আকাশ বাতাস সবুজের সবটাই নারীর যতোটা অন্যপক্ষের । নাদেরা সুলতানা নদী

  •  
  •  
  •  
  •  

নারী দিবস দেশে দেশে। যে প্রেক্ষাপটে এর প্রথম উদ্যোগ, নানান ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অনেক দেশই আছে এগিয়ে বা উল্লেখযোগ্য জায়গায়। এই শতাব্দীতে নারী দিবস প্রেক্ষাপটই তাই অনেকটা ভিন্ন।

৮ মার্চ – আন্তর্জাতিক নারী দিবস। প্রতিবছরের এই দিনে, দেশে দেশে এবং বাংলাদেশে, নারীদের জন্য আলাদা একটি দিবস পালন করাটাই অবশ্য বলে দেয় বিশ্বব্যাপী আমরা এখনও প্রকৃত সভ্যতায় প্রবেশ করিনি, পারেনি সকল দেশ এক সাথে, এক আবহে এক সুরে তাল মেলাতে, গাইতে বিজয়ের গান, সমতার।

ভারতীয় উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশে নারী-জীবনে আজও আছে অনেক বেশীই বৈরী হাওয়ায় কষ্টে সৃষ্টে মাথা তুলে থাকার চেষ্টায় আকুলি বিকুলি সময়ে। অনেক বেশীই না-পাওয়া গল্প আজও।
নারীর সমতা নিয়ে বাংলাদেশে আজও আছে কথা বলবার প্রেক্ষাপট।
মূলত এই দিবসের চাওয়া ছিল নারীকে পুরুষের সমান অধিকার ও সুযোগ দেওয়া, যাতে ‘নারী’ – শুধু এই নারী পরিচয়ের জন্যেই বঞ্চিত না হয়। অধিকার ও সুযোগ দিয়ে তাকে মুক্ত করা চাই অর্থনৈতিকভাবে।

কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তিই কি যথেষ্ট! কেননা নারীর উপর পুরুষের কর্তৃত্বের মূল ক্ষেত্রটা অর্থনৈতিক হলেও, আর্দশগত দূরত্ব বা শোষণটা অনেক বেশী পীড়াদায়ক।
কন্যা শিশু, কিশোরী এবং নারীদের জন্যে জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্র যতোটা অনিরাপদ, অসভ্য পুরুষের অশুভ ছায়া আজও মাড়াতে হয়, তা বড় বেশী ক্ষোভের এবং কষ্টের!
কাজের ক্ষেত্রে কিছু প্রতিষ্ঠান নারীর সমতা হয়তো এনেছে। কিছু নারী তাদের যোগ্যতা পেশাদারিত্ব দিয়ে হয়তো মাথা উঁচু করে সমাজে চলছে। কিছু সাহসী নারীই হয়তো সম্মান নিয়ে টিকে আছে বা পাশ কাটাতে শিখেছে উপেক্ষা। কিন্তু সবই বিচ্ছিন্ন, আমার মনে হয়।

বাংলার অনেক বেশী সংখ্যক ছেলে পুরুষ যখন ভাবে, নিজের মা-বোন ছাড়া যে কাউকে সুযোগ পেলেই যৌন হয়রানী করা যায়। কোন একটি মেয়ে কত বেশী কাপড় কায়দা করে গায়ে জড়ালো, কিভাবে হেঁটে গেলো তার উপর নির্ভর করে তার সম্মানের মাপকাঠি, তারপরও শেষ রক্ষা আর হয় কই! তখন আশার আলো আজও দূরে।
দুঃখজনক হলেও সত্যইটা হচ্ছে, কোন নারী কেবল ‘মমতাময়ী মাতৃ রূপ’ বা বোনের স্থানে হলেই তাকে সম্মান, নয়তো যা ইচ্ছে তাই ভাবা যায় তাকে নিয়ে, এই নিয়ে বেশীর ভাগ পুরুষের আছে অঢেল সময় এবং আগ্রহ এবং পরিবার, সমাজ এখনও এভাবে ভাবতেই উৎসাহিত করে। বাংলাদেশে।

অনেক বেশী ছেলে পুরুষের সবচেয়ে সবচেয়ে আগ্রহের জায়গা একজন মেয়ের শারীরিক কাঠামো এবং তার বাহ্যিক রূপ, প্রকাশ। যে যত অবরোধবাসিনী তারাই কেবল বেশীর ভাগ পুরুষের চোখে সম্মানীয়া।
আহ কী ভীষণ অসহায়ত্ব, ধর্মের নামে এবং পুরুষ সৃষ্ট মনোজাগতিক বৈকল্যে।
তবে হে খুব বেশীই বিস্ময়ে দেখি, কত কত বিত্তশালী নারীও আজকের বাংলাদেশে কি দারুণ করে তাদের যাপিত জীবন বা সুখের সংজ্ঞাকেই বদলে ফেলেছে, নিজেদের বুদ্ধি, বিবেচনা, রুচি-বোধ, সামাজিকতা এমনকি পোশাক আশাকও শুধুই তার জীবনসঙ্গী এবং তার পরিবারের চাওয়া পাওয়ার উপরই সঁপে দিয়ে, কি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে ”ইটস মাই চয়েজ” এবং সেও একসময় বিশ্বাস করে সব নারীদের জীবনই এমন হওয়াই উচিত, যেটা সে তার স্বামী মানুষটির অর্থনৈতিক ছায়াতলে বসে উপভোগ করছে। ইনফ্যাক্ট এমন ভাবনায় তলিয়ে গেছে তার স্বাভাবিক চাওয়া, স্বাভাবিক জীবন যাপন। ভুলেই গেছে ভাবতে, কেমন হতে পারতো ‘জীবন, সহজ সরল জীবন বোধ’!!
নারীদের পথচলা স্বাভাবিক হোক।  নারী দিবসেই না চাই বাংলার ঘরে, বাইরে, হাঁটে, মাঠে, বাজারে, অফিসে ছড়িয়ে থাকা বাংলার বিকারগ্রস্থ যেসব পুরুষ, তাদের মনোজাগতিক সুস্থতা যা পেলে সকল নারীর জীবন সুস্থ হবে, সব সময়ের জন্যেই। প্রতিটি পরিবারে, সমাজে এবং রাষ্ট্রে।

নারী জানুক এই আকাশ বাতাস নীল সবুজ সবটাই তার যতোটা অন্যপক্ষের!
ভালোবাসা শুভেচ্ছা শ্রদ্ধা আমার জীবনের আঁকেবাঁকে পাওয়া সব পুরুষের যারা ‘কোন ভাবেই আমার এই অনুভবে পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়নি’ এই পৃথিবী আমার যতোটা তাঁর!

নাদেরা সুলতানা নদী
সহযোগী সম্পাদক, প্রশান্তিকা
মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments