এলাম শেষে হাওরের দেশে-ফখরুল আবেদীন মিলন

1970
ফখরুল আবেদীন মিলন
ভৈরবের উজানভাটি রেস্টুরেন্ট এর ওয়াশরুম থেকে বের হবার মুখে ভদ্রমহিলার সাথে দেখা।গেটেই উনাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, “ম্যাডাম, আপনি বোধহয় ভুলে এখানে ঢুকে পড়েছেন।  এটা পুরুষদের, মহিলাদের জন্য পাশেরটা”।
ভদ্রমহিলা খানিকটা চমকে গেল। তারপর হাতের ইশারায় আমাকে বাইরে ডেকে নিয়ে উপরের দিকে তাকাতে বলল। তারপর যা হবার তাই হল। আমিই জিভে একটা কামড় দিয়ে, দুই হাত জোড় করে ক্ষমা চেয়ে পাশের টয়লেটে চলে গেলাম আর মনে মনে ভাবলাম, হে আমার প্রিয় সুনামগঞ্জ, কি রেখেছ যে আমার জন্য, কে জানে।
গাড়ি চালাতে চালাতে মহিলার মুখের এক্সপ্রেশানটা ভুলতেই পারছি না। ছিঃ ছিঃ কি বেইজ্জতি।
প্রসংগ পাল্টাতে গিন্নিকে বললাম, “বুঝলা,  জিপিএস এর উপর নির্ভরশীল হলে মস্তিষ্কের যেই অংশটা দিক নির্দেশনা দেয়, সেই অংশটা ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। তাই আমি ওইসব হাবিজাবি জিপিএস টিপিএস ইউজ করি না। ব্রেইনের অবস্থা এমনিতেই খারাপ, তার উপর যদি আবার নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, তাহলে তো বিপদ। আর তা ছাড়া বাংলাদেশের সব রাস্তা ঘাট আমার মুখস্ত।”
ছবি: সাবিরুল ইসলাম ( জেলা প্রশাসক, সুনামগঞ্জ)
এই সব আলাপ সালাপ করতে করতে কখন যে সিলেট শহরে পৌছে গেছি টেরও পাই নি। হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। যাক, সিলেট যখন চলে এসেছি তখন সুনামগঞ্জ এর দেরি নাই। রাস্তার পাশে গাড়ি দাড়া করিয়ে চা দোকানিকে সুনামগঞ্জের রাস্তা কোথায় জিজ্ঞেস করার পর সিলেটী ভাষায় যা বলল, তার অর্থ বুঝে আরো একবার বেক্কল হয়ে গেলাম। আমরা সুনামগঞ্জে যাওয়ার রাস্তা আরো ১০ কিলোমিটার আগেই ফেলে এসেছি। হায়রে কপাল।
বউ এর মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। গম্ভীর মুখে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। আমি গাড়ি ঘুরিয়ে সুনামগঞ্জের দিকে চালাতে লাগলাম। তাকে খুশি করতে হবে যে করেই হোক। হস্তশিল্পের উপর তার দুর্বলতা আছে। তাই ঠিক করেছি সুনামগঞ্জের স্থানীয় কোন হস্তশিল্প তাকে কিনে দেব। যেই ভাবা সেই কাজ। রাস্তার পাশের এক ছোট্ট বাজারে নেমে পড়লাম।
-কি এনেছো এটা?
-মাছ ধরার ঝুরি, পুকুরে এটা ফেলে রাখলে মাছ ঢুকে পড়বে, আর একবার ঢুকতে পারলে রেহাই নাই, বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বানানো। সুন্দর না?
-হুম, অনেক সুন্দর, তবে এটা দিয়ে ঢাকায় কোন পুকুরে মাছ ধরবা? আর এত বড় জিনিসটাই বা গাড়িতে কিভাবে নিবা?
ছবি: সাবিরুল ইসলাম ( জেলা প্রশাসক, সুনামগঞ্জ)
হায় হায়, এই সহজ বিষয়টাই মাথায় আসল না? কি আর করা, কাকুতিমিনতি করে সেই ঝুরি ফেরত দিয়ে এক কাদি কলা কিনে গাড়িতে উঠালাম।
সুনামগঞ্জ শহরে যখন পৌছালাম, তখন বিকেল হয়ে গেছে।  কেমন যেন নিরিবিলি শহরটা। প্রথম দেখাতেই ভাল লেগে গেল। দুপুরে হালকা এক পশলা বৃষ্টি হয়ে কেমন যেন ঠান্ডা ভেজা হাওয়া দিচ্ছে এই মার্চের শেষে। আকাশটা এখনো মেঘে ঢাকা। হোটেলের বারান্দায় বসে এককাপ চা সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে দিল। হোটেলের পাশে গাছগাছালি ঘেরা পুকুরটার পাড়ে দাঁড়িয়ে কয়েকটা হাঁস গা থেকে পানি ঝরাচ্ছে। এবার বাড়ি ফেরার পালা তাদের।
সন্ধ্যার চলে গেলাম মরমী কবি হাসন রাজার  স্মৃতি জাদুঘরে। পুরানো বাড়িটার প্রতিটি কোনায় ছড়িয়ে আছে উনার ছবি আর ব্যবহৃত জিনিস পত্র। পানি খাওয়ার গ্লাস থেকে শুরু করে ঘোড়ার লাগাম, সবই আছে। উনার নাতি সমিরন দেওয়ান খুবই আগ্রহ নিয়ে প্রতিটি জিনিস আমাদের চিনিয়ে দিচ্ছিলেন। আমি কাঠখোট্টা মানুষ, শিল্প সাহিত্য বুঝি কম। তারপরেও কবি হাসন রাজার বিশাল এক ছবির উপরে লিখা দুটো লাইনে আমার চোখ আটকে গেল,
“রুপ দেখিলাম রে নয়নে আপনার রুপ দেখিলাম রে,
আমার মাঝত বাহির হইয়া, দেখা দিল আমারে”।
স্ত্রী পাশে এসে জিজ্ঞেস করল, “কিছু বুঝলা?”। আমি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম “নাহ্”।
(চলবে)