এটাই বাংলাদেশ, এটাই বাংলার শত বছরের ধারা । মিতা চৌধুরী

  •  
  •  
  •  
  •  

প্রিয় লেখিকা এলিফ শেফাক একটি বিষয় নিয়ে প্রায়ই তার গল্পে বা বক্তব্যে তুলে আনে, আর তা হলো ‘ডেঞ্জার অফ সিঙ্গুলারিটি’ বাংলায় যা হবে ‘একক’কতার ভয়াবহতা’। একক’কতা কেন ভয়ঙ্কর বলি, একটি নির্জন স্থানে বসে চোখ দুটি বন্ধ করে নিচের পরিস্থিতিটা কল্পনা করে একটু দেখুন।

ধরুন যে সৃষ্টিকর্তা বৈচিত্র মোটেও পছন্দ করে না, তাই পৃথিবীতে জিনের পরিবর্তন বলে কোনো শব্দ নাই। তো যা হলো সেই আদম (আঃ) আর বিবি হাওয়া, যারা ধর্মমতে পৃথিবীর প্রথম মানব তাদের পরে যত মানব সন্তান সৃষ্টি হচ্ছে কারো কোনো জেনেটিক পরিবর্তন হয় নি, ফলে পৃথিবীর সকল পুরুষ দেখতে শুধু আদম আর সকল নারী হাওয়া। আপনি আপনার চারপাশে শুধুই দেখছেন আপনার প্রতিরূপ; একই চেহারা, একই গড়ন ও গঠন, একই মন একই হাসি মানে সব আপনার কার্বন কপি। আপনার ভাই, আপনার চাচা, আপনার বন্ধু, আপনার পিতামহ, বাড়ির পাশের টং দোকানি সবাই এক। খুবই ভয়াবহ কিন্তু, অনেকটা জম্বি বা সাইফাই মুভির মতো, তাই না! কল্পনা করতেই চরম অস্বস্তি হচ্ছে।

আবার ধরুন আপনার আবাসস্থল সব বর্ণহীন, কারণ আপনি বৈচিত্র পছন্দ করেন না, বিষয়টা আপনার কাছে খুবই হাস্যকর। তাই আপনার ঘরের সব শুধু কালো রঙের (লাল, সাদা, নীল তর্কের খাতিরে যে কোনো একটি রং চিন্তা করলেই হলো), ঘরের দেয়াল, মেঝে, আপনাদের সকলের পোশাক, বিছানার চাদর, জানালার পর্দা, আসবাবপত্র, সকল তৈজসপত্র মানে চারপাশের ১০০% একই রঙের। এটার চিন্তাও আমাকে প্রচন্ড অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছে, আর ভাবা আমার পক্ষে সম্ভব না, মনে হচ্ছে আমি কোনো টর্চের সেলে আছি।

এই উদাহরণগুলো দিলাম যারা মনে করেন যে পৃথিবীটা শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর তাদের জন্য। না পৃথিবীটা কোনো গোষ্ঠী, সম্প্রদায় বা ধর্মীয়দেরই একার নয়। সৃষ্টিকর্তার প্রতিটি সৃষ্টি মাত্রই আছে এই জগতের উপর সমান অধিকার।

গত ১৩ অক্টোবর বুধবার, যারা কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরান নিয়ে চুপিসারে হনুমানের পায়ের উপর রেখে এসে ধর্মীয় অবমাননার ধোঁয়া তুলে পূজামণ্ডপে হামলা করেছে তাদের জন্য বলতে চাই, আপনারা যে আরেক ধর্ম গোষ্ঠী বা তাদের বিশ্বাসকে হেয় করার জন্য এই নিকৃষ্ট কাজটা সুন্দর মতো পরিকল্পনা করে করলেন বা করালেন, আপনারা আসলে অপমানটা করলেন কার? আপনি আপনার নিজ ধর্মগ্রন্থের অপমান আপনার নিজ হাতে করলেন। এবং এই ভয়ংকর চিন্তাটার পেছনেও ছিল সেই একককবাদী চিন্তা ও আমার ধর্মই সেরা।

আপনার ধর্ম আপনাকে মহান করবে না, বরং আপনার কর্ম আপনার ধর্ম বিশ্বাসকে অন্যের চোখে মহান করেন। নবী মুহাম্মদ (সাঃ) কিন্তু মক্কা দখল করে অন্য ধর্মে বিশ্বাসীদের সামান্যতম ক্ষতিও করনেনি। আপনারা সেই মুয়াবিয়া যে, শেষ খলিফা আলী (রাঃ) সঙ্গে একক যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত জেনে বল্লমের মাথায় কুরআন বেঁধে নিয়েছিল।

আরেক ধর্মের মানুষের পবিত্র উৎসব নষ্ট করতে ও তাতে ধর্মীয় অবমাননার রং দেয়া, এমন জঘন্য কাজ কোন বিকৃত মস্তিস্ক থেকে আসতে পারে তা বুঝতে কারো রকেট সাইন্টিস্ট হওয়ার দরকার পড়ে না । বলাই বাহুল্য এটা দিবালোকের মতোই পরিস্কার যে এটা কোন সনাতন ধর্মীয় লোকের কাজ নয়। এটা আপনারা যারা কাবুলের পতনে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশকে আফগান বানানোর স্বপ্নে বিভোর তাদের কাজ, তাদেরই কুকর্ম !

আপনারা বা ভারতের শিবসেনা কিংবা পশ্চিমা উগ্র হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট বা সুপার অর্থডক্স জিউস কারো মাঝেই কোনো পার্থক্য নেই। আপনারা সকলেই একই মদ বিভিন্ন বোতলে, আপনারা সবাই সেই এজিদ সন্তান।

যেখানে পবিত্র কুরআনেই মহান আল্লাহ পাক নিজেই বলেছেন ” লাকুম দীনুকুম ওয়ালিয়া দীন”, যার অর্থ দাঁড়ায় “তোমাদের কর্ম ও কর্মফল তোমাদের জন্যে এবং আমার কর্ম ও কর্মফল আমার জন্যে”! সেখানে আপনি কি একবার ভেবে দেখেছেন যে আপনি কত বড় অপরাধে জড়ালেন?

এই মহাবিশ্ব একটা চমৎকার উদ্যান বা বাগান, যা সৃষ্টিকর্তার নিজ হাতে গড়া এক অন্যন্য সৃষ্টি। আর এটাও ভুলে যাবেন না সৃষ্টিকর্তা কোনো কিছুই অপ্রয়োজনে সৃষ্টি করেন নাই। এটাতো তো মানেন যে সৃষ্টিকর্তা পরম বিজ্ঞ ও বিচক্ষণ, তিনি চাইলেই কিন্তু যেকোনো কিছু করতে পারেন, সেখানে আমার আপনার দরকার পড়ে না।

এই মহা বিশ্ব একটি একক স্বত্তা, যার সবকিছু এবং প্রত্যেকেই এক অদৃশ্য জালের মাধ্যমে পরস্পর সংযুক্ত। আমরা এটি সম্পর্কে সচেতন থাকি বা না থাকি, আমরা সবাই এক নীরব কথোপকথনে আছি। তাই স্রষ্টাকে পেতে চাইলে আগে তার সৃষ্টিকে ভালোবাসুন, সন্মান করুন। ভিন্ন মত, ভিন্ন চিন্তা যাই হোক সন্মান করতে শিখুন। আরেকটা সত্য কথা, এই লেখার প্রচ্ছদে যে ছবিটা দেখছেন এটাই বাংলাদেশ। এটাই বাংলার শতবছরের ধারা।

মিতা চৌধুরী
সাংবাদিক, চিত্রশিল্পী, সংগঠক
মেলবোর্ন।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments