আমার অবসর ভাবনা । ফিরে দেখা-১ । পিয়ারা বেগম

  •  
  •  
  •  
  •  
পিয়ারা বেগম

৫ অক্টোবর ২০১৫ ছিল আমার শিক্ষকতা জীবনের শেষ কর্মদিবস। কাল সোমবার আমার অবসর জীবনের ৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে। আহারে! দেখতে দেখতে পাঁচ-পাঁচটি বছর কেটে গেল! সময় এতটা নিষ্ঠুর হতে পারল? মাথাটা বেঘোরে ঘুরছে। বুকের ভেতরটা ভয়ে ঢিপঢিপ করছে। কারণ আমার নির্ধারিত আয়ু থেকে খসে পড়লো আরো পাঁচটি বছর! আমরা জানি, জীবনের মূলধন বা পুঁজি হলো সময়। যা প্রতি মুহূর্তে এক সেকেন্ড করে কমে যাচ্ছে। পৃথিবীতে ঠিক যে মুহূর্তে আমরা পদার্পণ করি, ঠিক সে মুহূর্ত থেকেই আমাদের বরাদ্দকৃত সময়ের ব্যবহার শুরু হয়ে যায়। একইভাবে যে দিন থেকে চাকুরীতে যোগদান করেছি, সেদিন থেকে অবসরের তারিখও নির্ধারিত হয়। ঠিক যেন মৃত্যুর মতোই! যেদিন থেকে জন্ম, সেদিন থেকে মৃত্যুও অবধারিত!! কী চমৎকার যোগসূত্র।

অবসর মানে কর্মজীবনের পরিসমাপ্তি! আর মৃত্যু মানে জীবনের পরিসমাপ্তি!! 
আজ কয়েকদিন ধরেই শারীরিক দুর্বলতায় আধোঘুম আর আধোজাগরণে কাটাচ্ছি সময়। আর স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নের ঘোরে যেন সম্বিৎশূন্য হয়ে পড়ছি। তাই স্মৃতিকাতরতায় বারবার আবিষ্ট হচ্ছি। প্রায় ৩২ বছরের শিক্ষকতা জীবনের  প্রতিটা মুহূর্ত আনন্দ-কোলাহলে মুখরিত ছিলাম এতটা বছর। আমার ছাত্র-ছাত্রী ও সহকর্মীদের প্রগাঢ় ভালোবাসা আর মমতার মানবিক বন্ধনে জড়িয়ে ছিলাম অনাবিল মুগ্ধতায়। সে বিশ্বজনীন বিনে সূতোর বন্ধনকে ছিঁড়ে চলে আসতে হয়েছিল জাগতিক নিয়মের বাধ্যবাধকতার কারণে। সাথে নিয়ে এসেছিলাম কেবলমাত্র হৃদয়ের পলে পলে জমা এতদিনকার মধুর স্মৃতিগুলোকে। কর্মজীবনের ব্যস্ততার থৈ থৈ আনন্দ-মদির জীবনের যবনিকাপতন আমাকে শ্বাসরোধ করে চেপে ধরছিল। সেদিন অশ্রু-ভেজা চোখে পাহাড়সম বেদনার ভার বুকে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরেছিলাম। সে এক কঠিন বাস্তবতা! কষ্টের তিক্ত অভিজ্ঞতা! সে বিষাদঘন বেদনাবিধুর বিদায়ক্ষণটি ছিল বড়ই করুণ এবং মর্মান্তিক। এক দুঃসহ মর্মপীড়নের জ্বালাময়ী মুহূর্তটুকু আমাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে করে তুলেছিল আবেগ আপ্লুত, উদ্বেলিত। মনে হয়েছিল এই বিশ্বচরাচরে আমি এক অথর্ব, অক্ষম প্রাণী। তাই নির্মম, দুঃসহতার ঘেরাটোপে এক পর্যায়ে আমি মানসিকভাবে ছিলাম চরমভাবে বিপর্যস্ত।
এইভাবে কষ্টে-যাতনায়, বিষাদে- বিষণ্ণতায়, অবসাদে-ক্লান্তিতে কেটে গিয়েছিল দু’তিন মাস। একসময় অনুধাবন করলাম, জীবনের একটা দিন চলে যাওয়া মানে আমার নির্ধারিত আয়ু থেকে তা হ্রাস পাওয়া। তাছাড়া, আমার জন্য তো থেমে থাকছে না জীবনের গতি। সবাই তো যে যার মতো করে আনন্দ করছে। ব্যস্ততায় ন্যস্ত থাকছে। কই, আমাকে সময় দেওয়ার মতো সময় কারোরই নেই? তবে কেন মিছেকান্না আমার? কেন আমি দিনদিন মানসিক টানাপোড়নে, ডিপ্রেশনে ভুগছি?

ছাত্রজীবনে যেমন ছিলেন পিয়ারা বেগম। ছবি: লেখক।

একটা সময় আরো অনুধাবন করলাম, টাকা পয়সা সঞ্চয় করা যায়। ধার দেওয়া যায়, ধার নেওয়াও যায়। কিন্তু সময়? সময় ধার দেওয়াও যায় না, নেওয়াও যায় না। আমরা চেষ্টার মাধ্যমে আমাদের অর্থ বাড়াতে পারি। ধন-সম্পদ বাড়াতে পারি। কিন্তু শত চেষ্টার মাধ্যমে আমাদের জীবনের বরাদ্দ সময়কে কোন কিছুর বিনিময়েও বাড়িয়ে তুলতে পারি না। আমার বোধে যখন তা এল, তখনই আমি এক ঝটকায় গা ঝাড়া দিয়ে ওঠলাম। আগে দৃষ্টিভঙ্গিটা পরিবর্তন করলাম। আর সময় নষ্ট করব না। প্রতিটি দিনকে অর্থবহ করে তুলব। হ্যাঁ, আমার ভালোবাসা লেখালেখিতে আমি আত্মনিয়োগ করব। লেখাকে নতুন আঙ্গিকে, নতুন রূপ-বৈচিত্রে,ভাব-ব্যঞ্জনায় প্রকাশের দৃঢ় প্রত্যয় নিলাম।
এইভাবেই লেখালেখিতে কাটছিল সময়। কিছুদিন পর মনে হচ্ছে লেখালেখির বাইরেও কিছুটা ভিন্নতা থাকা দরকার। কারণ,কিছুটা বৈচিত্রতারও প্রয়োজন আছে। একটা আলাদা সুখের চাহিদা, অন্য আমেজের একটা অনবদ্য অনুষঙ্গ। যেহেতু, অবসর মুহূর্তের সুখ হচ্ছে কখনো নির্জনতা, কখনো কোলাহল মুখরতা। তবে স্মৃতি রোমান্থনের জন্য চাই একটা  নির্জনতার চমকপ্রদ পরিবেশ। হোক তা ঘর কিংবা বাইরে। অলস অবসরে মূলত ভিন্নমাত্রার, ভিন্ন স্বাদের একটা দারুণ সংযোজন চাই। এক চিলতে উঠোনে বসে সকাল কিংবা পড়ন্ত বিকেলে মিষ্টি রোদে ক্ষণিকের জন্য নষ্টালজিক হওয়া যায়। কখোনাও বা ঝুলবারান্দায় চেয়ারে বসে ঝুমবৃষ্টিতে স্মৃতিরোমন্থনে হারিয়ে যাওয়া যায়।
তাছাড়া, জ্যোতির্ময় মধুর শৈশব এবং দুরন্ত কৈশোরকে জীবন্ত করে তোলা যায়। আর বাঁধনহারা যৌবনের প্রেম-মধুময় স্মৃতিগুলোকে  আলিঙ্গনের উষ্ণতায় রংধনুর রঙে রাঙিয়েও তোলা যায়। মূলত কর্মজীবনের পথচলা থেকে শুরু করে ঘটনা পরিক্রমায় মনের ক্যামেরায় ধরে রাখা সেই কাঙ্ক্ষিত স্মৃতিগুলোকে সাদরে আহবান করা যেতে পারে। আর তা যদি হয় গ্রামের বাস্তুভিটেয় তাহলে তো কথাই নেই। হারিয়ে যাওয়া আমার মা-বাবাকে স্মৃতিমন্থনে প্রাণভরে কাছে পাব।
আত্মীয়স্বজন,খেলার সাথী,পড়ার সাথী এবং পাড়াপ্রতিবেশীদেরও স্মৃতিচারণায় তুলে আনব। তাদের সাথে আমোদ-আহ্লাদে আর খুনসুটিতে কাটানোর স্বপ্ন-ছোঁয়া মুহূর্তগুলোকে উপভোগ করব উচ্ছ্বসিত উল্লাসে। প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরপুর সেই মধুর স্মৃতিগুলোকে জীবন্ত করে চোখের সামনে এনে সোহাগে, চুম্বনে- চুম্বনে ভরিয়ে তুলব। আহ! সে কী দারুণ স্মৃতি সিঞ্চিত উপভোগ্য মুহূর্ত!
আগে ভাবতাম, আবার ভয়ও পেতাম কীভাবে অবসরটা কাটাবো? আর এখন ভাবছি, এটাও জীবনের জন্য অপরিহার্য এবং অত্যাবশ্যক। অবসর জীবনের ধর্মই হচ্ছে ভীরুতা। তবে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধর্মের প্রতি। আগে যে যাই করুক না কেন, অবসরে অনেকেই ধর্মকর্মে ঝুঁকে পড়ে বেশি। এ বয়সে এসে মানুষ নিজেকে চুলচেঁরা বিশ্লেষণে হিসেব-নিকেষ করে। তাছাড়া, আমরা জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য সঞ্চয় করি। কোথাও যেতে পথের সম্বল নিয়ে যাই। কিন্তু পরপারের  জন্য আমাদের সম্বল কী নিলাম? হাতে টাকা পয়সার ঘাটতি হলে মন খারাপ করি। কিন্তু পরকালের সম্বলের জন্য আমরা কতটুকুই মন খারাপ করি? কেবল পার্থিব-জাগতিক সুখ ভোগের জন্য আকণ্ঠ ডুবে থেকেছি। পরকালের সঞ্চয়ের খাতায় কতটুকু জমা আছে? কেউ জানিনা। তবে ভাবলে মনটা ভয়ে কুঁকড়ে ওঠে। কেঁপে ওঠে অন্তরাত্মা! তাছাড়া মানুষ মাত্রই তার দৈনন্দিন জীবনে কিছু না কিছু ভুল বা অপকর্মের ভার বহন করে বেড়ায় যা তার বিবেকের তাড়নাপ্রসূত। এভাবে একটু একটু করে বোঝা বাড়তে থাকে প্রতিনিয়ত। 
অথচ এ পৃথিবীতে আমরা অনেকেই শুধু নিজেকেই নিয়ে ব্যস্ত থেকেছি। কেবল নিজেই নিজের পান্ডিত্যের অহংকার, বীরত্বের বড়াই আর স্বীকৃতির লড়াইয়ে ন্যস্ত রয়েছি। অসুস্থ প্রতিযোগিতা, মারামারি-হানাহানি আর ক্ষমতার দ্বন্দ্বে মশগুল থেকেছি। অথচ এই সব ছাড়াও যে এ পৃথিবীতে কতশত ভাল কাজ পড়ে আছে। যা মানুষকে দেয় নিখাদ, নির্ভেজাল এক স্বর্গীয় অনুভূতি। অথচ এগুলো কিছুতেই অর্জিত ঐশ্বর্য, প্রতিপত্তি বা ক্ষমতার বিনিময়ে পাওয়া যায় না। তারপরেও সে ভাল কাজে আমাদের আগ্রহের অভাব অধিকাংশ মানুষেরই।
দিন যায় আসে। এমনই অবসরে আবডালে বন্ধু সহকর্মীরা ফোন করে বলেন, আপা ফেসবুক আইডি খুলেন। দেখবেন আপনার লেখালেখির চর্চাও হবে, সময়ও ভালো কাটবে। তাছাড়া, জ্ঞানচর্চাও এক ধরনের ইবাদত। গুরুত্ব দিইনি কখনো। যখন বুঝতে পারলাম অবসর মুহূর্তগুলো বড় দীর্ঘ, কিছুতেই যেন ফুরায় না। তখন ভাবলাম, অবসরটাকে আরো অর্থবহ আরো নান্দনিক করে তুললে মন্দ কী? অবসরের মাঝেও নিজের জন্য অন্যরকম একটা অবসর তৈরি করা হলে ক্ষতি তো নেই। জীবন তো একটাই। লেখালেখির উৎকর্ষতা বৃদ্ধি, সুস্থ বিনোদনও তো হতে পারে চিত্তের প্রশান্তির জন্য সেরা উপাদান। জীবনের মূল্যবান সম্পদ স্মৃতিগুলো, মায়াবী অনুভূতিগুলো যা আমার প্রাণে দোলা দেয়। আমাকে হাসায়, কাঁদায় যা একান্তই নিজের ভেতর থেকে উত্থিত হয়। এমন মূলধনসম স্মৃতিগুলোকে জাবর কেটে তার সাথে যোগ করব নিজের সৃজনশীলতা। আর যতটুকু আবেগ- অনুভূতি রয়েছে তা প্রকাশ করার জন্য বেছে নিলাম ফেসবুক। ফেসবুকে পেলাম সম্মানিত বরেণ্য ব্যক্তিত্ব, কবি, ছড়াকার, লেখক, সাংবাদিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী ছাড়াও বিভিন্ন পেশাজীবী বন্ধুদের। আরো পেলাম তাঁদের আন্তরিক সহমর্মিতাসুলভ শুভসান্নিধ্য। আর তাতে পেলাম এক অলোকসামান্য জীবনবোধ। আরো পেলাম স্বপ্নময় আনন্দের এক অনির্বচনীয় নতুন ভূবন। তাই তো ভূবন ভুলানো ভূবনে অবসর মুহূর্তটুকুকে জীবন-জাগানিয়া ভাবনা-বিভোরে ভরিয়ে তুলি।

সবশেষে বলবো, অবসর আসলে অতি আবশ্যিক একটা প্রক্রিয়া। মূলত মানুষের জন্য একটা নতুন অধ্যায়, নতুন জীবনের সূচনা। কারণ, ধর্মকর্ম করার জন্য ইচ্ছে মতো সময় ব্যয় করা যায়। কোনো পিছুটান থাকে না। এতে প্রার্থনায় গভীরভাবে একাত্ম হওয়া যায়। ভাবগাম্ভীর্যতায় লীন হয়ে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করা যায়। আসলে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকার জন্য উৎকৃষ্ট মুহূর্ত হচ্ছে এই অবসর। 
প্রদীপের চারপাশের আলোর দিকেই মানুষের দৃষ্টি পড়ে বেশি। প্রদীপের নিচে অন্ধকারের দিকে কেউই তাকিয়ে দেখে না। অবসরটা আসলে এই অন্ধকারের দিকে তাকানোর জন্যই। আমাদের চারপাশে গরীব আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশী আছেন। তাদের খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য তাদের বাড়িতে যাওয়ার সময় মূলত এই অবসরেই। আসুন, আমরা অবসর মুহূর্তটাকে আরো সুখকর ও মাধুর্যমন্ডিত করে তুলি। পছন্দমতো শখের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে নিই। মহানকিছু করার জন্যই তো স্রষ্টা আমাদেরকে পাঠিয়েছেন। আসুন, স্রষ্টার সৃষ্টিকে ভালোবাসি। সৎকর্ম হচ্ছে সৃষ্টির সেবার মূল কথা। আর সৃষ্টির সেবাতেই স্রষ্টার সন্তুষ্টি। পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার সময় যেন বলতে পারি। ওগো প্রভু দয়াময়, চেষ্টা করেছি, তোমার দেওয়া অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে। এবার তাহলে, আমাকে তোমার ছায়াতলে আশ্রয় দাও গো মহামহিম প্রভু।

০২/ ১০/ ২০২০।

পিয়ারা বেগম
কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক
নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা, বাংলাদেশ।  

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments