একটি হত্যাকাণ্ড অত:পর । শিল্পী নাজনীন

  •  
  •  
  •  
  •  

অদ্ভুত অনাসক্তি আর তীব্র বিবমিষা নিয়ে স্টীলের পাত্রটির দিকে চেয়ে থাকে নীরা। চোখ সরিয়ে নিতে চায়, পারে না। অদৃশ্য কোনো শক্তি তার দৃষ্টি আটকে রাখে। ছোপ ছোপ রক্তের ডেলা যেন কিছু বলতে চায় তাকে। যেন বা বিদ্রুপ করে ওঠে। নীরার মাথা ঘোরে, গা গুলিয়ে ওঠে।
মধ্যবয়সী নারীটি তবু দাঁড়িয়েই থাকে। নিরাবেগ মুখে তীব্র বিরক্তি ফুটিয়ে তুলে বলে- দেহেন অবস্তা! দেকচেন? দেন, বকশিশ দেন!
নীরা ফ্যালফ্যাল করে একবার রক্তে প্রায় ভরে ওঠা পাত্র আরেকবার নারীটির মুখের দিকে তাকায়। ব্যথায় গুঙিয়ে ওঠে আবার। নারীটি এবার খেঁকিয়ে ওঠে- অমন করেন ক্যা? কী অইচে? ঝামেলা তো মিটে গেচে গা! লন, কাপড় পিন্দেন, হেরপর বকশিশ দিয়া বাড়িত যান গিয়া!

পেইন্টিং: আসমা সুলতানা

নীরার মাথার মধ্যে মুহূর্তের জন্য মিঠুর বড়বোনের মুখ, পাড়ার শামু কসাই আর মিঠুর মুখ হুটোপুটি খায়। সামনে দন্ডায়মান ঐ নারীর মুখের সাথে যেন একাকার হয়ে মিশে যায় তারা। না, কোনো তফাৎ খুঁজে পায় না নীরা। একটু আগে শরীরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়টা স্মরণ করে শিউরে ওঠে। দুজন দুদিক থেকে চেপে ধরে রেখেছে তার অসুস্থ, অপক্ত শরীর, তারপর শরীরের নিভৃততম প্রদেশে চালিয়ে দিয়েছে তীক্ষ্ণ ছুরির ফলা! খোঁচায় খোঁচায় নীরার মনে হয় যেন ছিঁড়েখুঁড়ে যায় সে, যেন তাকে জবাই করে কোনো হিংস্র জানোয়ার। হয়তো একেই নরক যন্ত্রণা বলে, ভাবে নীরা। যন্ত্রণায় কাটা মুরগীর মত ছটফট করতে করতে পশুর মত গোঙায়, চেষ্টা করে টেবিল থেকে উঠে বসার। কিন্তু তাকে শক্ত করে চেপে ধরে রাখা হয় যেন সে কোনো ভাবেই অপারেশন টেবিল থেকে উঠতে বা সামান্যতম নড়াচড়াও করতে না পারে। তার চিৎকারে আয়া নারীটি বলে ওঠে- ছি! অমন করে চিল্লাও ক্যা? শরম নাই? সবুর করো, আর একটু সবুর করো, এই শেষ অইবো অহনই!
কি অইল? বকশিশ দেন! – ফের আয়া নারীটির ধমকে সম্বিৎ ফেরে নীরার। ধীরে ধীরে, দাঁতে দাঁত চেপে উঠে দাঁড়ায়। মনে হয় মাথা ঘুরে পড়ে যাবে, টাল সামলে নেয়। ব্যাগ খুলে বের করে দেয় পঞ্চাশ টাকার একটি নোট। তারপর আস্তে পা বাড়ায় সামনের বন্ধ দরজা লক্ষ্য করে। রক্তে ভিজে উঠছে সে ক্রমশ, টের পায়।
দৃশ্যটা স্পষ্ট চোখে ভাসে। প্রায় দশ বছর হতে চলল, তবু কিছুতেই স্মৃতি থেকে মোছা যায় না দৃশ্যটাকে। সিনেমার দৃশ্যের মত জ্যান্ত হয়ে ওঠে থেকে থেকেই, ভীষণভাবে নাড়া দিয়ে যায় নীরার মনে ও মননে। এলোমেলো করে দিতে চায়। নীরা নিঃসন্তান নয়। চার বছরের ফুটফুটে দুষ্টু মিষ্টি ছেলেটাকে নিয়ে দিব্যি চলে যায় দিন। তবু, মাঝে মাঝে এ কোন যন্ত্রণা গিলে ফেলতে চায় তাকে! মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত করে দিতে চায় যেন! গতরাতের স্বপ্নটা আবার মনে পড়ে। স্বপ্নটা সে প্রায়ই দেখে আজকাল।

সে বসে আছে পুকুর পাড়ে। বিশাল বড় একটি পুকুর। পুকুরটার জল অনেক নিচে নেমে গেছে। খাড়া পাড় ঘেঁষে সারিসারি গাছ। গাছগুলো পুকুরের খাঁড়ির নিচ থেকে লাগানো তবু নীরার মোটেই অস্বাভাবিক লাগে না ব্যাপারটা।সে অবাক হয়ে দেখে সবগুলোই তেঁতুল গাছ এবং সবগুলো গাছ পত্রশূন্য। গাছগুলোতে থোকা থোকা তেঁতুল ঝুলে আছে। পাশে তার বাবা বসে কিছু একটা বলছেন তাকে, খেয়াল করে না সে, বরং অবাক হয়ে গাছে ঝুলে থাকা তেঁতুলগুলো দেখে। তার মাথার মধ্যে তখন তেঁতুল ছাড়া আর কিছু ঢোকে না।
পরের দৃশ্যটা আরও অদ্ভুত। সে বসে আছে তার ঘরে। সামনে একটি মেয়ে শিশু, পাঁচ ছ’বছর বয়স। মাথাভর্তি চুল আর বড় বড় চোখ নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মুখে হাসি নিয়ে নীরা তাকে খুব আদুরে ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করছে, তুমি কী খাবে?
মেয়েটি খুব স্বাভাবিক, আদুরে গলায় বলে, ইতল বিতল!
নীরা মোটেই অবাক হয় না! সে ধরেই নেয় মেয়েটি তেঁতুল খেতে চাইছে, এবং তেঁতুলকে ইতল বিতল বলা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার । সে খুশি মনে বাচ্চা মেয়েটিকে তেঁতুল দিতে যায়। সাথে সাথে ঘুম ভেঙ্গে যায় নীরার। বাচ্চাটির জন্য বুকের মধ্যে তীব্র একটা কষ্ট খোঁচা দেয় মুহূর্তেই। হাহাকার করে ওঠে মন। কে মেয়েটি, কী নাম, কী সে খেতে চাইছিল আসলে ইত্যাকার ভাবনায় অস্থির হয় সে।

দশ বছর আগে পরিবারের অমতে নিজের পছন্দে বিয়ে করেছিল নীরা। বেকার মিঠুর পক্ষে অসম্ভব নতুন অতিথিকে বরণ করা, যখন সে নিজেই নীরাসহ তার বোনের উপর নির্ভরশীল। ব্যাপারটা নীরা প্রথমে বুঝতেই পারে নি। নিজের ক্লাস, পরীক্ষা, মিঠু আর তার বোনের সংসারের টুকিটাকিতে ব্যস্ত সে তখন। মিঠুই মনে করিয়ে দেয়। একটু পরিবর্তনও কি ছিল শরীরে!
এক রাতের কথা মনে পড়ে। নীরার শরীর জুড়ে তখন রাজ্যের ক্লান্তি আর ঘুম। মাঝ রাতে মিঠুকে রীতিমত অত্যাচার মনে হয়। শরীরের উপর চেপে আসা মিঠুকে দুহাতে ধরে সে ঘুমের ঘোরেই ছুড়ে দেয় দূরে। মেঝেতে ছিটকে পড়ে ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে মিঠু, অশ্রাব্য ভাষায় খিস্তি করে। ঘুম টুটে অবাক হয়ে মিঠুর ঝাপসা অবয়বের দিকে আবছা চেয়ে থাকে নীরা। মাত্র তিন মাস বিয়ে হয়েছে তাদের! এতো বদলে গেলো মিঠু!
সকালে মিঠুই স্মরণ করিয়ে দেয়। তারপর বাসায়ই কুইক চেক আপ। ভূত দেখার মত চমকে ওঠে দুজনেই। নীরা তখনও অবস্থার গুরুত্ব আঁচ করতে পারে নি। বহমান জীবন যে তাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে চরমতম এক বাস্তবতার হা করা মুখের সামনে সেটা বোঝার আগেই নীরা ঢুকে পড়ে তার অন্তরতম প্রদেশে! মিঠুর বড়বোনের জেরার মুখে নীরা বুঝতে পারে তার শরীরে অন্য এক শরীর আবাস গেড়েছে, দুমাস পার হয়ে গেছে তার। নীরা বিস্মিত হয়। সে তো কই তেমন কোনো অসুবিধা বোধ করে নি! তার শুধু খুব ঘুম পায় ইদানিং, ক্লান্ত লাগে খুব।

পেইন্টিং: আসমা সুলতানা

মিঠু বাচ্চা চায় না, নীরার মধ্যে সংশয়। মিঠু বেকার, এখন পর্যন্ত নীরার দায়িত্বই নিতে পারে নি সে । এদিকে নীরার পড়াশুনা, ক্যারিয়ার! কী হবে এবার! মিঠুর বোন যারপর নাই ত্যক্ত, বিরক্ত। মিঠুর ঘরে বাচ্চা মানে তার ঝামেলা আরও বাড়া। সে নীরাকে বলে অ্যাবরশন করে নিতে। চমকে ওঠে নীরা! তার সন্তান! তার প্রথম সন্তান! কোনো কথা বলতে পারে না নীরা। নির্বাক, নতমুখে বসে থাকে। মিঠুর বোন বকে যায় । যেন সব দোষ নীরার একার।
নিজের পরিবারে জানানোর মুখ নাই নীরার। সে পথে তাই হাঁটে না আর। বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্বরত ডাক্তারের শরণাপন্ন হয় অগত্যা। খুঁটিয়ে দেখেন তিনি, তারপর বলেন- বাচ্চাটা রেখে দাও।
ও চায় না! -নতমুখে বলে নীরা।
তুমি চাইলেই ও চাইবে!- হেসে বলেন ডাক্তার নারীটি।
হায়! এতটা সহজ যদি হত হিসাবটা! নীরা চাইবে! কীভাবে! একটা শিশুকে পৃথিবীতে এনে তাকে কষ্ট দেয়ার অধিকার কি আছে তার? সে কী করে চাইবে তার বাচ্চা অন্যের গলগ্রহ হয়ে বেড়ে ওঠে!

প্রথম বাচ্চা অ্যাবোর্ট করলে পরবর্তীতে আর বাচ্চা নাও আসতে পারে, সতর্ক করে দেন ডাক্তার। নীরাকে অনুরোধ করেন বাচ্চাটা বাঁচাতে। নীরা একবার ভাবে, যা হয় হবে, সে কিছুতেই রাজী হবে না মিঠুর বোনের কথায়। সময় তো থেমে থাকে না। কোনো একভাবে ঠিক কেটে যাবে তার দিন। কিন্তু বাস্তবতা বড় রূঢ়। নিজের আত্মীয়স্বজন বয়কট করেছে তাকে। নিজেই পরগাছা হয়ে কাটাচ্ছে তার রংহীন বিমর্ষ দিন। সেখানে সে কীভাবে এই ঝুঁকি নিতে পারে! চোখে জল নিয়ে বাসায় ফেরে নীরা। মিঠুকে সব জানায়। নির্বিকার মিঠু অ্যাবোরশনের সিদ্ধান্তে অটল। এছাড়া আর করারও কিছু ছিল না সে মুহূর্তে তার, বোঝে নীরা। অ্যাবোরশনের জন্য প্রয়োজনীয় টাকাটাও ছিল না মিঠুর। তার বোনই টাকাটা দেয় অবশেষে। অতঃপর নীরবেই হত্যাকান্ডটি ঘটে যায়। শুধু নিজের জান্তব গোঙানির আওয়াজটা এখনও মাঝে মাঝেই কানে বাজে নীরার।

বাসায় এসে কাঁদে নীরা। তারপর চোখে জল নিয়ে মিঠুর দিকে তাকিয়ে বলে, তোমার বোন না হয়ে ওনি যদি আমার বোন হতেন কিংবা যদি হতেন আমার মা তাহলে কখনই আমার সাথে এরকম করতে পারতেন না মিঠু! কখনই না!
মিঠু কোনো কথা বলে না। বসে থাকে চুপচাপ। আগের রাতে সে একটি সাদা কাগজে লিখেছিল, ‘আমরা স্বেচ্ছায় আমাদের প্রথম সন্তান অ্যাবোর্ট করালাম’, নিজে স্বাক্ষর করে নিচে নীরার স্বাক্ষরও নিয়ে রাখে সে! কে জানে কেন! নীরা অসুস্থ শরীরে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে থাকে অনড়। ডেকে সাড়া না পেয়ে পা দিয়ে লাথি ঝাড়ে মিঠু! চমকে ওঠে নীরা। জীবন!
অ্যাবোরশনর অসহ্য ব্যথা দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে নীরা। নিয়ম মাফিক রান্নাটাও করে। যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে মাঝে মাঝে গুঙিয়ে ওঠে পশুর মত। তাকে একা রেখে মিঠু কোথায় বের হয়ে যায় কে জানে!

শেষ পর্যন্ত নিঃসন্তান জীবন অবশ্য কাটাতে হয় নি নীরার। মিঠুরও এখন আছে মোটা মাইনের চাকরি। শুধু নীরার চোখের সামনে থেকে কিছুতেই দৃশ্যটা মোছে না।
চোখ বুঁজলেই স্টীলের পাত্রে ভাসা ছোপ ছোপ রক্ত আর সেই নারীর মুখ! অসহ্য যন্ত্রণা ছড়ায় শরীরে ও মনে। কী চুপিসারে আর নির্বিকার চিত্তে সে হত্যাকান্ডটিতে অংশ নিয়েছে সেদিন! তবু কোথাও যেন বিঁধে থাকে কাঁটা! প্রতিনিয়ত খোঁচায়, অলক্ষ্যে চলে ক্ষরণ। স্বপ্নে দেখা মেয়েটির মুখ চোখের সামনে ভাসে। হাসিমুখে বড় বড় চোখে যে নীরার প্রশ্নের উত্তরে বলে, ইতল বিতল!
নীরার মাথার মধ্যে শব্দটা যেন প্রতিধ্বনি তোলে বারবার- ইতল বিতল ইতল বিতল ইতল বিতল ইতল… যেন কোনো ইন্দ্রপূরী থেকে ভেসে আসে শব্দটা আর তা ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে বিবশ করে দিতে থাকে তার সমগ্র চৈতন্য। মনে হতে থাকে ঐ একটাই শব্দ আছে জগতে যা ভীষণ জীবন্ত হয়ে তার চারপাশে ভেসে বেড়ায়, অনুরণিত হয় আর তাকে মোহাচ্ছন্ন করে তোলে! সে ঘোরে ডুবে যায়। অজান্তেই বিড়বিড় করে নীরা, ইতল বিতল ইতল বিতল ইতল বিতল ইতল…

শিল্পী নাজনীন: শিক্ষক, কথা‌চিত্রী। এ পর্যন্ত প্রকা‌শিত গ্রন্থ চার‌টি।’ছিন্নডানার ফ‌ড়িঙ’ প্রথম প্রকা‌শিত উপন্যাস, ‘আদম গন্দম ও অন্যান্য’ এবং ‘বিভ্রম’ না‌মে প্রকা‌শিত বইদু‌টি ছোটগ‌ল্পের। এছাড়া ‘‌তোতন ও ফ‌ড়িঙরাজা’ না‌মে এক‌টি শিশু‌তোষ গ‌ল্পের বই প্রকা‌শিত হ‌য়ে‌ছে।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments