অস্ট্রেলিয়ার বনদাহনামা (পর্ব–২) -সালাহউদ্দিন আহমদ ও আহমেদ আবিদ

  •  
  •  
  •  
  •  

 141 views

নিউ সাউথ ওয়েলস, এসিটি, ভিক্টোরিয়া, সাউথ অস্ট্রেলিয়াসহ প্রায় সারা অস্ট্রেলিয়ার বনভূমিতে চারমাসের বেশি হলো জ্বলছে দাবানল। মাঝে কয়েকদিন একটানা বৃষ্টিতে দাবদাহ ও দাবানল কিছুটা কমে আসলেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার কোন লক্ষণ নেই।
দাবানল নিয়ে তথ্যমূলক এবং বিজ্ঞানসম্মত ধারাবাহিক রিপোর্টটি লিখছেন সালাহউদ্দিন আহমদ: সিনিয়র প্রজেক্ট অফিসার, ভিক্টোরিয়ান ফরেস্ট মনিটরিং প্রোগ্রাম ও আলোকচিত্র শিল্পী এবং আহমেদ আবিদ: গবেষক, মানবাধিকার, সমাজ ও সমন্বিত শাসন, ওয়েস্টার্ন সিডনী বিশ্ববিদ্যালয় ও পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ইতালি। আজ পড়ুন দ্বিতীয় পর্ব।

দ্বিতীয় পর্ব:
দাবানলের আগুন নিয়ন্ত্রণ করা অগ্নিনির্বাপন কর্মীদের জন্য একটি তীব্র বিপদজনক কাজ এবং যতই ব্যবস্থা থাকুক না কেন, অগ্নিনির্বাপন কর্মীরা সবসময় বিপত্তির মাঝেই থাকেন। অগ্নিনির্বাপন কর্মীদের ফায়ার ট্রায়াঙ্গেলর কথা সর্বদা মাথায় রেখে এ কাজ করতে হয়। ফায়ার ট্রায়াঙ্গেলর মৌলিক উপাদান হলো অক্সিজেন (বাতাশ), তাপ আর বন জ্বালানির (ফরেস্ট ফুয়েল)। উপাদানগুলোর সংমিশ্রনে জ্বলন শুরু হবার সাথে সাথে রাসায়নিক চেইন প্রতিক্রিয়া শুরু হয় । যতক্ষণ এই চেইন প্রতিক্রিয়া বন্ধ না করা যায় ততক্ষন অগ্নিনির্বাপন কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেন না। সাধারণত আগুন ১.৫ মিটারের নিচে থাকলে সেটির তীব্রতা থাকে অল্প, ৭ মিটারের নিচে থাকলে সেটির তীব্রতা থাকে মাঝারি, যখন আগুন ১৪ মিটার উচ্চতায় চলে আসে (যেমন রাস্তার বৈদ্যুতিক তারের খুঁটির) তখই তীব্রতা অতি উচ্চ তীব্রতা থাকে, দাবানলের আগুন সাধারণত ১৪ মিটারের বেশি হয়ে থাকে। যখন দাবানলের আগুন কোনো একটি গাছকে তার শক্তির আধার হিসেবে গ্রাস করে নেয় তখন আগুনের উচ্চতা সাধারণত বাতাসের গতিবেগে গাছের উচ্চতার দ্বিগুণ পর্যন্ত হতে পারে। বাতাসের তীব্রতা আগুনের শিখাকে কৌণিকভাবে সামনে ঠেলে দেয় এবং আগুন এগুতে থাকে ।

ছবি: সংকটপূর্ণ একটি রেডিও টাওয়ার । দাবানলের সময় রেডিও টাওয়ার পুড়ে যেতে পারে অথবা বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় অকেজো হয়ে যেতে পারে ফলে রেডিও(ওয়াকিটকি) যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতে পারে। ছবি সূত্র: ডিপার্টমেন্ট অফ এনভায়রনমেন্ট, ল্যান্ড, ওয়াটার এন্ড প্ল্যানিং, ভিক্টোরিয়া।

দাবানল আগুন প্রতি ঘন্টায় ১০ কিলোমিটার বেগে এগুতে থাকে এবং গ্রাসল্যান্ড (তৃণভূমি) তে প্রতি ঘন্টায় ২২ কিলোমিটারের বেশি বেগে এগুতে থাকে। আগুনের তীব্রতা সহজেই অনুমেয়। অগ্নি নির্বাপনের জন্য যে কাজ গুলো করা হয় তা হলো :
(১) গ্যাস বা ফোম (যেমন বাসন মাজার তরল সাবান) দিয়ে ধোঁয়া তৈরী করে অক্সিজেন কমিয়ে ফেলা হয়। দাবানলের আগুন নিয়ন্ত্রণে প্লেন বা হেলিকপ্টার থেকে লাল তরল পদার্থ নির্গত করা হয়,
(২) পানি দিয়ে তাপমাত্রা কমিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়। পানি আগুনেই তাপ শোষণ করে নেয় এবং পানি বাস্পায়িত হয়ে হয়ে আরো তাপ কমিয়ে দেয় ফলে চারপাশের তুলনায় আগুনের তীব্রতা কমে আসে।
(৩) বন জ্বালানির পরিমান কমিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়। হাতে ব্যবহারযোগ্য সরঞ্জামাদী দিয়ে বন জ্বালানির পরিমান কমিয়ে ফেলা হয়, মেশিন যেমন বুলডোজার দিয়ে চওড়া নিয়ন্ত্রণ রেখা তৈরী করা হয় এবং কৌশলগতভাবে আগুন লাগিয়ে নিয়ন্ত্রণ রেখার এবং আগুনের প্রান্ত পর্যন্ত পুড়িয়ে দেয়া হয় অথবা ব্যাক বার্নিং করে নিয়ন্ত্রণ রেখার বরাবর পুড়িয়ে দেয়া হয় ।

ছবি: স্পট ফায়ারে আক্রান্ত সংকটপূর্ণ একটি বাড়ী। এমেরজিন্সি মেনেজমেন্ট ভিক্টোরিয়ার একটি হেলিকপ্টার বাড়ী রক্ষা করতে চেষ্টা করছে। ছবি সূত্র: ডিপার্টমেন্ট অফ এনভায়রনমেন্ট, ল্যান্ড, ওয়াটার এন্ড প্ল্যানিং, ভিক্টোরিয়া।

বাতাসের বেগ দ্বারা দাবানলের আগুন এবং তার আচরণ নিয়ন্ত্রিত হয়। বাতাসের দিক পরিবর্তনের সাথে সাথে এর গতিবিধিরও পরিবর্তন হয়, শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং আকৃতিরও পরিবর্তন হয়। জোরালো বাতাস ছাই, ধোঁয়া এবং আদ্রতাকে দ্রুত সরিয়ে ফেলে যা অগ্নিশিখার তীব্রতা বৃদ্ধি করে এবং আগুন পৌঁছানোর আগেই চারপাশের বন জ্বালানিকে উত্তপ্ত করে ফেলে। এছাড়াও জোরালো বাতাস জ্বলন্ত ঘাস, জ্বলন্ত পাতা, জ্বলন্ত গাছের ডাল এমনকি আস্ত জ্বলন্ত গাছ বাতাসে উড়ে গিয়ে অন্য কোথাও নতুন আগুনের সূত্রপাত করতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার ভূদৃশ্য (ল্যান্ডস্কেপ) অনেক স্থানে উঁচুনিচু। ঢালু ভূদৃশ্যও আগুনের আচরণ যেমন গতি, আগুন ছড়িয়ে যাওয়ার হারকে প্রভাবিত করে থাকে। যদি আগুন ঢাল বেয়ে উপরে উঠতে থাকে তবে আগুনের শিখা থেকে বিকীর্ণ তাপ অল্প দূরত্বে অদগ্ধ বন জ্বালানিকে অনেক বেশি তাড়াতাড়ি পোড়ানো শুরু করে দিতে পারে । আগুন পৌঁছানোর আগেই চারপাশের বন জ্বালানিকে উত্তপ্ত করার প্রক্রিয়া এখানে অনেক দ্রুত কাজ করতে পারে। সাধারণত প্রতি ১০ডিগ্রী উঁচু ঢালুতে আগুন ছড়িয়ে যাওয়ার হার দ্বিগুন বৃদ্ধি পায়। দাবানলের সময় জ্বলন্ত বস্তু (অম্বর) বাতাসে উড়ে গিয়ে অন্য কোথাও আগুনের (স্পট ফায়ার) সূত্রপাত করে। ঝোড়ো বাতাসে অম্বর কোনো সংকেত ছাড়াই উড়ে গিয়ে ৪০ কিলোমিটার দূরত্বে পেছনের আগুন পৌঁছানোর আগেই আগুনের সূত্রপাত করার প্রমাণ রয়েছে।

দাবানল সংকট:
নিরবচ্ছিন্ন দাবানল সংকট অস্ট্রেলিয়ার বাস্তুতন্তের (ইকোসিস্টেমের) জন্য একটি ভয়াবহ হুমকি। এই সংকট দীর্ঘমেয়াদি কিংবা চিরস্থায়ী হতে পারে। এ পর্যন্ত প্রায় ১০ মিলিয়ন হেক্টর (বেসরকারী হিসাব) এলাকা পুড়ে গেছে। পুড়ে যাওয়া এলাকায় বসবাস ছিলো হুমকির সম্মুখীন অনেক প্রাণী এবং উদ্ভিদ । ইউনিভার্সিটি অফ সিডনির জীব বৈচিত্র্য বিষয়ের বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ক্রিস ডিকম্যানের
হিসেব অনুসারে প্রায়  ১০০ কোটি প্রাণী নিহত হয়েছে ।গড়ে প্রতি হেক্টর বনভূমিতে  ১৭.৫ স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২০.৭ পাখি, ১২৯.৫ সরীসৃপ বসবাস করে থাকে। প্রফেসর ক্রিস ডিকম্যানের রিপোর্ট (দি ইমপ্যাক্ট অফ দি এপ্রোভড ক্লিয়ারিং অফ নেটিভ ভেজেটেশন অন অস্ট্রেলিয়ান ওয়াইল্ডলাইফ ইন নিউ সাউথ ওয়েলস) বিস্তারিত বলা  হয়েছে কিভাবে এই সংখ্যা হিসাব করা হয়। অস্ট্রেলিয়ান স্টেট অফ এনভায়রনমেন্ট ২০০৬ তথ্য অনুযায়ী যখন কোনো এলাকায় ভূমি সাফ (ল্যান্ড ক্লিয়ারিং) হয় তখন এই এলাকায় যে প্রাণিকুল বসবাস করে তারা সব মরে যায়। নিরবচ্ছিন্ন দাবানল ল্যান্ড ক্লিয়ারিং না হলেও প্রাণী বসবাস করার পরিবেশে এর প্রভাব ল্যান্ড ক্লিয়ারিং এর তুলনায় কম নয়।

During the heavily impacted bushfire sun turns into red black, photo credit: Jordi Jewel.

দাবানল পরবর্তী সময় সঙ্কটময় এবং অনেক বিপদজনক। দাবানল বনভূমি পুড়ে গিয়ে অনেক গাছ পড়ে রাস্তা বন্ধ করে ফেলে। পোড়া গাছ পড়ে মানুষ নিহত এবং গাড়ি ও অগ্নিনির্বাপনে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি বিকল হবার ঘটনা ঘটেছে। আর দাবানল পরবর্তী সময়ের সামান্য বৃষ্টি এই পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ করে তুলে। মাটি নরম হয় আরো, এতে অনেক গাছ পড়তে থাকে। গাছ, ঘাস সহ মাটির উপরিভাগ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বর্তমানে গাছের ডাল, পোড়া পাতা ও ছাই বৃষ্টির পানির সাথে প্রবাহিত (ডেব্রি ফ্লো) হয়ে ভূমিধ্বস তৈরী করছে এবং পানীয় জলের সরবরাহের উপর প্রভাব ফেলছে। এ সময় ভুলেও কোন লোকের অতি আগ্রহী হয়ে দাবানলে পুড়ে যাওয়া বনের দিকে যাওয়া ঠিক না।
চলবে..


সালাহউদ্দিন আহমদ-সিনিয়র প্রজেক্ট অফিসার,
ভিক্টোরিয়ান ফরেস্ট মনিটরিং প্রোগ্রাম ও আলোকচিত্র শিল্পী।

আহমেদ আবিদ-গবেষক, মানবাধিকার, সমাজ ও সমন্বিত শাসন, ওয়েস্টার্ন সিডনী বিশ্ববিদ্যালয় ও পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ইতালি।

 

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments