অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের ওপর নির্যাতনের গল্প নিয়ে বাংলাদেশী নির্মিত তথ্যচিত্র ‘What is Australia Day’

  •  
  •  
  •  
  •  

অস্ট্রেলিয়া দিবস এবং অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের ওপর নির্যাতনের ইতিহাসের ওপর নির্মিত একটি দুর্দান্ত ক্ষুদে তথ্যচিত্র ক্যানবেরা শর্টফিল্ম ফেস্টিভ্যালে (CSFF) ১৭ নভেম্বর, ২০২১ প্রদর্শিত হতে যাচ্ছে।

রেমন্ড সালোমন পরিচালিত ক্ষুদে তথ্যচিত্র “What is Australia Day?” ক্যানবেরা শর্টফিল্ম ফেস্টিভ্যালে চূড়ান্ত তালিকায় মনোনীত হয়েছে। আগামী ১৭ নভেম্বর ২০২১ তারিখে অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরার ডেন্ডি সিনেমা হলে প্রদর্শিত হওয়ার পর এটি সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রতিযোগিতার দৌড়ে যোগ দিবে। এতে ৮ বছর বয়সী আদ্রিতা আকাশের অভিনয়ের সাথে যোগ হয়েছে শামা রেইনের জাদুকরী কণ্ঠ। সিনেমাটোগ্রাফি এবং এডিটিং করেছেন শিমুল শিকদার। তত্ত্বাবধানে ছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের বিখ্যাত অভিনেতা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার প্রাপ্ত রিয়াজ আহমেদ। পরিকল্পনা সহযোগিতায় ছিল বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান পিঙ্ক ক্রিয়েটিভ। ক্ষুদে তথ্যচিত্রটির নির্মাতাসহ অধিকাংশ কলাকুশলী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী।

মাত্র চার মিনিট দৈর্ঘ্যের এই ক্ষুদে তথ্যচিত্রটি অস্ট্রেলিয়ার জাতিগত চেতনা, অস্ট্রেলিয়া দিবস উদযাপনের তারিখ হিসেবে ২৬ জানুয়ারিকে বেছে নেয়া এবং এর সাথে অস্ট্রেলিয়ার

আদিবাসীদের ওপর নির্যাতনের যোগসূত্রের বিতর্ককে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রসঙ্গত ১৭৮৮ সালের ২৬শে জানুয়ারি ইংরেজরা অস্ট্রেলিয়াতে প্রথম আগমন করে। তারপর শুরু হয় এখানকার আদিবাসীদের উপর জাতিগত নিপীড়ন। শতাব্দীকালের বেশী ধরে চলা এই অত্যাচারের মধ্যে রয়েছে আদিবাসীদের হত্যা, লুটতরাজ, ভূমি কেড়ে নেয়া, তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি ধ্বংস করে দেয়া, কৃষ্ণবর্ণের আদিবাসী শিশুদের জোর করে বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা, বর্ণবাদী আইন প্রণয়ন করে আদিবাসীদের মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা এবং অস্ট্রেলিয়ার সংবিধান থেকে আদিবাসীদের নাগরিকত্ব রহিত করা। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীরা তাই ২৬শে জানুয়ারি তারিখটিকে তাঁদের উপর নিপীড়ন-নির্যাতন নেমে আসার দিন হিসেবে গণ্য করে। ঠিক সেই দিনটিকে রাষ্ট্রীয় দিবস হিসেবে উদযাপন তাই তারা মেনে নিতে পারেনি কখনো। জাতিসত্ত্বার ঠিক মধ্যিখানে নাড়া দেয়া এই বিতর্ক অস্ট্রেলিয়াকে আজও জাতিগত চেতনার দিক থেকে বিভাজিত করে রাখে। ক্ষুদে তথ্যচিত্রটি আরেকটি ভিন্ন আঙ্গিকে গুরুত্ব বহন করে। কেননা এর নির্মাতা ও শিল্পীদের জাতিগত শেকড় বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের মতো করে ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষেরাও দুই শতাব্দী ধরে ইংরেজদের হাতে নির্যাতিত হয়েছিল।

অভিনয়ে আদ্রিতা আকাশ।

সিডনি-প্রবাসী অভিবাসন বিশেষজ্ঞ রেমন্ড সালোমন, যিনি একই সাথে একজন চলচ্চিত্রনির্মাতা ও গীতিকার, ২৬শে জানুয়ারি অস্ট্রেলিয়া দিবস পালনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন “এমন উদযাপন আমাদের জাতিগত বিবেককে আহত করে”।
তিনি বলেন “অস্ট্রেলিয়ার জাতিসত্ত্বা নিয়ে সবচেয়ে মর্মান্তিক প্রশ্নটি খুব সহজেই করা যায়…তবে এর উত্তর অতটা সহজ নয়; মাত্র ৪ মিনিট ২২ সেকেন্ডের ক্ষুদে তথ্যচিত্রটি অস্ট্রেলিয়ার রক্তক্ষরিত হৃদয়ের ক্ষতচিহ্ন সকলের সামনে আরও উন্মুক্ত করেছে। জাতি হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার জন্মদিন ঠিক সেই দিনেই উদযাপিত হয়, যেই দিন এই ভূমিতে আদিবাসীদের ওপর মর্মান্তিক নিপীড়ন ও হত্যার  সূচনা হয়েছিল। দেশ ও জাতীগত উন্নয়নের স্বপ্ন আমরা কখনোই পরিপূর্ণভাবে অর্জন করতে পারব না যতদিন ২৬শে জানুয়ারি অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দিবস হিসেবে উদযাপন করা হবে”।

তথ্যচিত্রটির শিল্পী ও কলাকুশলী যারা :

আদ্রিতা আকাশ:
৮ বছর বয়সী অস্ট্রেলিয়া অভিবাসী শিশুশিল্পী আদ্রিতা স্কুলে পড়াশোনার মাধ্যমে এখানকার আদিবাসীদের ওপর অত্যাচারের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারে। নতুন একটি দেশে বেড়ে ওঠা শিশুটির কাছে তার আত্মপরিচয়ের হিসেবটুকু অমীমাংসিত রয়ে যায়। কারণ শিশুটির মনে ২৬শে জানুয়ারিতে “অস্ট্রেলিয়া দিবস” পালনের নৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ক্ষুদে তথ্যচিত্রে তার মর্মস্পর্শী প্রশ্ন “The picture you are painting with Australia Day… shall I paint the same picture too?”

তথ্যচিত্রটির অভিনয় ও কুশীলব- বাম থেকে শামা রেইন, শিমুল শিকদার, রেমন্ড সোলায়মান ও আদ্রিতা।

রেমন্ড সালোমন:
তাঁর পেশাজীবন শুরু হয় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একজন বৈমানিক হিসেবে। ২০০৩ সালে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় আসেন। সিডনির ইউটিএস বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষে বর্তমানে তিনি একজন রেজিস্ট্রার্ড মাইগ্রেশন এজেন্ট হিসেবে কর্মরত আছেন। সেই সাথে তিনি অস্ট্রেলিয়ান ফিল্ম রেডিও অ্যান্ড টেলিভিশন স্কুল (AFTRS) থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের ওপরেও পড়াশোনা করেছেন। অভিবাসন আইন পেশার পাশাপাশি তিনি একজন আন্তর্জাতিক পুরষ্কারপ্রাপ্ত গীতিকার এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা। তাঁর প্রথম কাজ ১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্টে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের উপর নির্মিত গীতিচিত্র “বাবা” বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে ১০টি পুরস্কার এবং মনোনয়ন জিতেছে। পরিচালক রেমন্ড অস্ট্রেলিয়া দিবস নিয়ে নির্মিত এই ক্ষুদে তথ্যচিত্রটি উৎসর্গ করেছেন “অস্ট্রেলিয়ার লক্ষ লক্ষ আদিবাসীদেরকে, যারা বছরের পর বছর ইংরেজ ঔপনিবেসিকদের দ্বারা অকথ্য নিপীড়নের স্বীকার হয়েছিল”।

শিমুল শিকদার:
ক্ষুদে তথ্যচিত্রটির সিনেমাটোগ্রাফার এবং এডিটর সিডনি-প্রবাসী শিমুল শিকদার অস্ট্রেলিয়ার নর্থ সিডনি টেফ (North Sydney TAFE) থেকে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, শর্টফিল্ম, নাটক, ধারাবাহিক, ডকুমেন্টারী, মিউজিক ভিডিও সহ প্রায় ২০০ টিরও বেশি প্রোডাকশনে পরিচালক, সিনেমাটোগ্রাফার, এডিটর এবং VFX আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। সম্প্রতি শিমুল শিকদারের পরিচালনায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “আমারো পরাণ যাহা চায়” গানের উপর নির্মিত মিউজিক ভিডিও ১৯টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার এবং মনোনয়ন পেয়েছে।

শামা রেইনঃ
২০২০ সালে বাংলাদেশ থেকে শিক্ষার্থী ভিসায় অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে আসেন। সঙ্গীতশিল্পী শামা বহুভাষী শিল্পী হিসাবে ইতিমধ্যে সুনাম কুড়িয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নির্মিত গিতিচিত্র বাবায় তাকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা গেছে। এতে গানটিও তাঁরই গাওয়া। ক্যানবেরা শর্টফিল্ম ফেস্টিভেলে শামা রেইন এদেশের আদিবাসীদের ভাষায় অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করবেন। যেকোনো অভিবাসী শিল্পীর জন্যে এমন সম্মান এটাই প্রথম। তিনি বর্তমানে সিডনি কনজার্ভেটোরিয়াম অফ মিউজিকে সঙ্গীতের ওপর নিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি ইউটিএস বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়ছেন।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments