ভিক্টোরিয়ায় বন্যা: আমাদের যা জানা প্রয়োজন । সালাহউদ্দিন আহমদ

  
    

যারা অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে সুন্দর রাজ্য ভিক্টোরিয়ায় বসবাস করেন এবং ভিক্টোরিয়াকে চেনেন তাদের কাছে এবারের বন্যা অবাস্তব ঘটনা বলে মনে হতে পারে। এখানকার লডন (Loddon ), গুলবার্ন (Goulburn), ওভেনস (Ovens) এবং মারি (Murry) নদীর মতো বড় জলাধারগুলো (water catchment) থেকে বন্যার পানি তীব্র বেগে মারি নদীতে ঠেলে দিচ্ছে। আকস্মিক বৃষ্টির ফলে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নদীর কুল উপচে সেন্ট্রাল ভিক্টোরিয়ার গ্রামীণ জনপদ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যেমন ইচুকা, ইচুকা ভিলেজ, বারমাহ, ময়রা বুনবার্থা, কারিম্বা, মুন্ডুনা, জিরুস্ট এবং কেরাং। এই শহরগুলো থেকে স্থানীয়দের অনত্র স্থানান্তর করা হয়েছে। ভিক্টোরিয়ার রাজধানী মেলবোর্ন শহরের সবচে কাছের শহর ম্যারিবির্নং। এখানে ম্যারিবির্নং নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় স্থানীয়দেরকেও অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়েছে এবং আরো অনেক ছোট ছোট অনেকগুলো বন্যাপ্রবণ শহরে বালুর বস্তা দিয়ে বাঁধ তৈরী করা হচ্ছে এবং জনসাধারণকে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে।

ভিক্টোরিয়ার প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রসঙ্গ আসতেই সবার বুশফায়ারের কথা মনে হতে পারে। তবে, অনিয়মিত হলেও বন্যা ভিক্টোরিয়াতে আঘাত হানতে পারে। কিন্তু কেন প্রকৃতির এই বৈচিত্রময়তা? 

সাধারণত, অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ অংশে শীতকালীন সময়ের কম তাপমাত্রা এবং নিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারনে নদী, খাঁড়ি পানিতে পূর্ণ হয়ে যায়। এ সময় মাটির আর্দ্রতা বেড়ে গিয়ে মাটিতে পানি ধারণক্ষমতাও কমে যায়। জলাধারগুলো (dam) পানিতে পূর্ণ হয়ে যায় এবং অনেকক্ষেত্রে পানি উপচে পড়তে থাকে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ভিক্টোরিয়ার সবচেয়ে বড় জলাধার ডার্টমাউথ, এলডন সহ অনেকগুলো জলাধার থেকে পানি উপচে পড়ছে। কোনো কোনো জলাধার ১০৩% ভর্তি হয়ে গিয়েছে, সামগ্রিকভাবে ভিক্টোরিয়ার জলাধারগুলো ৯৬.৩% পূর্ণ হয়ে আছে। আর সাথে যুক্ত হয়েছে বরফ গলা পানি এবং বিশাল অংশ জুড়ে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ১০০ মিলিমিটারের উপর বৃষ্টিপাত। ভিক্টোরিয়ার নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু শুষ্ক, সাধারণত মেলবোর্নে বছরে গড়ে প্রায় ৬৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, যেখানে সিডনিতে বছরে ১১৭৫ মিমি, ব্রিসবেনে ১১৫০মিমি এবং ডারউইনে ১৭৫০মিমি বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। সে তুলনায় এবছর এখন পর্যন্ত ৫২৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা গড়পড়তায় অনেক বেশি। ভিক্টোরিয়ার ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট কমিশনার এন্ড্রু ক্রিস্প সতর্ক করেছেন যে, এই তীব্র বৃষ্টিপাত এবং বন্যা ছয় থেকে আট সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

ভিক্টোরিয়ায় সবচেয়ে বড় বন্যার ঘটনা ঘটেছিলো ১৯৩৪ সালে। মেলবোর্নে টানা দুই দিন ধরে ১৪০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টি হয়েছিল ফলে প্রচণ্ড বন্যায় মেলবোর্নে ইয়ারা নদীর তীর ভাঙা পানি শহরতলিতে একটি হ্রদের মতো তৈরি হয়েছিল। সে সময় ছত্রিশ জন মারা যান এবং হাজারো মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছিলেন। তার আগে ১৯০৯ সালে ভিক্টোরিয়ার লডন এলাকায় বন্যা শহরকে প্লাবিত করেছিল এবং এতে চারজনের মৃত্যু ঘটেছিলো। ১৮৯১ সালের ভয়াবহ বন্যা রিচমন্ড, কলিংউড এবং প্রাহরানে ৩,০০০ এরও বেশি লোককে তাদের বাড়িঘর থেকে চলে যেতে বাধ্য করেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে ২০১০-১২ সালে ল্যা-নিনা চক্রের সময় বন্যায় পশ্চিম ভিক্টোরিয়া বেশ ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে বাঁধ দিয়ে এবং নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে ভিক্টোরিয়াতে বন্যার প্রকোপ হ্রাস করা হয়েছে। এবারের বন্যা আরেকটি ল্যা-নিনা চক্রের খেলা মাত্র। 

বর্তমানে ৪টি ইভাকুয়েশন অর্ডারের অধীনে ইচুকা এবং ইচুকা ভিলেজ ; বারমাহ, লোয়ার ময়রা, বুনবার্থা, কারিম্বা, মুন্ডুনা, জিরুস্ট এবং কেরাং টাউনশিপ থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে এবং ৭টি অঞ্চলে অতিরিক্ত জরুরী সতর্কতা বহাল রয়েছে। বন্যায় রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন রাজ্যগুলির মধ্যে মালবাহী ট্রাক চলাচলে বিলম্ব হচ্ছে। কয়েক হাজার বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিছিন্ন হয়ে গেছে। প্রায় ৩০০ স্কুল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে কয়েকটি বেশি  ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক, জরুরি পরিষেবা এবং স্থানীয়দের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গত সাত দিনে রাজ্য জুড়ে ৮০০,০০০ বেশি বালির ব্যাগ স্থাপন করে বন্যার পানির গতিপথ নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। বর্তমানে রাজ্য জুড়ে ১১ টি ত্রাণ কেন্দ্র খোলা হয়েছে; জরুরি ত্রাণ আবাসনে ৭০০ গৃহহীন লোক রাত্রিযাপন করছেন। সেনাবাহিনীর এবং জরুরী সেবা সংস্থার সহায়তায় ত্রাণ ও পুনরুদ্ধারের কর্মকান্ড এগিয়ে চলছে। 

এবারের বন্যায় এ পর্যন্ত ২ জনের মারা যাবার খবর পাওয়া গেছে। ৫৪ বছরের এক ব্যাক্তিকে তার বাড়ির পিছনের দিকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। রয়্যাল মেলবোর্ন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি মারা যান। ভিক্টোরিয়ান বন্যার পানিতে ৬৫ বছরের দ্বিতীয় ব্যক্তির লাশ পাওয়া গেছে। ইচুকার পূর্বে নাথালিয়ায় তিনি তার নিজ ট্রাক্টরে কাজ করছিলেন। বন্যার পানি তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

ইমার্জেন্সি রিকভারি ভিক্টোরিয়া (ERV) রাজ্যব্যাপী পুনরুদ্ধারের নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং সরকারি বিভাগের সহায়তায় বিভিন্ন সমন্বিত কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে।

বন্যা পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে এমন জায়গা গুলোতে থাকলে কি করবেন? 

  • মোবাইলে VicEmergency অ্যাপ ডাউনলোড করুন এবং ব্যবহার করুন
  • স্থানীয় বন্যা পরিস্থিতি এবং নির্দেশিকা পাবেন VICSES ওয়েবসাইটে 
  • বন্যায় কোন রাস্তাগুলো বন্ধ রয়েছে তা জানতে VicTraffic ওয়েবসাইট দেখুন
  • প্রয়োজনে VicEmergency হটলাইনে ১৮০০ ২২৬ ২২৬ কল করুন 
  • বন্যায় বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে, কাজেই পরিবার এবং পোষা প্রাণীদের জন্য একটি ব্যাগে (go bag) প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে রাখুন 
  • মোবাইল ফোন ফুল চার্জ করা হয়েছে নিশ্চিত করুন এবং সাথে একটি চার্জার রাখুন 
  • গাড়িতে পর্যাপ্ত পেট্রোল আছে তা নিশ্চিত করুন এবং শহর থেকে বের হবার পথ পরিকল্পনায় রাখুন ।

বন্যা সতর্কতা বার্তাগুলোতে নানা সাংকেতিক চিহ্ন থাকে, এগুলো দেখে দেখে কি বুঝবেন?

এখুনি এই এলাকা ত্যাগ করুন 

আপনাকে বন্যা আক্রন্ত এলাকা ত্যাগ করতে সুপারিশ করা হচ্ছে, যে অবস্থায় আছেন সে অবস্থায় এখুনি এই এলাকা ত্যাগ করুন।

জরুরী 

আপনি সর্বোচ্চ বিপদগ্রস্থ এলাকায় আছেন এবং আপনাকে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে।

সতর্ক হন (দেখে, বুঝে, ব্যাবস্থা নিন)

আপনার এলাকার কাছাকাছি কোথাও একটি জরুরী অবস্থা জারি হচ্ছে। নিজেকে এবং পরিবারের অন্যদের রক্ষা করার জন্য আপনাকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। মাঝারি মাপের বন্যা ক্ষেত্রে সতর্কবার্তাটি এই ধরণের হয়ে থাকে।  

উপদেশমূলক 

কোনো অঞ্চলে বন্যার ঘটনা ঘটছে, এবং আপনার এলাকা আক্রন্ত হবার সম্ভবনা রয়েছে। আপনাকে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে উপদেশ করা হচ্ছে।

 

অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন রাজ্যে এই সাঙ্কেতিক চিহ্নগুলোতে খানিকটা ভিন্নতা থাকতে পারে তবে এগুলো সাধারণভাবে একই বার্তা বহন করে।  

 

বন্যা আক্রান্ত এলাকায় থাকলে এই বার্তাগুলো মাথায় রাখুন:

  • নিরাপদ পানির জোগাড় রাখুন, কলের পানি ফুটিয়ে খেতে পারেন
  • রাস্তা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, শহর থেকে বের হবার পথ পরিকল্পনায় রাখুন  
  • সাথে কিছু ডলার রাখুন  
  • বন্যার পানিতে গাড়ি চালাবেন না, মাত্র ১৫ সেন্টিমিটার পানিতে গাড়ি ভেসে যেতে পারে
  • কিছু বালির ব্যাগ জোগাড় রাখুন, এগুলো আপনার বাড়িকে কম ক্ষতিগ্রস্ত করবে
  • আপনি যদি বাড়িতে থাকার সিদ্ধান্ত নেন তবে আপনার যেন কমপক্ষে তিন দিনের জন্য পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকে 
  • বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জন্য প্রস্তুত থাকুন এবং পর্যাপ্ত ব্যাটারি সংগ্রহে রাখুন 
  • বন্যার পানি প্রবাহের পথে এবং গাছের নিচে গাড়ি পার্ক করবেন না 
  • বাজারে কেনাকাটার সময় শুধু প্রয়োজনীয় জিনিসিটি ক্রয় করুন। একসাথে অনেক জিনিস করে তাকগুলি খালি করে ফেলবেন না।

 

বন্যা কবলিত ২০টি শায়ার এবং কাউন্সিলে অস্ট্রেলিয়ান সরকার দুর্যোগ পুনরুদ্ধারে প্রতি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে ,০০০ এবং প্রতিটি শিশুকে ৪০০ ডলার অর্থ সহায়তা প্রদান করার ঘোষণা দিয়েছেন। কেউ বন্যা ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে থাকলে এই লিংকে (https://www.servicesaustralia.gov.au/victorian-floods-october-2022?context=60042) গিয়ে সহায়তার জন্য আবেদন করতে পারবেন। এই আবেদন করার শেষ সময় ধার্য্য করা হয়েছে ১৯ এপ্রিল ২০২৩।

যদিও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশী কমিউনিটির কেউ বন্যায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া যায়নি। তবে শেপারটন শহরে কয়েকজন বাংলাভাষী বন্যায় আক্রান্ত। আগামী দিনে অন্য রাজ্যে কেউ বন্যায় আক্রান্ত হলে তারা এই লেখা পড়ে উপকৃত হবেন। এছাড়া, বন্যা সংক্রান্ত বিষয়গুলো জানা থাকলে তারা নিজেরা সাবধান হতে পারবেন এবং কমিউনিটিতে ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারবেন। সীমান্ত এলাকায় মারি নদীর জলাধার এলাকায় ভিক্টোরিয়া এবং নিউ সাউথ ওয়েলস সরকার একসাথে কাজ করছে। ভিক্টোরিয়ার বন্যায় ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া, কুইন্সল্যান্ড লোকবল দিয়ে সহায়তা করছেন। বন্যা পরিস্থিতি সামাল দিতে কমিউনিটিতে ভলান্টিয়ার খোজ করা হচ্ছে। যারা সহায়তা করতে আগ্রহী তারা এই লিঙ্কের (https://disasterreliefaus.org/vic-flood-recovery/) মাধ্যমে তাদের আগ্রহ নিবন্ধন করতে পারেন। যদি কেউ দয়া বশবর্তী হয়ে ডোনেশন দিতে চান তারা এই লিংকে (https://donate.vinnies.org.au/donation-hub) গিয়ে ডোনেশন দিতে দিতে পারবেন। বন্যায় বন্য পশু নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই লিংকে (https://www.wildlifevictoria.org.au/actnow) গিয়ে বিপন্ন প্রাণীদের জন্য ডোনেশন দিতে দিতে পারবেন। ফাউন্ডেশন ফর রুরাল এন্ড রিজিওনাল রিনিউআল নামের অর্গানিজশন গ্রামীণ কমিউনিটিকে বন্যা থেকে পুনরুদ্ধারের জন্য এই লিংকের (https://frrr.org.au/giving/flood-recovery-appeal/) মাধ্যমে সাহায্যের আবেদন করেছেন।

বন্যা কবলিত এলাকা (লাল) এবং সতর্কীকরণ এলাকা (হলুদ) সূত্র: ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট ভিক্টোরিয়া
নিরাপত্তার বজায় রাখতে বৃষ্টি এবং বন্যার আক্রান্ত ভিক্টোরিয়ায় অনেকগুলো ন্যাশনাল পার্ক বন্ধ রাখা হয়েছে। সূত্র: ডিপার্টমেন্ট অফ এনভায়রনমেন্ট, ল্যান্ড, ওয়াটার এন্ড প্ল্যানিং

 

সালাহউদ্দিন আহমদ

সিনিয়র প্রজেক্ট অফিসার 

ডিপার্টমেন্ট অফ এনভায়রনমেন্ট, ল্যান্ড, ওয়াটার এন্ড প্ল্যানিং 

এবং

প্ল্যানিং অফিসার, 

ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট ভিক্টোরিয়া । 

 

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments