ইতিহাসের মাহেন্দ্রক্ষণে জনকের সময়ের ফোঁড় । আহমেদ শরীফ শুভ

  •  
  •  
  •  
  •  

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বেঁচে থাকলে শতবর্ষী হতেন এবছর। ‘৭৫ এর ১৫ আগস্টে নির্মমভাবে নিহত হন স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার ও স্থপতি।জাতীয় শোকদিবসে বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত প্রশান্তিকার আয়োজন ‘রক্তস্নাত শোকাহত আগস্ট’ সংখ্যায় লিখেছেন মেলবোর্ন প্রবাসী লেখক ও চিকিৎসক আহমেদ শরীফ শুভ।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের ৪৫তম বার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে আজ থেকে এতোগুলো বছর আগে আমাদের জাতিরাষ্ট্রের অভ্যুদয়ে ভূমিকা, পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্তের সময়োপযোগিতা নিয়ে তাঁর দূরদৃষ্টি আমাদের মোহিত না করে পারে না। রাজনৈতিক সাফল্যে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, সেই সিদ্ধান্তটি সঠিক সময়ে নেয়া তারচেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক সিদ্ধান্তের সময়োপযোগিতাই একজন জাতীয় নেতাকে জাতির পিতায় অভিষিক্ত করে। সঠিক সিদ্ধান্তকে সঠিক সময়ে কার্যকর করে বঙ্গবন্ধুর বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির জনক হয়ে উঠা সমকালীন বিশ্বইতিহাসে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তাঁর এই দূরদৃষ্টির জন্যই ছাব্বিশে মার্চের প্রথম প্রহরে আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাটি রাজনীতির যথার্থতা বিচারের কষ্টিপাথরে যেমন উত্তীর্ণ হয়েছে নিষ্কলুষভাবে, তেমনভাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নাতীত বৈধতা দিয়েছে। তার অন্যথা হলে ইতিহাস অন্যরকম হতে পারতো।

৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধু প্রকাশ্য জনসভায় দাঁড়িয়ে ডাক দিয়েছিলেন – ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। তিনি ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি সেদিন উচ্চারণ করেছিলেন অত্যন্ত বলিষ্ঠ কন্ঠে ও সাবলীলভাবে। তাঁর সে উচ্চারণ বাঙালি জাতি যেমন শুনেছিল, তেমন শুনেছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠি এমনকি সারা বিশ্ব। সেই উচ্চারণ থেকে বঙ্গবন্ধুর কিংবা বাঙালি জাতির ফিরে আসার উপায় ছিল না। তবুও ৭ই মার্চকে আমাদের স্বাধীনতা দিবস নির্ধারণ করা হয়নি, অপেক্ষা করতে হয়েছে ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহর অবধি। ইতিহাসের যথার্থতা বিশ্লেষনে এই বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য। সেই সাথে স্বাধীনতা ঘোষণার অব্যবহিত পরেই বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতার বরণের যথার্থতাও একই সূত্রে গাঁথা।

ছাব্বিশের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পরপর বঙ্গবন্ধুর সামনে দু’টি পথ খোলা ছিল। একটি, অসতর্ক সাহসিকতার সাথে বাসভবন ত্যাগ করে জনতার ভিড়ে মিশে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি নেতৃত্ব দিতে সচেষ্ট হওয়া; অন্যটি গ্রেফতার বরণ করে হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীকে কৌশলগতভাবে অপ্রস্তুত করা এবং মুক্তিযুদ্ধকে আন্তর্জাতিকভাবে বৈধতা দেয়া, কক্ষচ্যুতি থেকে রক্ষা করা ও জাতির মনোবল সমুন্নত রাখা। বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকমাত্রই জানেন রাজনৈতিক কিংবা সামরিক সংঘাতে অসতর্ক সাহসিকতার সাথে নির্বুদ্ধিতার আর কৌশলী পশ্চাদপসারণের সাথে কাপুরুষতার ব্যবধান অতি সূক্ষ্ম। একটু পা পিছলে গেলেই হতে পারে রাজনৈতিক আত্মহত্যা। আর সে আত্মহত্যা কোন ব্যক্তি মুজিবের আত্মহত্যা নয়, হতে পারতো সমগ্র সমগ্র বাঙালি জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্খাকে দীর্ঘ মেয়াদে টুঁটি চেপে ধরা। বাঙালি জাতির সৌভাগ্য, ইতিহাসের মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করেননি। তাঁর সিদ্ধান্তের সময়োপযোগিতাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে তার অভীষ্ট লক্ষে পৌঁছে দিয়েছিল, আর তিনি হয়ে উঠেছিলেন আমাদের জাতির জনক।

সাতই মার্চেই তিনি সরাসরি স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। সেখান থেকে তাঁর ও বাঙালি জাতির সামনে যাওয়া ছাড়া দ্বিতীয় আর কোন পথ খোলা ছিল না। তবুও আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য বঙ্গবন্ধু অপেক্ষা করেছিলেন ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে গ্রেফতার হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত। সে মুহূর্তের পূর্ব পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার ‘পূর্ব পাকিস্তানে’র জনগোষ্ঠির উপর সরাসরি হামলা করে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি কিংবা জাতীয় সংসদের নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের সাংবিধানিক অধিকারকে সরাসরি অস্বীকার করেনি, তাদের নির্বাচিত নেতাকেও গ্রেফতার করেনি। সুতরাং, ৭ই মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করা হলে তা হতো রোডেশিয়ার (জিম্বাবুয়ের) শ্বেতাঙ্গ নেতা ইয়ান স্মিথের মতো ‘ইউনিলেটারাল ডিক্লারেশন অব ইন্ডিপেন্ডেস’; যা কখনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেনি। বঙ্গবন্ধু যদি ৭ই মার্চে সেই ঘোষণা দিতেন তা বিশ্ব সমাজের কাছে হতো  ‘ইউনিলেটারাল ডিক্লারেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্স উইদাউট এনি প্রভোকেশন’। সেটা হলে বহির্বিশ্বে ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে’র  চেয়ে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন’ হিসাবেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পরিচিতি লাভের অধিকতর সম্ভাবনা থাকতো।

২৫শে মার্চে বঙ্গবন্ধুর কাছে এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এত সময় নিয়ে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি গ্রহণের পর বাঙালি জাতির উপর আক্রমণ না চালিয়ে ফিরে যাওয়ার কোন ইচ্ছে কিংবা পথ কোনটাই নেই পাকিস্তানি জান্তার; তারা আক্রমণ করবেই। আর একটি নিরস্ত্র জনগোষ্ঠির উপর প্রথমে আক্রমণ চালালে এবং তাদের ও তাদের দ্বারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সাংবিধানিক অধিকার অস্বীকার করলে পাকিস্তান সরকার সেই জনগোষ্ঠির আইনসিদ্ধ সরকার হিসেবে বৈধতা হারাবে। তারা পরিণত হবে দখলদার সরকার হিসেবে, তাদের সেনাবাহিনী হবে হানাদার বাহিনী। সে কারণেই বঙ্গবন্ধু ২৫শে মার্চের রাতে বাঙালি জনগোষ্ঠির নির্বাচিত নেতা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। মধ্যরাতে পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পরপর ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহর তাই ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণার মাহেন্দ্রক্ষণ, সবচেয়ে উপযোগী সময়। এই সময়োপযোগিতাই ইতিহাসকে সঠিক নির্দেশনা দিয়েছিল। এই সময়টিতে পাকিস্তানি বাহিনী যৌক্তিকভাবেই পরিণত হয়েছিল দখলদার বাহিনীতে, বাঙালি জাতি একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন জাতিতে আর বঙ্গবন্ধু পরিণত হয়েছিলেন জাতির জনকে।

২৫শে মার্চের রাতে কিংবা ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে তাঁর পক্ষে আত্মগোপনের চেষ্টা করা কেবল কাপুরুষতাই হতো না, হতো নির্বুদ্ধিতাও। তিনি কাপুরুষ কিংবা নির্বোধ কোনটিই ছিলেন না। অন্য নেতাদের পক্ষে সম্ভব হলেও হানাদার বাহিনী, গোয়েন্দা ও স্বজাতীয় বিশ্বাসঘাতকদের দৃষ্টি এড়িয়ে সে রাতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আত্মগোপন করা ছিল দুঃসাধ্য। ‘পলায়নরত’ ও ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ শেখ মুজিবকে সান্ধ্য আইন ভঙ্গের অজুহাতে হত্যা করা তখন তাদের পক্ষে অনেক সহজ হতো। হয়তো আন্তর্জাতিক মহলে মৃদু নিন্দা জ্ঞাপন হতো, কিন্তু আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়ে পড়তো দিকভ্রান্ত, তাঁর ক্যারিশমাকে কেন্দ্র করে যে জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছিল তা ভেঙে পড়তো, মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবলে চিড় ধরতো। জাতিকে বিভ্রান্তি আর দিক-নির্দেশনাহীনভাবে ফেলে রেখে ২৫শে মার্চের কোন এক সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের আগে আত্মগোপন করলে তা  সন্দেহাতীতভাবে হতো কাপুরুষোচিত এবং অধিনায়কের বৈশিষ্ট্য বিবর্জিত।

২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু যদি স্বাধীনতা ঘোষণা না করে অন্য কোন সিদ্ধান্ত নিতেন কিংবা স্বাধীনতার ঘোষণাটি তার আগে কিংবা ৭ই মার্চে করতেন কিংবা ২৬শের পরে কোন এক সময়ের জন্য অপেক্ষা করতেন (তিনি সে সময় আর কখনো পেতেন না) তাহলে আমাদের জাতিসত্বার অভ্যূদয়ের মোড় অন্যদিকে ঘুরে যেতে পারতো। ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা ও বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতার বরণ করার সিদ্ধান্তটি আমাদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভাবের ইতিহাসকে দিক নির্দেশনা দিয়েছিল সঠিক গতিধারায়। শুধু বঙ্গবন্ধুর জীবনেই নয়, বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে এই সময়টিই ছিল ইতিহাসের মাহেন্দ্রক্ষণ, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। বঙ্গবন্ধু সময়ের ফোঁড়টি সঠিকভাবে দিতে না পারলে অসময়ের দশ নয়, একশত ফোঁড়েও আমরা স্বাধীন জাতি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারতাম না। আমাদের সৌভাগ্য – সময়ের ফোঁড়টি যথাযথভাবে দেয়ার জন্য আমাদের একজন বঙ্গবন্ধু ছিলেন। ফিলিস্তিনী, কুর্দি আর আরাকানীদের দূর্ভাগ্য – তাদের কোন বঙ্গবন্ধু নেই। আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা সেই সৌভাগ্যকে নিজেরাই  হত্যা করেছিলাম স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছরের মাথায়। ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর আমরা মেতে উঠেছি তাঁর আদর্শ হত্যার নেশায়।

আহমেদ শরীফ শুভ
কবি, কথাসাহিত্যিক ও চিকিৎসক
মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments