আফগান নারীদের দীর্ঘশ্বাস পৌছুবে কি বিশ্বে? । অনীলা পারভীন

  •  
  •  
  •  
  •  

আফগানিস্তান এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচাইতে আলোচিত বিষয়। পাশাপাশি আলোচিত হচ্ছে- দেশটির নারীদের ভূত-ভবিষ্যৎ। গত ১৫ আগস্ট, তালেবানরা দেশটি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পর আফগানিস্তানের নাগরিকদের জান-মাল হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে অসংখ্য হতাহত এবং সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। লাখ লাখ আফগানরা ইতোমধ্যে ঘর-বাড়ি, এমনকি দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করছে। এমতাবস্থায় নারীদের অবস্থা অনেক বেশি আশঙ্কাজনক। জাতিসংঘের এক রিপোর্টে দেখা গেছে, বছরের প্রথম ছয় মাসে নিহত ও আহতদের সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার মতে, মে মাসের শেষের দিকে যারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে, তাদের প্রায় ৮০% নারী ও শিশু। যদিও তালেবানদের মুখপাত্ররা জোর দিয়ে বলছে, ‘ইসলামী মতে নারীদের অধিকার দিতে তারা প্রস্তুত’।

অথচ তালেবানদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ইতোমধ্যে মেয়েদের স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ করেছে এবং তাদের চলাফেরার স্বাধীনতাও সীমিত করেছে। বাচ্চা মেয়েদের জোরপূর্বক বিয়ের খবরও পাওয়া যাচ্ছে। গত ৫ মে কাবুলের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে বোমা হামলা করে ৮৫জনকে হত্যা করেছে। তালেবানরা এমাসের শুরুতেও ২১ বছর বয়সী এক নারীকে পর্দা না করার অপরাধে হত্যা করেছে। অমানবিকতার চরম উদাহরণ হয়তো একেই বলে।
আফগান নারীরা কতখানি দুর্বিষহ সময় পার করছেন তা বিভিন্নজনের বক্তব্য থেকেও বোঝা যায়। তালেবানদের ভয়ে নিজেদের পরিচয় গোপন করে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে তাদের ভীতি ও শঙ্কার কথা ব্যক্ত করছেন।

একজন অজ্ঞাতনামা আফগান নারী গার্ডিয়ান পত্রিকায় বলেছেন- ‘আমার জীবনের ২৪ বছরে যা পড়াশোনা করেছি, তার সবকিছুই হয়তো বিফলে যাবে। আমরা আবার অধিকার বঞ্চিত হবো এবং অন্ধকার যুগে ফিরে যাব।’ তিনি আরও জানিয়েছেন, তাঁর বোনকে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য করা হয়েছে। তালেবান বন্দুকধারীরা কান্দাহার ও হেরাতের ব্যাংকেগুলো থেকে নারী কর্মচারীদেরকে বের করে দিয়েছে।
গত সপ্তাহে মালালা ইউসাফজাই আফগানিস্তানের নারীদের অধিকার রক্ষার জন্য বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আফগানিস্তানে নারী শরণার্থী ও বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষার্থে জরুরী মানবিক সহায়তা প্রদান করা প্রয়োজন।’

আফগান উইমেনস নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা মাহবুবা সেরাজ সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আজ আফগানিস্তানে যা ঘটছে তা এই দেশকে ২০০ বছর পিছিয়ে দিতে চলেছে।’
আফগান চলচ্চিত্র নির্মাতা সাহরা করিমি আফগানিস্তানের বর্তমান অবস্থা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে একটা খোলা চিঠি লিখেছেন। যেখানে তাঁর দেশ নিয়ে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন এবং বিশ্ববাসীকে তাদের পাশে দাঁড়াবার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন- ‘পৃথিবী যেন আফগানিস্তানকে ত্যাগ না করে, আমাদেরকে সাহায্য করুন।’
আমার প্রশ্ন- কেন এমন আতঙ্কজনক অবস্থার সৃষ্টি হলো?
তালেবানদের কার্যকলাপ, বিশেষ করে নারীদের প্রতি তাদের ভূমিকা যদি আমরা একটু খতিয়ে দেখি তাহলে কি দেখতে পাই?
১৯৯৬ সালে প্রথম তালেবানরা আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। ১৯৯৮ সালের মধ্যে এই জঙ্গি গোষ্ঠীটি আফগানিস্তানের ৯০ শতাংশ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল। তখন তারা নারীদের উপর শরীয়া আইনের কঠোর শর্ত প্রয়োগ করতে শুরু করে। ১০ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদের শিক্ষার উপর নিষেধাজ্ঞা, মুখমণ্ডল ঢেকে বোরকা পরা এবং দৈনন্দিন স্বাধীনতার উপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করে। শুধুমাত্র একজন পুরুষ আত্মীয়ের সঙ্গেই নারীদেরকে বাইরে চলাফেরার অনুমতি দেয়া হয়। এমনকি তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া হয়। এসব নিয়ম অমান্য করার কারণে কিছু নারীকে নির্মম শাস্তিও দেওয়া হয়। যার মধ্যে ছিল মারধর, বেত্রাঘাত এবং পাথর মেরে হত্যা।

তালেবানদের প্রভাব আফগানিস্তান ছাড়িয়ে পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। ২০১২ সালে ১২ বছর বয়সী স্কুল ছাত্রী মালালা ইউসাফজাই বিবিসিতে এক সাক্ষাৎকার দেন। উক্ত সাক্ষাৎকারে তালেবানদের দ্বারা তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নির্যাতিত এবং নিগৃহীত হবার কথা বলেছিলেন। সেই অপরাধে তাঁকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয়। ভাগ্যগুনে তিনি বেঁচে যান।
অথচ এই আফগানিস্তানেই ১৯৭০এর আগে নারীর অধিকার ছিল অন্যান্য অনেক পশ্চিমা দেশগুলির মতোই। ১৯১৯ সালে যুক্তরাজ্যের নারীদের মাত্র এক বছর পর আফগান নারীরা ভোটাধিকার অর্জন করেন। ১৯৫০ এর দশকে নারী-পুরুষে বৈষম্যনীতি বাতিল করা হয় এবং ১৯৬০ এর দশকে একটি নতুন সংবিধানের মাধ্যমে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তালেবানী শাসন এসে ১৯৯০ এর দশকে নারীদের এই অগ্রগতি বন্ধ করে দেয়। তখন জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনান বলেছিলেন, ‘নারীর অধিকার পুনরুদ্ধার ছাড়া আফগানিস্তানে প্রকৃত শান্তি এবং শৃঙ্খলা সম্ভব নয়’।

গত ২০ বছরে আফগান নারীদের অধিকার কিছুটা হলেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যদিও তা অনেকটাই কাবুল বা নগরজীবনকেন্দ্রিক ছিল। নারীদের চলাফেরা, পড়াশোনা করার সুযোগ তৈরি হয়। ২০০৩ সালে একটি নতুন সংবিধানের মাধ্যমে নারীর অধিকার রক্ষা এবং ২০০৯ সালে আফগানিস্তান নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা দূরীকরণ আইন (ইভিএডব্লিউ) পাশ করা হয়। আফগানিস্তানের পার্লামেন্টের ২৫০টি আসনের মধ্যে ২৭ শতাংশ নারীদের জন্য সংরক্ষিত করা হয়। গত বছর আফগানিস্তানের ৯.৫ মিলিয়ন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩৯% ছিল নারী। গত সপ্তাহেও আফগানিস্তানের প্রায় ২২ শতাংশ নারী কর্মী ছিল। এমনকি রাজনীতি, বিচার বিভাগ এবং সেনাবাহিনীতে নারীরা বীরদর্পে কাজ করছিলেন। উল্লেখ্য, আফগানিস্তানে ২০০ জনেরও বেশি নারী বিচারক ছিলেন। সুতরাং আফগান নারীরা যেকোনো পেশা বা কাজে পারদর্শী তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা আফগানিস্তান থেকে তাদের সাহায্যকারী আফগানী নাগরিকদের নিজ দেশে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। কিন্তু সাধারণ আফগান নারী-পুরুষের ভবিষ্যৎ কী?
তালেবানরা দেশের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার করে নারীদেরকে অন্দরমহলে আটকে রাখার সব রকম ব্যবস্থাই করছে। পৃথিবীর একপ্রান্তে যখন একজন নারী মঙ্গলগ্রহে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন আফগান নারীর জগতকে বোরকার অন্ধকারাচ্ছন্ন কয়েদখানায় বন্দি করার পায়তারা চলছে।
তাদের আকুতি-মিনতি, দীর্ঘশ্বাস কয়েদখানা ভেদ করে, বিশ্বের মানুষের কাছে কি পৌছুবে না?

অনীলা পারভীন
কর্মকর্তা, ইউনিভার্সিটি অফ সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments