ঈদের গল্প/ কিছু বিষাদ হোক পাখি -শাখাওয়াৎ নয়ন

  •  
  •  
  •  
  •  

     কিছু বিষাদ হোক পাখি


শাখাওয়াৎ নয়ন

(এক)
কোরবানী ঈদের তখনো সাত-আট দিন বাকি। শুভ্রা টেক্সট পাঠিয়ে জরুরী তলব করলো। শার্টের বোতাম তাড়াহুড়া করে লাগাতে গিয়ে একটা গেল ছিড়ে; যা তা অবস্থা! রিকশায় উঠে খেয়াল করলাম, একটু এদিক ওদিক হলেই আমার নাভি দেখা যাচ্ছে। কী বিপদ! আপনারাই বলুন? পুরুষ মানুষের নাভি কি দেখার মতো জিনিস? শার্ট চেঞ্জ করতে যে ফিরে যাব, সে সময় কই? আরেকটু পর আবিস্কার করলাম, দুই পায়ে দুই রঙের মোজা! কিভাবে যে এটা করলাম? আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। রিকশা থেকে নামতে না নামতেই, দেখি বোরকা পরা একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শুভ্রাকে কোথাও দেখছি না। কোনো মতে রিকশা ভাড়াটা দিতে না দিতেই হঠাৎ বোরকার জানালা খুলে শুভ্রা বললো,
-এদিকে আসো…
অবাক হয়ে গেলাম। বুঝলাম, আজকে খবর আছে। একটু হাটতে না হাটতেই শুভ্রা বললো,
-আমাদের বাসায় গরু পাঠিয়েছো কেন?
– দু’দিন পরে কোরবানী ঈদ, তাই হবু শ্বশুরকে একটা গিফট পাঠিয়েছি, ভালো করেছি না?
-ভালো করেছো না মন্দ করেছো, সেটা বুঝতে পারবে তখন, যখন তুমি নিজেই কোরবানী হয়ে যাবে।
– তাহলে তুমি বলো, ‘ তোমার বাবা আমাকে বাসায় ডেকে এভাবে ‘গরু’ ‘গাধা’ বলে অপমান করলো কেন?’
-তাই বলে তুমি আমার বাসায় একটা আস্ত গরু পাঠিয়ে দিবে? আমাদের বিল্ডিং এ কতগুলি ফ্লাট! আব্বা আজ জুমায় নামাজ পর্যন্ত পড়তে যায় নি; মহল্লায় মুখ দেখাবো কেমন করে? স্বাদে কি আর আমি বোরকা পরে এসেছি?
-আমি আর যাই কোথায়? এবার বোধ হয় গরু নয় আমার নিজেই কোরবানী যাব। লা ইলাহা ইল্লা আন্তা… আমি তো আর ইসমাইল না যে, আমার গলায় ছুরি চালালে দুম্বা কোরবানী হয়ে যাবে। এসব আগডুম-বাগডুম চিন্তা করছি…হঠাৎ শুভ্রা জিজ্ঞেস করলো,
-এখন বলো কিভাবে এটা ম্যানেজ করবে?
– জানি না।
– জানো না তাহলে এটা কেন করলে?
– মাথায় কী তে যে কি চেপেছিল! আর রাগটাও সেরকম হয়েছিল…
-এবার সামলাও…আমি কিচ্ছু জানি না…আব্বা বড় মামাকে এবং বড় চাচাকে খবর দিয়েছেন…রাতে বাসায় মিটিং…

(দুই)
– আমাদের পরিচয় হয়েছিল কিভাবে, মনে আছে?
– হুম, মনে থাকবে না আবার?
– তোমার মামাতো বোনের চিরকুটটা যদি আমার গায়ে না পড়ে, অন্য কারো গায়ে পড়তো?
– আমার কি দোষ? আপু বললো, ‘ ও ছুড়লে নাকি রফিকের জানালা পর্যন্ত পৌছাবে না, তাই আমাকে বলল, ‘তুই মার… তোর নিশানা ভালো’।
-হুম পড়বি তো পড় মালীর ঘাড়েই পড়… আমি তখন ঐ রাস্তা দিয়েই টিউশনি করতে যাচ্ছিলাম…গায়ের উপর পড়ল দলাপাকানো কাগজের এক চিরকুট, খুলে দেখি লেখা আছে ‘ভালোবাসি’ আর যখনি উপরের দিকে তাকালাম, সাথে সাথে ‘ও চোখে চোখ পড়েছে যখনি’ টাইপের অনুভুতি হলো।
-তারপর প্রতিদিনই কেন জানি তোমাদের বাসার দোতলার, সেই জানালার দিকে চোখ চলে যেত। পরের  কয়েকদিন কিন্তু তোমাকে দেখিনি।
-কারণ আমি খুব লজ্জা পেয়েছিলাম। অচেনা একজন মানুষ কি তে কী মনে করে… তার ঠিক আছে?
-আমার কিন্তু খারাপ কিছু মনে হয়নি। ভেবেছি, আমাকেই লিখেছো…তাই খুঁজেছি তোমায়… কিন্তু খোলা জানালায় চেয়ে দেখি তুমি নাই…
-আমি কিন্তু তোমাকে ঠিকই দেখেছি…
– কিভাবে?
-আরেকটা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে খেয়াল করতাম, তুমি এ পথে আবার আসো কি না? আমাকে খোঁজও কি না?
-তারপর?
-তারপরে ‘কি যাদু করিলা পিড়িতি শিখাইলা, থাকিতে পারি না ঘরেতে…’ টাইপ অবস্থায় পড়ে গেলাম।

 

অলংকরণ: আসমা সুলতানা মিতা

 

(তিন)

-প্রথম দিকের সেই পাঁচ সাতটা দিন যে কিভাবে গ্যাছে! তা কোনোভাবেই বোঝাতে পারবো না। একটা মেয়ের প্রেমে পড়েছি, কিন্তু তাঁর নাম-ধাম কিছুই জানি না। ভাই-ব্রাদার কে, কেমন? তাও জানি না। আজকাল তো মাস্তানের কোনো অভাব নেই। মেয়েরা আবার নিজের ভাইকে না বলে, পাড়াতো ভাইকে দিয়ে ডলা দেয়…
-তুমি তো এটলিস্ট আমার বাসাটা চিনতে, ইচ্ছে করলে আসতে পারতে…আমার তো সেই সুযোগটাও ছিল না। বিকেল চারটার সময় তুমি আমাদের বাসার পাশ দিয়ে যেতে…তা আবার এক মুহুর্তের, না দেখার মতো করে দেখা…
– তোমাদের বাসার জানালার কাছে গিয়ে একটু এদিক-ওদিক তাকিয়ে তোমাকে খুঁজতাম… মনে হতো এইখানে এই জানালার কাছেই হোক আমার চিরস্থায়ী ঠিকানা…প্রাইভেট পড়াতে যেতে ইচ্ছে করতো না…দশ কদম গিয়ে আবার ফিরে আসতাম…মাঝে মাঝে মনে হতো তোমাদের বাসার দেয়াল স্পর্শ করে দাঁড়িয়ে থাকি, সারাদিন। সারাজীবন।
-রক্ত করবী’র কথা মনে আছে?
-থাকবে না? এক শুক্রবারে তুমি ইত্তেফাকের ভিতরের পাতায়, লাল মার্কার দিয়ে কী যেন একটা মার্ক করে জানালা দিয়ে ফেললে। পত্রিকাটি হাতে নিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করলাম,
-এটা কি? পত্রিকা কেন?
তুমি ইশারায় বললে,
-মার্ক করা জায়গাটা দেখ।
পত্রিকাটি হাতে নিয়ে দ্রুত কেটে পড়লাম। পত্রিকার মার্ক করা জায়গাটা আসলে ‘মহিলা সমিতির গাইড হাউস মঞ্চে রক্ত করবী’র শো। পাশেই পেন্সিলে লেখা ‘ দেখা হবে’। সময় মতো চলে গেলাম। ‘রক্ত করবী’ শুরু হবার জাস্ট একটু আগে তুমি আর তোমার সেই কাজিন এলে। নাটক শুরু হয়ে গেল। রবী ঠাকুরের রক্ত করবী দেখবো কি? পুরো সময়টা আমরা আসলে আড়চোখে একে অপরকেই দেখলাম। নাটক শেষে কাছে এসে বললে,
-আমি শুভ্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকোনোমিক্সে পড়ি।
-আমি মাহবুব। চারুকলা থেকে পাশ করেছি।
-পরের ডেইটও কিন্তু আমিই ঠিক করেছিলাম।
-তা করেছিলে; কেউ কিছু দেখার আগেই হুট করে একটা চিঠি ধরিয়ে দিয়ে বললে,
-আমাকে যেতে হবে।
চিঠিটা দ্রুত পকেটে পুরে তোমার দিকে, তোমার চলে যাওয়া পথের দিকে চেয়ে থাকলাম। তুমি আর তোমার কাজিন কী যেন বলতে বলতে হাসতে হাসতে, একে অপরের গায়ের উপর পড়ছিলে। একটু পরে যখন চিঠিটা বের করলাম, একটা কাগজের উপরের দিকে লেখা ‘ দেখা হবে রমনা রেস্তোরায়, মঙ্গলবার বিকেল পাঁচটায়’।

(চার)
তারপর নিয়মিতই চিঠি আদান-প্রদান হয়, দেখা হয়, কথা হয় কিন্তু কথাও শেষ হয় না, দেখাও শেষ হয় না, চিঠিও শেষ হয় না। যতই দেখি, যতই কথা বলি…আরো কথা বলতে, আরো দেখা করতে ইচ্ছা করে। দিন যায়, মাস যায়, বছর ঘুরে আমাদের সম্পর্কের তিন বছর নয় মাস চার দিন। গত সপ্তাহে তুমি বললে,
-আব্বা-আম্মা তোমার সাথে কথা বলতে চেয়েছেন।
আমি তোমাদের বাসায় গেলাম। আমার জীবন বৃত্তান্ত শুনে তোমার বাবার মোটেও পছন্দ হয়নি। এনজিওর চাকরির কথা যখনই বললাম তখনি তিনি বললেন,
-আর বলতে হবে না, হয়েছে…যথেষ্ঠ হয়েছে।
ভদ্রলোক দপ করে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং গটগট করে ভিতরের রুমের দিকে যেতে যেতে বললেন,
-দেশে কি আর ছেলে নেই? …আরে এর চেয়ে তো গরু…গাধাও অনেক ভালো।
ভীষণ অপমানে তাই একটা দশাসই গরু কিনে শুভ্রাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিলাম। ফলাফল? বিয়ের আগেই প্রেমিকার বাবার সাথে যে ছেলে এত বড় বেয়াদবি করে, তাঁর কাছে নিজের মেয়ে কেন? কেউ তাঁর বাসার কাজের মেয়েকেও কি বিয়ে দেয়? না, দেয় না। তাই কিছু কিছু বিষাদ হয়ে যায় পাখি। হয়ে যায় পাখি।

ফেইসবুকঃ www.facebook.com\shakhawat.nayon