একালের সমাবর্তন-শিমুল শিকদার

2203
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নোবেল বিজয়ী দুইজন মানুষকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিলো আমার। পদার্থবিজ্ঞানী প্রফেসর আব্দুস সালাম এবং অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন সেই সমাবর্তন অনুষ্ঠানে অথিতি হয়ে এসেছিলেন। প্রফেসর আব্দুস সালাম বক্তৃতা দেবেন; পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে বসে আছি। হুইল চেয়ারে বসা বিজ্ঞানী কোয়ান্টাম মেকানিক্সের উপর দীর্ঘ এক বক্তৃতা দিলেন। মনে হলো, সভার উপর দিয়ে এক ঝড় বয়ে গেছে। তিনি কি যে বললেন, কিছুই বুঝলাম না। বুঝিনি তাতে কি, এমন একজন বিজ্ঞানীর সামনে বসে কথা শোনার মধ্যেও আনন্দ ছিলো। হুইল চেয়ারে বসা প্রফেসর আব্দুস সালামকে একটু ছুঁয়ে দেখেছিলাম সেদিন। সে ছোঁয়ার শিহরণ যে আজ এতকাল পরে এসে এখনো শেষ হয়ে যায় নি, সে কথা বলতে পারি।
এরপর অন্য একটি সমাবর্তন অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এসেছিলেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। অর্থনীতি নিয়ে দীর্ঘ এক বক্তৃতায় তাঁর কিছু কিছু কথা এখনো মনে আছে আমার। একটা কথা ভীষণভাবে মনে গেঁথে গিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, কোন দেশের মানুষের মনুষ্যত্বের উন্নয়ন না হলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন দেশের অগ্রগতিতে খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারে না।
এখন সময় বদলেছে। দেশে নোবেলবিজয়ী গুণীদের আর কদর নেই। সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে সুলায়মান সুখন, সালমান মুক্তাদিররা। এসব ফেসবুক, ইউটিউবাররা এখন ছাত্রছাত্রীদের অনুপ্রেরণা, পথ প্রদর্শক। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এখন নোবেলবিজয়ীদের স্থানে এদের ভাড়া করে নিয়ে আসে। তাদের উৎসাহমূলক বক্তৃতায় নবীন ছাত্রছাত্রীরা পথের দিশা খুঁজে পায়। তারা হাত পা নেড়ে বক্তৃতা করে বুঝায়, জীবনের আসল উদ্দেশ্য ফেসবুক, ইউটিউবে লাইক বাড়ানো, সাবস্ক্রাইবার জোগানো। এখনতো যার যতো লাইক, জীবনে সে তত সফল।
আমাদের চ্যান্সেলর সৎ, সহজ সরল মানুষ। তিনি অকপটে স্বীকার করেন, যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার যোগ্যতা তার হয়ে ওঠেনি, তিনি আজ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর। সরলভাবেই সমাবর্তনের মতো উৎসবে চ্যান্সেলররা প্রিয়াঙ্কা চোপড়াদের নিয়ে রসাত্মক কৌতুক বলেন। চান্সেলরের কথায় ছাত্রছাত্রীরা খুশিতে হাত তালি দিয়ে ওঠে। কৌতুক বলা দোষের কিছু না। কিন্তু সমাবর্তন উৎসব হলো স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালযের দীর্ঘ শিক্ষা শেষে কর্মজীবনে  প্রবেশের সন্ধিক্ষণ। এ সময় একজন ছাত্র অথবা ছাত্রী কিছুটা দ্বিধান্বিত, কিছুটা ভীত, মানসিকভাবে কিছুটা দিশেহারা থাকে। তারা ভেবে পায় না, এখন তারা কোথায় যাবে, কি করবে, কেমন হবে পরবর্তী জীবন। এ সময়ে গুরুজনেরা তাদের কি নির্দেশনা দিচ্ছেন, তারা সেদিকে কান খাড়া করে রাখে। শিক্ষকদের শেষ উপদেশ মাথায় নিয়ে তারা শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটায়। সমাবর্তন উৎসবের প্রতিটি ভাষণে ছাত্রছাত্রীদের জন্য দিক নির্দেশনা থাকে। এই ভাষণ ছাত্রছাত্রীদের জন্য মহানবীর দেয়া সেই বিদায়ী হজ্বের ভাষণের মতো। এটা শিক্ষকদের পক্ষ থেকে ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে শেষ ভাষণ। এখানে পরবর্তী জীবনের গাইডলাইন থাকে।
ডিজিটাল যুগ এখন। গভীরতা হারিয়ে গেছে সবকিছু থেকেই। প্রফেসর আব্দুস সালাম, অর্মত্য সেনের বক্তৃতা শুনতে কান খাড়া করে রেখেছিলাম কি কথা বাদ পড়ে যায় এই ভয়ে। একালের বক্তৃতায় আর কান খাড়া করতে হয় না। সে কথা ট্রল হয়ে এমনিতেই কানে আসে। তাতে প্রচুর হাততালি পড়ে। আমাদের সমাজ এখন আর প্রফেসর আব্দুস সালাম, অর্মত্য সেনদের শোনার মতো শ্রোতা সৃষ্টি করে না। সৃষ্টি করে হিরো আলম, সেফুদাদের শ্রোতা। বদিরা এখন তাই এমপি হয়। হিরো আলমরা এমপি হওয়ার স্বপ্ন দেখে। অমর্ত্য সেনের সেই কথাটাই শুধু মনে পড়ে, যে সমাজ মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটাতে পারে না, সে সমাজের অর্থনৈতিক উন্নয়ন দেশের তেমন কাজে আসে না।
শিমুল শিকদার
গল্পকার, নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।