আসুন গ্রেইস টেইমের জীবন থেকে শিক্ষা নিই । শিল্পী রহমান

  •  
  •  
  •  
  •  

 217 views

এবারে “অস্ট্রেলিয়ান অফ দ্য ইয়ার – sexual assault survivor and advocate গ্রেইস টেইম এর স্পিচ শোনার পর আমার কথাসাহিত্যিক আনিসুল হকের একটি কথা মনে পড়ে গেলো। কারণ গ্রেইস টেইম হেরে যায়নি। আমি জানি এমন আরও অনেক লক্ষ মেয়েরা হেরে যায়নি, আমরা যাদের সংগ্রামের কথা জানতেও পারিনি। গ্রেইস টেইমের জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর দুর্ঘটনা তাকে অন্য আরও দশজনের পাশে দাঁড়াবার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছে। অসাধারণ এক তরুণী। আমি তাকে স্যালুট জানাই।

গতবছর আমার দুটো বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেছিলেন আমাদের অত্যন্ত প্রিয় লেখক আনিসুল হক। মোড়ক উন্মোচনের কয়েকদিন আগে আমার প্রকাশক অন্বেষা’র কর্ণধার মোঃ শাহাদাত হোসেন ভাই সহ ওনার কাছে যেয়ে ‘ উৎকণ্ঠাহীন নতুন জীবন’ এবং ‘ধর্ষণ, ধর্ষক ও প্রতিকার’ বই দুটো দিয়ে এসেছিলাম। যেন মোড়ক উন্মোচনের আনিসুল হক আগে একটু পড়ে নিতে পারেন।
যথাসময়ে আনিসুল হক হাজির হলেন বইমেলার মোড়ক উন্মোচনের মঞ্চে। ‘ধর্ষণ ধর্ষক ও প্রতিকার’ বইটি হাতে নিয়ে বললেন, খুব প্রয়োজনীয় একটি বই লিখেছেন আপনি, খুব ভাল কাজ করেছেন। তারপর বললেন, এমন কিছু বলুন যেন ভুক্তভোগিরা এই ভয়ংকর দুর্ঘটনার পরেও বাঁচতে শেখে। এই বীভৎস দুর্ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক হলেও ওরা যেন ভেঙে না পড়ে, হেরে না যায়, ওরা যেন নতুন করে বাঁচতে শেখে নতুন সঙ্কল্প নিয়ে।
খুব মনে ধরেছিল আনিসুল হকের কথাগুলো। মনে মনে ভেবেছিলাম এটা নিয়ে একটু গবেষণা করা যেতে পারে। এবং যৌন নিপীড়নের পরে ওদেরকে কিভাবে সাহায্য করা যেতে পারে, তাদের কি ধরণের সাহায্য বা সাপোর্ট দিলে তারা শারীরিকভাবে তো সুস্থ হবেই, সেই সাথে মানসিক ট্রমা থেকে মুক্তি পেতে পারে।

গায়ের রোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছিলো গ্রেইসের অভিজ্ঞতা এবং সাহসী সংগ্রামের কথা শুনে, উপস্থিত সবাই চোখ মুছে নিচ্ছিল বার বার । ঘরে বসে টিভিতে দেখে আমারও চোখ ভিজে গিয়েছে। অসাধারন এই মেয়েটি হেরে যায়নি । নিজে তো হারেইনি। সেই সাথে পুরো বিচার পদ্ধতিতে একটা ঝড় তুলে দিয়েছে। এই ভিডিওটা অনেককেই সাহস দেবে বলে আমার বিশ্বাস। তাই দেখবার জন্য অনুরোধ করবো।

এবছরের অস্ট্রেলিয়ান অব দ্য ইয়ার গ্রেইস টেইম

যৌন নিপীড়নের ক্ষেত্রে আমাদের সমাজে অপরাধীদের জায়গায় ভুক্তভুগিদের লজ্জা দেওয়া হয় বেশী। সেই অবস্থানের পরিবর্তন আজ আনতেই হবে। পরিবারকে পাশে দাঁড়াতে হবে সবার আগে, সমাজকে ভয় পেয়ে এহেন অপরাধকে লুকিয়ে নিজেই কাতর হয়ে থাকলে অপরাধকেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে বেশী। নিজেকে জিজ্ঞেস করতে হবে – সমাজ কে? আসলে সমাজ তো আমরাই, তাই এর পরিবর্তনও আমাদেরই করতে হবে। নিজেকে দিয়েই শুরু করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে ধর্ষণের ক্ষেত্রে, ধর্ষিতার কোন দোষ নেই। “ধর্ষণ হয় ধর্ষকের কারণে” এই স্লোগানকে সোচ্চার করতে হবে, নিজেও বিশ্বাস করতে হবে। শিশুদের ওপরে যৌন নিপীড়নের ঘটনাগুলোই এর জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত।

আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে আমরা হরহামেশাই অভিযোগ করি। অপরাধীর শাস্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলি। আমরা এর প্রতিকার চাই। ধর্ষণ মুক্ত সমাজ চাই, আমাদের মেয়েদের নিরাপত্তা চাই।

কিভাবে তা সম্ভব?
কি করলে নিষ্পাপ শিশুরা ধর্ষক হয়ে বেড়ে উঠবে না আমাদের সমাজে?
পরিবারের কি দায়িত্ব?
বিচার ব্যবস্থার কি দায়িত্ব ?
সমাজের কি দায়িত্ব?
আমাদের যেসব মেয়েরা এই অপরাধীদের শিকার হয়েছে তাদের কি করে আমরা পুনর্বাসন দিতে পারি?
অনেক প্রশ্ন। শুধুমাত্র এইসব প্রশ্নের উত্তরই নিয়ে যেতে পারে আমাদের সমাধানের পথে। প্রশ্ন থাকলেই তার উত্তর খুঁজতে হবে। আর উত্তর খুজলেই উন্মুক্ত হয়ে যাবে অনেক অজানা তথ্য। আমরা যেন গবেষণা ছাড়া বা এইসব প্রশ্নের উত্তর না জেনেই নিজে থেকে কোন কাজ শুরু না করি সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। আমরা যেন ধরে না নেই আমরা সব জানি।

“ধর্ষণ, ধর্ষক ও প্রতিকার” বইটিতে পাওয়া যাবে এর কিছু উত্তর, তবে ভুক্তভুগিদের সাহায্য করবার ক্ষেত্রে আরও ব্যাপক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। তাদের সাথে কথা বলা প্রয়োজন, কারণ প্রত্যেকের জীবন ভিন্ন, আঘাত ভিন্ন, ট্রমা ভিন্ন। প্রত্যেক ভুক্তভুগিদের প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতি দেখাতে হবে। যারা এদের সাথে কথা বলবে তাদের কণ্ঠের আওয়াজ, কথা বলবার ধরন এবং বডি ল্যাঙ্গুয়েজে থাকতে হবে শতভাগ সহানুভূতির ছোঁয়া। যারা কথা বলবে তারা যেন অবশ্যই প্রফেশনাল কাউন্সেলের বা মনোবিজ্ঞানী হয়। আমাদের লক্ষ্য একটাই, প্রত্যেক ভুক্তভুগি যেন সুস্থভাবে আবার সমাজে বসবাস করতে পারে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, প্রাণ খুলে হাসতে পারে এবং সুখী জীবন যাপন করতে পারে।

গ্রেইস টেইম তার ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরে সম্পূর্ণ ভাবে বিধ্বস্ত হলেও ভেঙে পড়েনি। অপরাধীকে প্রকৃত শাস্তি দেবার জন্য বিচার পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছে এবং অন্য সব ভুক্তভুগিদের মনে সাহস জুগিয়েছে যেন তারা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। আসুন আমরা গ্রেইস টেইমের জীবনী থেকে কিছু শিক্ষা নিই। আনিসুল হকের সেদিনের সেই প্রত্যাশা পূর্ণ হবার সম্ভাবনা এখানেই নিহিত রয়েছে।

শিল্পী রহমান: 
গল্পকার, কবি, সংস্কৃতিকর্মী, কাউন্সেলর ও গবেষক। স্থায়ী নিবাস ব্রিসবেন, অস্ট্রেলিয়ায়। 
প্রকাশিত গ্রন্থসমুহ: ধর্ষণ ধর্ষক ও প্রতিকার; উৎকণ্ঠাহীন নতুন জীবন; মনের ওজন; সম্ভাবনার প্রতিচ্ছায়ায়; যুদ্ধ শেষে যুদ্ধের গল্প; পথের অপেক্ষা; পাহাড় হবো ইত্যাদি।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments