একাত্তরের আতংকক্লিষ্ট কুমকুম অবশেষে চলেই গেল! -রণেশ মৈত্র

  •  
  •  
  •  
  •  

কুমকুম আমাদের দ্বিতীয় কন্যা। জন্মেছিল পাবনাতে ১৯৬৯ এর অগ্নিঝরা এক মুহূর্তে সেপ্টেম্বর মাসে। বড্ড ঠান্ডা মেয়েটি। সুমধুর গানের গলা। অনেক বড় হতে পারতো মেয়েটি। কিন্তু তার যাত্রা পথে বাঁধ সেধেছিল ১৯৭১ এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ।
হ্যাঁ ঐ প্রজন্মের সকল শিশুই একাত্তরের নৃশংস-বর্বরতার শিকার হয়েছিল কোন না কোনভাবে। কিন্তু সে ইতিহাস আজও লেখা হয় নি। সে ক্ষেত্রে বা সেই মূল্যবান ইতিহাস লিখতে হয়তো বা আমাদের অনাগ্রহ, গুরুত্ববোধহীনতা তথা চিন্তার এক ধরনের দৈন্যই সম্ভবত: কাজ করেছে। এটা আমার অনুমান তবে লিখিত হয়ে থাকলে আমার ধারণা নিঃসন্দেহে ভুল বলে প্রমাণিত হবে আর মেনে নেব আমার জানাশুনার দীনতা। মনে প্রাণে কামনা করি, এ ব্যাপারে আমার ধারণা যেন অসত্য বলেই প্রমাণিত হয়। আর শিশু সাহিত্যিকদেরকে অনুরোধ জানাব একাত্তরের অবরুদ্ধ বাংলাদেশে আতংকঘেরা দিনগুলোতে পাঁচ বছর পর্যন্ত বয়সী শিশুদেরকে নিয়ে আরও বেশী লিখতে।
তেমনি যে শিশুদের প্রাণ বাঁচাতে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন তাদের মা-বাবা, থেকেছেন আশ্রয় শিবিরগুলিতে তাদের নিয়েও লেখা প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলিতে তাদের জীবন নিয়ে। আমি এতদিনে উপলব্ধি করছি এমন ধরনের প্রকাশনার গুরুত্ব সম্পর্কে।
একাত্তর যখন  এলো কুমকুমের বয়স মাত্র ১৮ মাস-দেড় বছর। কুমকুম আক্ষরিক অর্থেই তখন মাতৃক্রোড়ে। সহধর্মিনী পূরবী তখন গৃহকত্রী শুধু তাই নন, পরিবারের সকলেরই অভিভাবকও। শুধু সন্তানদেরকে নিয়ে নয়, আমাকে নিয়েও সারা জীবনই ব্যস্ত, উদ্বিগ্ন থাকতে হয়েছে আমার সহধর্মীনিকে।
সমগ্র পূর্ব বাংলার মত একাত্তরের পঁচিশে মার্চ গভীর রাতে পাবনাতে ও পাক সেনারা এসে পৌঁছায় । রাত দশটা পর্য্যন্ত ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবীতে দৈনন্দিনমিছিল সমাবেশ শেষ করে রাত ১০ টার পরে বাসায় পৌঁছে কিছু খেয়ে ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়েছি।সারা শহরটাই ছিল নিদ্রামগ্ন আর নিদ্রিত নিশ্চুপ শহরে এসে পৌঁছাল ২০০ পাক সেনা। পাবনা বাসীর অজান্তে।

তখন ভোর হয় হয়। অসহযোগিতা আন্দোলন চলতে থাকায় প্রায় রোজ দিনই শহরের দোকান পাট বন্ধ থাকতো বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে। তাই একটি বন্ধ থাকা দোকানের দরজা ভেঙ্গে মাইক একটি রিকসায় বেঁধে প্রচার করলো সান্ধ্য আইন অনিদির্ষ্টি কালের জন্য জারী করার খবর। আইন অমান্যকারীদের গুলি করে হত্যা করা হবে একথাও বলল। শহর বাসী সকলকে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় আহ্বান জানান হলে ঘরের বাইরে না বেরোতে যতক্ষণ সান্ধ্য আইন বলবৎ থাকবে সেই পর্যন্ত। প্রচারণা চালায় শুধু শহরের প্রধান সড়কে শেষ করে সূর্যোদয়ের আগেই মানুষ ছিল তখনও নিদ্রাচ্ছন্ন। তাই সান্ধ্য আইন জারীর খবরটা প্রায় কেউই জানতেন না।
ভোরে সাইকেলে চড়ে বাসায় এলেন জেলা স্কুলের প্রধান আরবী শিক্ষক মওলানা কছিম উদ্দিন আহমেদ। আমরা তখনও ঘুমে। ডেকে তুললেন মওলানা সাহেব। বললেন, শীগগির সপরিবারে নিরাপদ কোন আশ্রয় চালে যাও। আর্মি এসেছে শহরে কারফিউ জারী করেছে। যাকে রাস্তায় পাচ্ছে তাকেই গ্রেফতার করছে। বলেই তিনি সাইকেলে চড়তে নিলে বললাম, একটু বসুন, এক পেয়ালা চা খেয়ে যাবেন।
থামলেন না মওলানা সাহেব। বললেন ক্যাপ্টেন মনসুর সহ নেতাদের বাড়ীতে যাব খবরটা পৌঁছাতে হবে তো। বলেই দৌড়। খবর পৌঁছালেন আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ নেতাদেরকে নেতৃস্থানীয় ছাত্র নেতাদেরকে।
নিকটস্থ পূরবীর বান্ধবীর বাসায় এক কাপড়ে সপরিবারে গিয়ে উঠলাম। ছাত্ররা এসে বললো, এখানেই থাকবেন আমরা ছুটছি অস্ত্র সংগ্রহের কাজে। যেন প্রত্যেকেই স্বত:ফূর্ত উদ্যোগে কাজে নেমে পড়েছে। বেশী পরিচিত তাই আর্মির টার্গেট হতে পারি ভেবে কেউই বাইরে বেরুতে দেয়নি। সেদিন ছিল ২৬ মার্চ।
সকাল থেকে আকাশ বানীতে গাওয়া হচ্ছে “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি” আর মাঝে মাঝে বুলেটিন, পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ঢাকায় গতরাতে গণহত্যা চালিয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তার ছাত্রাবাসগুলি, পুলিশ-ই.পি.আর বাহিনীর হেড কায়ার্টাগুলিতে ব্যাপক গোলাগুলি। অসংখ্য মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে।ঢাকার কারফিউ তাই তাই তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

যাক। এভাবেই গৌরবের ইতিহাস শুরু। ২৬ মার্চ দিনভর ছাত্রলীগ ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরা চুপে চুপে অস্ত্র সংগ্রহ করলো দিনভর বাড়ী বাড়ী ঘুরে। গঠিত হলো প্রতিরোধ যুদ্ধ চালানোর লক্ষ্যে জেলা হাইকম্যান্ড আওয়ামী লীগ ন্যাপ ও শীর্ষ ছাত্র নেতাদের নিয়ে। তৎকালীন জেলা প্রশাসক নূরুল কাদেরও থাকলেন হাই কমান্ডের এক গুরুত্বপূর্ণ কাজে।
২৭ মার্চ সন্ধ্যায় আক্রান্ত হলো পুলিশ লাইন-পুলিশের অস্ত্রাগার দখলে নেওয়া এবং অসহযোগ আন্দোলনরত পুলিশকে আত্মসমর্পনে বাধ্য করতে। কিন্তু এই অভিযানের খবর গোপনে অগ্রিম পেয়ে পুলিশ লাইনের চারিদিককার দালান কোঠার ছাদে অস্ত্রধারী তরুণেরা, পুলিশ ও আনসার অস্ত্র তাক করে শুয়ে ছিল। ট্রাকে করে সন্ধ্যায় পাক-বাহিনী পুলিশ লাইনের নিকটে আসতেই প্রতিরোধ যোদ্ধরা পাক-বাহিনীকে তাক করে ব্যাপক গুলিবর্ষণ করলে আর্মি ট্রাকসহ পালিয়ে যায় কিন্তু পুলিশ লাইনের চাটাই এর বেরা ঝাঁঝরা হয়ে যায়।
তবু বিজয় ছিলো ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় পাবনার জনগণের।

মালবিকা ভট্টাচার্য কুমকুম

পরদিন ২৮ মার্চ সকাল।
ভোর থেকে সশস্ত্র জনতা প্রতিরোধ স্পৃহায় পুরাতন টেলিফোন ভবনটির চার পাশের দালানগুলির ছাদে অস্ত্র সজ্জিত হয়ে আক্রমণ করে ঐ ভবনের অভ্যন্তরে টেলিফোন ভবনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আধুনিক অস্ত্র সজ্জিত ২৮ জন পাক-সেনাকে। তারা দরজা-জানালা বন্ধ করে পুরাতন দালানের ফাঁক ফোঁকড় দিয়ে অবিশ্রান্ত গুলি ছুঁড়তে থাকে লক্ষ্য হীনভাবে। এক পর্য্যায়ে তাদের গুলি শেষ। টের পেল প্রতিরোধ সেনারা । সবাই মিলে দরজার জানালা ভেঙ্গে ঢুকে দেখলো ২৮ টি মৃত দেহ। সবগুলিকে টেনে বাইরেরর ছোট্ট মাঠটিতে শুইয়ে রাখলো। খবর ছুটলো তীব্র বেগে আরও একটি বিজয়ের। মানুষ ছুটে এসে ২৮ টি দেহ দেখে সে কী উল্লাস।
পরদিন ২৯ মার্চ এবার জনতার আক্রমণ আর্মির অস্থাীয় হেডকোয়ার্টার পানি উন্নয়ন বোর্ডের দালানগুলিতে। অকস্মাৎ সকাল নয়টার দিকে পাবনার আকাশে একটি বিমান উড়তে দেখা গিলো। বিমান থেকে সমানে জলবার দিকে গোলাগুলি বর্ষণ। অপরদিকে নাটোর থেকে ভেতরের পথ দিয়ে ৭টি ট্রাক সাদা পতাকা ঝুলিয়ে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিতে দিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দালানগুলির সামনে দাঁড়ালে ভেতর থেকে জীবিত সমস্ত সেনা-সদস্য রাইফেল সহ ট্রাকে উঠে দে দৌড়।
এর আগে ট্রাকগুলি সাদা পতাকা উড়িয়ে জয়বাংলা শ্লোগান দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে এলেও ফিরতি পথে নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয় ট্রাকগুলিকে। গাছ কেটে রাস্তায় ফেলে বহু জায়গায় অবরোধ সৃষ্টি করে গতি থামিয়ে আড়াল থেকে গোলগুলি চালিয়ে সেনা নিধন শুরু করা হয়। এভাবে চলতে চলতে বহরটি যখন নাটোরে গোপালপুর পৌঁছালো সব পাক-সেনা শেষ। একই ভাবে পাবনার আরও দু তিনটি জায়গায় অবস্থান নেওয়া সেনারাও খতম।
তাই ২৯ মার্চ পাবনা মুক্ত হলো বিজয় হলো পাবনার বীর প্রতিরোধ যোদ্ধাদের-পাবনার মানুষের।
এবারে হাই কমান্ড বৈঠক করে পাবনা সকলকে শহর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে গ্রামে চলে যেতে বললেন, যুব সমাজকে গ্রামে-গঞ্জে সর্বত্র অস্ত্র প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলো এবং পাবনার আওয়ামীলীগ নেতা প্রয়াত এডভোকেট আমজাদ হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে আমাকে (তখন আমি জেলা ন্যাপের যুগ্ম সম্পাদক) কলকাতা পাঠানো হলো ভারত সরকারের সাথে যোগাযোগ করে ভারত থেকে অস্ত্র প্রশিক্ষক এবং বেশ কিছু ভারী অস্ত্র সংগ্রহ করে আনতে। আমরা রওনা হলাম ৩১ মার্চ।
নিরাপত্তার স্বার্থে পরিবার পরিজন সহ কাউকেই বলা গেল না কোথায়, কেন কতদিনের জন্য যাচ্ছি। শহর থেকে ৬ মাইল দূরে ভাউডাঙ্গার এক জোতদার বাড়ীতে পূরবী, কুমকুম ও আরও তিন সন্তানকে রেখে চলে গেলাম পশ্চিম বাংলায়।
সেই যে বিচ্ছেদ হলো পূরবী, কুমকুম, কাজল, প্রবীর, প্রলয় আর কেউ জানতে পারলাম না কে কোথায় আছি, কেমন আছি কবে পরস্পরের সাথে দেখা সাক্ষাত হবে।
শুধুমাত্র ভরসা ছিল আমার সেজো ভাই ব্রজেশ ও আমার আমার সেজো শালিকা গৌরী উভয়েই বরাবর পূরবীদের সঙ্গে থেকেছে, কষ্টের ভাগ তারাও নিয়েছে এবং এক সাথেই সবাই পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি দিয়েছে জুলাই মাসে।

অবরুদ্ধ বাংলাদেশ। পূরবীর কোলে শিশু কুমকুম অন্য তিনজনও শৈশবে-কৈশোরে। টাকা পয়সা তো দূরের কথা বাড়তি কাপড়-চোপড়ও নেই। আজ এ গ্রাম কাল সে গ্রামে প্রাণ বাঁচাতে পূরবী সন্তানদেরকে নিয়ে ছুটছে তো ছুটছেই। সর্বত্রই নগ্নপদে যাত্রা চুলে তেল নেই, গায়ে সাবান নেই, রাতে ঘুম নেই-সে এক ভয়াবহ অনিশ্চিত জীবন।
হাতে একটি ট্রানজিষ্টার রেডিও ছিল। তা থেকেই চুপি চুপি আকশবানী ও বি.বি.সির খবর শুনে ক্ষণে ক্ষণে আশার সঞ্চার হলেও জীবনের অনিশ্চিত যাত্রার শেষ কোথায় হবে কি ভাবে হতে সে প্রশ্নের কোন উত্তর মিলত না।
১০ এপ্রিল দ্বিতীয়বার পাবনার পতন হলো। নগরবাড়ী ঘাট থেকে আধুনিক মারনাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পাক-বাহিনীর এক বিশাল বহর প্রতিশোধ স্পৃহায় উন্মাদের মত নগরবাড়ী পাবনা সড়কের উভয় পাশে দাউ দাউ আগুন জ্বালিয়ে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে পাবনা শহরে শহরে প্রবেশ করল দিবাভাগে। জনমানবহীন পাবনা শহর-সামান্যতম প্রতিরোধও তাৎক্ষণিকভাবে সংগঠিত করা গেল না।
ওদিকে আমরা কলকাতা পৌঁছে আশ্রয় নেই আমার (খুড়াতাত) মেজদা পরিমল মৈত্রের কালীঘাটের বাসায়। দুজনের কারও হাতেই তো টাকা পয়সা ছিল না। হাই কমান্ডের পক্ষ থেকে আমরা রওনা হওয়ার আগে একটি পঞ্চাশ টাকা নোট দেওয়া হয় শুধু। তার একটি অংশ রাস্তাতে খরচ হয়েছে খাবার বাবদ। বাস-ট্রেনের কোন ভাড়া দিতে হয় নি। আমরা জয় বাংলার লোক বললেই বাস ও ট্রেন ফ্রি করে দেওয়া হয়েছিল।
চেষ্টা চরিত্র করে আমরা পশ্চিম বাংলার কমিউনিষ্ট পার্টি সমর্থিত বাংলা কংগ্রেস সরকারের মূখ্য মন্ত্রী অজয় মুখার্জির সাথে দেখা করলে তিনি বিষয়টি কেন্দ্রীয় রকারের এবং প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী স্বয়ং এই ব্যাপারটি ডিল করছে বলে জানালেন। তবে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার উভয়েই আপনাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। এখন আমাকে দু’তিন দিন সময় দিন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করে জানাব।
যা হোক ইতিমধ্যে ১০ এপ্রিল পাবনার দ্বিতীয় দফা পতন ঘটে যাওয়ায় আর পাবনা ফেরা সম্ভব হলো না। নদীয়ার করিমপুরে ন্যাপ সিপিবি ছাত্র ইউনিয়নের পাবনা জেলার কর্মীদের রিক্রুটিং ক্যাম্প খোলা হলো-রিক্রুটি করে ভারতীয় সেনাদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষণ শেষে অবরুদ্ধ বাংলাদেশে পাক-বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করার জন্য দেশের ভিতরে পাঠানো ছিল ক্যাম্পের তথা আমার দায়িত্ব। এ দায়িত্ব নয়মাস ধরেই আমাকে পালন করতে হয়েছে।

কিন্তু কোথায় পূরবী? কোথায় শিশু সন্তানেরা? ভাই-বোনেরাই বা কে কোথায় তা জানাই যাচ্ছিল না হাজারো চেষ্টা করা সত্বেও।
মে-জুনও চলে গেল। কোন খবর নেই। লোক পেলেই দায়িত্ব দিয়ে দেশে পাঠাই তাদেরকে নিয়ে আসতে বা তা যদি আদৗ সম্ভব না হয় তবে খবর সঠিকভাবে সংগ্রহ করে আনতে। কিন্তু যেসব সম্ভাব্য জায়গায় তাদের সাথে দেখা হতে পারে সে সব এলাকা ঘুরে এসে খবর দেয় -“কোন সন্ধ্যান পাওয়া গেল না”।
করিমপুর থেকে পাঁচ মাইল দুরে কেচুয়াডাঙ্গায় ছিল পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের রিক্রুটিং ক্যাম্প বা যুবশিবির। এটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন প্রয়াত সাংসদ আহমেদ তফিজ উদ্দিন। তাঁরও বিষয়টি জানা থাকায় তিনিও চেষ্টা করছিলেন আমার পরিবারেরখবর আনার তাদেরকে নিয়ে আসারব জন্যে। কিন্তু তিনিও কোন সন্ধ্যান পাচ্ছিলেন না।
দেশের অভ্যন্তরে ব্যাপক অগ্নি সংযোগ, গণহত্যা, অপহরণ-ধর্ষণ ক্রমশ বাড়ছে বলে উদ্বেগজনক খবর আসছে অনেক দিন থেকেই। হঠাৎ আকশবাণী খবর দিলো পাবনার সুজানগর থানার সাতবাড়িয়া ও পাশ্ববর্তী গ্রামগুলি পাক-বাহিনী জ্বালিয়ে দিয়েছে-ভয়াবহ গণহত্যা চালিরয় সহ¯্রাধিক মানুষকে হত্যা করেছে। তাদের প্রধান টার্গেট ছিল হিন্দুরা এবং মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের আশ্রয় দাতারা ।
সুনির্দিষ্ট খবর না পেলেও আমার পরিবার পরিবার নিয়ে থাকতে পারে অনুমান করে ধরেই নিতে হলো আর হয়তো পরিবারের কারও সাথে দেখা হবে না কেউই হয়তো আর জীবিত নেই।
অপরদিকে পূরবী ও সন্তানেরাও ধরে নিয়ে ছিলো আমিও হয়তো বেঁচেনেই থাকলে নিশ্চয়ই কোন না ভাবে তারা জানতে পারত। উভয় পক্ষের এমন তরো উদ্বেগের মধ্যে হঠাৎ করে একদিন (জুলাই-এ) দুপুরে দেখি সন্তানদের সমেত পূরবী করিমপুর ক্যাম্পে এসে উপস্থিত। কেউই যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
পূরবীর পরণে ময়লা একটি সাধারণ শাড়ী ও ব্লাউজ, মাথায় তেল নেই, সন্তানরা সহ সবাই দিনের পর দিন হাঁটতে হাঁটতে আজ এ গ্রামে কাল সে গ্রামে রাত কাটিয়ে প্রায় ১৫ দিন ধরে হাঁটার পর সীমান্ত পার হয়ে জানতে পারে কেচুয়াডাঙ্গার খবর। সেখানে যেতেই সকলে চিনে ফেলে ও  সবার চেহারা দেখে আরও উদ্বেগ প্রকাশ করে। একজন বলে ফেলেন “রণেশ দা করিমপুর ক্যাম্পে আছেন। মাঝে মঝে এখানে আসেন আমরাও কেউ কেউ যাই তাঁর ওখানে”।
এ খবর শুনে যেন চাঁদ হাতে পাওয়ার মত। পূরবীর অনুরোধে ক্যাম্প থেকে একজন  কর্মী তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে করিমপুর পৌঁছাল।
কোলে মেয়ে কুমকুম। তাকে বিধ্বস্ত মনে হচ্ছিলো। দ্রুত তাকে কোলে নিয়ে পার্শ্ববর্তী এক বাড়ী থেকে গরুর দুধ এনে খাওয়ানো হলো। কত দিন যে ওর পেটে দুধ জোটেনি তার ইয়ত্তা নেই।
প্রতিবেশীরা সবাই মুসলিম প্রথমে সবাই ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী। রোজ সন্ধ্যায় তাঁরা আসতেন রেডিওতে খবর শুনতে। ক্যাম্পে একটি পকেট রেডিওতে খবর শুনতে। ক্যাম্পে একটি পকেট রেডিও ছিল। আকশবাণী ও বিবিসির খবর শুনতে শুনতে ও বাংলাদেশের অভ্যন্তর থেকে আসা শরণার্থীদের কাছ  থেকে খবরাদি শুনে তাঁরা হয়ে পড়লেন মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক। এতটাই যে ক্যাম্পে কোন জিনিষের ঘাটতি দেখলে নিজ নিজ বাড়ী থেকে লাউ, কুমড়া, আলু বা কোন কোন দিন যথেষ্ট পরিমাণে মাছও এনে দিতেন।
তাঁদেরই একজন পূরবী ও সকলকে তাঁর বাড়ীতে নিয়ে গেলেন। ওখানে রাতের আহার শেষ করে দীর্ঘদিন পর নিরাপদ জীবনের ও সকলে মিলিত হওয়ার আনন্দে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে। বিকেলে গেলাম দেখতে। ঘুম থেকে উঠতেই  বাড়ীর গৃহিনী চা-নাস্তা দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। এর পর পূরবীকে সঙ্গে নিয়ে এলাম ক্যাম্পে। সবাই মিলে শুনলাম ভেতরের পরিস্থিতি এবং পরিবারের সকলে কিভাবে দিনগুলি কাটাতো সেই খবর।
খবর হলো, ভাউডাঙ্গার যে বাড়ীতে মার্চের শেষে রেখে এসেছিলাম সেবাড়ী শত্রুদের টার্গেট হয়ে পড়ায় ওখানে আমার পরিবার সহ কয়েকশ আশ্রয় গ্রহণকারীদের পালাতে হয়। ১০ এপ্রিল পাবনার দ্বিতীয় দফা পতনের পর গোটা জেলাই পাক বাহিনীর টার্গেটে পরিণত হয়। সেই সুবাদে ভাউডাঙ্গার ঐ বাড়ীটিও । কারণ ওখানে শহরের লোকদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। শুধু তা-ই নয় ভাত-মাছবা রুট তরকারী প্রতিদিন রান্না করে শহরে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে যে পাঠানো হতো তাও শত্রুপক্ষ জেনে গিয়েছিল।ফলে পুরো গ্রামটিই টার্গেট।
পূরবীর দুশ্চিন্তা আরও বেশী।আমার পরিচয়কাউকে দিতে পারছেনা কারণ তা জানলে কেউ তাদেরকে আশ্রয় দিতে সাহস পাবেন না। তাই ঐ গ্রাম ছেড়ে হাঁটতে কখনও এ গ্রামে কখনও সে গ্রামে খেয়ে না খেয়ে রাত কাটিয়ে অবশেষে নিজ বোন কুটিদের নাজিরগঞ্জস্থ বাড়ীতে গিয়ে উঠতে হলো। বাড়ীটি পদ্মার তীর ঘেঁষে এবং মজবুত ধরণের। ভগ্নিপতি বিমল ত্রিবেদী ছিলেন ন্যাপের বিশিষ্ট একজন স্থানীয় নেতা।
ইতোমধ্যে ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা দেশে ঢুকতে শুরু করলে পূরবী, কুটি তাদের রান্না করে খাওয়ানোর দায়িত্ব পালন করেন বেশ অনেকদিন ধরে। ওদিকে দ্রুত সর্বত্র শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনী গঠিত হচ্ছিল পাক-বাহিনীর সহায়ক বাহিনী হিসেবে। তাদের অত্যাচারও তীব্র হয়ে উঠতে থাকে। এক পর্য্যায়ে ঐ গ্রামও ছাড়তে হয়।
যা হোক সাতবাড়িয়া গণহত্যার কয়েকদিন আগে থেকে শিশু সন্তানদের নিয়ে পূরবী সাতবাড়িয়াকলেজের তৎকালীন এক অধ্যাপকের বাসায় আশ্রয় নেন। হঠাৎঐ ভয়াবহ দিনটি এসে গেল। পূরবী কুমকুমকে কোলে নিয়ে বাড়ীর আঁচল দিয়ে ঢেকে হাতদিয়ে ওর মুখ বন্ধ করে (যাতে কোনক্রমেই কুমকুম হাসতে, কাঁদতে, চীৎকার করতে বা কোন প্রকার শব্দ না করতে পারে সেজন্যে) তার মুখ চেপে ধরে বাড়ীর পেছনে দিকে এক ঝোপের মধ্যে গিয়ে আশ্রয় নেন যাতে কেউ দেখতে না পায়। এদিকে দিনভর পাক-বাহিনীর গুলি, অগ্নিসংযোগ, টাটা শব্দ, মানুষের আর্ত চীৎকার শুনতে শুনতে কুমকুম আতংকে, অনাহারে বিবর্ণ হয়ে পড়ে। সন্ধ্যায় বৃষ্টি নামলে সৈন্যরা পালিয়ে যায়। সকলে ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসে। কিন্তু শীঘ্রই তো আবারও শত্রুা হানা দিতে পারে এমন আশংকা থেকে সাতবাড়িয়া থেকেও অজানা উদ্দেশ্যে আবার পাথ যাত্রা শুরু হলো।
এবারে পদ্মাপার হয়ে গোয়ালন্দের নিকটে এক গ্রামের শাজাহান নামে এক মুক্তিযুদ্ধের কর্মীকে সাথে নিয়ে সীমান্তপার হন।
দেশ শত্রু মুক্ত হলে আমরা ফিরে এলেও কুমকুম খুব একটা স্বাভাবিক হতে পারেনি শারীরিকভাবে দীর্ঘদিন যাবত। পূরবী তার স্কুলের শিক্ষারবাইরে শিক্ষক রেখে কুমকুমের গান শেখার ব্যবস্থা করেন। চমৎকার গলা ছিলকুমকুমের তবে মাঝে মাঝে ওর স্মৃতি শক্তি লোপ পেত। অন্য অসুখের চিকিৎসা হলেও স্মৃতিশক্তির ব্যাপারে কিছু করা হয়নি কারণ স্থায়ীভাবে ওর স্মৃতিশক্তি লোপ পেত না। অন্য কোন বড়অসুখ ধরা না পড়লেও পরিপূর্ণসুস্থ জীবনের সন্ধান সে পায়নি।
বিয়ে দেওয়া হলো কুমকুমের। আমাদের জামাতা গৌতম ভট্টাচার্য্য কুষ্টিয়ার সন্তান। সৎ, পরিশ্রমী, দায়িত্বশীল। পরবর্তীতে দেখতাম ওরা দু’জনে পরস্পর পরস্পরকে ভালোও বাসতো খুব।
দীর্ঘদিন পরে কুমকুম মাতৃত্বের সন্ধান পেলো। তখন গৌতম ও কুমকুম অষ্ট্রেলিয়ার সিডনীতে আমাদের জ্যেষ্ঠ সন্তান প্রবীরের তত্ত্বাবধানে থাকাকালে সিডনীর বিখ্যাত ওয়েষ্টমীড হাসপাতালে ওদের একমাত্র সন্তান জয়ীতার জন্ম হয় ২০০৭ সালের ৮ জুন। স্বভাবত:ই মেয়েটি খুবই আদর যত্নে বড় হচ্ছিল।
কিন্তু সম্ভবত: ২০১৪ সাল থেকে নানাবিধ জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে কুমকুম। তখন তারা ঢাকার বাসায়। গৌতম ঢাকাতে চাকুরী করে সেই সুবাদে। জয়ীতা একটু বড় হলে ওকে ভাল একটি স্কুলে ভর্তি করে দিলে রিকসায় করে মেয়েটিকে নিয়ে কুমকুম স্কুলে পৌঁছে দিয়ে বিকেল পর্য্যন্ত ওখানেই অপেক্ষা করে মেয়েটিকে সাথে নিয়ে বাসায় ফিরত।
এর ব্যতিক্রম হলো কুমকুম দফায় দফায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাসপাতাল, স্কয়ার হাসপাতাল, গ্রীন লাইফ হাসপাতাল এগুলিই হয়ে ওঠে কুমকুমের দ্বিতীয় আবাসস্থল।
বিপুল ব্যয় সাধ্য ছিল কুমকুমের চিকিৎসা। প্রবীর, প্রলয়, গৌতম, মধুমিতা,আমরা, বীথি (সাবেক মন্ত্রী নাসিমের স্ত্রী) এবং আরও অনেক শুভানুধ্যায়ীর মিলিত প্রচেষ্টায় উচ্চমানের চিকিৎসা শেষে বাসায় ফিরেআসে শেষবারের মত ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে । চলতে থাকে প্রতিদিন ফিজিওথেরাপি কারণ হাঁটা চলার শক্তি পাচ্ছিল না-পারছিল না কারণ কুমকুম হাটাচলা শক্তি পাচ্ছিল না ব্যালান্স রাখতেও। ।
কিন্তু রবীন্দ্র সঙ্গীতপ্রেমী কুমকুম একদিন বিকেলে একা একাই একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে উঠলো। আমরা আড়ালে থেকে শুনলাম। শেষ হলে ওর সামনে গিয়ে চমৎকার গাওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে আর একটি গাইতে বললে বলে উঠলো, আমার খুব গাইতে ইচ্ছে করে কিন্তু সব সময় সব মনে পড়ে না। বলে আরও একটা গাইলো। স্মৃতিশক্তি দেখে আমরা অবাক, বই বা খাতা সামনে নিয়ে নয় আপন মনেই গাইলো। মাঝে মাঝেই গাইতো আমরা অনেকেই শুনতাম।
বেশ খানিকটা সুস্থ হলে গত মার্চে আমরা পাবনা ফিরে এলাম।
হঠাৎ ২৪ জুন শুনি কুমকুমের অবস্থা ভাল না। ২৫ জুন ঢাকা রওনা হলাম উদ্বিগ্ন চিত্তে। সন্ধ্যায় পৌঁছে জানলাম কুমকুম নেই আর ও গাইবে না।
সকলকে ভালোবাসার, শ্রদ্ধা-সম্মান করার অসাধারণ নজির ছিল কুমকুম (মালবিকা ভট্টাচার্য্য)। কুমকুমকে কি ভুলতে পারবো আদৌ?

রণেশ মৈত্র: 
সাংবাদিক,কলামিস্ট,সাংবাদিকতায় একুশে পদক প্রাপ্ত। 
Email:raneshamitra@gmail.com