ইলেকশন – শিমুল শিকদার

  •  
  •  
  •  
  •  
অস্ট্রেলিয়াতে এখন স্টেট পার্লামেন্ট ইলেকশন চলছে। এখানে ভোটের দুই সপ্তাহ আগেই ভোট সেন্টার খুলে যায়। যে যখন পারে সুবিধামতো সময়ে সেন্টারে এসে ভোট দিয়ে যায়। ভোট ইলেকশনের দিনও দেয়া যায়। ওদিন ভোট সেন্টারে লম্বা লাইন থাকে। তাছাড়া ভোট দিতে ভুলে যাওয়ারও ভয় থাকে। একবার কি এক ইলেকশনের দিন সন্ধ্যার সময় হঠাৎ মনে পড়লো, হায় হায়, ভোট তো দেয়া হয়নি। কি করি, কি করি ভাবতে ভাবতে অসৎ এক বুদ্ধি মাথায় এলো। পেট ডলতে ডলতে ডাক্তারের কাছে গিয়ে বললাম – টয়লেট আর বিছানা, বিছানা আর টয়লেট, এই করতে করতে আমি কাহিল। ডাক্তার মুখ হাঁ করতে বললেন। মুখের মধ্যে টর্চ মেরে কি জানি দেখলেন। চোখ দেখে, নাড়ী টিপে, পেট চেপে গম্ভীরভাবে বললেন,
– গ্যাসট্রোএন্টেরাইটিস। তা খেয়েছিলে কি?
– তেলে ভাজা খাবার।
    – হুম। সেখান থেকেই ফুড পয়জনিং। তোমাকে না বলেছিলাম, ভাজাপোড়া না খেতে।
– ভুল হয়েছে। আর খাবো না।
ডাক্তার স্যালাইন, ঔষধ আর কি কি দিলেন। কিন্তু আমার দরকার ছিল শুধু প্রেসক্রিপশনটা। এর কয়েকদিন পরেই দেখি ভোট না দেয়ার কারণে জরিমানার চিঠি এসে হাজির। ইলেকশন কমিশনে ফোন দিয়ে বললাম, ভোটের দিন আমার পেট খারাপ ছিল। তোমাদের সেন্টার মাখামাখি হয়ে যেতে পারে এই ভয়ে ভোট দিতে যাইনি।
ইলেকশন কমিশনের মহিলাটা বললো,
– না গিয়ে ভালোই করেছ। ডাক্তার দেখিয়েছ?
– হুম।
– তাহলে মেডিকেল সার্টিফিকেটটা পাঠিয়ে দাও। ওতেই হবে। জরিমানা আর দিতে হবে না।
এরপর থেকে ইলেকশনের দিন পর্যন্ত আর অপেক্ষা করি না। দশ বারোদিন আগেই ভোট দিয়ে হালকা হয়ে যাই। প্রথম প্রথম ভোট দিতে গিয়ে কাকে ভোট দেই সেই নিয়ে ঝামেলায় পড়তাম। কাউকেই তো চিনতাম না। কোন দল থেকে কোন প্রার্থী বাসায় এসে অথবা রাস্তা ঘাটে থামিয়ে কখনো বলেনি, ভাই ভোটটা আমাকে দিও কিন্তু। ব্যালট পেপার হাতে নিয়ে মনে মনে বলতাম, কেউ যদি একবার অন্তত এসে নিজের ভোটটা চাইতো, তাহলে মনে হয় খুশিতে সব ভোটগুলো তাকেই দিয়ে দিতাম। সে সময়ে ভোট দেয়ার কায়দাটা ছিল অন্য রকম। যেমন, কারো নামের মধ্যে ব্যাঙ, চ্যাং থাকলে সে বাদ। গ্রিক নামের শেষের অংশটা সাধারণত অনেক বড় হয়। উচ্চারণ করা কঠিন। আমার এক এমনি বন্ধু ছিল, নাম পিটার মাভ্রোকৌকোলোপৌলাস। ব্যালট পেপারে এধরনের জটিল নাম দেখলে সেই বাদ। মনে হতো যাদের নাম এতো জটিল, তাদের মনও না জানি কতো জটিল। প্রার্থীদের নামের মধ্যে ডেভিড, হ্যারি থাকলেও বাদ। এই নামগুলোর মধ্যে কেমন জানি শয়তান শয়তান ভাব আছে। চার্লি নাম বাদ। এই নামটা শুনলে জোকার জোকার মনে হয়। নামের মধ্যে জর্জ, উইলিয়াম থাকলে ভারী ভারী মনে হয়। এলিজা, ক্রিস্টিনা থাকলে সুন্দরী মনে হয়। এসব ভালো ভালো নামের মধ্যে থেকেই ওবু দশ বিশ গুনে কাউকে ভোটটা দিয়ে ফেলতাম।
এরকম একবার ভারী সুন্দর কি একটা নাম দেখে ভোট দিয়ে সেন্টার থেকে বের হয়েছি। বাইরে দেখি মোটা থলথলে এক মহিলা সেন্টারের সামনে দাড়িয়ে ভোটারদের উদ্দেশ্যে ফ্রি সেক্সের বিষয়ে বক্তৃতা দিচ্ছে। পরে টের পেলাম, যাকে ভোট দিয়েছি সুন্দর নামের সেই মহিলাটাই এই। তিনি অস্ট্রেলিয়ান সেক্স পার্টির একজন প্রার্থী। ভোট দেয়ার সময় শুধু নামটাই দেখেছিলাম। এতো কিছু লক্ষ্য করিনি। মনে মনে ভাবলাম, এরা পার্লামেন্টে গেলে কি শুধু সেক্স বিষয়ক কথাবার্তাই হবে? সেদিন রাতে জানলাম, সেই সেন্টার থেকে অস্ট্রেলিয়ান সেক্স পার্টির সেই মহিলা প্রার্থী মাত্র এক ভোট পেয়েছিলেন। আমি ছিলাম সেই ভোটার। ভোটের এমন অপচয় কোন কালেও কেউ করেছে কিনা বলতে পারবো না। সেদিন থেকে প্রতিজ্ঞা করলাম, আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশী তাকে দিবো – ফর্মুলা বাদ।
এরপর সময় বদলেছে, পরিস্থিতিও বদলেছে। এখন ভোট শুধু ভোট সেন্টারে গিয়ে ভোট দিয়েই কাজ শেষ হয় না। ক্যাম্পেনিংও করতে হয়। কারণ, গত কয়েক বছর ধরে অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশীদের যোগ ঘটেছে। প্রতিটি ইলেকশনেই বাংলাদেশ থেকে আসা ইমিগ্রান্টরা প্রার্থী হচ্ছে। কি পার্লামেন্ট, কি সিটি কাউন্সিল, সব জায়গায়ই বাংলাদেশীদের উপস্থিতি। আমি যে এলাকায় থাকি সেখানে এবার প্রথম একজন বাংলাদেশী পার্লামেন্ট ইলেকশন করছেন। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল লিবারেল থেকে নমিশন পেয়েছেন তিনি। গতকাল ভোট দিতে গিয়ে দেখলাম, সেই প্রার্থী লোকজন নিয়ে সেন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ও আমার স্ত্রীকে দেখে ছুটে জড়িয়ে ধরলেন, আমার কোলের বাচ্চাকে আদর করে হাতে একটা বেলুন দিলেন। এরপর ভোট করার নিয়মটা বুঝিয়ে দিয়ে পথ দেখিয়ে দিলেন। অন্য পার্টির এজেন্ট ফেজেন্ট তেমন কাউকেই দেখলাম না। যে কক্ষে ভোট হচ্ছিল, সেখানে পাশাপাশি দুইটা নড়বড়ে প্লাস্টিকের টেবিলের ওপাশে দুই প্লাস্টিকের চেয়ারে বসা একজন বুড়া আর আরেকজন বুড়ি ভোট নিচ্ছিলেন। এদের কারো বয়স আশির কম নয়। এ দেশের ভোট কেন্দ্রে সাধারণত এ ধরণের পোলিং অফিসার, প্রিজাইডিং অফিসারের কাজ রিটায়ার্ড বুড়া, বুড়িরা করে থাকেন। ভোট কক্ষের মধ্যে দেখলাম আমি, আমার স্ত্রী, আমার কোলের বাচ্চা আর বুড়া ও বুড়িসহ মোট পাঁচজন ছাড়া আর কোন মানুষ নাই। কোন পাহারাদার নেই, নেই কোন আনসার, পুলিশ, আর্মি। ভোট কেন্দ্রে কোন উত্তেজনা নেই, মারামারি, হাতাহাতি, কোন্দল, মিছিল, স্লোগান কিছুই নেই। প্রাইমারী স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষাও এর চেয়ে কড়াকড়িভাবে হয়। কাগজের তৈরি বুথের মধ্যে দাড়িয়ে ব্যালটে সিল মেরে প্লাস্টিকের বাক্সে ব্যালট পেপার ঢুকিয়ে দিতে হয়। ব্যালট বাক্সে কোন তালা নেই, লোহার শিকল নেই, পাহারা দিতে কোন পাহারাদারও নেই। বাক্সের প্লাস্টিক ঢাকনা টান দিলেই খুলে আসে। বুড়ির পাশে দেখলাম বড় বড় ব্যালটের বান্ডিল। তাতে অন্তত কয়েক হাজার ব্যালট পেপার আছে। চাইলে আমি সমস্ত ব্যালট পেপার কেড়ে নিয়ে তাতে জাল ভোট মেরে ব্যালট বাক্স ভরে ফেলতে পারি। বুড়ি ও বুড়া দু’জন মিলে আমাকে ঠেকাতে পারবে না। তারা দু’জন এতোই বৃদ্ধ যে সে শক্তিও তাদের নেই। কিংবা ঠেকাতে এলেও বলতে পারি, বিনিময়ে তোমাদের দু’জনকে অনেক অর্থ দেয়া হবে। এখানে আমরা এই কয়জন ছাড়া আর কেউ নেই। এখানে কি হচ্ছে বাইরের কেউ জানবে না।
কিন্তু জাল ভোটে বাক্স ভরার চিন্তা তো অনেক বড় ঘটনা, সাংঘাতিক বিষয়। বরং ভাবতে লাগলাম, কিসের বিনিময়ে এই আমি আজ এখানে একটি জাল ভোট দিতে পারবো? শুধু মাত্র একটি জাল ভোট। পেশী শক্তি খাটিয়ে? আশি বছর বয়সের বৃদ্ধ আর বৃদ্ধা কি-ই বা করবে? বৃদ্ধ ও বৃদ্ধার ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে কাজটি কি সম্ভব? না সম্ভব নয়। দুই বৃদ্ধর ডাকে অস্ট্রেলিয়ার পুলিশবাহিনী এমনকি আর্মি বাহিনী নেমে আসবে। এই দুই বৃদ্ধ আসলে আইনের প্রতীক মাত্র। এর পেছনে আছে অস্ট্রেলিয়া সরকারের সমস্ত শক্তি। আরেকটা রাস্তা খোলা আছে, বৃদ্ধ দুইজনকে যদি টাকার লোভ দেখিয়ে রাজি করাতে পারি। লক্ষ টাকা। বিনিময়ে একটি জাল ভোট। এখানে আমরা মাত্র পাঁচজন প্রাণী। পৃথিবীর আর কেউ জানবে না। একটি মাত্র জাল ভোট বিনিময়ে লক্ষ টাকা। তারা কি রাজি হবে? না, রাজি হবে না।
একবার কয়েক মিনিটের জন্য রাস্তায় গাড়ি অবৈধভাবে পার্ক করেছিলাম। এক বৃদ্ধ এসে গাড়ির জানালায় ঠকঠক করে শব্দ করতে জানালার কাঁচ নামালাম। বৃদ্ধ বললো, তোমরা এদেশে আসছো, ভালো কথা। কিন্তু অস্ট্রেলিয়াকে পরিবর্তন করতে চেষ্টা করো না। সে কথা শুনে ‘সরি’ বলে সাথে সাথে গাড়ি সরিয়ে ফেললাম। টাকার বিনিময়ে জাল ভোটের কথা শুনলে সেই মানুষগুলো নিশ্চয় চমকে উঠবে, অবাক হবে, বিস্মিত হবে। চিৎকার করে উঠবে, Try not to change our Australia. অস্ট্রেলিয়ার সমস্ত ভোটকেন্দ্রে এ রকম হাজার হাজার বৃদ্ধ মানুষেরা কাঁপা কাঁপা হাতে ব্যালটের লেনদেন করছে। সেখানে ভোট সেন্টারে আর্মি, পুলিশ তো দূরের কথা, সিকিউরিটি গার্ডও থাকে না। এ দেশের ইতিহাসের কোন কালেও শোনা যায় নাই একটি জাল ভোট হয়েছে, ভোট সেন্টার দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই হয়েছে। এখানের পোলিং অফিসার, প্রিজাইডিং অফিসারদের উপর অবৈধ হুকুম দেয়ার সাহস রাস্ট্রের কারোরই নেই। এদেশে ভোটার বেচাকেনা হয় না। এখানকার মানুষরা জানে না, কি করে ভোট কিনতে হয়, কি ভাবে খালি ব্যালট বাক্সের সাথে ভরা ব্যালট বাক্সের বদল করতে হয়। এদেশের মানুষ জানে না জনগনের ভোট ছাড়া কি করে জনগনের প্রতিনিধি হতে হয়। এ দেশের মানুষগুলো কি বোকা?
সমস্ত বাংলাদেশ খুঁজে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার কি মিলবে, যে একটি জাল ভোটের বিনিময়ে এক লক্ষ টাকার লোভ সামলাতে পারবে? বিশ কোটি মানুষের মধ্যে একজন মানুষ? মাত্র একজন? যদি উত্তর হয় ‘না’, তাহলে প্রশ্ন ওঠে এই লোভ যারা সামলে চলে তারা কি তাহলে নির্বোধ? তারা কি অবুজ? অর্থের লোভ কি তাদের নেই? কোন বইয়ের পাতা পড়ে তারা এমন মানুষ হয়েছে? কোন শিক্ষকরা এদের জ্ঞান দিয়েছেন? কেমন শিক্ষা এরা পেয়েছে? নৈতিকতার প্রশ্নে কিভাবে এরা এতো অটল, এতো শক্ত? অন্যায় ভাবনা কেন তাদের মাথায় পুরোপুরিভাবে অনুপস্থিত? আমরা কেন, কিভাবে সেই শিক্ষা থেকে দূরে আছি?
ভোটকেন্দ্রে বৃদ্ধার মাথা কাঁপছিল। তিনি কাঁপা কাঁপা হাতে প্যাড থেকে ব্যালট পেপার ছিঁড়ে আমার হাতে দিয়ে হেসে বললেন, কষ্ট করে ভোট দিতে আসার জন্য ধন্যবাদ। আমিও ভোট দিয়ে বৃদ্ধাকে ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে এলাম। মনে হতে লাগলো, এই একজন অতিশীপর, নড়বড়ে বৃদ্ধার শক্তি বাংলাদেশের পুলিশবাহিনী, আর্মিবাহিনী এমনকি সমস্ত বাংলাদেশ সরকারের শক্তির চেয়েও বড়। বাংলাদেশের সমস্ত শক্তি দিয়ে এদের নৈতিক অবস্থান থেকে এক চুল পরিমান নাড়াতে পারবে না। নৈতিকতার চেয়ে বড় শক্তি আর কি হতে পারে?
শিমুল শিকদার
গল্পকার, নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।