একুশে পদক, দর কদর মরণোত্তর -ফাহাদ আসমার

  •  
  •  
  •  
  •  

 223 views


বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব ‘একুশে পদক’, যা প্রতিবছর ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, শিপ্লকলা, ভাষা ও সাহিত্য, গবেষণা, সমাজসেবা এরকম নানা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য দেয়া হয়ে থাকে। ১৯৭৬ সালে প্রথম বছর নয় জনকে এ পদক প্রদান করা হয়েছিল। সে তালিকায় ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম, সুফিয়া কামাল, জসীমউদ্দীন, আবদুল কাদির, কুদরত-এ-খুদা এবং তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া’র মত নাম। গত তিন বছর ধরে সংখ্যাটা একুশ জনে এসে ঠেকেছে। এবছরও বিশজন ব্যক্তি এবং একটি প্রতিষ্ঠান, সাকুল্যে একুশ জনকে দেয়া হয়েছে এই পদক। কারা পেয়েছেন যদি না জেনে থাকেন তাহলে দেখে নিতে পারেন নামগুলো। সবাই সন্মানিত সে ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ নেই। আপনি আমি আমরা আসলে এদের মধ্যে ঠিক কতজনকে চিনি বা এদের অবদান কতটুকু জানি, কিংবা অদৌ জেনে আলোকিত হবার কোন সুযোগ আছে কিনা সে প্রশ্নটা যদি চলেই আসে আপনার মনে বিচলিত হবার কিছু নেই, আপনি একা নন।

সম্ভবত ১৩ বছর আগে বাংলালিংক মোবাইল অপারেটর একটি বিজ্ঞাপন বানিয়েছিল পপ সম্রাট আযম খান’কে নিয়ে, সাথে কথক হিসেবে ছিলেন বাংলা রক সংগীতের আরেক কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চু। সে সময়ে ভীষণভাবে জনপ্রিয় এই বিজ্ঞাপনের কথাগুলো ছিল এমন; “উনি একজন সাদামাটা লোক, ভীষণ সাদামাটা। সাধারণ তাঁর জীবনযাত্রা, অতি সাধারণ। উনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন জনক, এক নতুন ধারার সংগীতের জনক। একাত্তরে ওনার বন্দুক বেজেছিল গিটারের মত, আর তারপর ওনার গিটার বেজেছে বন্দুকের মত। উনি আমাদের আজম খান, গুরু তোমায় সালাম। এমন সন্তানের জন্ম দিয়েছো মা, তোমায় সালাম”। আজ এই অদ্ভুত বন্ধ্যা সময়ে এই দুই কিংবদন্তি নেই আর আমাদের মাঝে। আজম খান’কে বাংলা পপ সম্রাট বলা হয় তর্কহীন, জনক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় বিশেষ ধারার এই সংগীতের। তিনি শুধু ২ নম্বর সেক্টরে খালেদ মোশাররফের অধীন সক্রিয় মুক্তিযুদ্ধই করেননি, উনসত্তরের গণ অভ্যুথহান তিনি ছিলেন রাজপথে। অথচ এই আজম খান শেষ জীবনে ধুঁকে ধুঁকে মরেছেন অতি সাধারণভাবে, সারাটা জীবন তিনি আসলে তাই ছিলেন, সাদামাটা একজন মাটির মানুষ। তাঁর ত্যাগ, সাধনা অবদানকে আমরা কি স্বীকৃতি দেইনি? হ্যাঁ, অবশ্যই দিয়েছি, দেশের আপামর সাধারণ মানুষ তাঁকে ঠাই দিয়েছেন হৃদয়ের মণিকোঠায়। আর রাষ্ট্র? না রাষ্ট্রের এত সময় নেই, তবুও গতবছর তিনি পেয়েছেন মরণোত্তর ‘একুশে পদক’। যে দেশকে স্বাধীন করতে অস্ত্র তুলে ধরেছিলেন একাত্তরে, যে দেশের যে ভাষার গানকে জনপ্রিয় করার সাধনায় কাটিয়েছেন বাকিটা জীবন, জীবিত অবস্থায় তিনি কোন কিছুরই স্বীকৃতি পাননি সে দেশের কাছ থেকে, না মুক্তিযোদ্ধা না সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে। আরেকজন যার কথা বলছিলাম, আইয়ুব বাচ্চু তাঁকেও পরবর্তি প্রজন্মের রক গায়কেরা গুরু হিসেবেই মানেন, শুধু এ বাংলা নয় ওপারেও তিনিই গুরু হাজার হাজার সঙ্গীতজ্ঞ এবং শ্রোতাদের। রুপালী গিটারের এই যাদুকরকেও হয়তো আগামীর কোন সংখ্যায় আমরা পদকে ভূষিত করে সন্মানিত করবো, যদিও অনেকেই বলে সেটা নির্ভর করবে তাঁর পক্ষে লবিংটা কতটা শক্তিশালী।

সঙ্গীতের কথাই যখন বলছি, বলতে হবে প্রয়াত বারী সিদ্দিকির কথা, যার মোহন বাঁশির সুরে, যার পান খাওয়া গলায় ঢেউ খেলানো বিষাদে কেঁপেছে বাংলার আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, তিনি লোকান্তরে চলে গেলেন গত বছর। তাকেও আমরা সন্মান জানাবো অচিরেই হয়তো। একই বছরে আমাদের আঙ্গিনা থেকে চলে যেতে যেতে একেবারেই চলে গেলেন বরেণ্য সংগীতস্রষ্টা লাকি আখন্দ। সুরের যাদুকর লাকি আখন্দ’কে নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। শুধু একটা ঘটনা বলবো, ছোটবেলায় অঞ্জন দত্ত’র গানের মাধ্যমে বাংলা গান শোনা শুরু হয়। সেই অঞ্জন দত্ত একবার হঠাৎ একটি গান বানিয়ে ফেললেন লাকি আখন্দ’কে নিয়ে। অঞ্জন তাঁর অনেক গানেই অনেক বিখ্যাত গায়কদের কথা বলেছেন কিন্তু একটা সম্পূর্ন গান শুধুমাত্র কোন একজন শিল্পিকে সন্মান জানিয়ে করাটা সম্ভবত সেটিই প্রথম এবং একমাত্র। নাহ, আখন্দ এতটা লাকি চিলেন না, রাষ্ট্র তাঁকে সেটা মনে করেনি। তিনিও তোলা থাকলেন আগামীর কোন সংখ্যায় ‘মরণোত্তর’ নামে, ঠিক যেভাবে বাংলা বাউল গানের এক দিকপাল আবদুর রহমান বয়াতি পেয়েছিলেন মরণোত্তর পদবী।

এই ‘মরণোত্তর’ অথবা কবর পদক তালিকাটা বলতে গেলে শুধু দীর্ঘই হবে। একজন হুমায়ুন ফরীদি, একজনই থাকবেন। এই বাংলায় তাঁর বিকল্প এত বছরেও তৈরি হয়নি, আর কোনদিন হবে বলেও মনে হয় না। তাঁকে নিয়ে লিখতে হলে ঠিক কোথায় শুরু করতে হবে সেটাই দীর্ঘ ভাবনার বিষয়। মৃত্যুর মাত্র ৬ বছর পরে তিনিও হলেন ‘মরণোত্তর’। অভিনয় এবং চলচ্চিত্রের কথা যখন বলা হবে আনোয়ার হোসেনের চেহারা ভেসে উঠবে আপনার মনের পর্দায়, নবাব সিরাজউদ্দৌলার চরিত্রে অভিনয়ের জন্য যাকে সবাই একনামে নবাব বলে ডাকতো। এখনো চোখ বন্ধ করলে ‘জীবন থেকে নেয়া দেখতে পাই’। প্রায় ৮০ বছর বেঁচে থেকেও তিনি রাষ্ট্রকে সন্মান প্রদানের জন্য যথেষ্ট সময় দিতে পারেননি, বাংলার শেষ নবাব তিনিও পদক ঝুলিয়েছেন কবরে।

থাক, মরণোত্তর তালিকাটা আর দীর্ঘ না করি। বলছিলাম আনোয়ার হোসেনের কথা। আমাদের সৌভাগ্য যে আমরা আরও একজন আনোয়ার হোসেন পেয়েছি, যিনি এখনো বেঁচে আছেন। স্বাধীনতা পরবর্তি সময়টাতে বাংলা সাহিত্যে যখন দীর্ঘদিনের বিশাল শূন্যতা তখন হাতে নিয়ে আলোকবর্তিকা এগিয়ে এসেছিলেন কাজী আনোয়ার হোসেন এবং তাঁর ‘সেবা প্রকাশনী’। হুমায়ূন আহমেদ অমর হয়ে থাকবেন বাংলা সাহিত্য জনপ্রিয় করার জন্য আর কাজী আনোয়ার হোসেন অমর হয়ে থাকবেন প্রাথমিক পাঠক তৈরি করে দেবার জন্য। শৈশব কৈশোরে সেবা প্রকাশনী’র কোন বই পড়েনি, অথবা সেবা’র বই পড়ে পাঠক সত্তা জেগে ওঠেনি এমন পাঠক পাওয়া এই বাংলাদেশে খুব বিরল। সেই সরল ছেলেবেলায় আমি এবং আমার মত কোটি পাঠকের বই পড়ার হাতেখড়ি, বই পড়ার প্রতি আকর্ষন, বই পড়ার দুর্নিবার নেশা সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন আমাদের ‘কাজীদা’। বিদ্যুৎ মিত্র এবং শামসুদ্দীন নওয়াব ছদন্মামের পেছনের ব্যক্তিটিও সেই একজনই। তিনি শুধু লেখক বা অনুবাদক নন, ছিলেন বেতারের নিয়মিত শিল্পী, চলচ্চিত্রে করেছেন প্লে ব্যাক। ‘তিন গোয়েন্দা’ পড়ে প্রথম জেনেছিলাম দেশের বাইরের ভিন্ন এক জগতের কথা, দুর্গম বুনো পশ্চিমে ঘুরে বেড়িয়েছি ‘ওয়েস্টার্ন’ গল্পগুলো পড়ে। ‘কুয়াশা’ এবং ‘মাসুদ রানা’ দিয়েছিল রোমাঞ্চ, রহস্য, অভিযাত্রা, যুদ্ধ আর দেশপ্রেমের স্বাদ। ‘সেবা অনুবাদ’ পড়ে প্রথম পেয়েছিলাম বিশ্বসাহিত্যের হাতছানি রূপ রং গন্ধ। আজ পর্যন্ত এত চমৎকার ঝরঝরে বাংলা অনুবাদ আর কেউ করতে পারেনি। যতদিন দেশে ছিলাম তাঁর প্রকাশিত ‘রহস্য পত্রিকা’ ছিল নিয়মিত সংগ্রহের অমূল্য রত্ন। সেবা প্রকাশনী না থাকলে হয়তো কোন একদিন পাঠক হতাম, কোন একদিন বিশ্ব সাহিত্যের অমর ক্লাসিকগুলো পড়া হত, কিন্তু সেটা কতদিনে কিভাবে কতদূর হত সে সন্দেহ থেকে যাবে আজীবন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে থাকতে পড়েছিলাম তিন গোয়েন্দা দক্ষিণের দ্বিপ, সেই যে দক্ষিণের দ্বিপগুলোর প্রতি অদম্য এক ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল তা আর কোনদিন কমেনি। অনেক পরে শুধুমাত্র দক্ষিণের কোন দ্বিপ দেখার সহজ সুযোগ পাবো বলেই অন্য যে কোন দেশের বদলে চলে এসেছিলাম অস্ট্রেলিয়ায়, এতটাই প্রভাবিত হয়েছিলাম ছেলেবেলায়। এই গল্পটা আমার অথচ আমার নয়, খুঁজলে এরকম গল্পের সংখ্যা কোটি ছাড়িয়ে যাবে। এখন অনেককেই বলতে শুনি, তাঁর লেখাগুলোর অধিকাংশ মৌলিক নয়, বেশিরভাগ অন্য লোকজন লিখেছে, সাহিত্যের মাপকাঠিতে সেগুলো কোন সাহিত্যের কাতারে পড়ে না আরও অনেক কিছু। যাক, সেসব কথা তর্কসাপেক্ষ। কিন্তু, এই যে ‘বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান’ শব্দযুগল ব্যবহার করে যে পদকটি দেয়া হয় তা কি শুধুমাত্র সাহিত্যমান যাচাইয়ের মাপকাঠি? এখনো যদি অনলাইন কিংবা অফলাইনে কোন পাঠক ভোটের আয়োজন হয় ‘পরবর্তি একুশে পদক কাকে দেয়া উচিৎ’ বলে, সবার প্রথমে কার নাম চলে আসবে তা খুব সহজেই অনুমেয়। কিন্তু না, তিনি তো এখনো বেঁচে আছেন কোনমতে, হয়তো কোন একদিন কোন একটা পদক আমরা তাঁর কবরেও পৌঁছে দিতে পারবো।

বাংলা বইয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় একজনের কথা লিখছি, অথচ যার অবদানে এভাবে লিখতে পারছি তাঁর কথা না বললে এই পুরো লেখাটাই অর্থহীন হয়ে যায়, তিনি আমাদের মেহেদী হাসান খান। তিনি ‘অভ্র’র জনক এটুকু বললেই যথেষ্ট, কারণ এই যে আপনি হাঁটতে বসতে শুতে হাতের মুঠোয় স্মার্টফোনে বাংলা লিখছেন, আমি ধরেই নিয়েছি যার জন্য এসব সম্ভব হয়েছে আপনি তাঁকে চেনেন। বাংলা ভাষাকে রোমান হরফ ব্যবহার করে সহজে লেখার জন্য ২০০৩ সালের ২৬শে মার্চ তিনি এবং তাঁর দল ‘ওমিক্রনল্যাব’ সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক ইউনিকোড ব্যাবস্থায় ‘অভ্র কি-বোর্ড’ অবমুক্ত করেন। ‘ইউনিকোড’ সারা বিশ্বের জন্য সহজে এবং একই স্টান্ডার্ডে বর্ণ লেখার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম সংস্থা যার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে। ইউনিকোড এখন সবগুলো কম্পিউটার এবং মোবাইল অপারেটিং সিস্টেমের জন্য ইন্ডাস্ট্রি স্ট্যান্ডার্ড যা ২০১৯ সালের হিসেব অনুযায়ী ১৫০ টি ভাষার বর্ণ ব্যবহার সুবিধা দিচ্ছে। আমরা যখন আমাদের পুরনো ‘বিজয়’ এবং অন্যান্য কিবোর্ডে বাংলা লেখা শেখার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম তখন কিবোর্ডে বাংলা ভাষা সহজে লেখার মন্ত্র নিয়ে স্বর্গ থেকে দেবদূতের মত করে হাজির হয়েছিলেন মেহেদী হাসান এবং তাঁর দল। মনে আছে, একসময় বাংলা ব্লগে লেখার জন্য প্রায় মাসখানেকের চেষ্টায় ‘বিজয়’ কিবোর্ড আয়ত্ত করেছিলাম, সেই সময়ে যারা ব্লগ লিখতেন তারা সকলেই জানেন বিষয়টা কেমন ছিল। কিন্তু সেটা কজন পারতো বা কজনই শুধুমাত্র বাংলা লেখার জন্য এত সময় নিয়ে একটা কিবোর্ড আয়ত্ত করতে পারতো সে প্রশ্ন করাটা খুব স্বাভাবিক, টাকা দিয়ে সে সফটওয়্যার কিনতে হলে তো কথাই নেই। ‘অভ্র’ মুক্ত অপারেটিং সফটওয়্যার, ‘ভাষা হোক উন্মুক্ত’ এই স্লোগান নিয়ে তার যাত্রা শুরু। তার মানে যে কেউ বিনামূল্যে তা ব্যাবহার করতে পারে, এমনকি ‘অভ্র’ কোডিং উন্মুক্ত তাই যে কেউ ইউনিকোডে নতুন কি বোর্ড বানাতে পারে। আজ আমরা আইফোন বা এন্ড্রয়েডে যে বাংলা টাইপিং সফটওয়্যার দেখি তার প্রায় সবগুলোই অভ্র বা অভ্র থেকে অনুপ্রাণিত। শুধু বাংলাদেশেই নয়, ওপার বাংলাতেও বাংলা লেখার অভ্যাস তৈরি করে দিয়েছে অভ্র। আমার বন্ধু বা ফেসবুক বন্ধু তালিকায় যাদেরকেই দেখতাম বাংলা লিখতো ইংরেজি হরফে ধরে ধরে অভ্র’র কথা বলেছি, আজ তারা সবাই বাংলাতেই লিখছে, শুধু ওপার বাংলাতেই যার সংখ্যা শতাধিক। হ্যাঁ, এটা গর্ব, তাই গর্বের সাথেই অভ্র’এর অবদান স্বীকার করছি। অভ্র না আসলে হয়তো আজও অনলাইনের পাতায় পাতায় আমাদের দেখতে হত, “gan tome kamon aco? Bat kaico?” জাতীয় কথাবার্তা। সোজা কথায় কিবোর্ডে বিশেষ করে ডিজিটাল কিবোর্ড/অনলাইনে বাংলা ভাষায় লেখা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়ার কাণ্ডারি অভ্র এবং একজন মেহেদী হাসান।

আজ এই ভাষার মাসে, বাংলা ভাষার অহংকারের দিনে লেখা প্রতিটি বাংলা বর্ণ হাহাকার করে বলে যায় একজন মেহেদী হাসান এবং অভ্র রয়ে গেছেন রাষ্ট্রের অগোচরে। অথচ একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে, বাংলা ভাষা নিয়ে এমনকি এমনকি একুশে পদকের খবর নিয়ে প্রায় প্রতিটি ফেসবুক লেখা তৈরি হচ্ছে অভ্র’তে। আমাদের যে জাতীয় পরিচয়পত্র, ভোটার আইডি কার্ড সরকার তা বিনামূল্যে অভ্রতেই তৈরি করেছে। ছেলেপেলেরা বলে, যতদিন একজন আইসিটি মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার থাকবেন, যতদিন তার ক্ষমতা ততদিন মেহেদী হাসানেরা রাস্ট্রযন্ত্রের চোখে শত্রু হিসেবেই গন্য হবেন। বিজয় কিবোর্ডে ব্যাবসা করার জন্য জব্বার সাহেব স্বীকৃতি পেলে মেহেদী হাসান’রা কেন পাবেন না সে প্রশ্ন কোনদিন পুরনো হবে না।
অনেক বছর ধরেই একটা কথা প্রচলিত যে, আমরা বেঁচে থাকতে আমাদের গুণীজনদের সন্মান জানাই না, জীবনের শেষ সময়গুলোতে কিভাবে কাটে তাঁদের অসহায় দিন-রাত কোনদিন কেউ খবর নিয়ে দেখে না। মৃত্যুর পর শুরু হয়ে যায় শ্রদ্ধা জানানোর মহাজাগতিক জোয়ার, তাও দুদিনের জন্য। এই যে মরণোত্তর একুশে পদক তথা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জয়জয়কার, এই পুরস্কারের আসলেই কি কোন মানে আছে? একজন মানুষ বেঁচে থাকতে রাষ্ট্রের কাছ থেকে কোন স্বীকৃতি পেল না, মৃত্যুর পর তাঁকে পৃথিবীর সকল সন্মান এনে দিয়ে আমরা আমাদের কোন হীনম্মতা ঢাকতে চাই? এইযে বেঁচে থাকতে আমরা পারছিনা আমাদের কির্তিমানদের যথাযোগ্য সন্মান প্রদর্শন করতে, এ লজ্জা এ ব্যর্থতা যতটা না রাষ্ট্রের তার চেয়েও বেশি কী জাতি হিসেবে আমাদের নয়? অকৃতজ্ঞ জাতির এই নির্লজ্জ তকমা আমরা আর কতদিন বয়ে বেড়াবো?

আর যদি মরণোত্তর একমাত্র সমাধান হয় তাহলে এবছরের ২১ জনের দীর্ঘ তালিকায় (সেখানেও পাঁচ জন মরণোত্তর) লাকি আখন্দ, বারী সিদ্দিকী’র মত গভীর আবেগের নামগুলো কেন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না? এইতো সেদিন তাঁরা চলে গেলেন আমাদের অঙ্গনে বিশাল শূন্যতা তৈরি করে, সে ক্ষত তো এখনো শুকায়নি। রাষ্ট্রযন্ত্র কি তবে এতটাই অনুভূতিহীন, মেধাশূন্য? কথা হচ্ছে, যে কোন যন্ত্রের চলার জন্য লুব্রিকেন্ট, সোজা বাংলায় তেলজাতীয় পদার্থের প্রয়োজন। রাষ্ট্রেযন্ত্রের সে প্রয়োজন আমরা কোন যোগ্যতায় অস্বীকার করবো? 
গতবছর যখন একুশে পদকপ্রাপ্ত একুশ জনের তালিকা ঘোষিত হয়েছিল, সেখানে মরণোত্তর আজম খান দেখে আমরা তাঁর ভক্তরা বলেছিলাম, আজম খানের এই স্বীকৃতি প্রয়োজন নেই, রাষ্ট্র আসলে এ স্বীকৃতি নিজেকেই দিয়েছে, নিজের ক্ষুদ্রতা ঢাকার জন্য।
সেসময় লজ্জায়, ক্ষোভে লেখা হয়েছিল কবিতাটি;  

একুশ পদক
একুশ মানে একুশ পদক
দিতে হবে তাইতো দেয়া
পেয়েছে বিজ্ঞ পাবেই বালক
তেলের ভেলায় পাড়ি খেয়া।

অনেক অনেক তারার ভিড়ে
একুশ পেলেন আদু ভাই
বলছি আমি লজ্জা ছিঁড়ে
তাঁদের মূল্য বুঝিনাই।

মরে গিয়ে যোগ্য হলেন
ভেঙ্গে লাল ঐ ফিতার বাণ
পদক নামে তামাশা পেলেন
মরণোত্তর গুরু আজম খান।

করছো কর হিংসা সবাই
দেখছি দেখবো কত্ত কি
পদক যখন পাবে জগাই
ভেবোনা সেটা খয়রাতি।

পদক পাবো পদক দেবো
বেচে একদিন তেলের মলম
এক মঞ্চে হাসব দুজন
আমি এবং হিরো আলম।
ফাহাদ আসমার
ফিচার সম্পাদক, প্রশান্তিকা।
0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments