অস্ট্রেলিয়ায় IT বাজার আর আমাদের সম্ভাবনা 

  •  
  •  
  •  
  •  


সময়টা ২০১৪, একযুগেরও বেশি সময়ের ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে তল্পিতল্পা গুছিয়ে পাড়ি জমালাম সুদূর অস্ট্রেলিয়া। প্লেনটা যখন সিডনি এয়ারপোর্টে নামলো, তখন থেকে আমি হয়ে গেলাম এক জীবন্ত কারেন্সী কনভার্টার। কি এক আজব দেশ, এককাপ কফির দাম ২৪০ টাকা !মনে মনে ভাবলাম, তিন/চার মাসে যদি কোনো চাকরি না পাই তাহলে হয়তো না খেয়ে মরতে হবে অথবা আবার দেশে ব্যাক করতে হবে। ধীরে ধীরে পরিচয় হলো আরো অনেক দেশি ভাই এর সাথে, শুনলাম তাদের IT চাকরি পাওয়ার করুন সংগ্রামের কাহিনী। কেউ কেউ পরামর্শ দিলো সিকিউরিটি বা এধরনের কোন জবের ট্রেনিং নেয়ার জন্য। কিন্তু এতদিনের অভিজ্ঞতটা আর স্বপ্ন, কোনটা বিসর্জন দিয়ে সম্পূর্ণ একটা ভিন্ন প্রফেশনে যাওয়ায় মন সায় দিচ্ছিলনা। পরদিন থেকে নেমে পড়লাম চাকরির সন্ধানে, ৭২০ টা জব এপ্লাই করলাম ১৭ দিনে, কল পেলাম ৪টা আর ইন্টারভিউ দিলাম ২টা। ১৮ দিনের মাথায় শুরু হলো আমার নতুন অধ্যায়।

একটা কনসাল্টেন্সি ফার্মে চাকরি পেলাম। দু রুম এর ছোট্ট একটা অফিস, মন কোনো ভাবে টেকেনা – দেশে তো হাজার গুন ভালো ছিলাম, কেন যে মরতে আসলাম এই বিদেশ বিভুঁইয়ে! যাইহোক দমলামনা, চোখকান খোলা রাখলাম। আমার আলটিমেট স্বপ্ন একটা টেক পাইওনিয়ার এর সাথে কাজ করবো। সেই স্বপ্ন পূরণ হলো এক বছরের মাথায়, চাকরি পেলাম আমাজনে।

এই চার বছরে একটা জিনিস বিশেষ ভাবে লক্ষ্য করলাম – অষ্ট্রেলিয়ায় কোম্পানি গুলো নতুন টেকনোলজি এডোপশন এ অনেক এগিয়ে। সাম্প্রতিক cloudscorecard রিপোর্টে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান পাঁচ নম্বরে। চার পাঁচ বছর আগেও কোম্পানি গুলো নিজস্ব ডাটাসেন্টার বিল্ডিংয়ে ইনভেস্ট করছিলো, আর এখন ডিমান্ড বেসিসে ক্লাউড বেসড টেকনোলজি ইউজ করা নিউ নরমাল। এটাকে তুলনা করা যায় ইলেকট্রিসিটি ইউজ করার মতো, যেখানে আপনি বিল পে করেন শুধু মাত্র ইউসেজ এর জন্য। বিগত কয়েক বছরে অস্ট্রেলিয়াতে একটা রেডিক্যাল টেকনোলজি শিফট লক্ষ্য করলাম। কোম্পানিগুলো এখানে অনেক ওপেন নতুন আইডিয়া বা ভিন্ন প্রসেস ফলো করতে। এই “change acceptance mentality” অনেক নতুন চাকরির বাজার উন্মোচন করলো। প্রথম যখন Cloud computing নিয়ে কথা শুরু হলো সবাই ভাবতো “চাকুরীটা মনে হয় এবার গেলো” অথবা “এইটা শুধু ছোট খাটো কোম্পানির জন্য”। ধীরে ধীরে সবাই বুঝলো যে ইলেকট্রিসিটি ইউজ করার জন্য যেমন ঘরে ঘরে “quick rental power plant” বসানোর দরকার নেই তেমনি টেকনোলজি ইউজ করার জন্য মিলিয়ন ডলার খরচ করে ডাটাসেন্টার বানানোরও দরকার নেই।

তা যাই হোক, নতুন চাকরির বাজার তো তৈরী হলো, কিন্তু এইখানে IT ইন্ডাস্ট্রিতে লোকাল ট্যালেন্ট এর অনেক অভাব। এবং সচরাচর যা হয় , সেই সুযোগটা আবারো কাজে লাগলো আমাদের প্রতিবেশী দেশ। আর অপরদিকে আমরা বাংলাদেশিরা হতাশ হয়ে অন্য ক্যারিয়ার এ শিফট হচ্ছি। কিছু জিনিস খুব জরুরি IT ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকার জন্য। যেমনঃ

প্যাশনেট হওয়া
এই গুনটা আসলে সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। বিশেষত IT ইন্ডাস্ট্রিতে। এই ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিটা মুহূর্তে নতুন কিছুর আগমন হচ্ছে। আপনার যদি নতুন কিছু শেখার আগ্রহ না থাকে অথবা চেঞ্জ একসেপ্ট করার মানসিকতা না থাকে, খুব সম্ভবতো IT ক্যারিয়ার আপনার জন্য উপযুক্ত না।

টেকনোলজি ট্রেন্ড সম্পর্কে সচেতন থাকা
যখন CD আবিষ্কার হয়, সবাই বলতো শত বছরের ডাটা প্রটেকশন এর জন্য এর চেয়ে আধুনিক কিছু নাই। আর এখন এই বেপারটা ইতিহাস! টেকনোলজি নিউজ পড়া , LinkedIn এ টেকলোজি লিডারদের ফলো করা, meetup এ জয়েন করা, ইত্যাদি, এই প্রাকটিস গুলো ট্রেন্ড বুঝতে খুব সহযোগিতা করে। আর বিশেষ করে Sydney, Melbourne এ টেক জায়ান্টদের ইভেন্ট খুব ফ্রিকুয়েন্টলি হয়। এই ইভেন্ট গুলোতে অন্য টেকনোলজি এক্সপার্ট দের সাথে নেটওয়ার্কিং করার বিশাল একটা সুযোগ থাকে। IT ইন্ডাস্ট্রিতে একটা জিনিস খুব জরুরি, তা হলো – আপনি যা জানেন তা খুব ভালো ভাবেই জানেন এবং সেটা অন্যকে জানাতেও আপনি পারদর্শী।

দীর্ঘ মেয়াদী চিন্তা করা
স্বল্পমেয়াদী চিন্তা করা, সবসময় শর্টকাট খোঁজা বাঙালির শতবছরের সমস্যা !! এই দোষে আমিও দূষি। IT ইন্ডাস্ট্রিতে আমরা ইন্টারন্যাশনাল সার্টিফিকেশন গুলোর পেছনে দৌড়াই শুধু মাত্র সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য। এর ফল আমরা পাই যখন আমরা ইন্টারভিউ ফেস করি। সার্টিফিকেশন খুব জরুরী, এই সার্টিফিকেশন প্রোগ্রাম কোম্পানি গুলো বানায় একটা এক্সপার্ট টেকনিক্যাল কমিউনিটি গ্রো করার জন্য, আর আমরা শুধু খুঁজি Question Set, যাতে মুখস্ত করে পাশ করা যায়। এই attitude টা খুব খারাপ ইম্ম্প্রেশন ক্রিয়েট করে যখন একজন চাকরি প্রার্থী গাদা গাদা সার্টিফিকেট নিয়ে যায় কিন্তু ইন্টারভিউতে সফল হতে পারেনা।

অন্যকে উৎসাহ দেয়া আর নিজের অজ্ঞতায় লজ্জা না পাওয়া
গত সাড়ে চার বছরে এটা আমার সবচেয়ে বড় শিক্ষা। একটা সময় ছিল, আমি ইমেইল লিখতে ভয় পেতাম। কারণ কিছুনা কিছু ভুল থাকতো ইমেইলে আর আমার বস অলওয়েজ বেপারটার সমালোচনা করতো। মানুষ মনের জোরে অনেক কিছু করতে পারে আর উৎসাহ মনের জোর বাড়ায়। এখন যে খুব ভালো ইংরেজী লিখি তা কিন্তু না, কিন্তু এখানে বসদের কাছ থেকে এই এটিটিউড পাইনাই কখনো। বরং পেয়েছি উৎসাহ, যেটা কনফিডেন্টস আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। ইংরেজী ভাষায় দেশি কাউকে কথা বলতে দেখলে বাঁকা চোখে দেখা আর ভুল ধরাটা আমাদের কমন অভ্যাস। আসলে ভাষা হলো যোগাযোগের মাধ্যম, অপরপক্ষের বোঝা নিয়ে কথা – কঠিন কঠিন ওয়ার্ড ইউজ করা আর ১০০% শুদ্ধ ব্যাকরণ প্রয়োগ কিন্তু মুখ্য না। এই ক্রিটিসিজমটা বাদ না দিলে বাঙালীর বিশ্ববাজারে বোল খুলতে আরো সময় লাগবে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ এই প্রব্লেমটা ওভারকাম করেছে বলেই বিশ্ববাজারে ওদের এতো একসেপ্টেন্স। এই টেক ইন্ডাস্ট্রিতে জানার কোনো শেষ নাই, প্রতিদিন এতো টেলেন্টেড কলিগদের ভিড়ে নিজেকে কিছুক্ষনের জন্য হলেও বলদ মনে হয়, মনে হয় কিছুই জানি না। আর একটা জিনিস শিখলাম – না জানলে অকপটে শিকার করা আর জানার চেষ্টা করা। তাই নিজের অজ্ঞতায় লজ্জা পেয়ে বসে না থেকে শর্টকামিং একসেপ্ট করা আর শেখার চেষ্টা করাটা IT ইন্ডাস্ট্রিতে একটা sustainable ক্যারিয়ার গড়তে খুব জরুরী ।

পড়া, পড়া এবং বেশি বেশি পড়া
IT ইন্ডাস্ট্রিতে একটানা পড়ার কোনো বিকল্প নাই। সপ্তাহে অন্তত নতুন একটা টপিক পড়ার অভ্যাস আপনাকে সাহায্য করবে নিজের স্কিল গ্যাপ আইডেন্টিফাই করতে এবং পরিকল্পনা করতে নিজেকে তৈরি করার – লেটেস্ট ট্রেন্ড এর সাথে এডজাস্ট করার জন্য।

বের্থতায় হার না মানা
আমরা যারা মাইগ্রেশন নিয়ে এই দেশে আসি, আমারদের জন্য বেপারটা অনেক কঠিন হয় শুরুতে এই দেশে। প্রত্যেকে আমরা দেশে একটা সলিড ক্যারিয়ার সেক্রিফাইস করে এখানে আসি আর অনেকে হতাশ হয়ে পড়ি সামান্য ব্যর্থতায়। আমি জানি এই সিচুয়েশনটা হ্যান্ডেল করা অনেক কঠিন, কারণ আমিও একই সিচুয়েশন পার করেছি। এই সময়ে নিজের উপর বিশ্বাস রাখুন, IT ক্যারিয়ার বাদ দেয়ার চিন্তা মাথা থেকে ছাড়ুন, ধর্য্য ধরুন আর চেষ্টা করে যান – নিশ্চিত উৎরে যাবেন।

যাইহোক, অনেক জ্ঞান দিলাম, এই ইস্যু গুলোতে আমি নিজেও কাজ করছি নিজের ইমপ্রুভমেন্ট এর জন্য। অনেকেই হয়তো রিসেন্টলি মাইগ্রেট করেছেন অথবা নতুন অপর্চুনিটির খোঁজ করছেন অস্ট্রেলিয়াতে। তাই যদি হয়, তাহলে এখনই উপযুক্ত সময় নিজেকে আগামী বছরের চাকরির বাজারের জন্য তৈরি করার। হাতে আছে ৪ মাস, নিজেকে তৈরি করুন কোনো একটা ডিমান্ডিং সেগমেন্টের জন্য। আর আমার বিশ্বাস ২০১৯ সালে নিম্নক্ত স্কিল গুলোর ডিমান্ড বাড়বে।

