ঈদ আসুক একাত্তরের চেতনায় । আহমেদ শরীফ শুভ

  •  
  •  
  •  
  •  
আহমেদ শরীফ শুভ

আর ক’দিন বাদেই ঈদ। এবারের ঈদ পালিত হবে এক অচেনা পরিবেশে। ১৯৭১ সালে আমাদের অবরুদ্ধ ও শত্রু অধিকৃত বাংলাদেশেও ভিন্ন এক অচেনা পরিবেশে ঈদ পালিত হয়েছিল। যদিও ‘ঈদ’ অর্থ ‘খুশি’, ১৯৭১ সালের ঈদে কারো মনেই কোন আনন্দ ছিল না। সেই ঈদ সীমাবদ্ধ ছিল ধর্মীয় আচারে, নামাজ পড়ায়। সামর্থবানেরা কেউ কেউ হয়তো সেমাই পায়েস খেয়েছেন – তার অধিকাংশই ছিল সন্তানদের প্রবোধ দেয়ার প্রয়োজনে। নতুন জামা কাপড়ের বাহুল্য ছিল না। থাকবেই বা কীভাবে! সে সময় সমগ্র বাংলাদেশ ছিল আতঙ্কের উপত্যকা, বেঁচে থাকার লড়াই ছিল মানুষের নিত্যদিনের আহ্নিক। যাদের যেটুকু সাধ্যই ছিল তাই নিয়ে তারা এগিয়ে এসেছিলেন অসহায় আর দুস্থ মানুষের সাহায্যে। নিজের অর্থ, বিত্ত,‌ সম্পদ এমনকি দিনের খাওয়াটা ভাগ করে নিয়েছেন অন্যদের সাথে। তাতে কিন্তু ঈদের আবেদন একটুও কমেনি, বরং তার সার্বজনীন মাহাত্ম্য বেড়েছিলো আপন বৈভবে।

এবারের ঈদও এসেছে তেমন একটা অনিশ্চয়তা আর আতংকের পরিবেশে। লক্ষ লক্ষ মানুষ দাঁড়িয়ে আছে অনাহার অর্ধাহারের মুখোমুখি। ৭১ সালে শত্রুর থাবা যেমন ধনী দরিদ্র কিংবা হিন্দু মুসলিম কাউকে ছাড় দেয়নি, করোনা ভাইরাসও তেমন কাউকে আলাদা করে ছাড় দিচ্ছে না। সেই সাথে যোগ হয়েছে আরেক সমস্যা, সামাজিক নৈকট্যের সমস্যা। এই সামাজিক নৈকট্যের কারণেই করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হচ্ছে বিদ্যুৎবেগে। অথচ, ঈদের আবেদনই সামাজিক নৈকট্যের আবেদন। সুতরাং, এবারের ঈদ পালন করতে হবে ভিন্ন আঙ্গিকে, অনেকটা ৭১ সালের মতো। সেদিনও আমরা সামাজিক নৈকট্য থেকে, কেনাকাটার মহোৎসব থেকে, ভোজনের আতিশয্য থেকে দূরে ছিলাম – যদিও তা ছিল ভিন্ন প্রেক্ষিতে।

সরকারের খুলে দেয়ার ঘোষণা দেয়া সত্ত্বেও অনেক শপিং মল কর্তৃপক্ষ তা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন – যাকে সাধুবাদ দিতেই হয়। তারপরও অনেক দোকানপাট খোলা থাকবে, অনেকেই শপিংয়ে যাবেন। তবে যদি ভিড়ের মধ্যে গিয়ে শপিং করেন তবে তারা নিজেদের কোভিড-১৯ এর ঝুঁকিতে ফেলবেন।

শুধু নিজেদেরই নয়, সেই সাথে ঝুঁকিতে ফেলবেন তাদের সংস্পর্শে যারা আসবেন তাদের সবাইকে। এবারের ঈদে তাই শপিং না করলেই মঙ্গল। মানুষের মনে কি উৎসবের মানসিকতা আছে, বিশেষ করে সমাজের নিচতলার মানুষগুলোর? আমাদের চারপাশে নজর দিলেই দেখবো শুধু হাহাকার। সুস্বাদু উপাদেয় খাওয়াগুলোতে কি আমাদের রুচি হবে? নতুন জামা কাপড়গুলো কি আমাদের গায়ে কাঁটা হয়ে বিঁধবে না? জামা কাপড় পড়ে তো কোথাও যেতে পারবেন না কেউ, তেমন কাউকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতেও পারবেন না। শপিংয়ে না গিয়ে, নতুন জামা কাপড় না কিনে, ভোজনের বাহুল্য কিছুটা কমিয়ে সেই অর্থ নিরন্ন মানুষকে দিয়ে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে পারলেই বরং এবারের ঈদ অর্থবহ হবে। শুধু তাই নয়, তাতে নিজে কোভিড-১৯ এ সংক্রমিত হবার সম্ভাবনাও কমে যাবে। নিজের প্রতি এবং অন্যদের প্রতি এবারের ঈদে এটাই আমাদের দায়বদ্ধতা।

১৯৭১ সালের ঈদের সাথে এবারের ঈদের পরিবেশের অনেক মিল থাকলেও একটি বড় অমিলও আছে। সে সময় আমাদের সমাজে প্রদর্শনকামিতা এমন প্রকট ছিল না, এখন সব কিছুতেই প্রদর্শনকামিতার থাবা। ধর্মাচার, সামাজিকতা আর সৌজন্যবোধ হয়ে উঠেছে গৌণ। অন্ততঃ এবারের মহাবিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আশা করতেই পারি একবারের জন্য হলেও আমরা ৭১ এর চেতনায় ফিরে যাবো, প্রদর্শনকামিতার উর্ধে উঠে ঈদের প্রকৃত সহমর্মিতার আবেদনে ফিরে যাবো। নিজের স্বাস্থ্যনিরাপত্তা হবে তার আবশ্যিক প্রণোদনা।

আহমেদ শরীফ শুভ
মেলবোর্ন প্রবাসী ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান, কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও সমাজকর্মী।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments