এক রাত্তির দুঃস্বপ্ন । পিয়ারা বেগম

  •  
  •  
  •  
  •  

দু’দিনের এই খেলাঘরে প্রকৃতি প্রদত্ত চাওয়া-পাওয়ার অধিকার নিয়েই প্রতিটি মানুষ জন্মগ্রহণ করে। তাই তো জন্মগ্রহণের পরেই শিশু তার মায়ের স্তনে দুধ পায়। আর জীবের বৈশিষ্ট্যগত কারণে বড় হয়। বাড়তে থাকে তার চাহিদার পরিধি, ব্যাপ্তি। বংশবৃদ্ধিও জীবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বিধায় মানুষ সংসার বাঁধে। সন্তান জন্ম দেন। সামগ্রিক পূর্ণতায় তাদের আনন্দচকিত জীবন হয়ে ওঠে প্রমত্ত আবেগে উত্তাল। কখনো নিয়তির রুদ্রঝড়ের তাণ্ডবে তছনছ হয়ে যায় সাজানো সংসার। ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে যায় স্বপ্ন-স্বাধ ভালোবাসা। মুহূর্তে পুরো পৃথিবীটা সূচীভেদ্য আঁধারে ছেয়ে যায় এক অনিবার্য ধূসরতায়।

তারপরেও মানুষ কোনো এক অশরীর ইঙ্গিতে  আবারো স্বপ্ন বুনে। আশায় ঘর বাঁধে প্রাপ্তির প্রত্যাশায়। কেউ পায় সার্থকতার অমৃত স্বাদ। কেউ পায় ব্যর্থতার তিক্ত বিস্বাদ। কেউ বা গড়ে তুলে অঢেল বিত্ত-ব্যাসাত। কেউ রোগ-ব্যাধিতে হয় জরাগ্রস্ত। শেষমেশ শূন্য হাতে একেবারে বিদায় নেয় এই নিষ্ঠুর পৃথিবী থেকে। কিন্তু কেন এমন হয়? প্রকৃতির অগাধ ধন-সম্পদের তো অভাব নেই। নেই স্রষ্টার রহমতের সীমাবদ্ধতাও। তবে কেন এতো কার্পণ্য? কেনই বা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আকাশ-পাতাল বৈষম্য? প্রকৃতি তো মানুষেকে চাওয়া-পাওয়ার অধিকার দিয়েই এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তাই তো মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে খ্যাত। তাহলে? তাহলে প্রাপ্তিতে এত বাঁধা কিসের?

হ য ব র ল ভাবনায় বিধ্বস্ত মন বলছে, এইতো সেদিন যেন এলাম। এক রাত্তির স্বপ্নের চেয়েও ছোট মনে হচ্ছে জীবনটাকে। ঠিক যেন শিউলি ফুলের মতো। শিউলি ফুল গভীর রাতে ফোটে আবার ভোর হওয়ার আগেই ঝরে পড়ে! কী ক্ষীণায়ু শিউলি ফুলের জীবন!!

আরো ভাবছি, জীবনে কত কিছুই না পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেছি। সে অপেক্ষায় পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল। পেয়েছিও। সেই প্রাপ্তিতে প্রাণপ্রাচুর্য ছিল। আবার দীর্ঘ অপেক্ষায় না পাওয়ার বেদনাবোধ ছিল। হতাশা-বঞ্চনার, প্রতারণার গ্লানিও ছিল। তারপরেও যেমনটি ছিলাম মন্দ ছিলাম না। কেন জানি মনে হচ্ছে, দুঃখের ভেতরেও অনেক গভীর সুখ লুকিয়ে থাকতো। সে সুখের প্রতি লোকমায় পেতাম আস্বাদনের তৃপ্তি! আর তৃপ্তির ঢেঁকুরে পেতাম অনির্বাচনীয় আরেক সুখ।

মনটা হঠাৎ বিমর্ষতায় ডুবে যাচ্ছে অজানা এক আশঙ্কায়। বুকটা হাহাকার করছে খাঁ খাঁ শুন্যতায়। হঠাৎ দেখি স্বজনরা ধরাধরি করে আমাকে বাইর করল৷ মশারী নিচে আমাকে ঢুকাল। আমি সবকিছু দেখছি কিন্তু বলতে পারছিনা। খুশবু সাবান আমার গায়ে মাখল। বড়ই পাতা গরম জলে আমাকে গোছল করালো। সাদা ফকফকা পোশাক পরালো। আতর-গোলাপজল ছিটালো। খাটিয়ায় করে আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। আমাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ট্রেনের দিকে। দেখি, ট্রেনের কামড়া থেকে ডাকছে আমার মরহুম মা-বাবা, ভাই। আয়! আয়!! আয়!!! তাঁদের আদরমাখা সেই ডাক শুনে আমি আনন্দে আত্মহারা। আবারো সেই ডাক! ভয় কীসের? আমরা তো আছি। দু’হাত বাড়িয়ে তাঁরা ডাকছেন আমাকে। আর কী থাকা যায়? কতদিন পর তাঁদের দেখা পেলাম। হঠাৎ সাদা পোশাকে একজন আগন্তুক এসে আমার দুহাতে দুটি পোঁটলা তুলে দিল। ভাবছি, ভালোই হলো, ট্রেনে বসে খেতে পারব। উনি কীভাবে যেন বুঝে ফেলেছেন। তাই আমাকে বললেন, বাছা এগুলো খাবার নয়, এগুলো তোমার আমলনামা।  আমালনামা?  বললাম সে আবার কী? বললেন, তোমার পাপপুণ্যের হিসাব! বুকটা ধপাস করে ওঠল! হায় রে জীবন? পাপপুণ্য নিয়ে কখনো কী কিছু ভেবেছি। সারাটা জীবন কেবল ‘খাইলাম না, পাইলাম না’ করে করেই কাটালাম।  ট্রেনের  আবারও হুইসেল বেঁজে ওঠল। পেছনে আর তাকালাম না। দ্রুত ট্রেনের সিঁড়িতে পা রাখলাম। তাঁরা টেনে তুললেন আমাকে। কামড়ায় পা রাখার সাথে সাথে দেখি কোথাও কেউ নেই ! কোথায় গেলেন তাঁরা? ভয়ে আমার  দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমি পেছনে তাকালাম। দেখি যারা আমাকে বিদায় জানাতে এসেছিলেন তারাও কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে চলে যাচ্ছে। সামনে দেখি গভীর একটা গর্ত! এ কী? এই যে গুমোট অন্ধকার! কবর? ও মাগো! ভয়ে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠছে। ছমছম করছে বুক! আমি জোরে চিৎকার করে বলছি, আমাকে নিয়ে যাও তোমরা। যেয়ো না, যেয়ো না। আল্লাহর দোহাই, তোমরা আমাকে নিয়ে যাও। তারা ফিরেও তাকালো না। ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলো!! তক্ষুনি ট্রেন ছাড়ার শেষ হুইসেল বেঁজে উঠলো। আমি আমার পুঁটলি-পাটলি ছুঁড়ে ফেলে সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলাম, আমি বাঁচতে চাই! বাঁচতে চাই!! আরো বাঁচতে চাই!!! আমার গগনবিদারী আর্তনাদে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে তুললো। সাথে সাথে প্রতিধ্বনিত হয়ে ভেসে আসছে, “তোমার আর এক মুহূর্ত থাকার অধিকার নেই বাছা! এটাই তোমার শেষ আশ্রয়, তোমার বাসস্থান।  “না, না, না।” আমার সাজানো বাগান ছেড়ে কেন যাব? আমি ভ্রুক্ষেপ না করে চোখ বন্ধ করে জোরসে ঝাঁপ দিলাম চলন্ত ট্রেন থেকে। পাকা প্লাটফর্মে পড়ে আঘাতে আমার মাথা ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে। আমি দু’হাত দিয়ে চেপে ধরার চেষ্টা করছি। কিন্তু পারছি না। আমার চোখ ঝাপসা হয়ে মুঁদে আসছে। শরীরটা অবশ হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। তারপর…..!!

যখন আমার জ্ঞান ফিরলো, চোখ মেলে দেখি আমি হাসপাতালের বেডে। আত্মীয় স্বজনদের মুখে হাসির ঝিলিক। জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে আমার? ওরা জানাল, ঘুমে চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। মনে করার চেষ্টা করছি, কেন চিৎকার করেছিলাম আমি? আবছা আবছা মনে উঁকি দিচ্ছে। সেই দুঃস্বপ্নের বিভীষিকাময় কালো অধ্যায়ের তিক্ত অভিজ্ঞতার কিছু দৃশ্য! ভয়ে শিহরিত হলাম!! মাথাটা ঝিমঝিম করছে। ভাবছি, এটা কি আসলেই দুঃস্বপ্ন ছিল? না কি পরপারে যাওয়ার সমন জারির পূর্বাভাস!!!

(সম্পূর্ণ কাল্পনিক)

১১/০৪/২০২২, নারায়ণগঞ্জ, বাংলাদেশ।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments