আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করে কারা? -শিল্পী রহমান

  •  
  •  
  •  
  •  

এরা কেউ অন্য গ্রহ থেকে আসেনি, এরা এই গ্রহেরই মানুষ। আমরা কেউ ওদেরকে মানুষ বলে স্বীকৃতি দিতে চাই না। কিন্তু ওদেরও বাবা মা আছে, সেই ছোট বেলা থেকে কোন স্কুলে পড়বে, তার জন্যে সকাল সন্ধ্যা বিরামহীন স্কুল এবং কোচিংয়ে দৌড়াদৌড়ি করেছে। বাবা মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রমে স্কুল শেষ করে সবচেয়ে ভালো কলেজটাতে পড়েছে। তারপর বুয়েটে ভর্তি হবার জন্য তো কোথা দিয়ে দিন গেছে, রাত গেছে বুঝতেই পারেনি ওরা। এতো ব্যস্ততার মাঝে ওরা কখন খুনি হয়ে উঠলো? কেন হয়ে উঠলো?
রাজনীতি করতো বলে? সুস্থ রাজনীতি কি অসম্ভব একটা ব্যাপার?
এই যে পাশ্চাত্য দেশগুলোতে আমরা দেখি প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে বড় বড় শাসকদের যা তা বলে ট্রল করছে, কার্টুন করছে, তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের চরম নিন্দা করছে, প্রতিবাদ করছে, লেখালেখি হচ্ছে, টক শো গুলোতে ধুয়ে দিচ্ছে … এসবের জন্যে কয়টা মানুষ খুন হচ্ছে?

এই দেশের মানুষের চামড়া এতো পাতলা কেন যে সামান্য মন্তব্যটুকুও নিতে পারে না? এই কারো বিরুদ্ধে কোন মন্তব্য নিতে না পারার কালচারটা কোথা থেকে শুরু হয়েছে? কখন শুরু হয়েছে? কতো পেছনে যেয়ে এই শেকড় টান দিতে হবে যা থেকে মুক্তি পেতে পারে মানুষ । ওদের কি শেখানো হয়নি যে ” We must respect the opinion of others, even if we disagree with them“। রাজনীতি, ধর্ম, সংগীতের স্বাদ বা ফুটবল যাই হোক না কেন, আমাদের সবার মতামত আলাদা হবে, তবে ইতিবাচক বন্ধুত্ব বজায় রাখার জন্য একে অপরের মতামতকে সম্মান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । এই শিক্ষা বড় হবার পর শেখানো যায়না। একদম ছোট বেলা থেকেই শেখাতে হয়।
অন্যায় করবার পর মানুষ ধরা পরে, আমরা খুব ভাগ্যবান হলে হয়তো ওদের শাস্তিও হবে ( যদি হয়) … কিন্তু এদের মতো মানুষ রূপী অমানুষ তৈরি হওয়া বন্ধ হবে কীভাবে ? অন্যায় না করা পর্যন্ত তো জানতে পারছি না অন্য আর ১০ টা মানুষের মতো দেখতে মানুষগুলো আসলে ভেতরে ভেতরে পশু হয়ে উঠেছে। ব্যাড মানুফ্যাকচারিং এর পেছনে কোন ইংগ্রেডিয়েন্টস গুলো কাজ করেছে তার আমূল পরিবর্তন দরকার। খুঁজে বের করতে হবে, ভুল হচ্ছে কোথায় ? অপরাধীকে শাস্তি দিলে অপরাধের পরিমাণ কমবে বলেই বিশ্বাস করি আমরা কিন্তু অপরাধী না বানানোর জন্য কি কি করা প্রয়োজন সেটাও জানতে হবে।
কারণ আমাদেরই ঘরে জন্ম নিচ্ছে আবরারের খুনিরা । একই জীবন সংগ্রামে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছুটতে ছুটতে কেউ কেউ ছিটকে পড়ছে ভুল পথে। সেই ভুল পথের শুরুটা কোথায় খুঁজে বের করতে না পারলে আমাদের এক সন্তান আরেক সন্তানকে খুন করবে। খুব সামান্য কথায় মতের বিরোধ হলেই মানুষের হিংস্র হয়ে উঠবার কথা না। তাহলে ওরা কেন হচ্ছে? জানতে হবে।
যে কোন ধরণের হিংস্রতাই গ্রহণযোগ্য নয়, তবুও এমন দীর্ঘ সময় নিয়ে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে ,পিটিয়ে একটা জলজ্যান্ত মানুষকে মেরে ফেলা সাধারণ ক্রোধের সংজ্ঞায় পড়ে না।
তাহলে প্রথমে জানতে হবে ওরা কীভাবে বেড়ে উঠেছে তার বৃত্তান্ত, তারপর এই ইউনিভার্সিটিতে আসার পর কিসের বা কার প্ররোচনায়, কিংবা কোন লোভে বা চাপে পড়ে ওরা এমন অসুরের মতো ঘৃণ্য শক্তি ধারণ করছে নিজেদের ভেতরে। সুত্র পাওয়া গেলে, তা সংশোধনের চেষ্টা করা যেতে পারে।

নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ

আজ বাংলাদেশের মানুষ ভালো নেই। যেই দেশটাকে মানুষ ভালোবাসে সেই দেশটার এমন রূপ দেখতে কারো ভালো লাগেনা। সবাই দুঃখ বেদনায় মুষড়ে পড়েছে। একজন ৬২ বছরের পুরুষ মানুষ ফোনে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন , আবরারের মৃত্যুর নৃশংস ঘটনাটা আর নিতে পারছেন না তিনি। উনি কোন ভিডিও দেখেননি, দেখতে পারবেন না বলেই ডুকরে কেঁদে উঠলেন। বললেন, “কি হচ্ছে আমার দেশটার? কেন এমন হবে? এমন একটা বাচ্চা কেন এভাবে মারা যাবে”? আমি জবাব খুঁজে পাইনি। নীরবে নিজের চোখের পানি মুছেছি। কারণ স্বস্তি আমারও নেই, আমিও ছটফট করছি। আবরারের মৃত্যুতে পুরো বাংলাদেশের মানুষ (যারা মানুষ) মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কারো কারো রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে, কারো বুকে চাপ চাপ কষ্ট এবং কারো মধ্যে অস্থিরতা ।
আবরারের পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী, বন্ধু সবাই ভীষণভাবে ভেঙ্গে পরেছে, কেউ কেউ নিজেকে দায়ী করছে কেন বন্ধু আবরারকে রেখে থিয়েটার দেখতে গেলো ইত্যাদি অনেক কিছু মনে করে মানুষ খুব অসহায় বোধ করছে। কারো খুব বড় রকমের ট্রমা হচ্ছে ভেতরে ভেতরে। এইসব মানসিক অস্থিরতাকে হালকা করে দেখবেন না, খুব বেশী অস্থির লাগলে কারো সাথে কথা বলুন।
আজ ‘বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস’ । সবাই সুস্থ মানসিকতা নিয়ে বাঁচুন এবং মানসিক ভাবে সুস্থ থাকুন এই কামনা করি। আমরা একটি সুস্থ দেশ চাই। যেই দেশে আমাদের সন্তানেরা নিশ্চিন্তে কলেজ ইউনিভার্সিটিতে পড়াশুনা করতে পারবে এবং সুস্থ মানসিকতা নিয়ে একেকজন সুন্দর মানুষে পরিণত হবে।

শিল্পী রহমান: গল্পকার, কবি, সংস্কৃতিকর্মী, কাউন্সেলর ও গবেষক। স্থায়ী নিবাস ব্রিসবেন, অস্ট্রেলিয়ায়। কর্মসূত্রে রয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে।