আপনারা শুনছেন তো ?

আমি জানতাম  এমন হবে।  এমন তো হবারই কথা।  এই কথাটি আমি সেদিন থেকেই জানি যেদিন অনেক মানুষের ভালবাসা/আশা/ শুভ ইচ্ছাগুলোকে উপেক্ষা করে একটি মামুলী, অতি সাধারণ ডিজাইন দিয়ে এসফিল্ডে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়েছিল। একটু পিছনের কথা দিয়ে শুরু করি।
একুশে একাডেমী আন্তর্জাতিক স্মৃতি স্তম্ভ বানাবে। এই কথাটি যেদিন শুনেছি সেদিন থেকেই আমি শিহরিত হয়েছিলাম। আহা  …. এই প্রবাসে আমার দেশের একটি আইকন মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। শহীদ মিনারের কত গল্প শুনেছি।  কিভাবে হলো, কারা প্রথম বানালো? তারপর নতুন করে কি করে আবার তৈরি হলো? কে নকশা করেছিল? একাত্তরে কেন ওটা ভাঙল? এগুলো আমার ঠোঁটের মধ্যে লেগে থাকতো। সেই ছোটবেলা থেকে খালি পায়ে যে শহীদ মিনারে আমি ফুল দিতে গিয়েছি ওটার সাথে তো আমার আত্মার সম্পর্ক হবেই। শহীদ মিনারের কত ব্যাখ্যা শুনেছি।  কেউ বলেছে মাঝখানের যে মিনার ওটা হচ্ছে মা।  আর মায়ের চারিপাশে তার সন্তানরা দাঁড়িয়ে আছে। আমার এক শিক্ষক বলেছিলেন, মাঝখানের মিনারটি হলো পশ্চিম পাকিস্তানের আগ্রাসন। ওরা অনেকদিন আমাদের মাথা নিচু করে রেখেছিলো। কিন্তু বাহান্নর পর সবাই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।  তাই পরের মিনারগুলো আর মাথা নিচু করে দাঁড়ায়নি।  শিল্পীর কাজই হচ্ছে আমাদের ভাবনাগুলো এলোমেলো করে দেয়া।  তারপর আমরা নিজে নিজে এর একটি অর্থ বের করবো।

প্রবাসে দেশের ছোঁয়া পাবার জন্য আমাদের কত চেষ্টা। বাংলা পত্রিকা দেখি, বাংলা গান শুনি, দেশের কাপড় পড়ি।  কিন্তু যখন আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গানটি শুনি – আমি থমকে দাঁড়াই।  আমার মতো প্রতিটি বাঙালি হয়তো তাই করে।  এই গান আমাদের যে ভাবে স্পর্শ করে আর কোনো গান আমাদের হৃদয়ে এই ভাবে ঢেউ তুলে কিনা আমি জানি না।  সেই শহীদ মিনারের আদলে সিডনিতে একটি মিনার হবে।  আমি জানতাম এই মিনারটি শেষ পর্যন্ত আমাদেরই হবে।  বাঙালিদের মতো করে আর কে এই মিনারটিকে বুকের ভিতরে বসাবে?
আমি জগতের সকল উৎসাহ নিয়ে একুশে একাডেমীর সাথে যোগাযোগ শুরু করি।  দেখতে চাই সেই মিনারের ডিজাইনটি। অনেক ধর্না দিয়ে শেষ পর্যন্ত ডিজাইনটি দেখলাম। খুব সাদামাটা একটি ডিজাইন। একটি বড় স্টোনের  উপর কাঁচা হাতে কিছু অক্ষর, আর আমাদের প্রাণের শহীদ মিনারের একটি মামুলি ড্রয়িং।  জিজ্ঞেস করলাম ডিজাইনটি কে করে করেছে? কেউ নাম বললো না।  আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘ডিজাইন কি ফাইনাল নাকি পরিবর্তন করার সুযোগ আছে?’  নিরস উত্তর পেলাম, ‘দেখা যাক কি করা যায়!’
আমি হাল ছাড়লাম না।  আমি আর্কিটেক্ট নই। ছবিও আঁকি না।  কিন্তু ঈশ্বর চোখ আর মন দিয়ে দিয়েছে। ওগুলো শানিত করেছি ভাল ভাল কাজ দেখে।  আমার মনে হলো – এই মিনারটি তো একবারই বানানো হবে তাহলে আমাদের শ্রেষ্ঠ ডিজাইন দিয়ে কেন বানানো যাবে না ? ছুটলাম এদিক-সেদিক। আমার কত আর্কিটেক্ট বন্ধু – শুভাকাঙ্ক্ষী আছে।  ওদের সাথে আলাপ শুরু করলাম। আমার কিছুই বলতে হলো না। কারণ ওরা  বাঙালী।  ওদের হৃদয়ে শহীদ মিনার অনেক আগে থেকেই বসে আছে।  দেশ ছেড়েছে কিন্তু বাক্সে ভরে নিয়ে এসেছে দেশের যত মায়া।