১. ক্লাউড মাইগ্রেশন স্পেশালিস্ট
ক্লাউড টেকনোলজি এখন আর ইভ্যালুশন এর পর্যায়ে নাই, এখন কোম্পানী গুলো প্ল্যান করছে ঠিক কখন তারা ক্লাউড এ মাইগ্রেট করবে। এই ক্ষেত্রে অনেক কোম্পানির স্কীলড লোক দরকার হবে যারা মাইগ্রেশন মেথডোলজি গুলো ভালো বোঝে, আর যাদের ক্লাউড সার্ভিস নিয়ে হ্যান্ডসঅন এক্সপেরিয়েন্স আছে (যেমন আমাজন ওয়েব সার্ভিস এ কাজ করার অভিজ্ঞতা)।

২. কন্টেইনার স্পেশালিস্ট
একটা সময় ছিল, আমার ফিজিক্যাল সার্ভার ইউজ করতাম আলাদা আলাদা সার্ভিস হোস্ট করার জন্য। তারপর আসলো ভার্চুয়ালইজেশন। আর এখন কোম্পানি গুলো ঝুঁকছে Containerization এ। আমার বিশ্বাস, কেও যদি Kubernetes এ দক্ষ হয় তার চাকরির অভাব হবেনা (অন্তত ২০১৯ সালে) । এ ব্যাপারে আমি বাজি ধরতেও রাজি!!

৩. আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স – মেশিন লার্নিং স্পেশালিস্ট
যত দিন যাচ্ছে ভার্চুয়ালাইজেশন, মাইক্রো সার্ভিস আর্কিটেকচার বেপার গুলো বেসিক আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়ে যাচ্ছে। কোম্পানি গুলোও এই টেকনোলজি গুলোতে মাচুরর্ড হচ্ছে। আর এই পরিস্থিতি নতুন রিকুয়ারমেন্ট তৈরি করছে। সবাই এখন এনগেজমেন্ট প্লাটফর্ম বানাতে আগ্রহী। আর তার জন্য দরকার আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স/ মেশিন লার্নিং এ দক্ষতা। এখন একটা মোবাইল এপ্লিকেশন ডেভেলপারও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স / মেশিন লার্নিং ফীচার যোগ করছে ওদের সফটওয়্যার এ। অন্যদিকে সারা দুনিয়া একটা স্কিল ক্রাইসিস এ আছে এই সেগমেন্ট এ। আপনি যদি এই বিষয়ে দক্ষ হতে চান, ৪ মাস খুবই কম সময়। এ ব্যাপারে দক্ষ হতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং মেশিন লার্নিং এর উপর ইউনিভার্সিটির কোর্স গুলো আপনাকে সাহায্য করবে।

৪. মাইক্রোসার্ভিসেস স্পেশালিস্ট
Monolithic এপ্লিকেশন বানানোর যুগ সেই কবেই শেষ। এখন কোম্পানি গুলো ফোকাস করছে highly available, resilient, fault tolerant এপ্লিকেশন ডিজানের। মাইক্রোসার্ভিসেস আর্কিটেকচার এই ডিজাইন রিকুয়ারমেন্ট গুলো পূরণ করতে পারে। শিখে ফেলুন কিভাবে এপ্লিকেশন ডিজাইন করা যায় মাইক্রোসার্ভিসেস আর্কিটেকচার ফলো করে।

আশাকরি আমার সীমিত জ্ঞানের ভাবনা গুলো কারো কারো কাজে লাগবে। শুভকামনা রইলো সকল কঠোর পরিশ্রমী আর প্যাশনেট IT প্রফেশনালদের জন্য।

মাসুদুর রহমান সায়েম
সলিউশন আর্কিটেক্ট
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।