয়ে কোন একাডেমিক শিক্ষা ছাড়াই তাসলিমা মিজি বাংলাদেশের এই গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানীমুখী শিল্পে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলেন। বর্তমানে তিনি তার প্রতিষ্ঠিত কোম্পানী লেদারিনা প্রাইভেট লিমিটেড এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর। ইউরোপের নামকরা কয়েকটি ডিজাইনার ব্র্যান্ডের লেদার ব্যাগ তৈরি হয় তার প্রতিষ্ঠানে। তার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশী লেদার ব্যাগ ব্র্যান্ড গুটিপা’র মাঝে ফেসবুকে ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করেছে। সম্প্রতি তিনি অস্ট্রেলিয়া সরকারের আমন্ত্রণে দক্ষিণ এশিয়ার ১৫ জন নারীদের সাথে একটি ট্রেনিংয়ে অংশ নিতে অষ্ট্রেলিয়া এসেছিলেন। সেসময় মেলবোর্নে প্রশান্তিকার পক্ষ থেকে মিজি’র সাক্ষাতকার নিয়েছেন প্রশান্তিকার সহযোগী সম্পাদক নাদেরা সুলতানা নদী।

উদ্যোক্তা তাসলিমা মিজি

নাদেরা সুলতানা নদী: আপনিসহ বাংলাদেশের তিনজন নারী উদ্যোক্তা অস্ট্রেলিয়ার এই গুরুত্বপুর্ন ট্রেনিংয়ে অংশ নিয়েছেন, শুরুতেই প্রশান্তিকার পক্ষ থেকে জানাই অভিনন্দন। অষ্ট্রেলিয়ার প্রবাসী বাঙ্গালীদের মুখপত্র হিসেবে প্রশান্তিকা আপনাদের নিয়ে গর্ব অনুভব করে। এই প্রোগ্রামের সাথে আপনাদের টিমের যোগসুত্র সম্পর্কে আমাদের কিছু বলবেন কি?
তাসলিমা মিজি: অষ্ট্রেলিয়ান সরকারের Department of Foreign Affairs and Trade এর বৈশ্বিক বাণিজ্য সম্প্রসারনের একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে এই প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম হাতে নেয়া হয়। ট্রেনিং প্রোগ্রামটির নামকরণ করা হয় ”Women Trading Globally“। বিভিন্ন দেশে অষ্ট্রেলিয়ান এম্বেসী অংশগ্রহনেচ্ছুদের মাঝে আবেদন আহবান করে। অসংখ্য আবেদনকারীদের মাঝে আয়োজকরা তাদের সিলেকশন কমিটির মাধ্যমে ১৫ জনকে নির্বাচন করে। এই সিলেকশনের শর্তাবলীর মধ্যে গুরুত্বপুর্ণ ছিল আবেদনকারিদের রপ্তানী উপযোগী পণ্য থাকতে হবে অথবা তাদের রপ্তানী করার প্রস্তুতি থাকতে হবে অন্তত। বাংলাদেশ থেকে আরো গিয়েছিলেন Taranga Bangladesh এর সিইও কোহিনুর ইয়াসমিন ও ASIX Limited এর আফসানা আহমেদ যারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তাদের তৈরী হস্তশিল্পজাত পণ্য রপ্তানী করেন।

নদী: সামাজিক মাধ্যমে আপনাদের ট্রেনিং প্রোগ্রামের অনেক ছবি দেখেছি, আপনাদের ছবি ও লেখাতে রয়েছে আপনাদের আনন্দ আর উচ্ছাসের ছাপ, কোন ব্যাপারগুলো আপনাদের ভ্রমনে এই আনন্দ এনে দিয়েছে?
মিজি: সত্যি বলতে কি আজকাল ব্যবসায়িক উদ্যোগ সম্প্রসারণে সরকারী ও বেসরকারীভাবে অনেক সেমিনার, সভা, ট্রেনিং, ওয়ার্কশপ আয়োজন চোখে পড়ে চারপাশে। আমি এই ট্রেনিং প্রোগ্রামটির মডিউল যখন জানতে পারি, আমি খুব আগ্রহী হয়ে পড়ি। অষ্ট্রেলিয়া এসে আমার প্রত্যাশাটা বাস্তবের সাথে সেভাবেই মিলে যায়। ট্রেনিংয়ের বিষয়বস্তু একদিকে ছিল খুবই বাস্তবমুখী, অন্যদিকে ট্রেইনার ও প্যানেলিস্টরাও ছিলেন আমাদের ব্যাপারে দারুন উৎসাহী। আমরা দেশে আমাদের ব্যবসায়িক পন্যগুলোকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করেই তৈরী করছি, কিন্তু আমাদের প্রয়োজন ছিল সেগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে বহুলভাবে বাজারজাত করা। এই ব্যাপারটি আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি ছিল আমাদের প্রবাসী বাংলাদেশী বন্ধু ও পরিজনদের আন্তরিক ও উষ্ণ অভ্যর্থনা। অনেক পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা হয়েছে যারা অষ্ট্রেলিয়াতে অভিবাসন করে নতুন জীবন শুরু করেছেন।

মেলবোর্নের উইমেন ট্রেডিং গ্লোবালি অনুষ্ঠানে সনদ নিচ্ছেন তাসলিমা মিজি

নদী: আমরা জানি আপনি ব্যবসায়িক ক্যারিয়ার শুরু করেছেন আইটিতে, কম্পিউটার হার্ডওয়ারের আপনার একটি আউটলেট ছিল, সেখান থেকে চামড়াজাত পণ্য ব্যবসায় কিভাবে মোড় নিলেন ?
মিজি: এর আগে আমি সাংবাদিকতাও করেছি, হা হা হা। আমার ক্যারিয়ার মোটেও কোন মসৃন পথের ছিলনা। ২০০৬ সালে আমার সন্তান জন্ম নেবার পর আমি সাংবাদিকতা পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হই। সন্তান ও পরিবারকে সময় দিতে গিয়ে দেখলাম নিজের মত করে একটি কাজ করা খুব জরুরী। এভাবেই আইটি হার্ডওয়্যার ব্যবসা শুরু করি। একটা সময় ভাল করলেও আইটি ব্যবসা শেষ পর্যন্ত খারাপ হতে থাকে। আর আমিও হারাতে থাকি আমার আগ্রহ। তখন আমি এমন একটা কিছু করার তাড়না বোধ করি যা আমাকে আর্থিক মুক্তি দিবে আর আনন্দও দিবে। আমি কাজের প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসায়িক সুত্র খুঁজতে গিয়ে আমার মনে হলো, চামড়া আমাদের দেশীয় কাঁচামাল, দেশে অঢেল উৎপাদন আছে, আবার দেশে বেকারের সংখ্যা অগণিত। এরপর আমি আইটি ব্যবসা করতে করতেই চামড়া শিল্প নিয়ে পড়াশুনা, সম্ভাবনা, প্রস্তুতি ও মার্কেট পর্যবেক্ষণ দিয়ে গবেষণা করতে থাকি। ২০১৬ সালে Gootipa (গুটিপা) নাম দিয়ে একটা ফেসবুক পেজ খুলে আমি আমার ব্যাগগুলো অনলাইনে বিক্রি করতে শুরু করি। একটি কারখানার সাথে আমি নিজের ডিজাইন দিয়ে তখন আমি কাজ করতাম। আমার বন্ধু নেটওয়ার্কে, আমি তখন দারুন সাড়া পাই আর এতে আমার কাজ করার উৎসাহ বেড়ে যায়। এরপর গুটিপা একটু একটু করে বন্ধুদের গন্ডি ছাপিয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। সেবছরের মাঝামাঝি আমি Leatherina নাম দিয়ে আমি আমার কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করি। ২০১৭ সাল থেকে আমি আমার কারখানায় বানানো ব্যাগ নেদারল্যান্ডস এ রপ্তানী শুরু করি।

লেদেরিনার পণ্য

নদী: নিজেই বললেন আপনার আজকের এই অবস্থানে আসার রাস্তাটা নিশ্চয়ই মসৃন ছিলনা। খারাপ সময়গুলো কি করে মোকাবেলা করেছেন, তবে ভালো কিছু সময়ের গল্পও আমাদের বলুন প্লিজ। যা শুনে তরুন ও নারী উদ্যোক্তারা উৎসাহ পাবে।
মিজি: অমসৃন পথের গল্পতো আছে প্রচুর। লেদারিনা প্রাইভেট লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করার পর তিনবার অপ্রত্যাশিতভাবে কারখানার স্থান পরিবর্তন, পার্টনারশীপ পরিবর্তন এবং আরো কিছু ভুল সিদ্ধান্ত আমাকে বেশ কয়েকবার দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার মতন পরিস্থিতিতে নিয়ে গিয়েছিল। সেগুলো ধৈর্য, পরিশ্রম আর সাহসের সাথে পার করেছি। আর ব্যবসায়ে এই সংকটগুলো উত্তরনের প্রতিটি ঘটনাই আবার অপার আনন্দের। আমার মনে আছে প্রথমবার আমাদের বিদেশী বায়ার আমাদের ক্রিসমাসের গিফট আইটেম অর্ডার করেছিলেন, লিড টাইম দিয়েছিলেন একমাস, সেসময় আমরা অস্তিত্ব রক্ষার একটা লড়াইয়ে নেমেছিলাম। সেসময় আমি যেন ২৪ ঘন্টাই কাজ করতাম। কাজ ও কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য নানান গবেষণা করতাম, অনলাইনে সুযোগ পেলেই প্রোডাক্ট ডিজাইন, ট্রেন্ড, মার্কেট এসব নিয়ে পড়াশুনা করতাম। সেবার নতুন পণ্য, ম্যাটেরিয়াল সোর্সিং, কাজের দক্ষতা প্রমাণ ইত্যাদি বিষয়কে টার্গেট করে যখন শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময়ে শিপমেন্ট করলাম, সেদিনই আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল সামনের দিনগুলোর বাধা অতিক্রম করতে পারবো। এখন নেদারল্যান্ডস এর চারটি ফেয়ার ট্রেড ব্র্যান্ডকে আমার কোম্পানী থেকে ব্যাগ সরবরাহ করা হয়। বায়াররা প্রায়ই আমাকে ওদের কাজের ফিডব্যাক দেয়, আর বলে, লেদারিনার কাজের কোয়ালিটি  মার্কেটে ওদের ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি এটাকে অনেক বড় একটা মাইলস্টোন অর্জন হিসেবে দেখি।

মেলবোর্নে তাসলিমা মিজি’র সঙ্গে নাদেরা সুলতানা নদী

নদী: এই সময়ের বাংলাদেশে জনপ্রিয় শ্লোগান “চাকরী খুঁজবো না চাকরী দেব”, কিভাবে দেখছেন আপনি? নারী উদ্যোক্তাদের মাঝে এই বিষয়টির প্রভাব কতটুকু, বিষয়টাকে আপনি কি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন না কি অন্য কোন দৃষ্টিকোণ?
মিজি: শ্লোগানটি একজন উদ্যোক্তার কানে অবশ্যই একটি পজিটিভ আবহ তৈরী করে। আমার ক্ষেত্রেও তাই ঘটে। তবে উদ্যোক্তা হওয়াটা যেন স্রোতে গা ভাসানো ট্রেন্ড না হয় সেটা দেখাটা জরুরী। যারা প্যাশন এবং আত্ববিশ্বাস থেকে ব্যবসা করে তারাই সেটা ধরে রাখতে পারেন, অন্যদিকে যারা স্রোতে গা ভাসায় তারা খুব খারাপভাবে ফেইলও করে। তবে আমাদের সমাজে নারীরা পুরুষের চাইতে বেশি উদ্যমী ও উদ্যোগী, এ আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলা। নারীদের ব্যবসায়ের স্কেলটা হয়তো ছোট, কিন্তু নারীদের ব্যবসায়িক উদ্যোগ থেকে প্রাপ্ত আয় তাদের পরিবার ও নিজের জীবনে রাখে অমূল্য ভুমিকা। যেটা পুরুষের ক্ষেত্রে ঘটেনা বললেই চলে। ইন্টারনেটের সহজপ্রাপ্যতার যুগে নারীরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে যেভাবে ঘরে বসে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোগ দাঁড় করাচ্ছে, সেটা আমার কাছে দারুন এক নিরব বিপ্লব মনে হয়।

লেদেরিনার পণ্য সমারোহের সামনে মিজি

নদী: গুটিপা আপনার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান, গুটিপা নিয়ে আজকের অবস্থান এবং আগামীর স্বপ্ন নিয়ে কিছু বলুন
মিজি: ”Women Trading Globally “ প্রোগ্রামের কথায় ফিরে যাই আবার। গুটিপা’তে আমি সবসময় পন্যের কোয়ালিটির দিকে নজর দিয়েছি। আর আমার প্রতিষ্ঠানে আমি আমার কাজের মুল যে চালিকাশক্তি, আমাদের শ্রমিক, তাদের কল্যাণ, সঠিক কর্ম পরিবেশে কাজ করতে পারার সুযোগ তৈরী, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য বান্ধব উপাদানে কাজ করা, টেকসই পণ্য তৈরী করা ইত্যাদি বিষয়কে মাথায় রেখে কাজ করছি। এসব কিছু নিশ্চিত করে যখন আমি মুক্তবাজার অর্থনীতির সাথে প্রতিযোগিতা করতে যাই, তখন প্রায়শই আমি হেরে যাই। অষ্ট্রেলিয়ান সরকারের এই ট্রেনিংয়ে আমি গুটিপার ব্যাগের যে স্যাম্পলগুলো এনেছিলাম, সেগুলো ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে এখানকার নারীদের কাছে। অষ্ট্রেলিয়ান ব্যবসায়ী নারীরা মনে করেন, আমি অনায়াসেই শুধুমাত্র একটি চৌকস বিজনেস স্ট্যাটেজি করে অষ্ট্রেলিয়ান মার্কেটে আমার ব্র্যান্ডকে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত করতে পারি। আমি ব্যাপারটিতে ব্যাপকভাবে আলোড়িত ও উৎসাহিত। আমার শুরু থেকে ইচ্ছে ছিল আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ব্যান্ড হিসেবে গুটিপা’কে নিয়ে যাওয়া।

নদী: আপনি কি এখানে কোন বাজার যাচাই করে দেখেছেন এর মধ্যে?
মিজি: অবশ্যই আমি সে সুযোগ কাজে লাগিয়েছি। আমি ট্রেনিং চলাকালীন সময়ে প্রায়ই এখানকার বড় আউটলেট Myer, David Jones সহ বিভিন্ন লাইফস্টাইল শপিং মল ঘুরেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে আমরা প্রোডাক্ট বানাতে জানি, শুধু জানিনা, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিং। বিশ্ব বাজারে গার্মেন্টস এর গুরুত্বপুর্ন প্রস্তুতকারী দেশ আমরা, লেদার ব্যাগেও আমরা একটু একটু করে এগোচ্ছি। আমাদের এখন ব্র্যান্ড নিয়ে সে সাহস করতে হবে।

নদী: আপনার এই স্বপ্নকে সাধুবাদ জানাই নিঃসন্দেহে। উন্নত দেশের মার্কেটে একটি উন্নয়নশীল দেশের একটি ব্র্যান্ডকে ক্রেতারা কেন গ্রহণ করবে বলে মনে হয় আপনার? সেটা কি একটা বড় পুঁজির খেলা নয়?
মিজি: আমার ব্যবসায়িক উদ্যোগের পেছনে শক্তিশালী অনেক গল্প আছে। আমি যখন আমার ক্লাসে দু একটা গল্প বলেছি, অষ্ট্রেলিয়ান নারীদের সেগুলো আকর্ষণ করেছে। আধুনিক ক্রেতাদের এটা একটি নতুন চরিত্র দাঁড়িয়েছে। তারা জানতে চায় তারা যে পন্য কিনছে, সেটা কোথায় বানাচ্ছে, কারা বানাচ্ছে। যারা বানাচ্ছে এবং যেভাবে বানাচ্ছে, সেটা মানবিক কিনা, সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে কিনা, তারা পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল কিনা। তারা পন্যের সাপ্লাই চেইনের স্বচ্ছতা চায়, গল্প শুনতে চায়। উন্নত দেশের তরুণ সমাজ এখন আর শুধু সস্তা পন্য দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ছেনা। ক্রেতাদের এই চাপে এখন বিশ্বের অনেক বড় বড় ব্র্যান্ড তাদের পলিসি পরিবর্তন করছে, তারা টেকসই ফ্যাশন নিয়ে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে। এবিষয়গুলো বিবেচনা করলে আমি মনে করি, আমার পন্য কেনার জন্য একটি অত্যন্ত পটেনশিয়াল বাজার তৈরী হয়ে আছে। আমার শুধু নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে।

নদী: এই ট্যুরের অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু শুনতে চাই, শুরু থেকে শেষ… মেলবোর্ন এবং সিডনী আলাদা করে কিছু বলুন।
মিজি: আমি এবারই প্রথম অষ্ট্রেলিয়া এসেছি। নতুন মানুষ ও নতুন সমাজকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা আমার সবসময়ই ভাললাগার বিষয়। অষ্ট্রেলিয়া বড় দেশ, জনসংখ্যা নিতান্তই কম। কিন্তু মানুষগুলো অসাধারন। একটা মাল্টিকালচারাল সমাজে ঘোরার আনন্দই আলাদা, রাস্তায় মানুষের পথচলা দেখতে ভাল লাগতো, সবচেয়ে বেশি দেখতাম তাদের ব্যাগ আর জুতা। কি ম্যাটেরিয়াল, কি রং, কি ট্রেন্ড এসব দেখতে থাকতাম নেশার মত। প্রবাসী বাংলাদেশী বন্ধুরা বুকের উষ্ণতা দিয়ে আতিথেয়তা করেছে। ভিন্ন সমাজে গিয়ে তাদের মানিয়ে নেয়ার প্রকৃতিও দেখেছি। সেখানে তারা তাদের সন্তানরা একদিকে অষ্ট্রেলিয়ান সংস্কৃতিতে বড় হচ্ছে, আবার বাবা মায়েরা তাদের সন্তানদের সাথে বিনিময় করছে বাংলায়। তাদের কমিউনিটি অনুষ্ঠানে একদিকে চলে জাকারান্ডা উৎসব, অন্যদিকে চলে পিঠা পুলি সমেত রবীন্দ্র সংগীত সন্ধ্যা। সিডনীতে ল্যাকেম্বা নামে একটি বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকায় গিয়ে দেখেছি, এ যেন বাংলাদেশেরই একখন্ড চিত্র। সেখানে যে একটি ভিন্ন সংস্কৃতির ভিন্ন কমিউনিটি গড়ে উঠেছে, তারাও বর্নিল অষ্ট্রেলিয়ার মানচিত্রে আরেকটি রং। আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানগুলোতে বিভিন্ন সংস্কৃতি থেকে আগত অষ্ট্রেলিয়ানদের দেখেছি, তারা খুব সহজেই এখানকার সমাজে নিজেদের যুক্ত ও প্রতিষ্ঠিত করেছে।

সিডনিতে বন্ধু ও শুভাকাঙ্খীদের সাথে তাসলিমা মিজি

নদী: এ ভ্রমনে আপনার কোন অভিজ্ঞতাটুকু সবচেয়ে স্পেশাল, কোনটি সবচেয়ে বড় অর্জন? কিভাবে কাজে লাগাবেন এই অভিজ্ঞতা আগামীর পথচলায়?
মিজি: এখানে টেনিংয়ে এসে একটা বিষয় বুঝলাম, আমরা দেশে যে কাজটি করছি, সেটি অনেক গুরুত্বপূর্ন কাজ। তবে যে পরিশ্রম করছি, সেটা বাংলাদেশে না করে অষ্ট্রেলিয়াতে করলে এতদিন অনেক সুনাম, বাহবা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারতাম। তবে এরকম একটি পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে নিজেকে আবিস্কার করা অন্যরকম গুরুত্ব বহন করে। আমি প্যানেলিষ্টদের সাথে প্রশ্নোত্তরে প্রায়ই বলতাম, আমি আমার দেশের জন্য, সমাজের জন্য বেশি কিছু করতে পারবোনা, কিন্তু যা করবো, তার প্রভাব হবে প্রশস্ত, শক্তিশালী আর সুদূর প্রসারী।ছোট করে বলতে গেলে বলা যায়, আমি অষ্ট্রেলিয়ায় যতটা শিখেছি, তার চেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত হয়েছি। একজন আবেগী মানুষ হিসেবে আমি মনের শক্তিতে বিশ্বাস করি বেশি। আমার ব্যবসাকে ঘিরে আমার গড়ে ওঠা স্বপ্নকেই বাস্তবায়ন করতে উঠে পড়ে লাগবো। এর বেশি কি করা লাগে!

নদী: আপনি একজন ‘’নারী উদ্যোক্তা এবং সফল, এই বিশেষণকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন?
মিজি: আমি একঘেয়ে কথাকে বড় ভয় পাই। কারন আমি খুব বাজেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ফেলি। দুঃখিত এই জন্য যে ”সফল নারী উদ্যোক্তা” এই শব্দগুলো খুব হালকা এবং মানুষের অগভীর ভাবনাকে প্রতিফলিত করে। প্রয়োজন ছাড়া উদ্যোক্তা শব্দটির আগে নারী শব্দটির প্রয়োগ নারীর অবস্থানকে হেয় করে। আর সফলতা একটি আপেক্ষিক বিষয়। আপনি কোন বেঞ্চমার্ক ছাড়া কারো সফলতা কি করে মাপবেন? এই যেমন আমি আমার বেঞ্চমার্ক ঠিক করেছি Versace বা Gucci বা Coco Chanel এর কোয়ালিটির ব্যাগ বানাতে চাই। আমি সেদিন সফল হবো, যেদিন আমাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে আরো পাঁচজন উদ্যোক্তা এগিয়ে আসবে এবং আমাদের শিল্প উপকৃত হবে। ক্ষমা করবেন, আমি এখনো আমার নিজের অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম করছি।

নদী: আপনি কি প্রশান্তিকার পাঠকদের জন্য কিছু বলতে চান?
মিজি: শুধু বলতে চাই, এই যে এতবড় সাক্ষাতকার কষ্ট করে পড়েছেন, সেজন্য ধন্যবাদ। কারন আমার কথাগুলো অনেক কঠিন, সবার সে ধৈর্য থাকার কথা নয়। আরো বলতে চাই, মানুষের সম্ভাবনার উপর যেন সবাই আস্থা রাখেন সবাই। বাংলাদেশে আমার মতন আরো কিছু উন্মাদ এখনো স্বপ্ন দেখে।
নদী: শুভ হোক, আরো বেশী সুন্দর হোক আপনার আগামীর পথচলা তাসলিমা মিজি!
মিজি: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।