আইয়ুব বাচ্চুর প্রয়াণে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশী কমিউনিটিতে শোকের ছায়া ও তাদের শোকবার্তা

2060

প্রশান্তিকা প্রতিবেদক: আকষ্মিক হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে চলে গেলেন বাংলা ব্যান্ডসঙ্গীতের ধ্রুবতারা আইয়ুব বাচ্চু। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে শিল্পীকে মৃত ঘোষণা করা হয়। খবরটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশে এক শোকবিহবল পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দেশের বাইরে সারা বিশ্বে যেখানেই বাঙ্গালী রয়েছে সেখানেই প্রিয় শিল্পীকে হারানোর শোকে মুহ্যমান হয় ভক্তরা।

সিডনি তথা সারা অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশী সমাজে গতকাল শোকের ছায়া নেমে আসে। প্রশান্তিকার আহবানে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বুদ্বিজীবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, ছাত্র ও আপামর বাংলাদেশীরা তাদের প্রতিক্রিয়া জানান।

প্রশান্তিকার পাঠকদের জন্য সেসব প্রতিক্রিয়া এখানে তুলে ধরা হলো:

অজয় দাশগুপ্ত, সাংবাদিক ও কলামিস্ট, সিডনি:
আইয়ুব বাচ্চু চট্টগ্রামের মানুষ। সেখানকার কাজীর দেউরিতে প্রথমে সৈকতচারী নামে একটি ব্যান্ডে যুক্ত ছিলেন। সেখানে তপন, পার্থ সহ আরো বেশ ক’জন ছিলো। সৈকতচারী পরে সোলস নামে আত্নপ্রকাশ করে। আইয়ুব বাচ্চু সোলস থেকে বের হয়ে এসে এলআরবি গঠন করে। তারপর তাকে আর পেঁছনে তাকাতে হয়নি। বহু গান আর আ্যলবাম বেরিয়েছে। শতশত সেই গানের মধ্যে আমার প্রিয়গান, ‘এক আকাশের তারা তুই একা গুনিশনে; গুনতে দিস কিছু মোরে।’ হয়তো বাচ্চুরও প্রিয়গান ছিলো এটি। নইলে তিনিও কেনো এতো তারা গুণতে আকাশের প্রাণে পাড়ি দেবেন। ভালো থাকুন আকাশের পাড়ে প্রিয় আইয়ুব বাচ্চু।

গামা আব্দুল কাদির, রাজনীতিবীদ ও সংগঠক, সিডনি: আমার মনে পড়েনা আইয়ুব বাচ্চুর সিডনির কোন প্রোগ্রাম মিস করেছি কিনা। এরকম দরাজ গলার শিল্পী আর হবে না। মানুষ হিসেবেও খুব আন্তরিক ছিলেন তিনি। একসাথে খোশগল্প করেছি প্রচুর। মহান আল্লাহ যেনো তাকে জান্নাতবাসী করে সেই প্রার্থনা করছি।

সিরাজুস সালেকীন, সঙ্গীতশিল্পী ও সংগঠক, সিডনি:
বাবা বলতেন, “গান করা খুব একটা সোজা কাজ নয়। তাই যে যেভাবেই গান করুক না কেন, তাঁকে ভালবাসবি”।  সে থেকেই আইয়ুব বাচ্চুকে ভালবাসতাম।আইয়ুব বাচ্চু আমাদের যুব সমাজের জন্য অন্যরকম এক গানের জগতের রূপকার ছিলেন বলা যায়। স্বাধীনতার পর আজম খান, ফিরোজ সাঁই, ফেরদৌস ওয়াহিদরা অন্য ধারার এক গানের প্রচলন করেন। সেসময় আমরা তাকে পপ গান বলতাম, আসলেই পপুলার ছিল বলেই তো পপ গানের প্রচলন। সেই ধারার গানেরই আর এক ধারক ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু।তিনি একাধারে ছিলেন গায়ক, গীতিকার, সুরকার এবং গিটারবাদক।  তাঁর এই অকালমৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছি। তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।

মাকসুদ, বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত:
ও বন্ধু তোমায় যখনি মনে পড়ে যায় 
বুকেরি মাঝে বড় বেশি ব্যাথা জাগে 
আমার ইচ্ছে করে প্রাণ ভরে তোমায় দেখি।

এস এম আমিনুল রুবেল, সাংবাদিক ও সংগঠক, সিডনি:
সিডনিতে কনসার্টের আগের রাতে বাচ্চু ভাইয়ের জন্য দেশি খাবার নিয়ে গেলাম। খাবার খেয়ে ভাইয়া আমাকে বললো, 
রুবেল, তুইও খেয়ে নে. আমি ঘুমাতে গেলাম , আমাকে কেউ যেনো না ডাকে , আমার একটু শান্তির ঘুম খুব দরকার, আমি ক্লান্ত …
ভাইয়া ঘুমিয়ে গেছেন …আর জাগবেন না।

হাসান তারিক, সাংবাদিক, সিডনি:
অশ্রু চোখেই প্রিয় শিল্পীর সংবাদ করতে হোল। আফসোস, দেশে থাকলে হয়ত তাকে শেষ দেখা দেখতে পেতাম।

শাহে জামান টিটু, কাউন্সিলর, সিডনি:
এখন অনেক রাত; আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি; আরো কত যে গান গেয়ে গেছেন বাচ্চু ভাই। সিডনিতে তিনি যতোবার এসেছেন দেখা হয়েছে। আমি এদেশীয় রাজনীতি করতাম শুনে তিনি খুশি হয়েছিলেন। খুব শিগগির বাচ্চু ভাইকে নিয়ে আসার কথা হচ্ছিলো। সেটা আর সম্ভব হলোনা। আমি বাচ্চু ভাইয়ের বিদেহী আত্নার শান্তি কামনা করছি।

সৌর পান্ডে আ্যলভিন, গানবাকশো, সিডনি:
আইয়ুব বাচ্চু, যিনি পুরো এশিয়ার মধ্যে স্বনামধন্য একজন মিউজিশিয়ান, একজন গিটারিস্ট, একজন মিউসিক ডিরেক্টর, এবং একজন মেন্টর ও বড় মনের মানুষ। এ বি’স কিচেনে আর কোনোদিন গান তৈরি হবেনা। এই শূন্যতা কোনোদিন পূরণ হবার নয়। গান বাকসো পরিবারের পক্ষ থেকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

নাজমুল হুদা, কাউন্সিলর, সিডনি:
আমাদের সময়ে ছেলেবেলা, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়ে আমরা বাচ্চু ভাইদের গান শুনে বেড়ে উঠেছি।
তার চিরবিদায় আমাদের ব্যথিত করেছে। আমি সিডনি বাসী সাংস্কৃতিক সংগঠকদের আহবান জানাই আসুন আমরা বাচ্চু ভাই স্মরণে অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। পাশাপাশি তার আত্নার মাগফেরাত কামনায় মসজিদে দোয়ার আয়োজন করি।

ফাহাদ আসমার, সাংবাদিক, সিডনি:
মাঝে মাঝেই শুধু একটা গান কয়েকদিন এমনকি কয়েক সপ্তাহ প্লে-লিস্টে দিয়ে শোনার অভ্যেস আমার। প্রথম প্রেম হারানোর অব্যক্ত কান্নায় আশ্রয় খুঁজেছিলাম, “বেলাশেষে ফিরে এসে পাইনি তোমায়”। তারপর তীব্র প্রবাসের এই নিঃসঙ্গ নির্বাসিত যাযাবর জীবনে কত শতরাত যে কেটেছে, “এখন অনেক রাত” শুনে, হিসেব নেই। কি অদ্ভুত, গতকাল রাতেও তাঁর গাওয়া আমার সবচেয়ে প্রিয় এই গানটি শুনতে শুনতে ঘুমিয়েছি। আর ঘুম ভাঙতেই থেমে গেল মহাকাব্যের রুপালী গিটার…… 
”সেদিন চোখে অশ্রু তুমি রেখো, গোপন করে…”

শারমিন সুলতানা সুমি,চিরকুট:
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত) 
এই ক্ষতি, এই ক্ষত; এই দেশ, এ পৃথিবী পোষাবে কি দিয়ে!
বাচ্চু ভাই, আল্লাহ আপনাকে শান্তিতে রাখুন।

সিরাজুল হক, আইনজীবি ও রাজনীতিবীদ, সিডনি:
অকাল প্রায়ত আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন আমাদের জীবন বোধের এক চিরায়ত রক শিল্পী। ভীষন জনপ্রিয় ও প্রতিভাবান এই শিল্পী বাংলাদেশের সংগীতাগণকে নাড়া দেন অপ্রত্যাশিত ভাবে। মজ্জাগত ভাবে শিল্পী সত্তার অধিকারী প্রিয় বাচ্চু ভাই উপহার দিয়েছেন অগণিত কালজয়ী গান। প্রশান্ত সাগরের পারে এই অস্ট্রেলিয়াতে তিনি এসেছিলেন কয়েকবার-ভালো সময় উপহার দিয়েছেন প্রবাসীদের। তিনি বেঁচে থাকবেন আমাদের মাঝে দীর্ঘ দিবস -দীর্ঘ রজনী অপ্রতিরোধ্য গতিতে। মায়ের আশীর্বাদে তিনি পারহবেন পুলছিরাত। উপরে ভালো থাকবেন আপনি প্রিয় বাচ্চু ভাই।

বাপ্পী হোসেন, ফটোগ্রাফার, ব্রিসবেন:
দেশ থেকে বন্ধুর ফোন, হাউমাউ কান্না ! কিশোর বয়সে কাটানো সময়গুলো যাকে ঘিরে ছিল তিনি আজ থেকে নেই। এই হাহাকার বলে বোঝাবার নয়। ৩ বছর আগে ব্রিসবেনে কনসার্ট করতে এসেছিলেন, BAB এর আমন্ত্রণে photoshoot করি অনুষ্ঠানের। কিংবদন্তিকে কাছ থেকে দেখার আর ছবি তোলার সুযোগটি ছিল আমার জীবনের পরম পাওয়াগুলোর একটি ।ছবি তোলার ফাকে একটু বিরতি, রুমটিতে শুধু উনি আর আমি- গোছগাছের এক ফাকে খেয়াল করলাম এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছেন আমাকে ! চোখে চোখ পরতেই বলে উঠলেন আপনার মত এত dedication আমি কম photographer এর মধ্যে পেয়েছি !আমি কিছুক্ষন নড়াচড়ার ক্ষমতা হারিয়ে দাডিয়ে ছিলাম। কিভাবে একটা মানুষ অসুস্থ শরীরে ৩ ঘন্টা গান গেয়ে এমন crowd এ আমার কাজ খেয়াল করতে পারে। কতটা বিচক্ষন আর দরদী হলে এমনটা সম্ভব ! ঐ আকাশের একটি তারায় রোজ খুঁজবো তোমায় হে সাধক।
সুখেরই পৃথিবী
সুখেরই অভিনয়…
যতই আড়ালে রাখো…
আসলে কেউ সুখী নয়।
কি অমোঘ সত্যটা কত নিখুঁত, সাদাসাপটা ভাষায় আর কে পারবে গান বানাতে ? শত শত হৃদয় ছোয়া গান আর কজনার ব্যক্তিগত ঝুড়িঁতে শোভা পাচ্ছে ?সারা পৃথিবীতে কোটি কোটি ভক্ত কজন মানুষের ভাগ্যে থাকে ?

তুলি নূর, প্রশান্তিকা প্রধান, ব্রিসবেন:
দুপুরে FB এ খবরটা দেখে চমকে উঠলাম, মনে হল কেউ যেন শরীর থেকে খানিকটা মাংস কেটে নিয়ে গেল। এত তাড়াতাড়ি কেন যেতে হবে গো গিটারের যাদুকর ? এই সেদিনও গর্ব করে আইয়ুব বাচ্চুর আমেরিকায় music store এ গিটার বাজিয়ে লোক জড় করে ফেলার গল্পটা বলছিলাম আমার ছেলেদের।৩ বছর আগেই ব্রিসবেনে concert করে গেলেন, কাছ থেকে কিছুটা সময় দেখেছি।অনেক অসুস্থতা নিয়েও পুরো ৩ ঘন্টা দর্শক মাতিয়ে আবার ঐ মাঝরাতে যখন সবার সাথে হাসিমুখে ছবি তুলছিলেন তা দেখে আমারই অপরাধী লাগছিল। বাচ্চাদের সাথে খুনসুটি করে, আদর দিয়ে তোলা ছবি দেখে বোঝাই যাচ্ছিল উনি দেখানো কিছু করছেন না । পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় নিয়েও মানুষের মন যে কত বিশাল হতে পারে তা সেদিন শিখেছি।আমরা যখন University তে পড়ি, technology র কড়াল গ্রাসে নিজেকে সপে দেয়ার সময় হয়নি তখনো। কে আমাদের পৃথিবী চিনিয়েছে? ভালবাসতে শিখিয়েছে? তারুন্যের সময়গুলোকে চুরি করে আমাদের সঠিক পথে ধরে রেখেছে কে? আপনি সেই অল্প কজনার একজন পথ প্রদর্শক !পৃথিবীর কোন বাঙালী তাদের জীবদ্দশায় আপনাকে ভুলতে পারবে না !
একটা সময় আরো বুড়ো হলে নাতিপুতিদের বলবো আমরা আইয়ুব বাচ্চুর আমলে জন্মেছিলাম । আর এভাবেই আপনাকে বাচিয়ে রাখবো আমরা প্রজন্ম  থেকে প্রজন্মান্তরে। ওপারে অনেক ভালো থাকবেন এই কামনা সবার।

নোমান শামীম, সম্পাদক, মুক্তমঞ্চ, সিডনি:
আইয়ুব বাচ্চু কি ছিলেন? আমাদের শরীরের এবং মনের একটা বিরাট অংশ, কেনো যেন মনে হচ্ছে শরীর থেকে কেউ এক কেজি মাংশ আস্তে আস্তে করে কেটে নিচ্ছে। আহা, আমাদের স্বর্নালী সময়ের স্বর্নালী মানুষগুলো! আমরা যখন প্রথম প্রেমে পড়া শুরু করি, যখন কবিতা পড়ি, যখন অনেক বড় বড় স্বপ্ন দেখা শুরু করি, তখনকার সময়ের মহামানব যারাঃ গুরু আযম খান, কুমার বিশ্বজিত, মাকসুদ, আইয়ুব বাচ্চু, ফিরোজ সাঁই, তপন চৌধুরী, শেখ ইশতিয়াক, জেমস, পার্থ, নকীব খান, লাকি আখন্দ, খালিদ হাসান মিলু, খালেদ, শুভ্রদেব, সাবাতানি, সুমনা হক, ডলি সায়ন্তনী, বেবি নাজনীন, সামিনা চৌধুরী, রবি চৌধুরী, সোলস, এল আর বি, ডিফারেন্ট টাচ, অবসকিউর, চাইম, ফিলিংস, ওয়্যারফেজ, মাইলস…আহা, এক ঝাক থোকা থোকা ভালোবাসা, সেই আশি আর নব্বইয়ের দশক।
আমরা সুপার স্টারদের দেখেছি, তাদের একটা প্রোগ্রামের জন্য জগন্নাথ, আর্মি স্টেডিয়াম, ধানমন্ডি মাঠ, মিরপুর-কোথায় না গিয়েছি! একটা টিকেটের জন্য বুভুক্ষু গেটে দাঁড়িয়ে থেকেছি। আমরা আমাদের সময়ে স্টার দেখেছি, কিভাবে গানের পর গান গেয়ে এক একজন মহামানবে পরিনত হয়। দিনের পর দিন সাধনায় দেশজুড়ে তাঁরা ভক্তশ্রেনী তৈরি করেছেন, সম্মান আর ভালোবাসা অর্জন করেছেন, নিজেদের লিজেন্ড বানিয়েছেন। ব্যান্ড সঙ্গীতকে তারুন্যের একদম ভিতরে নিয়ে গিয়েছেন তাঁরা, আমাদের অজান্তেই আমাদের উত্তাল করেছেন, আমাদের যৌবনকে পরিপুর্ন করেছে এই জেনারেশন।
আইয়ুব বাচ্চুর সাথে কোনোদিন পরিচয় হয় নি, কাছ থেকে দেখা হয়েছে কেবল একবার, কিন্তু আমরা এই জেনারেশনের শিল্পীদের মনে ও প্রানে ধারন করেছি, তাদের গান গেয়েছি, জীবনকে জীবনের মাপে মেপেছি, মানব জন্মকে সেলিব্রেট করেছি। মহল্লার কোনো মেয়ের বাসার কোনায় বন্ধুরা মিলে তাদেরই গানে গানে আমাদের নিবেদনকে জানান দিয়েছি, গভীর রাতে বাসায় ফিরতে ফিরতে একমনে তাদের গান গেয়েছি, রিক্সায় চার বন্ধু কোনো বন্ধুর মন খারাপ বা ভালো হলে চিৎকার করে তাদেরই গান গেয়েছি। কি বেসুরে ছিলো আমাদের গলা, আর কি অদ্ভুত ভালো লাগতো তাদের গান গাইতে! আহা, আমাদের আইয়ুব বাচ্চুদের দিন।

নামিদ ফারহান, সাংবাদিক, সিডনি:
আচ্ছা মাধবীরা কি কান্না করতাছে? মনে হয় কাঁনতাছে । তাদের নষ্ট কাহিনীতে সুর বসাইয়া মাতায় দিছিলো যে লোক, উনারই স্থান শূণ্যতায় আজ বাংলাদেশ। আচ্ছা এখনও কি পেনশনের জন্য বাবারা ঘুরে বেড়ায় অফিস পাড়ায়? কিংবা কোন শেষ রাতের ডাক্তার কি কথা দিয়েও আসেনা? হয়তো সময় পাল্টেছে, ওরকম আর হয়না। কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্মের সময় থমকে দিয়েছে হঠাৎ করে প্রকৃতির মৃত্যুক্ষুধা।
নাপতার বাক্সের সেই ফিতেওয়ালা ক্যাসেট কিংবা সেই তুমি। রুপালী গিটার হাকিয়ে তোমাকে খুজতে যাওয়া, পাওয়া না পাওয়ার কষ্ট কিংবা ক্যাপসুলের ভালোবাসায় বাংলাদেশ; সব যেনো থমকে গেছে। ঘুম ভাঙ্গা শহরের জেগে উঠা সে বালক নীরবে নীল বেদনায় শায়িত আজ। শুধু হাওয়া ভাসছে তার সুরের সুবাস। জীবনের সকল আয়োজন দরজার ওপাশে রেখে ভালেবাসা আজ রাতের তারা। আইয়ুব বাচ্চুর সাথে আমাদের স্মৃতি রোমন্থন করতে গেলে একটা পুরো জীবন ধরে টান দিতে হবে। একসময় ছুটে বেড়াতাম রাজধানী কিংবা বাংলার বিভিন্ন শহরের বিবিধ অলিগলি কোথায় গেলে পাওয়া যাবে সেই ছয় তারের ঝংকার সংগে দরদ ভরা গলায় আমাদের শ্লোগান । হ্যা আমাদেরই শ্লোগান। যে ক’জনের সুর কিংবা গীতিকাব্য সাথে নিয়ে বেড়ে উঠেছি নি:সন্দেহে আপনি অন্যতম।
রাত পোহালেই বুঝি হকাররা সব ছুটোছুটি করবে বড়বাবু মাষ্টারের কাছে চাঁদমামার খবর নিয়ে, কেউ হয়তো তিন পুরুষের হিসেব মিটিয়ে আপনার সাথেই উড়াল দিবে আকাশে।
সবকিছুই চলবে,
দৌড়োবে,
হাঁটবে
কাঁদবে
তোমার গান গাইবে।
কিন্তু এ শূন্যতা?
কে পোষাবে?
যাত্রা শুভ হোক বড্ড পিরিতের মানুষটার।

নিজাম উদ্দিন উজ্জ্বল, সঙ্গীত শিল্পী, সিডনি:
গান বাজনার সাথে আমার সম্পর্কটা অনেক ছোট্ট বেলা থেকে। হাজার হাজার গান শুনেছি শত শত শিল্পীর। কিন্তু কিছু কিছু শিল্পীর গান জীবনের সুখ দু:খ হাসি কান্নার সাথে এমন ভাবে জড়িয়ে আছে যে তা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত হৃদয় এবং মস্তিষ্কের ভিতরে থেকে যাবে। আমাদের জেনেরেশনের জন্য তেমনি একজন শিল্পী ছিলেন বাচ্চু ভাই। আহা কি মেলোডি। প্রথম প্রেমিকার পাত্তা না পেয়ে যখন ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলাম তখন ফেরারি এই মনটা আমার শুনে কত রাত যে চোখের জলে ভিজেছি। কিংবা ফেরারি এই মনটা আমার শুনে আবার নির্লজ্জের মতন তার কাছে যেয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। বন্ধুদের আড্ডায় চিৎকার করে গেয়ে বেড়াতাম হাসতে দেখো গাইতে দেখো। কত রাত কত অভিমান বালিশে গুঁজে শুনেছি, সেই তুমি কেন এতো অচেনা হলে কিংবা ঘুমন্ত শহরে। মনের অজান্তে এই গান গুলো কখন যে নিজের কত আপন হয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি। এইতো গত অগাস্ট মাসের কথা আমার “জলসা” অনুষ্ঠানের শেষ গানটা ছিল “সেই তুমি”, বাচ্চু ভাইয়ের এই গান গুলো শুনে কেটেছে আমাদের শৈশব,তারুণ্য এবং যৌবন. আমি জানি ঠিক আমার মতোই আরো লক্ষ লক্ষ তরুনের অগণিত নির্ঘুম রাতের একমাত্র সঙ্গী ছিলেন আপনি এবং আপনার কালজয়ী সব গান। মেলোডি কিং বড় তাড়াহুড়া করে চলে গেলেন আপনি।

পি এস চুন্নু, রাজনীতিবীদ:
আমি মনে করি সময়ের অনেক আগেই মৃত্যু হলো এই কিংবদন্তী শিল্পীর। বাংলাদেশের তরুন, যুবা, বয়স্ক সকলের প্রিয় শিল্পী ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। তার বিদেহী আত্নার শান্তি কামনা করছি। শোকসন্তপ্ত পরিবারের সকলের প্রতি আমার সমবেদনা জানাচ্ছি।

রাফিয়া হাসিন যুঁই, প্রশান্তিকা প্রধান, মেলবোর্ন :
সব যদি লিখে ফেলা যেতো, এক লাইন ও লিখতে পারছি না। শুধুই এক শূণ্যতা, ভয়াবহ শূণ্যতা।

তানিম হায়াত খান রাজিত, সরোদ আর্টিস্ট, শিল্পী, সিডনি:
আইয়ুব বাচ্চুর সাথে আমার অসংখ্য স্মৃতি। আমার বোন রিনা ফওজিয়া এলআরবি’র সঙ্গে ফিউশন করেছে। সেখানে আইয়ুব বাচ্চু গীটার এবং রিনা সেতার বাজিয়েছে। সাবিনা ইয়াসমিন খালার ক্যানসার ধরা পড়লে সিংগাপুর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য অর্থ সংগ্রহে আইয়ুব বাচ্চুর অগ্রণী ভূমিকা ছিলো। এমনকি অসুস্থ কাঙালিনী সুফিয়াকে সাভার থেকে তুলে এনেছেন আইয়ুব বাচ্চু। উনি শুধু বড় শিল্পী ছিলেন না, বড় মানুষও ছিলেন।

আবু তারিক, সম্পাদক, সিডনি বেঙ্গলী, সিডনি:
আমি ছেলেবেলায় বাচ্চু ভাইয়ের নয়, তপন চৌধুরীর ভক্ত ছিলাম। তারপর একসময় বাচ্চু ভাই আমার কাঁধে ভর করলো। বাচ্চু ভাইয়ের গান এতো শুনেছি যে, অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেয়া আমার ছোট ছেলেও গিটারে ‘এতো কষ্ট কেনো ভালোবাসা’ গাইতে পারে।

সোহেল খান, গীটারিস্ট, সিডনি:
আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন অসাধারন শিল্পী ও মানুষ। আমার মা শিল্পী দিলরুবা খানের সাথে মাত্র কথা হলো, তিনিও ভাত খেতে পারছেন না। আমার মা এবং বোন দুজনেই বাচ্চু আংকেলের সুরে গান গেয়েছেন। আমিও তাকে অনেক দেখেছি। আজ তার মৃত্যুর খবর শুনে গীটার ধরে বসে আছি। পরপারে ভালো থাকুন।

মিঠু স্বপ্ন, সঙ্গীত শিল্পী, সিডনি:
বাচ্চু ভাই অনেক বড় মানুষ। আমি তুচ্ছ একজন মানুষ। এতো বড় কাউকে নিয়ে আমি বলতে পারছিনা, ভাই…( তারপর মিঠু হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন)।

আউয়াল খান, সম্পাদক, স্বদেশবার্তা ও বাংলাকথা, সিডনি:
বাংলা ব্যান্ড সংগীত শোনাটা নেশায় পরিনত হয়েছিল আইয়ূব বাচ্চুর গান দিয়ে। তিনি বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতকে নতুন উচ্চতা নিয়ে গিয়েছিলেন । সংগীতাঙ্গনে নতুন অনেক শিল্পী আসলেও জনপ্রিয়তায় আইয়ূব বাচ্চুর ধারে কাছেই যেতে পারেননি কেউ। ভালবাসা-আবেগ আইয়ূব বাচ্চুর গানকে অবিনশ্বর করেছে, তার মৃত্যুতে দেশের সঙ্গীত জগতের অপূরণীয় ক্ষতি হলো।

তপন ডি কস্টা, তান্ত্রিক ব্যান্ড, সিডনি:
এই রুপালী গিটার ফেলে
একদিন চলে যাব বহু দূরে….
সেদিন চোখে অশ্রু তুমি রেখো
গোপন করে”………
সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমাদের এই পথ চলায় শুধুমাত্র তিনিই জানেন আমাদের সমস্ত কিছু…… প্রার্থনা করি আমাদের প্রিয় আইয়ুব বাচ্চু ভাইয়ের আত্মার চির শান্তির জন্য। চির ভালবাসা রইল আপনার প্রতি।

এনায়েত উল্লাহ, সম্পাদক প্রত্যয়, এডেলেইড:
মঞ্চ আছে, থাকবে। ধূলো মলিন নিঃসঙ্গ গীটার বেঁচে থাকবে স্মৃতি নিয়ে। শুধু মানুষটি নেই। মঞ্চের সেই যাদুকর আর আসবেন না। সোনালী সেই গীটারে আর কোনোদিন বাজবেনা ঐন্দ্রজালিক সুরের মুগ্ধ মূর্ছনা। আজম খান পরবর্তী পপ সংগীত তাঁর পরিবেশনায় খুঁজে পেয়েছিলো নান্দনিক আধুনিকতা এবং চমৎকার স্মার্টনেস। দাম্ভিক শিল্পের ভূবনে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম বিনম্র, অনন্য বিনয়ী। পৃথিবীর নানা প্রান্তের বাঙালি, যারা মধ্য বয়সী তারা হয়তো আমৃত্যু মনে রাখবেন। তারুণ্যে ভরপুর নতুন প্রজন্ম অন্তত আরো কয়েক যুগ তাঁকে ভুলতে পারবেনা। আইয়ুব বাচ্চু, আপনি কী দেখতে পাচ্ছেন পৃথিবীময় আপনার অগনিত ভক্তের কাঁন্নাভেজা চোখ! আপনি কী শুনতে পাচ্ছেন তাদের হৃদয়ের তার ছেঁড়া গীটারের তালহীন সুর। চলে গেলে আর ফিরে আসা হয়না। আপনি বরং আমাদের ভালোবাসায় নতুন দীর্ঘ যাত্রা পথে শান্তিময় থাকুন। আমাদের মনের মঞ্চ জুড়ে আপনার সপ্রাণ সুরের মায়াময় মাতামাতি।

সাকিনা আকতার, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মী, সিডনি:
হাসতে দেখ গাইতে দেখ, অনেক কথায় মুখোর আমায় দেখ, দেখ না কেউ হাসির শেষে নীরবতা।
আমরা আজ সেই নীরবতা উপলব্ধি করছি প্রতি মূহুর্তে, কিংবদন্তি, জনপ্রিয় ব্যান্ডদল এলআরবি’র লিড গিটারিস্ট ও ভোকাল আইয়ুব বাচ্চুকে হারিয়ে।একাধারে গায়ক, লিডগিটারিস্ট, গীতিকার, সুরকার, প্লেব্যাক শিল্পী, বাংলা ভাষাভাষী তরুণ প্রজন্মকে জাগ্ৰত করেছেন অধরা মাধুরীর ছন্দ বন্ধনে। তার হাত ধরে এ দেশীয় ব্যান্ড সংগীত অনন্য মাত্রা পেয়েছে।পাইরেসি বন্ধ করতে, সচেতনতা বাড়াতে, বাংলাদেশের টেলকোগুলোর সাথে কাজ করেছেন। শিল্পীদের সম্মাননা দিতে চেষ্টা ক‍রেছেন এই পথ প্রদর্শক। আইয়ুব বাচ্চু শ্রোতাদের উচ্ছ্বাস, মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত থাকবেন , হ্নদয় জুড়ে থাকবেন অনন্তকাল।

সালেহ জামী, লেখক, সিডনি:
একদিন ঘুম ভাঙা শহরে মায়াবী এ সন্ধ্যায় চাঁদ জাগা এক রাতে একটি কিশোর ছেলে একাকী স্বপ্ন দেখে হাসি আর গানে সুখের ছবি আঁকে আহা কি সুর!’ কিশোর আমি আইয়ুব বাচ্চুর সাথে মিশে গেলাম সেই গানে.. তারপরের ৩ দশক ব্যান্ড সংগীতের এই দিকপাল তাঁর অসমান্য প্রতিভায় আমাদের মুগ্ধ করে গেছেন গেয়ে আর গিটার বাজিয়ে! তাঁর এই অকাল প্রয়াণ যে অপূরনীয় ক্ষতি তা বলাই বাহুল্য। আমরা শোকাহত। বেদনার বালুচরে বসে গাইব, “সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে?”

কাজী সুলতানা শিমি, সাংবাদিক, সিডনি:
আমার খুব খারাপ লাগছে……লিখার মতো যথার্থ শব্দ খুঁজে পাচ্ছিনা। এই খারাপ লাগা অক্ষরে প্রকাশ করা যায়না। মনে হচ্ছে হাড় -পাঁজর” গুলো পাথরের মতো ভারী হয়ে আছে……জাগতিক সময় পেরিয়ে যাওয়া আইয়ুব বাচ্চু” যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন……এছাড়া আর কি বলতে পারি !!!

শরীফা তাসমীম টুলটুলী, লেখক ও শিক্ষক, পার্থ:
আমরা যারা প্রাইমারী স্কুলের চতুর্থ অথবা পঞ্চম শ্রেণীতে হ্যামিলনের বাঁশীওয়ালা পড়েছি ,আমাদের প্রায় সবার মাঝেই কেমন এক রোমাঞ্চ কাজ করতো, কেমন এক অদেখাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা ।হ্যামিলনের বাঁশীতে মোহাচ্ছন্ন হয়ে এক অগণিত মানব শিশুরা চলে যাচ্ছে ,হ্যামিলনের পেছনে পেছনে অজানা ওই দূর পাহাড়ের আড়ালে । আমরা কেউ জানি না …তারপর অথবা তারপর শিশুগুলো কোথায় গেলো ?! কেমন হবে সেই অজানায় চলে যাওয়া শিশুগুলোর জীবন প্রনালী অথবা জীবন যাত্রা । এই অজানাকে জানার আকাঙ্ক্ষা বুকে চেপেই আমরা কিশোর অথবা কিশোরীকালে পা রেখেছিলাম ।
শিশুকালের সেই হ্যামীলনের মোহ আমাদের কেটে গেলো আমাদের কিশোর কিশোরী কালে এসে । আমরা পেলাম আমাদের সত্যিকারের জীবনে এক গিটারওয়ালা, একজন গানওয়ালা ।যার সুর কথা আর স্টাইলে আমরা মানে আমাদের প্রজন্ম মোহাচ্ছন্ন হয়েছিলাম অথবা মোহাচ্ছন্ন হয়ে আছি এই মুহূর্ত পর্যন্ত । যার গানের সুরে আমরা কিশোরীকালে মেতেছি, তরুন বয়সে এসে মনে হয়েছে গানগুলো শুধু আমার জন্য লেখা, আমার জন্য গাওয়া। আমাদের প্রায় প্রত্যেকের অনুভূতিই এক । কালো পোশাকের, কোঁকড়া চুলের, বুকের সাথে রেখে দেওয়া সোনালী গিটারের, ভরাটপুরু, আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ কণ্ঠের আমাদের হ্যামীলনের বাঁশিওয়ালা, আমাদের আইয়ুব বাচ্চু । আজ জব শেষ করেছি ৩ টা ৩০ মিনিটে । উবার কল করে উবারের জন্য অপেক্ষা করার সময় ফেসবুক একটু দেখতে গিয়ে একটা খবরে চোখ স্থির হয়ে গেলো খানিকক্ষণ। পরক্ষনে তড়িঘড়ি স্কলে দেখলাম শুধু শোক …আর শোকের ছায়া, শোকের কথা আমাদের হ্যামীলনের গিটারওয়ালাকে নিয়ে ।একটা দেশের কয়েকটা প্রজন্ম ভালোবাসে একজন গিটারওয়ালাকে । আমাদের গিটারওয়ালা, আমাদের গানওয়ালাকে সৃষ্টিকর্তা ভাল রাখুন ওপারে।

শাখাওয়াৎ নয়ন , লেখক ও কলামিস্ট, সিডনি:
একজন আইয়ুব বাচ্চু শুধু বাংলাদেশের ব্যান্ডের গানের কিংবদন্তীই নন, তিনি অনেকের জীবনে ঘুমভাঙা শহরের সাদাকালো কৈশোর, আমাদের কৈশোর ছিল এল আর বি-র নাগরিক গানের মত বর্ণিল। আইয়ুব বাচ্চুর গিটারের মত বাঙময়। আমাদের আংশিক রঙ্গিন যৌবনে, যার গানের কথা দিয়ে প্রেমপত্র লিখেছি, ইউনিভার্সিটিতে মেয়েদের হলের সামনে দুস্টছেলের দল হেরে গলায় গেয়েছে, ‘আমি বারো মাস তোমায় ভালোবাসি, তুমি অবসর পাইলে বাসিও’। ‘সব ভালো তুই একা বাসিস নে, একটু ভালবাসতে দিস মোরে’ কিংবা ‘আমি কস্ট পেতে ভালোবাসি’। আবার এই আইয়ুব বাচ্চুই কারো কারো জীবনে, ব্রেকআপের পরে জোড়ালাগা সম্পর্কের দাম্পত্য সঙ্গীত, ‘অপরাধ যতটুকু ছিল তোমার কাছে, তুমি ক্ষমা করে দিও আমায়’।
ঢাকার এলিফ্যান্ট রোড, আমাদের চিরচেনা ব্যান্ডের শহরে সোলস, ফিডব্যাক, মাইলস, চাইম, ওয়ারফেজের মাঝে আর কোনো দিন কেউ গাইবে না, ‘হাসতে দ্যাখো, গাইতে দ্যাখো, …মুখর আমায় দ্যাখো…’। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে হিন্দী গানের সুনামী, যে ক’জন সুরের পদাতিক বুক চিতিয়ে ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে এলআরবির আইয়ুব বাচ্চু, ঢাকা ব্যান্ডের মাকসুদ, মাইলসের ভ্রাতৃদ্বয়, জেমস এবং লাকি আখ্‌ন্দ এর নাম বাংলাদেশের মানুষ ভুলবে কেমন করে?
সেই অভিমানী মানুষটি, তাঁর প্রিয় লিটল রিভার ব্যান্ড (এলআরবি) এবং রুপালী গিটার ফেলে, ফেরারি মনটা নিয়ে চলে গেলেন কিভাবে?

মিল্টন হাসনাত, কবি ও রাজনীতি:
শিল্পী জীবন বড় কষ্টের। এত কষ্ট নিয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব। মাত্র ৫৬ বছর বয়সে চলে যাওয়ায় তাই অবাক হইনি বাচ্চু ভাই। সোলসের বাচ্চু, সোলস ছেড়ে এলআরবির বাচ্চু, ঢাকায় নতুন গায়কদের জন্য আস্থার বাচ্চু, আপনার পুরো উত্থান তো চোখের সামনেই। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে থাকতে কত যে এসেছেন, গেয়েছেন। সেই সময়টা সযত্নে বুকে পুরে রাখা আছে। পরপারে যে ফর্মেই জীবন থাকুক ভাল থাকবেন। আর এইপারে অসাধারণ গানের মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন আপনি। বিদায় প্রিয় বাচ্চু ভাই।আপনার প্রস্থানে আজ দিনটা বিষন্ন থেকে বিষন্নতর হয়ে গেলো!

তানভীর বিপ্লব, ব্যবসায়ীক ও সাংবাদিক :
নব্বই দশকের শুরু থেকেই আইয়ুব বাচ্চুর গানের সাথে পরিচিত হই। ধীরে ধীরে তিনি জনপ্রিয়তার শিখরে চলে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তার এলআরবি সহ বামবার অন্যান্য ব্যান্ডের পারফরমান্স দেখেছি। এখনও মনে পড়ে কলাভবন ও আই আর বিল্ডিংয়ের মাঝখানে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীকে তিনি মাতিয়ে রেখেছিলেন। পাশ্চাত্য ও ভারতীয় সঙ্গীতের বিপরীতে আইয়ুব বাচ্চু ব্যান্ড সঙ্গীত দিয়ে ভিন্ন মাত্রা সংযোজনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। শিল্পীর এ মৃত্যু অপরিমেয় ক্ষতি হয়ে গেলো। তার বিদেহী আত্নার শান্তি হোক।

এ কে এম শফিক, রাজনীতিবীদ ও সংগঠক:
প্রতিটি আত্মাকেই মৃত্যুর স্বাধ গ্রহন করিতে হইবে। আইয়ুব বাচ্চুও এই চিরন্তন সত্যকেই আলিঙ্গন করলেন তবে একটু তাড়াতাড়ি। সংগীতকে তার আরও কিছু দেয়ার ছিল এবং তার পরিকল্পনাও ছিল কিন্তু বিধাতার ইচ্ছাই সব। গিটার আর বাচ্চু একটা আরেকটার পরিপূরক ছিল। জানিনা তার এই জায়গাটায় অন্য কেও আসতে পারবে কিনা।
যেখানেই থাকুন ভাল থাকুন।

তানজিনা ফেরদৌস তাইসিন, এডেলেইড প্রধান, প্রশান্তিকা:
চলে গেলে অধিক কিছু থেকে যায়, না থাকা জুড়ে…
আহা বেঁচে থাকতেই যিনি কিংবদন্তী, তাঁর না থাকা জুড়ে আরও বেশি থেকে যাক ওনার সৃষ্টি! এমন হুট করে না বলে কয়ে চলে যাওয়াটা তো কিংবদন্তীদেরি মানায়! এই ভাল, এই যেন বেশ রাজকীয় চলে যাওয়া! এ চলে যাওয়াতো যাওয়া না আরও অধিক করে ফিরে আসা! চলে গিয়ে কোথাও কি বসে আরও রাজকীয় কোন রুপালী গিটার বাজাবেন, গাইবেন ভক্তদের উদ্দেশ্য- ‘আমার সবটুকু ভালোবাসা তোমায় ঘিরে।

ডা: আব্দুল ওয়াহাব, রাজনীতিবীদ, সিডনি:
আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুতে আমি অস্ট্রেলিয়া বিএনপি’র পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করছি। তিনি মাত্র ৫৬/৫৭ বছর বয়সে চলে গেলেন, এটা এমন কোন বয়সইনা। আমার মনে পড়ে, সিডনিতে বনলতা রেস্টুরেন্টে আমাকে তার পালস্ দেখাচ্ছিলেন। বলছিলেন, দেখেন কতো দ্রুত উঠানামা করছে। যতোবার দেখা হয়েছে ততোবার হাসিমুখে কথা বলেছেন।

রহমতউল্লাহ, অস্ট্রেলিয়া প্রেস এন্ড মিডিয়া ক্লাব, সিডনি:
আইয়ুব বাচ্চুর মতো নম্র, ভদ্র এবং এতো বড় মাপের শিল্পী ও মানুষ মিডিয়ায় বেশি নেই। সিডনি যতবার এসেছেন দেখা হয়েছে। তার গান এবং সাক্ষাতকার বিদেশ বাংলা’র মাধ্যমে TVS এ প্রচারিত হয়েছে। আমি তার বিদেহী আত্নার শান্তি কামনা করছি।

এস এ রহমান অরুপ, রাজনীতিবীদ, মেলবোর্ন:
বড় ভাই, আমাকে সারা জীবনের অপেক্ষায় রেখে গেলেন, এভাবে কেন চলে গেলেন ? আমি আপনাকে মিস করবো সারা জীবন। দেখা হবে আবার মরনের পর।
লাভ ইউ ভাই।

আব্দুল মতিন, সিডনি প্রেস এন্ড মিডিয়া কাউন্সিল, সিডনি:
আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর খবর শুনে খুব অবাক হলাম। আমরা দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অগ্রদূতকে হারালাম। তিনি মানুষ হিসেবে চমৎকার ছিলেন। আমি তার আত্নার মাগফেরাত কামনা করছি।

নাদিরা সুলতানা নদী, সহযোগী সম্পাদক, প্রশান্তিকা, মেলবোর্ন:
আরো কিছু বলার ছিলো, আরো কিছু শুনার ছিলো, কেন… বাচ্চু ভাই কেন, এতো অবেলায়, কেন, কোথায় হারিয়ে গেলেন এমন অচেনা হয়ে। বাচ্চু ভাইকে নিয়ে এলিজি লিখতে বসেছিলাম, হলোনা আজ আমাকে দিয়ে, শব্দেরা আজ স্তব্ধ।

সৈয়দা তাজমিরা আখতার, সাংবাদিক, সিডনি:
আমার একবার সৌভাগ্য হয়েছিলো উনার সাক্ষাৎকার নেওয়ার ।উনার ব্যবহার ,ভদ্রতার তুলনা নেই ।এই মানুষটির গান শুনতাম মুগ্ধ হয়ে ।আল্লাহ যেন উনাকে বেহেস্ত দান করেন ।

এহসান আহমেদ, সঙ্গীত শিল্পী, সংগঠক ও শিক্ষক, সিডনি:
বাচ্চু ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় ২০০১ থেকে। ঢাকায় একটি ইউনিভার্সিটিতে থাকার সময় প্রতি বছর তিনটি কনসার্ট হলে বাচ্চু ভাই অন্তত দুটিতে পারফরম করতেন। তার সাথে আমার অসংখ্য বার একসঙ্গে বসা হয়েছে। প্রথমে তিনি গীটার বাজাতেন কিন্তু জিদ করে তিনি গাওয়া শুরু করেছেন। একসময় গীটার বাজনার সাথে সাথে তিনি শীর্ষস্হানীয় গায়ক হিসেবে পরিনত হয়েছেন। প্রথম যখন এলআরবি গঠন করেন তখন অনেক স্ট্রাগলও করেছেন। কিন্তু কখনো হাল ছাড়েননি।
বাচ্চু ভাইয়ের প্রতি সবচেয়ে বেশি রেসপেক্ট হলো তার মনের জোর। তিনিই প্রথম ব্যান্ড শিল্প ও শিল্পীদের ক্যারিয়ার গঠনে ভূমিকা গ্রহন করেন। আগে এটা ছিলো অনেকটা সাইড ব্যবসা বা শিল্পের মতো। অনেক অর্থ কষ্টের মধ্যেও বাচ্চু ভাই তার ব্যান্ড মেম্বারদের নিয়মিত নির্দিষ্ট বেতন দিতেন।
এলবাম প্রকাশ ও প্রচারেও তিনি নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে এসেছেন। তাই তিনি কখনো একক বা মিক্সড এলবাম বের করতেন। তিনি একই সঙ্গে পপ, রক, হার্ড রক, ফ্লাস মেটাল গানের শুরু করেন। নতুন জেনারেশন নিয়ে তিনি প্রচুর কাজ করেছেন।
আমার কাছে আইয়ুব বাচ্চু একজন ম্যাজিশিয়ান ও জিনিয়াস শিল্পী ও মানুষ ছিলেন। আমি তার মৃত্যু মেনে নিতে পারছিনা।

মামুনুর রহমান চৌধুরী, সাবেক ছাত্রনেতা, সিডনি:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে বাচ্চু ভাইয়ের অনেক কাছে যেতে পেরেছিলাম। বন্ধু মুকুলের চিকিৎসার সাহায্যে কনসার্টে বাচ্চু ভাই আমাদের অনেক পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেছেন। আমাদের দেশে অনেক শিল্পী জন্ম নিয়েছে কিন্ত বাচ্চু ভাই ছিলেন লিজেন্ড। এই লিজেন্ডের মৃত্যু নেই, হতে পারেনা।

আবু রেজা আরেফিন, সিনিয়র সাংবাদিক, সিডনি:
আমি হাসপাতাল সূত্রেই খবর পাই বাচ্চু অনেক আগেই শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেছেন। তখনও মিডিয়ায় আসেনি, অস্ট্রেলিয়া য় শো করতে আসা আমাদের বন্ধু মাকসুদকে বিষয়টি জানাই। মাকসুদ কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলোনা। কিন্তু সত্যিই বাচ্চু আমাদের ছেড়ে চলে গেলো। ঢাকায় আজকের কাগজ অফিসে বহুদিন আড্ডা মেরেছি। সিডনিতেও দেখা হয়েছে অনেকবার। কিছুতেই ভুলতে পারছিনা বাচ্চু নেই। আল্লাহ ওকে জান্নাতবাসী করুক, এটাই প্রার্থনা।

এলিজা টুম্পা জারা, সংগঠক, সিডনি:
আইয়ুব বাচ্চু ভাই অসুস্থ ছিলেন বেশ ক’দিন ধরে। সেদিন সন্ধ্যায় খবরটি আমি আরেক ব্যান্ড তারকা মাকসুদ ভাইকে বলার পর তিনি চমকে উঠলেন। মাকসুদ ভাই বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন, সত্যি বাচ্চু ভাই অসুস্থ কিনা? আমি বেশি কিছু আর বলিনি। আমার শোনাটা আর মিথ্যে হলোনা, বাচ্চু ভাই চলেই গেলেন। শেষবার সিডনি আসার সময় বাচ্চু ভাই আমাকে বলেছিলেন, কালো অথবা নীল রংয়ের টি শার্ট কিনতে যার উপরে থাকবে হারবার ব্রিজের ছবি। আমি সে শার্টটিও কিনতে পারি নাই। হয়তো কোনদিন সেরকম একটি জামা খুঁজে পাবো, কিন্তু সেদিন আর বাচ্চু ভাইকে পাবোনা। পরকালে শান্তিতে থাকুন প্রিয় বাচ্চু ভাই।

আতিকুর রহমান শুভ, সম্পাদক, প্রশান্তিকা, সিডনি:
বাংলাদেশের মানুষ যদি ১৭ কোটি হয় আর যদি ১৬ কোটিই একটু বুঝতে জানে। তাহলে এই ১৬ কোটি মানুষ পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক না কেনো বাচ্চু ভাইকে মিস্ করবে।
আমিও বাচ্চু ভাইকে মিস্ করবো, আমৃত্যু। আপনাদের সকল শোকবার্তা পড়ার পর আমি নিজে কিছু লিখতে পারছিনা। ক্ষমা করবেন বাচ্চু ভাই।

( প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন স্টেটে বসবাসকারী প্রশান্তিকার প্রতিনিধিরা। )