ছবিঃ শহীদ মিনার (সংগৃহিত)

বন্ধু আর্কিটেক্ট কত প্রশ্ন করলো, ‘মিনারটি কত বড় হবে? বাজেট কত? কোথায় হবে?’
আমি প্রশ্নগুলো নিয়ে দৌড় দিলাম একুশে একাডেমীর কাছে। নাহ ! কোনো উত্তর নেই। কোনো খবর বের করা যাচ্ছে না।  কেমন যেন ফিস ফিস একটি ভাব।
আমার সেই আর্কিটেক্ট বন্ধুকে বললাম কি করা যায়? ওদের একটি মডেল তৈরি করে দিতে বললাম। ভাবলাম, হয়তো মডেল দেখে সবাই নতুন করে ভাববে।
আর্কিটেক্ট বন্ধুর সাথে গল্প শুরু করলাম।  কি ভাবে এমন একটি ডিজাইন করা যায় যা শুধু আমাদের কথা বলবে না বরং অন্য ভাষাভাষীদের কথাও বলবে। এক সময় সেই বন্ধু একটি ডিজাইনের কথা বললো, ‘শহীদ মিনার যেমন আমাদের ঠিক তেমনি এই নতুন আন্তর্জাতিক মিনারটিও হতে হবে সবার।’
বন্ধু বললো , ‘আমরা ওই মিনারের গায়ে যদি অন্য ভাষার কিছু বর্ণমালা ঝুলিয়ে দেয় সেটা দেখতে ভাল লাগবে কিন্তু যাদের ভাষার বর্ণমালা ঝুলাচ্ছি তারা কি জানে কেন তাদের বর্ণমালা ঝুলাচ্ছি? তারা কি জানে এই শহীদ মিনারের অর্থটি কি? ওরা যদি ওগুলো না বুঝে তাহলে ওই বর্ণমালাগুলো শুধু ডেকোরেশন হবে। ওরা  ২১শে  ফেব্রুয়ারিতে আমাদের মতো করে এই মিনারে আসবে না।’
আমার কথাটি ভারী পছন্দ হয়েছিল। জিজ্ঞেস করলাম, ‘তাহলে এমন ডিজাইন কিভাবে করা যায় যেন অন্য ভাষাভাষীর মানুষগুলোও ভাবে যে এই মিনারটি ওদের’?
আর্কিটেক্ট বন্ধু একটি চমৎকার আইডিয়া দিলো।  বললো , ‘শহীদ মিনার তো আর ইট সুরকি দিয়ে তৈরী না।  ওটা তৈরি হয় আবেগ আর ভালোবাসা দিয়ে। তাই শহীদ মিনার হচ্ছে জীবন্ত। যাদের বর্ণমালা এই মিনারে থাকবে তাদের আবেগও তো ছুঁতে হবে। ধরুন ডিজাইনটি এমন ভাবে করা হলো যে প্রতিবছর একুশে একাডেমী একটি বা দুটি করে ভিন্ন ভাষার কমিউনিটিকে এই একুশে ফেব্রুয়ারির গল্প বলবে। ওরা  আমাদের গল্প শুনবে। ওদের নিজের ভাষার কথা ভাববে এবং যখন ওরা প্রস্তুত হবে তখনি এদের একটি বর্ণমালা নিজের হাতে এসে এই মিনারে লাগাবে ।’
বন্ধু আরো বুঝিয়ে বললো যে মূল নকশাটি এমন করে করা হবে নতুন বর্ণমালা যোগ দেবার জন্য মূল মিনারে আগেই জায়গা ঠিক করে রাখা হবে।  অনেকটা ওই গাছের মতো। ধীরে ধীরে ফুল ফুটবে। আর মনে হবে মিনারটি গাছের মতো জীবন্ত।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, তার মানে প্রতিবছর খরচ হবে ?
আর্কিটেক্ট বন্ধু জানতো সে কি বলছে, ‘ তার জন্যই  তো একটি চমৎকার ডিজাইন করতে হবে যেন নতুন করে অনুমতিও নিতে না হয় আর আলাদা খরচও না হয়। ‘
আমি ভয়ে জিজ্ঞেস করি, ‘এটা কি সম্ভব?”
বন্ধু হেসে বলে,’অপেরা হাউজও বানানো সম্ভব নয় বলে বাদ দেয়া হয়েছিল।’
আমি এই কথাগুলো মূল কমিটিকে জানালাম। নাহ  উনারা আমার বন্ধুর কথা শুনতে রাজি হলেন না।  আমাকে ভয় দেখালেন যে এখন যদি ডিজাইন নিয়ে আমার বেশি কথা বলি তাহলে হয়তো মিনারটি আর হবেই না।  আমি বিশ্বাস করিনি। কারণ এটা  তো আর বাংলাদেশ না রে ভাই।  ঘুষ আর মামা চাচা দিয়ে তো কাজ করতে হয় না।
একজন, দুজন, তিনজন করে একুশে একাডেমীর বেশ কয়েকজনের সাথে কথা বললাম। ফোনে সব বুঝাতে পারলাম না। দৌড়ে গেলাম একজনের অফিসে। কিন্তু সবাই কোন এক হ্যামিলনের বাঁশির সুরে ঘুমিয়ে থাকলো।
এখন  দুয়ে দুয়ে চার যোগ করে দেখি হিসাবটি ছিল অন্যখানে। প্রথম আন্তর্জাতিক স্মৃতিস্তম্ভের ডিজাইনার হিসাবে যখন কেউ নিজেকে ফলাও করে প্রচার করে তখন মনে হয়, ‘হায় আমার একুশ! তোমাকেও এমন হিসাবের মারপ্যাঁচে পড়তে হলো!’
একুশে একাডেমী আমার এই ‘অতি উৎসাহ’ পছন্দ করেনি। তাই যখন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের উপর একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছিলাম সেটা না দেখেই একাডেমীর নামে সভাপতি একটি আপত্তিকর প্রেস রিলিজ দিয়েছিলো। আমি সেটার একটি যুতসই উত্তর বাংলা-সিডনীতে দিয়েছিলাম। কিন্তু ওটার প্রতিউত্তর পাইনি। আমি এটাও  বলেছিলাম যে এই অস্ট্রেলিয়াতে বাঙালীরা হয় এই মিনারটিকে নতুন করে সাজাবে নতুবা নতুন করে আরো একটি মিনার বানাবে।
হলোও তাই। লাকেম্নায় নতুন একটি ভাষার মিনার হবে।  আবার  নতুন করে  সেই পুরানো কথাগুলো মনে হলো।  মনে হবার কারণ আছে। নতুন মিনার তৈরির কমিটিকে একটি অনুরোধ করতে চাই।  আপনাদের ‘প্রবাসে প্রথম মিনার তৈরি’র দম্ভটি নেই।  আপনাদের কাজে আমি কেবল দেখেছি দেশের জন্য, ভাষার জন্য ভালোবাসা। আমি বিশ্বাস করিনা আমাদের মতো করে আর কেউ শহীদ মিনারকে আগলে রাখবে।  আমরা যত নামেই ওই মিনারকে ডাকি না কেন, ওটা আসলে আমাদের প্রাণের শহীদ মিনার। মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার মিনার। অভ্র সফটওয়ারের স্লোগানটি আমার বেশ ভাল লাগে, ‘ভাষা হোক উন্মুক্ত।’ আমাদের শহীদ মিনারও হোক উন্মুক্ত।  স্টিলের ফ্রেম দিয়ে ঘেরাও করা ডিজাইনটি কি পরিবর্তনের সুযোগ আছে? অনুগ্রহ করে আপনারা কি এই অস্ট্রেলিয়ার বাঙালি আর্কিটেক্ট আর শিল্পীদের সাথে একটু কথা বলবেন? তাদের কি একটি আমন্ত্রণ জানাবেন?
একটি চমৎকার শিল্প তৈরির এই সুযোগটি কি আমরা আমাদের সর্বোচ্চ দিয়ে নিশ্চিত করতে পারি?
আমি বিশ্বাস করি আপনাদের এই দলে  নতুন প্রজন্মের অনেকেই আছেন যারা নতুন কিছু করার জন্য উদগ্রীব হয়ে বসে থাকে।  তাদের কথা ভেবেই আমার ভাবনাগুলো লেখার সাহস পেলাম।
আপনারা শুনছেন তো ?

জন মার্টিন
মনোবিজ্ঞানী, নাট্যজন
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।