আলী যাকের: থিয়েটারে ভারসাম্য বিন্দু । বদরুজ্জামান আলমগীর

  •  
  •  
  •  
  •  

অদ্ভুত একটি কথা বলেছিলেন আমার নাট্যগুরু মুহম্মদ বাকের, আমি তখন ঢাকা শহরে আসিওনি।সেইসময় সরিষাপুর গ্রামই ছিল আমাদের ঢাকা শহর- এনএসডি, মণিপুর, কী মস্কোর বলশোয় থিয়েটার। ৮দশকের গোড়ায় এই একটি গ্রামেই হচ্ছে ইডিপাস, নাট্যকারের সন্ধানে ছয়টি চরিত্র, হইতে সাবধান, সাজাহান, মহাবিদ্রোহ- এমন সব নাটক।

আলী যাকেরের মঞ্চভরাট গ্যালিলিও গ্যালিলেও তেমনি অনিবার্য পাঠ।

মুহম্মদ বাকের হাই ইশকুলে পড়া একটি ছেলেকে বলেন- তুমি যদি কোনদিন নাটক লিখতে আসো, তাহলে ঢাকায় গিয়ে প্রথমেই দেখবে কিত্তনখোলা- তাতে তোমার একটি চোখ খুলবে- তুমি তখন একচক্ষু হরিণ; তোমার আরেকটি চোখ খোলার জন্য কোপেনিকের ক্যাপ্টেন দেখতে ভুলো না। তা যদি না করো- অবলীলায় শিকারীর বল্লমে বিদ্ধ হবে- কেননা, তুমি তাহলে অর্ধেক দেখায় সক্ষম, পুরোটা দেখার জন্য বাঙলা মীড়ের নাটক যেমন দেখতে হবে, সেইসাথে দেখবে ইউরোপীয় ঘরানার থিয়েটার।

অভিনয়ের বিষয়েও তেমন অসামান্য একটি কথা বলেছিলেন মুহম্মদ বাকের: বাঙলা অভিনয়ের পরম্পরাটুকু বোঝার জন্য খেয়াল করে দেখো যাত্রা আঙ্গিকের এক বিপুল অভিনেতা কামালপুরের হরিদাস বণিকের অভিনয় শৈলী, আবার দেখো আমাদেরই গ্রামের কিসসাকার চিনির বাপের পরিবেশনা, চান্নি রাতে কুপিবাতির নিচে শোনো কেমন মায়ামায়া সুরে পুঁথি পড়েন রফু মিয়া, আলিয়াবাদে আছে প্রতিবছর গোপালের পাঠাভিনয়ে রামায়ণ, বাজারে বাজারে নিজের কবিতা গেয়ে শোনান আমাদেরই গ্রামের ইল্লাস কবিয়াল, তমাল তলায় লৈকো বিলাস, প্রতি আশুরায় হয় ভেইক্কা চান্দুর বাড়িতে কারবালার জারী মর্সিয়া: ওখানে বেদনার সঞ্চারে মন ভরে তোলো- আর তাদের সঙ্গে মিলিয়ে নিও আলী যাকেরের ক্যারেক্টার এক্টিং।

সবটা মিলেই দুনিয়া, অভিনয় আর থিয়েটার; একটাকে বাদ দিলে আরেকটা নালায়েক। ছটফটে অভিনেতা যেমন লাগবে, থাকতে হবে লাম্বা গীতের গায়ন, সেইসাথে আলী যাকেরের মঞ্চভরাট গ্যালিলিও গ্যালিলেও তেমনি অনিবার্য পাঠ।

তখনই আমি প্রথম শুনি- নাগরিক নাট্যসম্প্রদায় বলে একটি থিয়েটার গ্রুপ আছে- তাদের মধ্যমণি আলী যাকের; যাঁরা নাটকে বাঙলা আর বিশ্বকে একসুতায় বাঁধেন; তাঁরাই মাইকেল মধুসূদন দত্ত, সাঈদ আহমদ যেমন মঞ্চে তোলেন, তেমনি পরিবেশন করেন কার্ল জুকমায়ার, সেমুয়েল ব্যাকেট, আরউইন শ, বার্টোল্ট ব্রেশট।

আলী যাকের শুরু করেছিলেন আরণ্যক নাট্যদলে মামুনুর রশীদের নির্দেশনায় কবর নাটকের মধ্য দিয়ে।তারপর নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের বিভিন্ন নাটকে দুর্দান্ত অভিনয়ে, নির্দেশনার হেডমে ঢাকার মঞ্চে একেকটি মহীরুহ নিদর্শন সৃষ্টি করেছেন আলী যাকের। দেওয়ান গাজীর কিসসা, গ্যালিলিও, নূরলদীনের সারাজীবন, ক্রিস্টোফার স্যানফোর্ডের নির্দেশনায় ম্যাকবেথ, ডেবোরা ওয়ার্নারের টেম্পেস্টে আলী যাকেরের অভিনয় এখনও চোখে জ্বলজ্বল করে ভাসে।

আমার মধ্যে একটা অমোচনীয় অসুখ আছে- যারা বিখ্যাত মানুষ, বা যাদেরকে লোকে স্টার বলে- তাদের থেকে ১০হাত দূরে থাকা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন একবার আকস্মিকভাবে আমার বন্ধু চয়ন খায়রুল হাবিবের উসকানিতে তার সঙ্গে নাগরিকের মহড়া কক্ষে গিয়ে হাজির হই। সেদিন আলী যাকের শারীরিকভাবে বেশ অসুস্থ ছিলেন- কিন্তু তারপরও তিনি গ্রামের একটি ছেলের সঙ্গে স্নেহশীলভাবে কথা বলেছিলেন, তাঁর হাসিটিও খাঁটি ছিল। আমার এখনও মনে পড়ে! ওখানেই দেখি- নিকটজনরা তাকে ছটলু ভাই বলে ডাকে।

সবকাজে, সিদ্ধান্তে আলী যাকেরের মুক্তিযুদ্ধমুখী, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক চৈতন্যটি আমাদের আকাঙ্ক্ষার সহযাত্রী হবে। তাঁর নাগরিক কল্যাণার্তি টেলিভিশন, বা সিনেমায়ও সমানভাবে দৃষ্টিগ্রাহ্য- বহুব্রীহি, আজ রবিবার, নীতু তোমাকে ভালবাসি, নদীর নাম মধুমতি, লাল সালু, রাবেয়া- আলী যাকের-এর অভিনয়ে বিশিষ্ট হয়ে ওঠে।

এই মুহূর্তে বাঙলাদেশের নাটকে একটি একহারা ব্যাপার যাচ্ছে- স্যামুয়েল বেকেট, বা ডেভিড ম্যামেট, কী অ্যানি বেকারের একটি ট্যাক্সট হয়তো কুদ্দুস বয়াতীর অভিনয়াঙ্গিকে মঞ্চে তুলে আনা হলো- তখনই নিজেনিজে একটু শিউরে উঠে ভাবতে থাকি- নাটক কোনভাবেই কানাগলি নয়- থিয়েটার ন্যায়বিচারের মতোই একটি স্কোয়ার- অন্তর্গত চারদিক;
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র‍্যের বিষবৃক্ষ একেকটি পশ্চিমা নাটক মঞ্চে আনতে চরিত্রাভিনয় লাগবে, বর্ণনাভিনয়ের অতি উৎসাহী জাতীয়তাবাদী ঘেরাটোপে সবকিছুকে আটকে ফেললে তো চলবে না।

থিয়েটারকে একটি সৃজনশীল ভারসাম্য বিন্দুতে মিলাবার যজ্ঞে আপনাকে খুব মনে পড়বে- আলী যাকের!

বদরুজ্জামান আলমগীর
কবি, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার
ফিলাডেলফিয়া, যুক্তরাষ্ট্র।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments