আজিজুল হাকিমের সাক্ষাৎকার । নাইম আব্দুল্লাহ

  •  
  •  
  •  
  •  

[ বাংলাদেশের জনপ্রিয় ও গুণী অভিনেতা আজিজুল হাকিম দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর ধরে নাটক, অভিনয় এবং পরিচালনার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। সম্প্রতি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে রয়েছেন তিনি। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তিনি এখনও লাইফ সাপোর্টে রয়েছেন। পারিবারিক সুত্রে জানা গেছে, অভিনেতার অবস্থা আগের চেয়ে বেশ ভালো। তাঁর আশু রোগমুক্তির জন্য দেশবাসী দোয়া ও প্রার্থনা করছেন।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ২০১৬ সালে সিডনির ক্যাম্পসি ওরিয়ন রিসেপশন সেন্টারে “বাংলা মা আমার” নামে একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আজিজুল হাকিম সিডনি আসেন। সেসময় তাঁর এই সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন নাইম আবদুল্লাহ।]

বৃষ রাশির জাতক জনপ্রিয় অভিনেতা আজিজুল হাকিমের জন্ম কুমিল্লার মেঘনা জেলার লুটেরচড় গ্রামে। বাবা মরহুম ইঞ্জিনিয়ার মোঃ আবদুল হাকিম এবং মা মরহুমা মহিজুন্নেসা। ছাত্রাবস্থায় জড়িয়ে পড়েন আরণ্যক নাট্য দলের সঙ্গে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্র বিজ্ঞানে মাস্টার্স শেষ করে মঞ্চ, টেলিভিশন ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনার মতো গুরু দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। দীর্ঘদিনের অভিনয় জীবনে ভিন্নধর্মী নাটক ও সিরিয়ালে অভিনয়ের জনপ্রিয়তা ছাড়াও পূর্ণ দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র শঙ্খ নীল কারাগার, পদ্মা নদীর মাঝি ও যাত্রা এবং স্বল্প দৈর্ঘ্য ছবি বৃষ্টি তাকে গগনচুম্বী সাফল্যের চুড়ায় পৌঁছে দিয়েছে।
সেরা অভিনয় শিল্পী হিসাবে যায় যায় দিন (১৯৯৪),সাংস্কৃতিক পরিচালক সমিতি( ২০০১, ২০০২, ২০০৩), বাংলাদেশ টেলিভিশন সাংবাদিক সমিতি(২০০২), বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সাংবাদিক ফোরাম (২০০৩) এবং বাংলা টিভি ইউকে লি:(২০০৪) পুরস্কার সহ আরও অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন। এছাড়াও পেশাদার সদস্য হিসাবে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত রয়েছেন।

প্রশ্ন: আপনি তো নানান মাত্রার চরিত্রে অভিনয় করেছেন। মূলত কোন ধরনের চরিত্র আপনাকে আন্দোলিত করে?
হাকিমঃ
মূলত আমি একজন অভিনেতা, তাই সব ধরনের চরিত্রের প্রতি আমার দুর্বলতা আছে যা খুবই স্বাভাবিক । তবে সে সুযোগ পাওয়াটা খুবই ভাগ্যের বাপার, আর আমি সে দিক থেকে সৌভাগ্যবান বলতে পারেন।
প্রশ্ন: মনে করুন শুটিং এর বেশ কিছুদিন আগে আপনি একটি নাটকের স্ক্রিপ্ট হাতে পেলেন। তখন থেকে আপনার মানসিক প্রস্তুতি কিভাবে শুরু করেন?
হাকিমঃ
প্রথমে আমি স্ক্রিপ্টটি খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ে চরিত্রটি বুঝে নেই, তারপর পরিচালকের সাথে বোঝাপড়া করে সেই চরিত্রটি হয়ে ওঠার চেষ্টা করি। অবশ্যই এক্ষেত্রে আমি স্তানিস্লাভস্কির “Building of a character” method অনুসরণ করি।

প্রশ্ন: একটি চরিত্রের পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানকে আপনি কিভাবে বিশ্লেষণ করবেন?
হাকিমঃ
একটি চরিত্র বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে এই তিনটি বিষয় ছাড়াও রাজনৈতিক অবস্থানও বিশ্লেষণ করতে হয়।
মোটকথা আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থান বিশ্লেষণ অতীব জরুরী। আর এটি করার প্রক্রিয়াটাও রপ্ত করতে হয় কোন নাট্যদল এর সঙ্গে যুক্ত থেকে। অভিনেতার অভিনীত চরিত্রটি অসংখ্য প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে তৈরি করতে হয়।
প্রশ্ন: আপনার আঞ্চলিক ভাষা ছাড়া অন্য অঞ্চলের ভাষায় অভিনয়ের জন্য আপনি কিভাবে প্রস্তুতি নেন?
হাকিমঃ
আমার বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষার প্রতি এক ধরনের দুর্বলতা আছে। ওই অঞ্চলের মানুষের কাছ থেকে আঞ্চলিক উচ্চারণ জেনে অনুশীলন করে রপ্ত করে নেই।

স্ত্রী ও কন্যার সাথে আজিজুল হাকিম।

প্রশ্ন: ধারাবাহিক নাটকের একটি বিশেষ চরিত্রে বহুদিন ধরে অভিনয়ের পরে নাটক শেষে কিভাবে আপনি চরিত্রটি থেকে বেড়িয়ে আসেন?
হাকিমঃ
এটাও এক ধরনের অনুশীলন। চরিত্রটিতে যে প্রক্রিয়ায় Transformation হয়, ঠিক একই প্রক্রিয়ায় চরিত্রটি থেকে বেরিয়ে আসতে হয় । এই প্রক্রিয়াটি জানতে হয় নাট্য কর্মশালার মাধ্যমে ।
প্রশ্ন: গল্প বা চিত্রনাট্য অতটা যুতসই না হলেও একজন দক্ষ নির্মাতা তার নির্মাণ শৈলী দিয়ে কিংবা অভিনেতা /অভিনেত্রী অভিনয় দিয়ে গল্পটিকে উৎরে দিতে পারে – এব্যাপারে আপনার মন্তব্য কি?
হাকিমঃ
কথাটা পুরাপুরি সত্য নয়, নির্মাণ শৈলী দিয়ে নির্মাতা তার পটুতা জাহির করতে পারেন, কিন্তু অভিনয় শিল্পীর ক্ষুরধার অভিনয় ছাড়া কখনই দর্শক গ্রাহ্যতা পাবেনা। আবার গল্প দুর্বল হলে অভিনয়ের বা নির্মাণ কুশলতার কোনই মূল্য থাকবে না। এখনও দর্শকরা নাটকের মধ্যে গল্প খোঁজেন ।

প্রশ্ন: প্রায়ই শোনা যায় নির্মাতা শুটিং স্পটে সংলাপ পরিবর্তন করে- সেই সময়ে আপনার অনুভূতি পাঠকদের বলবেন?
হাকিমঃ
এটা হতেই পারে। নাটকটির সার্বিক কল্যাণের জন্য এ ধরনের পরিবর্তন গ্রহণ করতে আমার কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় না।
প্রশ্ন: “একজীবনে – বহু জীবন যাপন করা” আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
হাকিমঃ
একজীবনে –বহু জীবনযাপন করা আমি মনে করি অনৈতিক, তবে একজন অভিনেতা একজীবনে বহু জীবন যাপন করতে পারেন বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে।

প্রশ্ন: যখন নিজের অভিনয় বাসায় প্রিয়জনদের সাথে বসে দেখেন তখন আপনার কেমন লাগে?
হাকিমঃ
প্রথমদিকে টেনশন কাজ করত, কারণ তারাই আমার প্রথম সমালোচক। একসাথে বসে নাটক দেখতে আমার ভালই লাগে।
প্রশ্ন: স্ক্রিপ্ট হাতে পেয়ে কখনো চরিত্রটি নিয়ে দ্বিমত তৈরি হলে কি করেন?
হাকিমঃ
দ্বিমত তৈরি হওয়ার কারণ গুলো বের করে নাট্যকারের সাথে আলোচনা করে অভিন্ন মতে পৌঁছাবার চেষ্টা করি। তবে একজন অভিনেতার নাট্যকারের ভাবনা গুলোকে তার নিজস্ব সৃজনশীলতা দিয়ে উপস্থাপন করা উচিত।

ক্যারিয়ারের শুরুতে জনপ্রিয় দুই অভিনেত্রী বিপাশা হায়াৎ এবং শমী কায়সারের সাথে নিয়মিত অভিনয় করেছেন আজিজুল হাকিম।

প্রশ্ন: “অভিনয়ে সততা” কথাটিকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?
হাকিমঃ একজন সৃজনশীল অভিনেতাকে এই কথাটি সবসময় মনে রাখতে হয় । অভিনয়ে সততা না থাকলে চরিত্রের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা সম্ভব না।
প্রশ্ন: আপনি একজন অভিনেতা, নির্দেশক। সহধর্মিণী নাট্যকার। ছেলেমেয়েদের ব্যাপারে আপনাদের পরিকল্পনা কি?
হাকিমঃ
আমি চাই আমার ছেলেমেয়েরা আগে মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন মানুষ হোক। তার জন্য সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে যা দরকার সেটা আমি করবো। তারপর তারা যা হতে চায় সে ব্যাপারে সহযোগিতা করবো। অবশ্য মেয়ে নাযাহরাইদাহ হাকিম ইতিমধ্যে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর ছেলে হ্রিদওয়ান হাকিম এখনও ছোটো ।

প্রশ্ন: এখানকার তরুণ প্রজন্মের জন্য আপনার পরামর্শ কি?
হাকিমঃ তরুণ প্রজন্মকে আমি বলতে চাই,যে কোনো লক্ষে যেতে হলে দরকার প্রথম লক্ষ্য স্থির করা, তারপর সেখানে যেতে নিয়মিত অনুশীলন ও চর্চা করত হবে সর্বোপরি কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও সততা থাকলে অবশ্যই লক্ষ্যে যেতে পারবে।
প্রশ্ন: ব্যস্তটার মাঝেও আপনি এখানকার বাংলা ভাষাভাষী পাঠক ও দর্শকদের জন্য সময় দিয়েছেন সেজন্য দর্শক পাঠকদের পক্ষ থেকে অশেষ ধন্যবাদ।
হাকিমঃ
নাইম আবদুল্লাহ’কে অসংখ্য ধন্যবাদ। সিডনির দর্শক ও পাঠকদের জন্য আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা রইলো।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments