আমাদের বর্ষা বনাম বিদেশের বৃষ্টি -শিমুল শিকদার

  •  
  •  
  •  
  •  


প্রকৃতির নিজস্ব কিছু সঙ্গীত আছে। টিনের চালে বৃষ্টির রিমঝিম, প্রবল বাতাসে কলাপাতার পতপত, গহীন বনে শাল সেগুনের শনশন কিংবা নদীর পাড়ে জলের ছলাৎ ছলাৎ। এই শহরে কয়েকদিন ভালো বৃষ্টি হয়েছে। টুপুর টাপুর না। একেবারে চাল ভাঙ্গা বৃষ্টি। টিনের চালে কান পেতে বৃষ্টির সে গান শুনি। ঝমঝম ঝমঝম ঝমঝম…। অবিরাম।
অস্ট্রেলিয়া দেশটাতে এমনিতে বৃষ্টির বড় অভাব। এখানের আকাশে মেঘ জমে না যে তা না। কিন্তু সে মেঘেরা বড়ই ফাঁকিবাজ। হঠাৎ হঠাৎ এসে ছিটেফোঁটায় একটু আধটু ভিজিয়ে দিয়ে কোনমতে দায়িত্ব শেষ করেই তারা পালিয়ে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে। এরপর আর তাদের খুঁজে পাওয়াই দায় হয়ে যায়।

বৃষ্টি নিয়ে বৃষ্টিপাগল এক বিদেশির সাথে কথা হচ্ছিল সেদিন। সে বলছিল, কেন ভাই, আমাদের দেশে ভালোই তো বৃষ্টি হয়। এই দেখো আকাশ জুড়ে ঘন কালো মেঘ জমেছে। ঝরঝর করে কি ভীষণ বৃষ্টি ঝরছে! আমি বললাম, এ কোনো বৃষ্টি হলো? বৃষ্টি দেখতে চাও তো আমাদের দেশে যাও। তোমাদের দেশে ঋতুতো মোটে চারটা। গ্রীষ্ম, শরৎ, শীত আর বসন্ত। তোমাদের ক্যালেন্ডারের পাতায় বর্ষাকালের কোন স্থান নেই। তাই হয়তো এ নিয়ে বৃষ্টিদের মনেও অভিমান জমেছে। আর এ কারণে তোমাদের দেশে বর্ষার তেমন কোন আয়োজন, সমারোহও দেখা যায় না। তোমাদের এখানে বৃষ্টি ঝরে স্ট্রিটে, রোডে, এভিনিউতে, বাড়ির চালে, ব্যাকইয়ার্ডে, গাড়ির ছাদে, মার্কেটে। আর তোমরাও তখন টিপ ছাতা আর গামবুট নিয়ে বেরিয়ে আসো। বর্ষার তেমন কোন প্রভাব তোমাদের জীবনে দেখা যায় না।
– তা তোমাদের দেশের বৃষ্টি কেমন বলতো শুনি? লোকটি জিজ্ঞেস করলো।
আমি বললাম, তোমাদের দেশে বৃষ্টি আসে কোন ঘোষণা ছাড়াই, হুট করে। আমাদের বর্ষা এভাবে আসে না। ওখানে বৃষ্টি আসে ঘনিয়ে। দশ দিক অন্ধকার করে। তার আসার বিরাট বিপুল এক আয়োজন থাকে। প্রথমে আকাশের ঈশান কোণ ঘন কালো মেঘে ঢেকে ফেলে। এরপর আকাশে মেঘ জমতে থাকে। মেঘের উপর মেঘ। তার উপর আরো মেঘ। শনশন করে শীতল ঠাণ্ডা বাতাস মেঘেদের আগমন বার্তা নিয়ে আসে। এরপর মেঘগুলো দৈত্যের মতো হুংকার দিতে দিতে সারা আকাশজুড়ে তাণ্ডবলীলা শুরু করে দেয়। তাদের ছুটোছুটি দেখলে মনে হবে দামামা বাজিয়ে, নিশান উড়িয়ে তারা কোন যুদ্ধে যাচ্ছে। চারিদিকে বাতাসের শনশনানি, বজ্রের কাপুনি,

বাংলাদেশের বর্ষা, ছবি: নাদেরা সুলতানা নদী

বিদ্যুতের ঝকমকি আরম্ভ হয়ে যায়। সাথে থাকে বৃষ্টির নৃত্য আর গান। এতে ছন্দ, তালের কোন ঘাটতি পাওয়া যাবে না।
লোকটি উৎসাহী হবে বললো, ভারী ইন্টারেস্টিং তো!
আমি বললাম, তোমাদের বৃষ্টি তোমাদের মতোই ক্যালকুলেটিভ। তারা তোমাদের মতোই ইনভেস্টমেন্ট, প্রফিট, লস নিয়ে ভাবে। অনেক হিসেব নিকেশ করে সাবধানে একটু জল ছিটিয়ে দিয়ে যায়। ব্যাস ওইটুকুই। এখানে বৃষ্টির পরে তাই ব্যাঙদের কোন উৎসব দেখা যায় না। ঝিঁঝিঁ পোকারাও নীরব। বৃষ্টি হলে তোমাদের জীবনের কাজগুলো স্লো হয়ে যায়। হাটঘাটের ব্যস্ততা কমে যায়। অফিস আদালত, দোকানপাটের ঝাঁপি নামিয়ে তোমরা হাঁসফাঁস করতে থাকো। তোমাদের কাছে বৃষ্টি হলো ডিস্টারবেন্স, নুইসেন্স, ইন্টারাপশন।
লোকটি বললো, সবাই যে বৃষ্টি অপছন্দ করে তা নয়।
আমি বলতে লাগলাম, তোমরা কিছু কিছু মানুষ হয়তো বৃষ্টি পছন্দ করো। কিন্তু করাটা বড়ই ইকোনোমিক। শোনো, আমরা শুধু বৃষ্টির জন্য ‘বর্ষাকাল’ নামে আলাদা একটা ঋতুই তৈরি করে ফেলেছি। এ কাণ্ড পৃথিবীতে আর কোথাও পাবে না।
বিদেশী চোখ বড় বড় করে বললো, হ্যাঁ হ্যাঁ। এটা শুনেছি। তোমাদের এ ঋতুটার নাম মনসুন। ঠিক বলেছি না?  আচ্ছা মনসুনের একটু গল্প বলতো।
আমি বললাম, আমরা বলি বর্ষাকাল। এ সময়ে আমাদের পুরো দেশটা চেহারা বদলে অন্য এক রূপ ধারন করে। আমাদের গ্রামগুলোতে গেলে দেখবে বিস্তীর্ণ শস্যক্ষেতের উপর দিয়ে বৃষ্টি আর বাতাস এক হয়ে ঢেউ খেলিয়ে নাচতে নাচতে কোথায় যে মিলিয়ে যায়! নদীর পাড়ে খোটায় বাঁধা নৌকাগুলো দুলতে থাকে। নৌকার ভিতরে কাঁথা গায়ে গুটিসুটি মেরে বসে থাকে মাঝিরা। ঘোলা পানির শত শত ধারা কলকল শব্দে স্থলকে ধুয়ে মুছে নদীতে নামিয়ে দিয়ে আসে। গায়ের বধু নদীতে নাওয়া সেরে ভরা কলশী নিয়ে পিছলা পথ ধরে সাবধানে পা ফেলতে ফেলতে বাড়ি ফিরে। পুকুরের সিঁড়িগুলো তখন অদৃশ্য হয়ে হয়ে যায়। পাড়গুলো কানায় কানায় ভরে গিয়ে মনে হয় পুকুরগুলো যেন ভেসে আছে। ভিজে কাকগুলো জুবুথুবু হয়ে যেন বর্ষা উপভোগ করে। বর্ষার জলধারায় আম বাগান, জাম বাগান, বাঁশঝাড় স্নান করে ওঠে। টুপটাপ বৃষ্টির ফোঁটায় গাছের পাতাগুলোতে যেন নৃত্যের উৎসব লেগে যায়। নদীর জলে যখন টপটপ করে বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে থাকে তখন মনে হবে নদীর বুকে অসংখ্য, অগণিত জল-নৃত্যের প্রতিযোগিতা চলছে।
– ওসব কি আমাদের দেশে হয় না?  লোকটি জিজ্ঞেস করলো।

আমি বললাম, ওসব যে হবে, তোমাদের দেশে নদী কোথায় রে ভাই? আমবন, বাঁশঝাড়, বিস্তীর্ণ শস্যক্ষেত, গায়ের বধু, নৌকা এগুলো কোথায় পাবে? আবার তোমাদের দেশের শিশুদের কল্পনার জগতে থাকে ড্রাকুলা, ভ্যাম্পায়ার। আমাদের শিশুদের কল্পনার জগত জুড়ে থাকে শাঁকচুন্নি, পেত্নি, মেছভুত, গেছোভূতেরা। মেঘ, বৃষ্টি, বজ্র, ঝড় না থাকলে আমাদের রূপকথাগুলো মিছে হয়ে যাবে। শিশুরাও কল্পনার জগত আর খুঁজে পাবে না। বিছানায় কাঁথার নিচে শুয়ে দাদা দাদী নানা নানীর কাছে রূপকথার গল্প শুনতে শুনতে শিশুদের মন কোন দেশে যে হারিয়ে যায়! রূপকথার অসম্ভব সেসব কাহিনীগুলো শিশুদের মনে বর্ষাকালেই সত্য হয়ে ধরা দেয়। ছেলেমেয়েরা ঘরের দাওয়ায় বসে গরম গরম চালভাজা, মুড়িভাজা, খইভাজা  খেতে খেতে বলে ওঠে, আয় বৃষ্টি ঝেঁপে, ধান দিবো মেপে। আষাঢ়ের ঘন বর্ষায় বড়রা তামাক খেতে খেতে আষাঢ়ে গল্পে মেতে ওঠে। বর্ষার অবিরাম ঝরঝর ধ্বনি তাদের মনের অবসাদ, ক্লান্তির উপর স্বস্তির আবরন টেনে দেয়। মনকে আরাম দেয়। বর্ষা কবিদের আরো কবি, শিল্পীদের আরো শিল্পী করে তোলে। ঘোর বর্ষার এ আয়োজনের সাথে কেয়া, কামিনী, কদমরা আনন্দে মেতে ওঠে। ফুলের বর্ণে, গন্ধে চারিধার মাতিয়ে তোলে। সারাদিন বর্ষণ শেষে বারিধারারা যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন শুরু হয় সন্ধ্যা উৎসব। জোনাকিরা সন্ধ্যা বাতি জ্বালানোর আয়োজন করে। ঝিঁঝিঁ পোকা, ব্যাঙেরা নানান ছন্দে বর্ষা সঙ্গীত শুরু করে।
বিদেশী জিজ্ঞেস করলো, তোমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা কি এসময় স্কুলে যায় না?

আমি বললাম – যাবে না কেন? কিন্তু আমাদের ছেলেমেয়েরা তোমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের মতো অমন যান্ত্রিক না। স্কুলে যাওয়ায় ব্যাঘাত ঘটে বলে তোমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা বর্ষাকে ডার্টি, মাডি, আগলি আরো কি কি সব গালি দেয়। ম্যাথ, সায়েন্স, লজিক, ইকনোমিক্স ছাড়া অন্যসব তারা অনর্থক মনে করে। হয়তো এদের বিদ্যাবুদ্ধি খারাপ না। সমাজের দৃষ্টিতে এসব ছেলেমেয়েরা যথেষ্ট প্রয়োজনীয় এলিমেন্ট। কিন্তু আমি একে ভালো বলবো না কি নিন্দা করবো বুঝে উঠতে পারি না। কারণ, এদের দেখলে আমার কিছুটা করুনা হয়। মনে হয়, জন্মের পর থেকেই এরা বার্ধক্যরোগে আক্রান্ত।
লোকটি এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। এবার সে প্রতিবাদের সুরে বললো,
– তুমি তো এদেশের শুধু নিন্দেই করছো। তা তোমাদের দেশের ছেলেরা কেমন, শুনি?

আমি বললাম, নিন্দে আমি করছি কোথায়? পাখিকে পিঞ্জরে, পশুকে খাঁচায়, মাছকে অ্যাকুয়ারিয়াম বড় তুমি করতে পারো। তারা ভালো দানাপানি পাবে, সময় মতো ভাক্সিন পাবে। তাদের বৃদ্ধি থেমে থাকবে না। বরং বন্য সহদরদের চেয়ে ওরা বেশ হৃষ্টপুষ্ট হবে। তারা হয়তো একটু আধটু কথা শিখবে। নানান ট্রেনিং এ ট্রেইন্ড হবে। আমাদের সমাজকে নানানভাবে উপকার করবে। কিন্তু এসব করতে গিয়ে পরাধীন জন্তুটার মনটাকে যে একেবারে মেরে ফেলেছ তার খবর তোমরা রাখো না।

ভদ্রলোক কিন্তু এবার মাথা নেড়ে আমার সাথে সায় দিলেন। আমি বলতে লাগলাম,
আমাদের ছেলেরা বর্ষার দিনে স্কুল পালিয়ে কাঁদার মধ্যে ফুটবল খেলা শেষে সমস্ত শরীরে কাঁদা মেখে একসাথে দলবেঁধে পুকুরে, খালে, নদীতে লাফিয়ে, ঝাঁপিয়ে সন্ধ্যায় ভিজা বইখাতা বগলে নিয়ে ঘরে ফিরে মায়ের বকুনি, পিটুনি খায়। জীবনের লাভ ক্ষতির এতো হিসাবের ধার ওরা ধরে না। একটা কথা কি জানো? প্রকৃতি আর কিছু পারুক বা না পারুক, আমাদেরকে এক একটা সাহসী, আত্মবিশ্বাসী, খাঁটি মানুষ তৈরি করেছে। নাইলে কোথাকার কোন অচিন গ্রাম থেকে সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ি দিয়ে তোমাদের এই অজানা, অচেনা দেশে এসে এতো গভীরভাবে মিশে যেতে পারতাম না। তোমরা কি সাহস করো, আমাদের দেশে একা একা গিয়ে দুই দিন কাটিয়ে আসতে।
লোকটি অনেকক্ষণ চুপ থেকে ‘না’ মাথা নাড়ল।
কিন্তু আমরা বাংলাদেশীরা পারি। পৃথিবীর যে প্রান্তেই রাখো না কেন, আমরা সেখানেই টিকে যাবো। আমাদের দেশ আমাদের সেভাবেই তৈরি করেছে।
লোকটি বললো, হুম, তোমরা বাংলাদেশীরা অনেক পরিশ্রমী, এটুকু অন্তত টের পেয়েছি। তবে তোমাদের দেশের বর্ষার গল্প শুনে লাগলো। কোনদিন সুযোগ পেলে তোমাদের দেশে যাবো মনসুন দেখতে।
আমি বললাম, প্রচণ্ড পিপাসায় অনেক অপেক্ষার পরে ঠাণ্ডা এক গ্লাস পানি পেলে খেতে কেমন লাগে?
– অবশ্যই অসাধারণ
– কতটুকু অসাধারণ একটু বুঝিয়ে বলবে?
– এটা মনে হয় ভাষায় বুঝানো সম্ভব না।

– আমি এতক্ষণ যে বক্তৃতা দিলাম তা একেবারেই মিছে। কারণ, বর্ষার অনুভূতিগুলো প্রকাশের মতো কোন শব্দ অথবা ভাষা পৃথিবীতে সৃষ্টি হয়নি। আমাদের দেশে বর্ষাকাল এমন এক ঘটনা যা কোন ভাষা দিয়ে ব্যাখা করার চেষ্টা একেবারেই বৃথা। বর্ষা শুধুই উপলব্ধি করতে হয়।

শিমুল শিকদার
গল্পকার, নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।