এলাম শেষে হাওরের দেশে (২য় পর্ব )-ফখরুল আবেদীন মিলন

1270

ফখরুল আবেদীন মিলন

বাকি সময়টা কেটে গেল হাসন রাজার গান শুনে। এবার হোটেলে ফেরার পালা। কে একজনের কুবুদ্ধিতে চলে গেলাম পেছনের পুরানো একটা বাড়ির কাছে। হাসন রাজা বাড়ি। যেখানে উনি থাকতেন। বাড়ির পাশের ভাংগা পুকুর ঘাটে দাঁড়াতেই কোত্থেকে যেন হিম বাতাস এসে পুরো কলজে নাড়িয়ে চলে গেল। একেতো পুরানো বাড়ি,তার সাথে ভাংগা পুকুর ঘাট, আর সেই সাথে নিকষ অন্ধকার। ভয়ে শক্ত হয়ে দাত কপাটি লাগাতে এর চেয়ে বেশি আর কি লাগে।

ছবি: সাবিরুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক, সুনামগঞ্জ

মাঝরাতে ঘুম ভেংগে গেল বজ্রপাত এর শব্দে। সেই সাথে বৃষ্টি। বিরামহীন ভাবে চলতেই লাগল। পরেরদিন টাংগুয়ার হাওর দেখার প্রোগ্রাম নিয়ে শংকিত হয়ে পড়লাম। যা হবার হবে। দেখা যাক।

সকালে শহর থেকে বের হতে গিয়েই আটকে গেলাম। তাহেরপুর যাওয়ার রাস্তায় গাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে না। কারন জাদুকাটা নদীতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পুণ্যস্নান আজকে। তাই যেতে হলে পায়ে হেটে বা সিএনজি নিতে হবে। এইবার ঠেলা সামলাও। এমন কুফা শেষ কবে লেগেছিল মনেও নাই। শেষে কাচুমাচু মুখ করে অনুরোধ করাতে বিশেষ বিবেচনায় আমাদের ছেড়ে দিল। স্থানীয় এক লোক এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করল। মনে মনে ভাবলাম, এই যুগেও আমার মত ভাল মানুষ আছে।

ছবি: সাবিরুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক, সুনামগঞ্জ

লোকটি অনুরোধ করল উনাকে যেন পথের মাঝে তার বাসায় নামিয়ে দেই। সানন্দে রাজি হয়ে গেলাম। পথেই তো। আর খানিকটা ঋনও শোধ হলো। এভাবে ৪০-৫০ মিনিট চলার পর লোকটি গাড়ি থামাতে বলল। নেমে বিদায় নেয়ার সময় জানালার কাছে এসে বলল, “ভাই, গাড়িটা ঘুরায়ে নেন। ৭-৮ কিলোমিটার আগে একটা বাজার দেখছেন না, ওই বাজার থেকে বামে মোড় নিয়েন”।উনার কথা শুনে আমার মুখ তিতা হয়ে গেল। দুই ঢোক পানি খেয়ে আবার চলতে শুরু করলাম।

চারপাশটা বিস্তীর্ণ সবুজ ধানে ভরা। বর্ষার আগে এটাই শেষ ফসল। তারপর পানিতে তলিয়ে যাবে সব কিছু। এখনো কোথাও কোথাও জলাভুমি দেখা যাচ্ছে। গাড়ির গ্লাস নামিয়ে বুক ভরে নিশ্বাস নিই। আহা, কি সুন্দর এই দেশটা।  আকাশটা আবার কাল হয়ে আসছে। দুর থেকে বিশাল একটা কাল মেঘ ধেয়ে আসছে আমাদের দিকে। গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিলাম। গ্রামের কোন বাজারে আশ্রয় নিতে হবে, সেই সাথে নাস্তাও খেতে হবে। সকাল থেকে পেটে দানাপানি কিছু পরে নাই।

রাস্তার দুইপাশে বেশ কিছু দোকানপাঠ নিয়েই ছোট এই বাজারটা। হোটেলের সামনে মাটির চুলোর উপর বড়সড় তাওয়াটা যেন আমাদের অপেক্ষাতেই ছিল। আহা বেচারা, তেল না পেয়ে কেমন শুকিয়ে গেছে। নাস্তার অর্ডার দিতেই ব্যস্ত হয়ে গেল রাঁধুনি। তাওয়াতে তেল ছড়িয়ে দিয়েই চটপট চার পাঁচটা পরোটা ছেড়ে দিল। তারপর এপাশ ওপাশ করে, খুন্তির চাপে চাপে গায়ে তেল মেখে কেমন মুচমুচে হয়ে উঠল পরোটা গুলো। তারপর তাওয়াতে পেয়াজ কাঁচামরিচ মেশানো ডিমটা যখন ছাড়ল, তার ঘ্রান ছড়িয়ে পড়ল যেন পুরো বাজার জুরে। বেঞ্চে বসে নাস্তা খেতে খেতেই হাওয়া ছেড়ে দিল। মেঘটা এখন ঠিক আমাদের মাথার উপর। হাওয়ার জোর বাড়ছে। কালবৈশাখী ঝড়ের তোড়ে বাজারের দোকানগুলো দ্রুত ঝাপ ফেলে দিল। আমরাও দৌড়ে আশ্রয় নিলাম গাড়ির ভেতর। এই প্রথম রাস্তায় বসে কালবৈশাখী ঝড় দেখছি। গাড়িটা বিশ্রীভাবে এদিক ওদিক দুলতে লাগল। সেই সাথে তুমুল বৃষ্টি। মনে হয় দোকানগুলোর চালের টিনগুলো উড়িয়ে নিয়ে যাবে এক্ষনি। এভাবে কতক্ষন চলল মনে নেই। তারপর ধীরে ধীরে ঝোড়ো হাওয়া থেমে গেল। শুধু ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। কেমন এক অদ্ভুত নিরবতা চারপাশে।

এবার একটা দ্বিধায় পড়ে গেলাম। সামনের দিকে যাব নাকি সুনামগঞ্জ শহরে ফিরে যাব। একজন সাইকেল আরোহী এসে জানালো সামনে অনেক বাশ গাছ ভেংগে রাস্তায় পড়ে আছে। ভেবে দেখলাম, এভাবে তো ফিরেও যাওয়া যাবে না। পেছনের রাস্তাতেও নিশ্চই গাছ পড়ে আছে। যা থাকে কপালে, সামনে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

ছবি: সাবিরুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক, সুনামগঞ্জ

বেশ কিছদুর যাওয়ার পর পেলাম প্রথম বাধা। গাড়ি থেকে নেমে বৃষ্টির মধ্যে নেমে গাছ সরিয়ে আবার সামনে এগিয়ে চলা। বারবার বাধা পেয়েছি, বারবার বাধা পেরিয়েছি। আমার মত মাঝবয়েসী মানুষের জন্য এটাকে এক ধরনের এডভেঞ্চারই বলা চলে। আর তাছাড়া গিন্নিকে ইমপ্রেস করার একটা সুক্ষ প্রয়াস তো ছিলই। এভাবেই চলতে চলতে পৌছে গেলাম তাহিরপুর।

এখান থেকে গাড়ি আর যাবে না। মটরসাইকেলে চড়ে ঘাটে যেতে হবে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মধ্যে এই পিচ্ছিল পথে মটরসাইকেলের পেছনে বসতে হবে ভেবে আমি যতনা উদ্বিগ্ন হলাম, আমার স্ত্রী তারচেয়ে বেশি ছিল। আমি আবেগ জড়ানো গলায় বললাম, “তুমি আমাকে নিয়ে ভেবনা, আমি ঠিকঠাক চলে যাব”। স্ত্রী গলায় আরো আবেগ নিয়ে বলল, “আমি আসলে মটরসাইকেলের ড্রাইভারের কথা ভাবছি, তোমার এই ভারী মানুষটাকে নিয়ে বেচারা এই রাস্তায় কিভাবে যাবে।”

ততক্ষনে পেটে ইঁদুর দৌড়াতে শুরু করেছে। আর করবেই না বা কেন, পরিশ্রম তো আর কম হয়নি। বাজারের মধ্যেই একটা দোকান থেকে খিচুড়িরর সুঘ্রাণ নাকে এসে ধাক্কা দিল। গন্ধের উৎস খুঁজে হাজির হয়ে গেলাম সেখানে। মাত্রই খুদের চালের খিচুড়ি রান্না শেষ হল সেখানে। এক মুহুর্ত দেরী না করে ছোট একটা প্লাস্টিকের প্লেট নিয়ে বসে পড়লাম টুলের উপর। আহা, কি স্বাদ তার।

এর মধ্যেই দুইটা মটরসাইকেল এসে হাজির হলো দোকানের সামনে। হর্ন বাজিয়ে তাড়া দেয় আমাকে, আর আমি দুই প্লেট খিচুড়ি খেয়ে আরেক চামচ নেয়ার জন্য দোকানীর দিকে প্লেট বাড়িয়ে ধরলাম..