ইফতার ও ঈদ সমাচার । শিল্পী রহমান

  •  
  •  
  •  
  •  
একদম ছোটবেলায় অর্ধেক রোজা রাখবার সাহস মা’ই দিতেন, সেহেরির সময় দুধভাত খেয়ে রোজা রাখতে শুরু করতাম । কিন্তু সকাল থেকেই ক্ষুধার চাইতে কেমন একটা বিশাল শুন্যতা গ্রাস করতো। কি নেই, কি হচ্ছে না এমন একটা ভাবনা তাড়া করতো। তারপর দুপুর ১২টা বাজতে না বাজতেই আর শরীর চলতো না, যেখানে বসি তো বসেই থাকি, চলাফেরার গতি কমে যেতো অন্য দিনের চাইতে কয়েকগুন বেশি। ছুটাছুটি করবার শক্তি থাকতো না, চোখে সরষে ফুল দেখবার মতো অবস্থা কিন্তু রোজা যে রেখেছি সেটা আবার খুব গর্বের একটা বিষয় ছিল।
বাসার সবার সাথে একই কাজে সামিল হওয়া, একই লেভেলে ওঠার মতো একটা ব্যাপার যেটা মনের মধ্যে অন্য রকমের ভালোলাগা দিতো। ওই বয়সে বড়দের কাছ থেকে আরেকটু বেশি পাত্তা পাবার আরেকটি সুযোগ।  ১২টা বাজলে মা সাহস দিয়ে বলতেন ছোটদের জন্য অর্ধেক রোজার নিয়ম আছে । আমি যদি রান্না ঘরে যেয়ে খেয়ে ফেলি কিছু হবে না। রোজা ভাঙতেও ভালো লাগতো না আবার পেটও মানতো না। অগত্যা অর্ধেক রোজাতেই নিজেকে মানাতে হতো, সেই সাথে আল্লাহ্‌র কাছে মাফ চেয়ে নিতাম যেন আল্লাহ্‌ আমার রোজাটা কবুল করে নেন।
একটু বড় হতে হতে, ক্লাস ওয়ান বা টু তে পড়ার সময় তিনটা রোজাতে মোটামুটি মনস্থির করে ফেলেছিলাম। প্রথম রোজা, সাতাশে রোজা আর শেষের টা। এরপর যত বড় হতে থাকি তত রোজার পরিমান বাড়তে থাকে। কিন্তু মাঝে মাঝে আমার বয়সী কোন চাচাতো খালাতো ভাই বোনেরা আমার চাইতে বেশি রোজা রেখেছে শুনে নিজেকে খুব ছোট মনে হতো। গর্বের জায়গায় লজ্জা এসে হানা দিতো। ছোট বেলায় কয়টা রোজা রাখলাম আর সবে বরাত বা লাইলাতুল কদরের রাতে কতো রাকাত নামাজ পড়লাম এটা প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছিলো।  পরের দিন কে কতো রাকাত নামাজ পড়লো এর একটা বিস্তারিত বিবরণ শুরু হয়ে যেতো বন্ধুমহলে, এই আলচনায় অংশগ্রহণ করতে হলে কমপক্ষে ১০০ রাকাত নামাজ তো পড়তেই হতো। নাহলে মান থাকে না।
সারাদিনের রোজা শেষে আমাদের প্রধান আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইফতার যা এখনও আছে। আমরা সবাই সাধ্যমত চেষ্টা করি সারাদিনের সংযমের শেষে ইফতারকে বর্ণাঢ্য করে তুলতে। সাধারণত বাংলাদেশী ইফতারিতে আমরা খেজুর, ছোলা, মুড়ি, পিয়াজু, বেগুনি, জিলাপি ইত্যাদির প্রাধান্য দেখতে পাই বেশি। পাশাপাশি থাকতো ঋতু বুঝে নানা ধরনের ফল।
রোজার দিনে ইফতারের আয়োজন শুরু হয়ে যেতো বিকেল থেকেই, শুধু দুপুরের পরেই ছোলাটা বসিয়ে দেওয়া হতো। মা বোনেরা ইফতার বানাতে ব্যস্ত থাকতো, আমরা ছোটরা শরবত বানাতাম আর প্লেট সাজাতাম। সবার নামে নামে প্লেট থাকতো, তাতে বাঁধাধরা কতোগুলো আইটেম থাকতোই ,  যেমন ছোলা ভাঁজা, মুড়ি, পিঁয়াজু, বেগুনী, খেজুর এবং লেবুর শরবত। বিভিন্ন বাসা অনুযায়ী আইটেমেরও কিছু হেরফের থাকতো তবে এগুলো একেবারে না হলেই নয় এমন অবস্থা। পাকোরা, ফুলুরি, জিলাপী, আলুর চপ, নূডুলস , দই চিড়া ছিল বিশেষ সংযোজন। কাউকে আবার দেখেছি সুজির হালুয়া , পিঠা , ইত্যাদি থাকতো প্রতিদিনের ইফতারের টেবিলে।  আমাদের বাড়িতে কখনো রুহ আফজা বা ট্যাং এর শরবতের কোন স্থান ছিল না এখনও নেই। অবশ্য রুহ আফজা আর ট্যাং এসেছে অনেক পরে ততদিনে আমরা বড় হয়ে গিয়েছিলাম।  দেশ ছেড়েও বেরিয়ে গিয়েছিলাম ততদিনে।
ছোটবেলা থেকেই শিখেছিলাম ইফতারের সামনে বসে থাকতে হয়। চোখের সামনে আকাংখিত খাবার থাকবে কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের আগে তা খাবো না এতে আল্লাহ্‌ খুশী হবেন। প্রতি মিনিটে তখন ঘড়ি দেখতাম  কখন সময় হবে, কখন আজান শুনবো আর আমরা ঝাঁপিয়ে পরবো ইফতারের ওপর। মা শিখিয়েছিলেন প্রথমে আদা কুঁচি লবন দিয়ে মুখে দিয়েই লেবুর শরবত।  শরবত ছাড়া আদা বা কাঁচা ছোলা ওই বয়সে একদমই ভালো লাগতো না কিন্তু এইসব কিছুকে নিয়ম জেনে মেনে নিতাম অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে।   আজান পড়ার সাথে সাথে অর্ধেক ইফতার করার পর , নামাজটা পরে এসে আবার দ্বিতীয় পর্ব শুরু হতো।  সব ভাইবোনেরা হাত পা ছড়িয়ে একসঙ্গে বসে, সব ইফতারের আইটেম একসঙ্গে মেখে গল্প করতে করতে লম্বা সময় নিয়ে খেতাম। ছোলা, মুড়ি, পিঁয়াজু, লেবু, শসা, জিলাপী আরও যা যা থাকতো সব একসঙ্গে মাখিয়ে খেতাম, মাঝে মাঝে কার মাখানোটা বেশি মজা হয়েছে সেটা জানার জন্য আবার একজন আরেকজনের সাথে শেয়ারও করতাম। নির্ঝঞ্ঝাট সুন্দর জীবন, নির্মল আনন্দে ভরপুর ছিল জীবন তখন, আহা আবার যদি ফিরে পেতাম সেইসব দিন – সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি…!
আমার প্রিয় ইফতার বেগুনী তখনও ছিল,  এখনও আছে। দেশে বিদেশে যেখানেই যাই না কেন শুধু একটু বেশন পাবার অপেক্ষা , আর বেগুন তো  মোটামুটি সব দেশেই পাওয়া যায়, বাকি সব জোগাড় হয়েই যেতো, যেমন ছোলা,  পিঁয়াজু বানাবার জন্য ডাল , অস্ট্রেলিয়া আসার পর আবিষ্কার করেছি সুপার মার্কেটে ডাল মিক্স পাওয়া যায় যা  দিয়ে বাংলাদেশীরা হালিম বানানোর সুযোগ্য মিক্স খুঁজে পেয়েছিল। ব্যাস শুরু হয়ে গেলো হালিমের যুগ। সাথে ফালুদা, মাঝে মাঝে দহি বড়া। যতদিন গেছে নতুন নতুন ইফতারের খাবার শুধু যোগই হয়েছে, কমেনি কিছু। সেই ছোলা পিঁয়াজু, বেগুনী তো রয়েছেই সাথে নিত্য নতুন আইটেমের সংযোজন ।
যখন কাতারে ছিলাম, ওখানকার খাবারের তালিকায় মাংসের পরিমান থাকতো অনেক বেশি, সেই সাথে হরেক রকমের খেজুর এবং ফল। লাবান ( দই দিয়ে বানানো পানীয়), বিভিন্ন ধরনের স্যুপ- বিশেষ করে আমাদের বাসায় মুশুর ডালের সুপ ছিল খুব পপুলার কারন আমার হাসবেন্ড খুব সখ করে , যত্ন করে এই সুপ বানাতো।  খুব মজা হতো সেই সুপ। আমার হাসবেন্ডের প্রসঙ্গ যখন এসেই গেলো তাহলে বলি ইফতারের আইটেমে  সে নিজেই আলু বা ডাল পুরি, মোঘলাই পরোটা বানাতে পছন্দ করতো, কারন উনি এগুলোর মাস্টার সেফ !
একটা খাবার কাতারে এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যেই আমি বলবো খুবই বিখ্যাত তাহলো খাবসা।   ভেড়া/মুরগির মাংস দিয়ে তৈরি বিরিয়ানির মতো একটি খাবার । বিভিন্ন রকমের কাবাবে ভর্তি থাকতো রেস্তরার ইফতারি। ওখানে বাসার বাইরে ইফতার করবার বেশ প্রচলন রয়েছে। প্রত্যেকটা  নামকরা বড় রেস্তোরাই “ইফতার টেন্ট” বলে একটা বিশেষ আয়োজন করতো, সেখানে বুফেতে শত শত আইটেম দ্বারা সুসজ্জিত থাকতো ইফতারের অংশ। রমরমা অবস্থান, একটা ফেস্টিভ মুড সাড়া দেশে।
ফিরে আসি বাংলাদেশে,  ছোটবেলা পেরিয়ে বড়বেলায় (বুড়োবেলা প্রায় ) এসে পৌঁছেছি। বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন রকমের সীমাবদ্ধতা। কি খেলে গ্যাস হয়, ডাইয়াবেটিস বাড়ে, কিংবা কোনটা কোলেস্টেরোলের জন্য ক্ষতিকারক ইত্যাদি নানা দিকে মনোযোগ দিতে যেয়ে ইফতারের সেই চমকই চলে যাচ্ছে তবুও সুস্থ্য থাকা জরুরী। কিন্তু আমার মায়ের বাড়িতে এর ব্যাতিক্রম দেখে আমি খুশি। অনেক বছর পরে দেশে এসে যদি মজা করে ইফতারই না করলাম তাহলে কি করে হবে !
বড় ভাইয়া প্রতিদিন অফিস থেকে ফেরার পথে জিজ্ঞেস করে আজ কি কি লাগবে, আমি এবং আমার ভাইয়ের মেয়েরা যা মন চেয়েছে বলেছি , ভাইয়া তা মনের আনন্দে নিয়ে এসেছে, আর ভাবী তো বাসায়  প্রতিদিন সব রকমের আইটেম বানিয়েছে।  কোন ভাবনা চিন্তা না করে মনের আনন্দে পুরো রোজা রেখে এবং ইফতার করে মন ভরে গেছে। আমার শশুর বাড়িতে একটু সাস্থ্য বিধি মেনে চলার নিয়ম আছে বলে সেখানে এসে আমি নিজেও তা মেনে চলেছি।  তবে এই মাসের বেশীর ভাগ সময়টা আমি আমার মায়ের কাছেই থাকার কারণে মনের সাধ মিটিয়ে ইফতার করেছি। কোন আফসোস নেই।  পুরান ঢাকার “বড় বাপের পোলায় খায় “ অবশ্য খাওয়া হয়নি তবে অনেক বছর পরে সেই ছোটবেলার মতো ছোলা, মুড়ি, পিঁয়াজু লেবু শশা দিয়ে মাখিয়ে খেয়েছি মোটামুটি প্রতিদিনই।
রোজা শেষ, বেঁচে থাকলে আবার দেশে এসে ইফতার করবো, তখনও যেন সবকিছু এইরকম আনন্দের সাথে উপভোগ করতে পারি সেই প্রত্যাশা রইলো।
সবাইকে ঈদ মোবারক। প্রিয় মানুষ এবং পরিবার নিয়ে সবাই হাসি আনন্দে বেঁচে থাকুন, সুস্থ্য থাকুন, শুভ কামনা।
শিল্পী রহমান
গল্পকার, কবি, সংস্কৃতিকর্মী, কাউন্সেলর ও গবেষক। স্থায়ী নিবাস ব্রিসবেন, অস্ট্রেলিয়ায়। 
প্রকাশিত গ্রন্থসমুহ: ধর্ষণ ধর্ষক ও প্রতিকার; উৎকণ্ঠাহীন নতুন জীবন; মনের ওজন; সম্ভাবনার প্রতিচ্ছায়ায়; যুদ্ধ শেষে যুদ্ধের গল্প; পথের অপেক্ষা; পাহাড় হবো ইত্যাদি।
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments