আমাদের ফিরে আসা । আইভি রহমান

  •  
  •  
  •  
  •  
আইভি রহমান

প্রথম পর্ব: 

ক্যালেন্ডারে ফেব্রুয়ারি মাসের জন্য অপেক্ষা থাকে সব সময়ই। কারণ প্রাণের মেলা বই মেলা হয় এই মাসে। সেই মত এবারেও সেই মাস এলে দেশে যাই। এবারে যাওয়াটা ছিল অন্য রকম। এবারে প্রথমে গেলাম ওমরাহ্‌ করতে মক্কা শরীফ। মদিনা ঘুরে ওমরাহ্‌ শেষ করে আমার সোনার দেশ বাংলাদেশে গিয়ে পৌঁছালাম ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০তে।

এবার মেলায় আমার তিনটি বই আসবার কথা থাকলেও দুটো এলো আর আমার বর মূনির হোসেনের প্রথম বই ‘নির্বাচিত জোকস’ প্রকাশিত হোল। সারাটা বইমেলা কি যে আনন্দে উল্লাসে কেটেছে তা প্রকাশের ভাষা নেই। জাপান থেকে আসা ছোট ভাইয়েরা আর দেশের ভাই বোনদের সাথে তুমুল আড্ডা আর খানাপিনার এক রাজকীয় উৎসব চলেছে দিনের পর দিন। এত এত ভালবাসা আর সম্মান পেয়ে নিজেকে বার বার শুধিয়েছি আমি কি এই এত ভালবাসা পাবার যোগ্যতায় যেতে পেরেছি! কে জানে।

২৯ ফেব্রুয়ারি বই মেলা শেষে গেলাম কলকাতা, সেখান থেকে শান্তি নিকেতনে। আমার মিতা দিদির সাথে কাটানো দিনগুলো জমে থাকবে আমার গহীনে আনন্দের নাম হয়ে আজীবন।
কলকাতা থেকে আবার ঢাকায় ফিরে এলাম ৫ মার্চ ২০২০। আমাদের অস্ট্রেলিয়া ফিরে আসার তারিখ ছিল ৯ মার্চ ২০২০।
৭ মার্চে দেখা করতে গেলাম আমার ভাই কবি কামাল চৌধুরীর সাথে তাঁর বর্তমান কর্মস্থল মাতৃভাষা ইন্সটিটিউটে । যিনি বর্তমানে মুজিব জন্মশত বার্ষিকীর প্রধান আহবায়ক এবং প্রাক্তন মুখ্য সচিব।
অনেক অনেক গল্প চা নাস্তা পর্বের পর কামাল ভাই জানালেন ১৭ মার্চের আয়োজনের কথা যেখানে প্রায় লক্ষাধিক দেশী বিদেশী আমন্ত্রিত অতিথিদের সমাগম হবে আর আমি সেই মাহেন্দ্রক্ষনের সাক্ষী না হয়ে কেন চলে যাব। আমার আর মূনিরের নামে আমন্ত্রণ পত্র প্রদানের নির্দেশ করা হোল আর আমাদের ফেরার টিকেট তারিখ পরিবর্তন করে ২২ মার্চ করা হলো।

ঢাকায় পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে আইভি রহমান ও মূনির হোসেন।

তারপরের ঘটনা দুনিয়া জানে সেই অলৌকিক এবং অনভিপ্রেত অদ্ভুত অদৃশ্য এক মহামারির কথা। যা ডিসেম্বর ২০১৯ থেকেই চীনে সংক্রামন ছড়াচ্ছিল এবং কেড়ে নিচ্ছিল অসংখ্য প্রাণ। তাবৎ পৃথিবী আসলে অতটা আমলে নেয়নি এই ভাইরাসের আক্রমণ। সবাই ভেবেছিল এটা বুঝি শুধু চায়নাতেই সীমাবদ্ধ আছে বা থাকবে অথবা কতটা মারাত্মক এর সংক্রামণ।

কিন্তু কালে কালে সেই  করোনা ভাইরাস তার বিষাক্ত ফণা তুলে ছোবল দিতে শুরু করল সারা দুনিয়ার আনাচে কানাচে। চোখের পলকে বদলে যেতে থাকলো আমাদের খুব চেনা পৃথিবীর রঙ। নিভে যেতে থাকলো অসংখ্য তাজা প্রাণের আলো। বড় করুণ সেই চলে যাওয়া। সহ্যের বাইরে এ মৃত্যু সহ্য করা। তবুও আমরা খুব ভীষণ অসহায় এবং একে মেনে নেয়া ছাড়া কোন উপায় নেই এই মুহূর্তে। নেই এর প্রতিকারের পথ্য। নেই একে হটিয়ে দেবার মন্ত্র।

আমাদের ফেরার টিকিট ছিল সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের সাথে কিন্তু সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স তাদের সব ফ্লাইট বাতিল করে দিল ২০ মার্চ থেকে।
আমরা তখনো দাওয়াতের পর দাওয়াত খেয়ে আর আনন্দ করে বেড়াচ্ছি কোন ধারণাই তখনও জন্ম নেয়নি যে বাংলাদেশেও আসছে ভয়াবহ এই করোনার বিষাক্ত ছোবল।
আমাদের দুই ছেলেই অস্ট্রেলিয়াতে তারা সারাক্ষণ উদগ্রীব আর উৎকণ্ঠায় তাদের দিন রাত পার করে। তাদের ঘুম নেই খাওয়া নেই কারন বাবা মা দুজনেই অনেক দূরে আর কবে তারা ফিরতে পারবে তার কোন সুনির্দিষ্ট সময়সীমা কেউ জানিনা।
আমার বর মূনিরের হার্টের সমস্যা। মূনিরের হার্টে ৯ টা রিং আর ৬টা বেলুন লাগানো আছে। আমি নিজে উচ্চ রক্তচাপের রোগী। আমাদের দুজনেরই ওষুধ প্রায় শেষের পথে কারণ দেশে থাকার কথা ৩ সপ্তাহ সেই হিসেবে ওষুধ নিয়ে গেছি মাস খানেকের মত। বাচ্চাদের বুঝতে দেইনা যে আমাদের ওষুধ কতটা দরকার। দেশী ওষুধ কিনেছি ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন নিয়েই কিন্তু তা আসলে ঠিক মত কাজ করেনা। কারণ বড় দীর্ঘ দিন আমাদের শরীর অভ্যস্ত হয়ে আছে অস্ট্রেলিয়ার ওষুধে।
২৪ মার্চ যখন সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স তাদের ফ্লাইট বাতিলের সময় সীমা বাড়িয়ে নিয়ে গেল আরও মাস খানেক দূরে তখন সত্যি হিম হয়ে এলো আমার ইন্দ্রিয়, আমার মন।

অস্ট্রেলীয় হাইকমিশনার জেরেমি ব্রুয়ারের সঙ্গে মূনির হোসেন।

সেই রকম হিম হয়ে যাওয়া এক দুপুরে আমাদের বড় বাবু হাোসিনের টেক্সট এলো। সে লিখেছে , ‘আর মনে হয় তোমাদের সাথে আমাদের দুই ভায়ের দেখা হবে না’। সারাজীবনের নরম হৃদয়ের মানুষ আমি কান্নায় ভেঙে পড়ি, কিছুক্ষণ পর আমার বাবু ফোন করে আর সেই ফোনে তার কান্নার শব্দ আমাকে ঘুমুতে দেয়নি যে কটা দিন দেশে ছিলাম অস্ট্রেলিয়া ফেরা তক। পুরো ছয় ঘন্টা আমার বাবুটা কেঁদেছে আর তার ফলে সে ডিহাইড্রেট হয়ে গেছিল। আমার খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। আমার ভেতরের আমি ঝুপ করে মরে গেলাম। পুরো দুটো দিন অবশ নির্জীব থাকার পর কেউ কানে কানে বলে গেল শক্ত হও, ঘুরে দাঁড়াও, বাচ্চাগুলো কাঁদছে, শক্তি নিয়ে কাজ করো ওদের কাছে ফিরে যেতে হবে।যেতেই হবে তোমার।

অবাক হয়ে বুঝলাম সেই ফিস ফিসের শক্তি কতটা যা সারাজীবনেই আমাকে উঠে দাঁড়াতে শিখিয়েছে কিন্তু এই যে আমি সেই ২০ মার্চ থেকে চোখে কাজল দেইনি কই এক বারও তো কেউ ফিস ফিস করে বলে নি ‘তোমার চোখে কাজল নাই কেন বাপ’ যেটা আমার মন খারাপের সময় সব সময়ই বলে যায় আর আমি কাজল পরে নেই দ্রুততায়।
তার মানে এই যে করোনা কাল এই সময়ে তিনিও ছেয়ে আছেন এক ধূসর বিষণ্ণতায়। তিনিও হয়ত মগ্ন আছেন নীরব এক প্রার্থনায়।
আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। উঠে বসলাম এবং শুরু করে দিলাম আমার কাজ।

মূনির সারাক্ষণ বিভিন্ন এয়ারলাইন্সে কথা বলেই যাচ্ছে কিন্তু কোন কিছুই খোলা নেই, যাচ্ছেনা কেউ আকাশের বুক চিরে। মূনির ফেস বুকের মাধ্যমে একটা বেশ শক্তিশালী দল বানিয়ে ফেলেছে তাদের নিয়ে যারা আটকে আছে আর ফিরে যেতে চাইছে অস্ট্রেলিয়ায়।
সারাদিন কত শত জন ফোন করছে ইমেইল করে পাঠাচ্ছে তাদের পাসপোর্ট কপি ভিসা কপি আর আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে ইমেইল করে যাচ্ছি একের পর এক।
প্রথম ইমেইল করেছি আমাদের অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন’কে। আর আমাকে অবাক করে দিয়ে ঘন্টা খানেকের মধ্যেই প্রধান মন্ত্রীর দফতর থেকে উত্তর এলো যে, তারা আমার ইমেইল পেয়েছে এবং তা প্রধানমন্ত্রীর সমীপে পেশ করা হয়েছে আর তারা তাদের দিক থেকে যা করার করছে আমাকে ধন্যবাদ দিয়েছে এই ইমেইলের জন্য।
আমি আবার ইমেইল করি পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে আর ইমেলের সাথে পাঠাই আমাদের কাছে পাঠানো সকলের তথ্য, ইমেল করি আমাদের ক্যানবেরার মুখ্যমন্ত্রীকে, বিরোধী দলের নেতাকে, আমাদের খুব ভাল বন্ধু একজন সিনেটরকে, আমাদের আরেক বন্ধু মুখ্যমন্ত্রীর ডায়রেক্টরকে, ইমেইল করি ক্যানবেরা টাইমসে আমাদের ভাল বন্ধু এক সিনিয়র রিপোর্টারকে।

তারপর আমি সিডনিতে আমার এক ছোট ভাই আবু তারেককে বলি আমাদের নিয়ে একটা নিউজ করতে। আমি সিডনিতে আতিকুর রহমান ভাইকে বলি উনার প্রশান্তিকা পেপারে একটা নিউজ করতে। আনিসুর রহমান ভাইকে বলি উনার অনলাইন বাংলা সিডনিতে নিউজ করতে। আনিস ভাই বলেন, এই সব বাংলা অনলাইন বা পত্রিকার নিউজে কিছু হবেনা আইভি আপা, আপনি প্রধানমন্ত্রী আর পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে লিখেন। উনি আমাকে একটা লিংকও পাঠিয়ে দেন। তখন খানিকটা জমে থাকা আমার ভেতরে কিছুই কাজ করছিল না আমি শুধু শুনে যেতে থাকি সবার কথা কিছু বলতে গেলে উত্তর দিতে গেলেই কান্না গলার ভেতরে হাউমাউ করে ওঠে। আমার মনেও থাকে না কি বার বা কোন তারিখে চলছে ক্যালেন্ডারের পাতায়।

অবশেষে শ্রীলঙ্কা এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার পথে উড্ডয়ন।

আমি যাদের যাদের ইমেল করেছি সবাই উত্তর দিয়েছে। জানিয়েছে, তারা তাদের সাধ্যমত চেষ্টা করবে আমাদের ফিরিয়ে নিতে যা করণীয় করার। আমাদের খুব ভাল বন্ধু সিনেটর জানিয়েছে তার ভাই আর ভায়ের বঊ মুম্বাইতে আটকে পড়েছে তাদেরও ফিরে যাবার কিছু হয়নি, তবুও সে আমাদের জন্য লিখবে যথাযথ বিভাগে।
এর মধেই ঢাকাস্থ হাইকমিশন থেকে ইমেল পেলাম যে আমার প্রেরিত সব ইমেলের প্রেক্ষিতে তাদের কাছে অস্ট্রেলিয়ান প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে নির্দেশের ভিত্তিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় থেকে নির্দেশ এসেছে আমরা যারা আটকে আছি তাদের তালিকা প্রস্তুত করতে। ওই ইমেলের আমাকে একটা স্প্রেডশিটও পাঠানো হয়েছিল যাতে আমাকে বলা হয়েছে আমার আর মূনিরের যাবতীয় তথ্য প্রদান করতে।
দম আটকে আটকে যা যা করার করেছি আর চোখের পানিকে বলেছি ফিরে যাও প্লিজ এখন আমার কান্নার সময় নেই এখন অনেক কাজ করার সময় কারণ আমার বাচ্চাগুলো কাঁদছে। সাথে কাঁদছে আমার মতই আটকে পড়া আরো কতশত জনের আপন জনেরা। তারা মাঝে মাঝে ফোন করছে মূনিরকে আতংকিত হয়ে তারাও জানতে চাইছে কি হবে, ফিরে যেতে কি পারব, কবে হবে, এই সব।
হাইকমিশনের অফিসারদের সাথে মূনিরের নিয়মিত কথা হতে থাকলো, জানতে পারলাম আসলে আমাদের আটকে পড়া বাংলাদেশী-অস্ট্রেলিয়ানের সংখ্যার পরিমাণ প্রচুর। প্রায় ১২০০ থেকে ১৫০০ জনের মত এর মধ্যে আছে অনেক অনেক বাচ্চা। আছে বেশ কিছু বয়স্ক মানুষ।

এর পর শুরু হয়েছে রেজিস্ট্রেশন পর্বের। অনেকেই প্যানিক হয়েছে, কান্নায় ভেঙে পড়েছে যারা দেরীতে রেজিস্ট্রেশন করেছে এবং তার ফলে তাদের কাছে ইমেল আসেনি টাকা জমা দেবার জন্য।
টাকা জমা দেয়া নিয়েও চলেছে এক ভয়াবহ অধ্যায়। কারন  শ্রীলংকা এয়ারলাইন্স বলে দিয়েছে ইমেলের মাধ্যমে টাকা জমা দেবার নির্দিষ্ট এক ব্যাংকের নাম আর তাদের শর্ত সমুহ। সেই ব্যাংকে অনেকেই টাকা জমা দিতে পারেনা প্রথম পর্যায়ে কারণ বাংলাদেশে তখন শবে বরাতের ছুটি, তারপর শুক্রবার শনিবার ব্যাংক বন্ধ। এয়ারলাইন্স ক্রেডিট কার্ড পেমেন্ট নেবেনা। অনলাইন ট্র্যান্সফার করা যাবেনা এই রকম সব শর্তাবলী।
আমাদের কপাল ভাল কারণ আমাদের ভাতিজা রিয়াদের একাউন্ট ছিল একই ব্যাংকে সে তার একাউন্ট থেকে সরাসরি ট্র্যান্সফার করে দেয় আমাদের টিকিটের টাকা।
চলবে।

আইভি রহমান
নভোটেল হোটেল, সাউথ ওয়ার্ফ মেলবোর্ন।
২৩ এপ্রিল ২০২০।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments