ওপারে ভালো থাকুন অগ্রজ । গুঞ্জন রহমান

  
    

 

গাজী মাজহারুল আনোয়ার। (জন্ম: ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৩ – মৃত্যু: ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২)

বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের দলীয় সংগীতটি তাঁর লেখা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর “জয় বাংলা, বাংলার জয়”। আমি এতদিন জানতাম বিএনপির দলীয় সংগীত ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’-ও তাঁর লেখা। আমার জানায় ভুল ছিলো। এদিকে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির দলীয় সংগীত অবশ্য তাঁর লেখা নয়, সেটা সেই দলের প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ নিজেই লিখে ফেলেছিলেন। তবে, তেমনটা না হলেও তিনি এই দলের দলীয় সংগীত লিখতেন বলে মনে হয় না। কারণ, আসলে আওয়ামী লীগের দলীয় সংগীতটিও তো তাঁর লেখা নয়। মানে, দলীয় সংগীত হিসেবে লেখা নয়। তিনি তাঁর মতো করে দেশাত্মবোধক গান লিখেছিলেন। আওয়ামী লীগ সেই গানকে নিজেদের দলীয় সংগীত হিসেবে বেছে নিয়েছে, তাতে তাঁর নিজের ভূমিকা ছিলো না। আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে দলীয় শ্লোগান প্রবর্তন করেন, এবং পরবর্তীতে যা মুক্তিযুদ্ধের শ্লোগান তো বটেই, দেশের জাতীয় ধ্বনিতে পরিণত হয় – সেই ‘জয় বাংলা’ শব্দমালা দিয়ে এমন অসামান্য গান তিনি লিখলেন যে, সেই গান বঙ্গবন্ধুর আমলেই আওয়ামী লীগ আত্মীকরণ করে ফেললো। এখন এটা এতটাই ট্রেডমার্ক যে, আপনি গুনগুন করে এই গান গাইলেও পাশ থেকে শুনে যে-কেউ ধরে নেবে আপনি আওয়ামী লীগার।… আর ঠিক এই বিষয়টা থেকেই গীতিকবি হিসেবে তাঁর অবিসংবাদিতা প্রমাণিত হয়। কেননা, সাধারণ গীতিকবি যেটা করেন, কারো ফরমায়েস অনুসারে তার প্রয়োজনে বা তার প্রতিষ্ঠানের-অনুষ্ঠানের প্রয়োজনে গান লিখে দেন। এমন গান আমি ভুরি ভুরি লিখেছি। কিন্তু কালজয়ী গীতিকবি তিনিই, যাঁর সাধারণভাবে লিখা অসাধারণ সৃষ্টিকে আত্মীকরণ করা হয়। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, ডিএল রায়, বঙ্কীমচন্দ্র, ইকবাল প্রমূখ কবি-সাহিত্যিকদের সৃষ্টিকর্ম এভাবে আত্মীকরণ করা হয়েছে বঙ্গভারতে। ঠিক একইভাবে আত্মীকরণ করা হয়েছে তাঁর সৃষ্টি। তিনি আমাদের গর্ব, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ গীতিকবি – গাজী মাজহারুল আনোয়ার।

বাংলাদেশের প্রধান দুই কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীন ও রুনা লায়লা’র চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়েছিলো তাঁর লেখা গান গেয়ে। সাবিনা’র গানটি ছিলো – শুধু গান গেয়ে পরিচয়। অবশ্য, আলতাফ মাহমুদের সুর ও সংগীতে গানটি ষাটের দশকের মধ্যভাগে রেকর্ড করা হলেও কোনও কারণে সে সময় প্রকাশিত হয়নি। যে ছবির জন্য গানটি রেকর্ড করা হয়েছিলো, সেই ছবিতে আর ব্যবহার করা যায়নি। পরবর্তিতে ‘অবুঝ মন’ ছবিতে গানটি প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে, আলতাফ মাহমুদের মৃত্যুর পরে। তার আগেই ১৯৬৭ সালে ‘আগুন নিয়ে খেলা’ ছবির গান দিয়ে সাবিনার আত্মপ্রকাশ ঘটে যায়, তবে তেমন আলো ছড়াতে পারেননি। সিনেমায় তথা সব মহলের শ্রোতাদের কাছে সাবিনা প্রথম পছন্দে পরিণত হন জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া ছবিতে ‘এ কী সোনার আলোয়’ গানটি গেয়ে, যেটিও গাজী মাজহারুল আনোয়ারেরই লেখা ছিলো, সুরকার ছিলেন খান আতাউর রহমান। এদিকে, রুনা লায়লা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে প্রথম যে বাংলা গানটি গেয়েছিলেন, সেটি হলো – গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে, যার সুরকার ছিলেন সুবল দাস, ছবির নাম স্বরলিপি, প্রকাশের সাল ১৯৭৪। … গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লিখা গানের সংখ্যা আনুমানিক একুশ হাজার! আমার তো মনে হয়, রবীন্দ্র-নজরুলের গানের বাইরে এই দেশের প্রসিদ্ধ যত গান আছে, তার অধিকাংশই বুঝি তাঁর লেখা। একশোতে অন্তত আশিটা তো হবেই। বাদবাকি সবাই মিলে লিখেছেন বাকি বিশটা গান। ফলে, চলচ্চিত্র প্রযোজক, পরিচালক, কাহিনীকার, সংলাপ রচয়িতা, চিত্রনাট্যকার, চলচ্চিত্র পরিবেশক, ইত্যকার নানান পরিচয় থেকে থাকলেও বাংলাদেশ তাঁকে চেনে গীতিকবি হিসেবে। তাঁর লেখা কবিতাও তেমন প্রসিদ্ধ নয়, যতটা প্রসিদ্ধ তাঁর গান। এজন্য তিনি বরং গীতিকবির চেয়ে গীতিকারই বেশি।

শুরু করেছিলাম যে প্রসঙ্গ দিয়ে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল যাঁর গানকে দলীয় সংগীত হিসেবে বেছে নিয়েছে, তিনি নিজে রাজনীতি-মুক্ত থাকতে পারেন না। রাজনীতি করাটা দোষেরও নয়। মজার ব্যাপার হলো, আওয়ামী লীগের দলীয় সংগীতের রচয়িতার রাজনৈতিক অবস্থান ছিলো বিএনপিতে। তিনি এই দলের চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য ছিলেন, ছিলেন এই দলের সাংস্কৃতিক সংগঠন জাসাস-এরও উপদেষ্টা। তথাপি, তিনি দলীয় অবস্থানের ঊর্ধে উঠেই শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন আপামর বাংলাদেশীর কাছে। তিনি ছিলেন সেই বিরল ব্যক্তিত্ব, যিনি ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত থেকে প্রেসিডেন্ট’স গোল্ড মেডাল, ২০০২ সালে বেগম খালেদা জিয়া’র হাত থেকে একুশে পদক এবং ২০২১ সালে শেখ হাসিনার হাত থেকে রাষ্ট্রের সুবর্ণ জয়ন্তী বর্ষের স্বাধীনতা পুরস্কার গ্রহণ করেন। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর হাত থেকে নেয়া পদকটি বাংলাদেশ রাষ্ট্রেরই প্রবর্তিত ও প্রদত্ত সর্বপ্রথম পদক ছিলো! রেকর্ড ছয়বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, একাধিকবার বাচসাস পুরস্কার, বিএফজেএ পদক, বিজিএমইএ পদকসহ অসংখ্য পদক ও সম্মাননায় ভূষিত এই বরেণ্য গীতিকারের তিনটি গান স্থান পায় বিবিসি’র জরীপে নির্বাচিত সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকায়।

বাংলা দেশাত্মবোধক গানে তাঁর চেয়ে বেশি অবদান আর কেউ রাখতে পেরেছেন বলে জানা নেই। রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ পর্যায়ের গান অনেক, নজরুলেরও কম নয়। ঠাকুর ও কাজী – এই দুই ক্লাসিক গীতিকবিকে আলোচনার বাইরে রাখলে, গাজী’র সমকক্ষ কেউ নন। ১৯৬৪ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে গান লিখতে শুরু করেন রেডিও পাকিস্তানের জন্য। পাকিস্তান টেলিভিশন, যা এখন বাংলাদেশ টেলিভিশন, এর সূচনালগ্ন থেকেই তিনি এর প্রধান গীতিকার। সিনেমায় ক্যারিয়ার শুরু করেন ১৯৬৭ সালে। যদি গীতিকার হিসেবে তাঁর ফিল্মোগ্রাফি দেখেন, দেখবেন একটা বছরও তিনি বাদ দেননি, যে বছর সিনেমায় কাজ করেননি। পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবে নিজে ছবি বানিয়েছেন, কাহিনী লিখেছেন, চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন। কিন্তু সেসবের জন্য গান লিখা ছাড়েননি। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্য গান লিখে গেছেন, মুক্তিযুদ্ধের পরও লিখে গেছেন মুক্তিযুদ্ধের গান।

তবে কেবল দেশাত্মবোধক গানই নয়, বাংলা গানের সবগুলো জনরা’তেই সমান দক্ষ ছিলেন তিনি। রেডিও, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র – তিনটি মাধ্যমেই সমান মুন্সীয়ানায় গান লিখে গেছেন টানা ছয় দশক ধরে। গান লিখেছেন বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রসিদ্ধ প্রায় সকল শিল্পীর জন্য, কাজ করেছেন প্রসিদ্ধ সকল সংগীত পরিচালকের সঙ্গে। অ্যান্ড্রু কিশোর যেমন এই দেশের সবচেয়ে পেশাদার গায়ক ছিলেন যিনি কারো সাথেই আলাদা করে জুটি না গড়ে সবার সাথে সমানভাবে কাজ করে গেছেন, একইভাবে গাজী মাজহারুল আনোয়ারও বাংলাদেশের সবচেয়ে পেশাদার গীতিকার ছিলেন, যিনি বিশেষ কারো সাথে জুটি গড়েননি, কারো প্রতি পক্ষপাতিত্ব করেননি, পছন্দের ব্যাপারে কাউকে কারো চেয়ে এগিয়ে রাখেননি। কাজ করে গেছেন সবার সাথে, গান লিখেছেন সব মেজাজের। সিনেমার ক্ষেত্রে নির্মাতাদের চাহিদা হুবহু বুঝে নিয়েছেন, একশোভাগ পূরণ করেছেন। এতটা ধৈর্য, এমন সৃজনশীলতা, এত বেশি আত্মনিবেদন, এমন আবেগ নিয়ে, ভালোলাগা নিয়ে, দায়িত্ব নিয়ে তাঁর আগে-পরে আর কেউ এই ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করেছেন বলে আমার জানা নেই।

এই জগতে কাজ করতে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতা এত বেশি হয়েছে যে, গীতিকার পরিচয় নিয়ে আমি মোটেই গর্ব অনুভব করি না। তবে এই মানুষটিকে নিয়ে আমার সীমাহীন গর্ব – আমি সেই ভাষায় গান লিখি, সেই দেশের সেই ইন্ডাস্ট্রির জন্য, যে দেশের প্রধান গীতিকারের নাম গাজী মাজহারুল আনোয়ার। তাঁকে আমি সামনাসামনি দেখেছি বেশ কয়েকবার, নানান অনুষ্ঠানে তাঁর সাথে সালাম বিনিময়ের সৌভাগ্য হয়েছে, তিনি স্মিত হাসিতে সালামের প্রত্যুত্তর করেছেন, কিন্তু এর বেশি আর কোনও কথা কখনও হয়নি। আমি কখনো তাঁর সাথে পরিচিত হতে পারিনি, তাঁর হাত ছুঁতে পারিনি, কেবল একবার তাঁর পা ছুঁয়েছিলাম সোনারগাঁও হোটেলে একটি অ্যাওয়ার্ড ফাংশানে তাঁকে দেখতে পেয়ে। নচেৎ, বরাবর তাঁকে দেখেই আমি শ্রদ্ধায় নত হয়ে গেছি, নত হয়েই থেকেছি। আগবাড়িয়ে তাঁর কাছে নিজের পরিচয় দেয়ার মতো পরিচয় আমার তখনও গড়ে ওঠেনি, এখনও না। আর আজ থেকে তো তিনি আর রইলেনই না এই পৃথিবীতে। কোনওদিন যদি দেবার মতো পরিচয় আমার হয়ও, সেটা তাঁকে জানানোর আর উপায় রইলো না। জীবন্ত কিংবদন্তী থেকে আজ তিনি সত্যিই কিংবদন্তী হয়ে গেলেন!

ওপারে ভালো থাকুন হে অগ্রজ। মহান সৃষ্টিকর্তা আপনার পারলৌকিক অনন্তজীবনকে সুখের করে দিন। আপনার রেখে যাওয়া সাম্রাজ্যের কোনো না কোনো ভাঙ্গা দ্বারে অলস রাতপ্রহরীর মতো ঘুমে-জাগরণে কাটিয়ে দিতে পারবো তাৎপর্যহীন অগুরুত্বপূর্ণ একটা জীবন – এটাও আমার জন্য কম সুখের নয়। আপনি আমার আভূমি ভক্তি স্বীকার করুন।

ট্রিভিয়া:
১. গাজী মাজহারুল আনোয়ার ছিলেন জহির রায়হানের সবচেয়ে পছন্দের গীতিকার। তিনি জহির রায়হানের কাচের দেয়াল, বেহুলা, দুই ভাই, জীবন থেকে নেয়া ইত্যাদি ছবিতে গান লিখেন। ১৯৬৮ সালে জহির রায়হান তাঁকে একটি ছবির জন্য ৭টি গান লিখে দিতে বলেন, যার জন্য তিনি তাঁকে সময় দেন মাত্র দুই দিন। গাজী মাজহারুল আনোয়ার তখনই লিখতে বসে যান এবং মাত্র দুই ঘণ্টায় সাতটি গান লিখে দেন, যা দেখে হতভম্ব হয়ে যান জহির রায়হান।
২. গাজী মাজহারুল আনোয়ার ষাটের দশকে পড়াশোনা করেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। তবে তিনি পেশাগত জীবনে কখনও ডাক্তারি করেছেন বলে আমার জানা নেই।
৩. মেডিকেল কলেজের ছাত্র থাকাকালীন তাঁর লেখা প্রথম গানে সুর দেন নাজমূল হুদা বাচ্চু, যে গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন ফরিদা ইয়াসমিন।
৪. ফেরদৌসী রহমান, শাহনাজ রহমতুল্লাহ্, সাবিনা ইয়াসমীন, রুনা লায়লা, মাহমুদুন্নবী, মিতালী মুখার্জি, খালিদ হাসান মিলু, কনক চাঁপা, প্রমুখ শিল্পীর সবচেয়ে বিখ্যাত গানগুলির গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার।

গুঞ্জন রহমান : গীতিকার, লেখক। ঢাকা, বাংলাদেশ। 
প্রকাশিত গ্রন্থ- গল্পগ্রন্থ: কে হায় হৃদয় খুঁড়ে
কাব্যগ্রন্থ: সামরিক প্রটোকল
আত্মজৈবনিক: মহিমাগঞ্জ
প্রবন্ধ সংকলন: বাবা – একলা পুরুষ কর্তব্যে (ইবুক)
কাব্যগ্রন্থ: দুঃখ পেয়ো না (ইবুক)
প্রবন্ধ সংকলন: আলো যায় রাত্রি আসে (প্রকাশিতব্য)
প্রবন্ধ সংকলন: ছুটির দিনের কথামালা (যন্ত্রস্থ)
উপন্যাস: ত্রিস্রোতা (প্রকাশিতব্য) । 

বিজ্ঞাপন

 

 

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments