ওরা শুধু আমার মাকে হত্যা করেনি, হত্যা করেছে আমাদের ৩০ বছরের জীবনকাল: সারাহাত সালমা চৌধুরী

  •  
  •  
  •  
  •  

আতিকুর রহমান শুভ: “আমার মা, আমার আম্মি আজ থেকে ৩০ বছর আগে এক বিকেলে আমাকে স্কুল থেকে আনতে গিয়েছিলেন। আমিও আম্মির জন্য বসে ছিলাম। তারপর স্কুলের সব মেয়েরা বাসায় চলে গেলো।আম্মিতো সবার আগে ঢোকেন গেট দিয়ে, আজ কি হলো? অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরে তিন ভদ্রমহিলা এলেন, আমাকে নিয়ে চললেন প্রিন্সিপাল আপা হামিদা আলীর বাসায়। রাস্তায় একজন ফিসফিস করে বললেন, ‘এই সেই মেয়ে যার মা খুন হয়েছে’। কথাটা আমার কানে এসেছিলো। তখনো আমি বুঝতে পারিনি ওনারা আমার আম্মির কথাই বলছেন।” এমন শ্বাস রুদ্ধকর কথা বলছিলেন ৩০ বছর আগের সেই ক্লাস টুতে পড়া ভিকারুন্নেসা স্কুলের ছোট্ট শিশু সারাহাত সালমা চৌধুরী। ১৯৮৯ সালে ২৫ জুলাই স্কুল গেটের অদূরেই নৃশংসভাবে খুন হয়েছিলেন তাঁর মা সাগিরা মোর্শেদ। পুরো ৩০ বছর ধরে সবাই জানতেন ওটা ছিলো ছিনতাইয়ের ঘটনা এবং ছিনতাইকারীর গুলিতেই প্রাণ হারান তিনি। সব ভুল ভেঙ্গে দিয়ে বাংলাদেশের পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন সম্প্রতি তদন্ত শেষ করে বলছেন, ওটি ছিলো পরিকল্পিত খুন। তাঁরা ইতোমধ্যে চার আসামীকে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় নিয়ে এসেছেন। আসামীরা হলেন, নিহত সাগিরা মোর্শেদের ভাসুর বারডেম হাসপাতালের স্বনামধন্য ডাক্তার হাসান আলী চৌধুরী, তাঁর স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহীন, তাঁর শ্যালক আনাস মাহমুদ রেজোয়ান এবং তাঁর পেশেন্ট মারুফ রেজা। জানা গেছে, সকল আসামীই এই হত্যার কথা ১৬৪ ধারায় স্বীকার করেছেন।

সেদিন যে ছোট্ট মেয়েটি স্কুলে মা’র জন্য অপেক্ষা করেছিলো, সেই মেয়েটির বাস এখন অস্ট্রেলিয়ায়। মেলবোর্নের মোনাশ ইউনিভার্সিটিতে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছেন। এখন তিনি নামকরা মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির একজন একাডেমিক। আমরা প্রশান্তিকার পক্ষ থেকে সেই মেয়ে সারাহাত সালমা চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করার পর তিনি প্রশান্তিকার সাথে কথা বলেন।

মায়ের কোলে ২১ দিন বয়সী সারাহাত সালমা চৌধুরী, ছবি: সারাহাত পরিবার

প্রশান্তিকা: আপনার মা’র সাথে শেষ কি কথা হয়েছিলো?
সারাহাত: আমি ছিলাম ভিকারুন্নেসা ডে শিফটের ছাত্রী। আম্মি আমাকে স্কুলে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, ‘ভালো ভাবে পড়াশুনা করো, টিচারদের কথা শুনো’। তারপর আম্মি নানুর বাড়ি যান কিছু খাবার দিতে। বিকেলে আমাকে নিতে আসবেন এটাও বলে গিয়েছিলেন। পরে শুনেছি আম্মিকে বুকে গুলি করার পর রাস্তায় পড়ে যান সে। রিকশাওয়ালা খুনিদের মোটরসাইকেল ধাওয়া করেছেন কিন্তু ধরতে পারেননি। সেসময় রাস্তায় যাওয়ার সময় ডাক্তার রুমি নামে এক ভদ্রলোক আম্মিকে তাঁর গাড়িতে তুলে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে রওয়ানা হন। আমরা সেদিন সন্ধ্যায় হাসপাতালে যখন স্ট্রেচারে আম্মির নিথর মুখটা দেখি সেটা আমি সারাজীবনেও ভুলতে পারবোনা। ডাক্তার রুমি আংকেল বলেছিলেন, আম্মি মারা যাবার আগে বলছিলেন,’মেয়েটা স্কুলে থেকে গেলো’, এইটুকুই।

মা সাগিরা মোর্শেদ

প্রশান্তিকা: আপনারা তিন বোন এখন কে কোথায়?
সারাহাত: আমি মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটিতে, আমার সবার ছোট বোন আম্মি মারা যাওয়ার সময় যার বয়স ছিলো দু’বছর সেও আমেরিকার কান্সাস ইউনিভার্সিটি’র একাডেমিক। আর মেঝো বোনটি সেসময় যার বয়স ছিলো পাঁচ, সে একাউন্টিং ও হিউম্যান রিসোর্সে মাস্টার্স ও এমবিএ করেছে। একটি নামকরা প্রতিষ্ঠানে সে চাকুরীও করেছে। আর আব্বু আছেন। আব্বু আমাদের মা ও বাবা দুই হয়েই মানুষ করেছেন।

প্রশান্তিকা: পিবিআই সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, আপনার মা ছিনতাইকারীর কারনে খুন হননি, তাঁকে খুন করা হয়েছে। এ বিষয়ে কিছু বলবেন কি?
সারাহাত: জি গত ৩০ বছর ধরে মানুষ তাই মনে করতো। কিন্তু আমার নানুমা আমৃত্যু মনে করতেন আমার বড় চাচা বারডেম হাসপাতালের ডাক্তার হাসান আলী, চাচী শাহীন এবং শ্যালক রেজোয়ান এই খুনে জড়িত ছিলেন। আমাদের মনেও প্রশ্ন জাগতো। এমনকি তারা আমার আম্মির জানাযা, কুলখানি থেকে শুরু করে কোন আনুষ্ঠানিকতায় আসেননি। কোনদিন খোঁজ নেননি আমরা কি খেয়েছি বা খাইনি। কোনদিন আমাদের তিন বোনকে মাথায় হাত দিয়ে আদর পর্যন্ত করেননি। তাঁরা একজনকে এভাবে খুন করার পরেও বীরদর্পে চলেছেন। তাদের সামাজিকতা ও আচার আচরণে কখনও অনুশোচনা প্রকাশ পায়নি।

১৯৮৯ সালে দৈনিক ইনকিলাবে সাগিরা মোর্শেদ হত্যার খবর।

প্রশান্তিকা: আপনার মা ও বাবাকে তারা সহ্য করতে পারেননি বুঝা যাচ্ছে, কিন্তু কেনো?
সারাহাত: আমরা দুই চাচা ও তাদের পরিবারের সাথে একই বিল্ডিংয়ে থাকতাম। নীচতলায় থাকতেন বড় চাচা শামসুল আলম চৌধুরী, তিনতলায় থাকতেন হাসান আলী চৌধুরী এবং দোতলায় আমরা। আমার আম্মি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে (আব্বুও একই সাবজেক্ট ও ইউনিভার্সিটিতে পড়তেন) ভালো রেজাল্ট করে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিসে জব করতেন। আর ওদিকে শাহীন চাচীর শিক্ষাগত যোগ্যতা তেমন ছিলোনা। আম্মির আচার ব্যবহার, শিক্ষা ও গুণের কারনে আমার দাদীও আম্মিকে খুব পছন্দ করতেন। এটা ওঁরা সহ্য করতে পারতেননা। অকারণে নানা তুচ্ছ ব্যাপারে তাঁরা আম্মির সাথে ঝগড়া বিবাদের প্রয়াস চালিয়ে যেতেন। একবার তুচ্ছ কারনে হাসান চাচা আমাদের কাজের মেয়ে জাহিনুরকে চড় ও প্রহার করে। তারপর আম্মি ও আব্বুকে তিনতলায় ওনাদের বাসায় ডেকে নিয়ে যান, প্রচন্ড ঝগড়া করেন। সেখানে শাহীন চাচীর ভাই রেজোয়ানও ছিলেন। তারা সবাই মিলেই আম্মিকে শাসায় এবং বলেন, ‘আমরা তোমাকে দেখে নেবো’। এ ঘটনাটি ঘটেছিলো আম্মি খুন হওয়ার আড়াই মাস আগে।

তিন কন্যার সাথে বাবা আব্দুস সালাম চৌধুরী ও মা সাগিরা মোর্শেদ

প্রশান্তিকা: আপনাদের ছোট ছোট তিন শিশুকে আপনার বাবা একা মানুষ করে গড়ে তুলেছেন, আপনার বাবার সেই সংগ্রামের কথা কি বলবেন?
সারাহাত: আমাদের মতো তিন মাসুম বাচ্চাকে মানুষ করে তুলেছেন আমাদের আব্বু আব্দুস সালাম চৌধুরী। তিনি সারাজীবন অসংখ্য ছাত্র পড়িয়েছেন। ছাত্ররা আব্বুকে প্রিয় সালাম স্যার বলে জানেন। যে সংগ্রাম আর কষ্ট সহ্য করে আব্বু আমাদের মানুষ করেছেন সেটা আমরা সারাজীবন বলেও শেষ করতে পারবো না। আম্মি মারা যাবার পরে আব্বু জব থেকে ছুটি নিয়ে একটানা ছয় মাস বাসায় ছিলেন। আমাদের খাওয়া দাওয়া, স্কুল সবই নিজের হাতে করাতেন। কাউকে বিশ্বাস করতেন না। শুধু আল্লাহকে ডাকতেন। সবার ছোট বোনটির বয়স ছিলো দুই বছর। ঘুমানোর সময় মাকে ছাড়া ঘুমোতে চাইতোনা সে। আব্বু আলমারী থেকে আম্মির শাড়ি বা ওড়না বের করে মাথায় ঘোমটা দিয়ে ওকে ফিডারে দুধ খাওয়াতেন। ও আব্বুকে তখন আম্মি মনে করে দুধ খেতে খেতে ঘুমোত। এটা গেলো কেবল ছোট্ট একটি উদাহরণ। আমাদের বড় হওয়া সবই আমাদের আব্বুকেই সামাল দিতে হয়েছে আম্মির মতোন করে। আমরা যাপিত জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি। এর সব কৃতিত্ব আমাদের আব্বুর।আব্বুকে আমরা সকল সময় মিস করি। আব্বু আম্মিকে খুব ভালোবাসতেন এখনও বাসেন। অথচ তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী তাঁকে বেশিদিন পাননি। আব্বুর কি এমন বয়স হয়েছিলো, আত্নীয় স্বজনেরা আব্বুকে আবার বিয়ে করার জন্য বলতেন। আব্বু পাত্তা দেননি। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে আম্মির স্মৃতি আর আমাদের তিন বোনকে আগলে রেখেছেন। আমার আব্বু মানুষরূপী ফেরেস্তা।

প্রশান্তিকা: আমাদের জানা মতে আসামীরা সবাই ধরা পড়েছেন। কিরকম বিচার আশা করেন এখন?
সারাহাত: জি। পিবিআই খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আম্মি হত্যা রহস্য উদঘাটন করেছেন। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আইন ও স্বরাস্ট্র মন্ত্রনালয়ের প্রতি অসীম ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। সেই সাথে মহামান্য হাইকোর্টের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। কারন মামলাটির পূনর্বার তদন্তের জন্য না পাঠালে হয়ত খুনিরা এখনও ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকতো। মাননীয় বিচারপতি এম. এনায়েতুর রহিম ও মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান মহোদয় আঠাশ বছরের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের আদেশ দেন। একই সঙ্গে অসীম ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি পিবিআই’র প্রতি। তাদের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনাটি উম্মোচন করার জন্য। এডভোকেট মোতাহার হোসেন সাজু(সাবেক এটর্নি জেনারেল) যার আন্তরিক প্রচেষ্টার কারনে মামলাটি আবার জনসম্মূখে আসে। এছাড়া মাসউদুর রহমান রানা, দিদারুল আলম সহ সকল সাংবাদিককে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। তাদের কারনে আম্মি হত্যার মামলাটি দেশ ও বিদেশের মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা প্রত্যাশা করি এই মামলার বিচারকার্য দ্রুত প্রক্রিয়ায় শেষ হবে এবং আসামীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হবে। ওরা শুধু আমার মাকে হত্যা করেনি, হত্যা করেছে আমাদের ৩০ বছরের দীর্ঘ জীবন।

বাবার সাথে সারাহাত সালমা চৌধুরী

প্রশান্তিকা: আমরাও চাই দ্রুত বিচারের মাধ্যমে আপনার মা হত্যার বিচার শেষ হোক, তিনি ন্যায় বিচার পান। প্রশান্তিকাকে সময় দেবার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
সারাহাত: আমার আব্বু সারাজীবন চেয়েছেন আমরা যেনো স্বাভাবিক জীবন যাপন করি। আমাদের শিক্ষা যেনো ভালো কাজে এবং জীবন দর্শনে পরিপূর্ণতা লাভ করে। আমরা চাই যত কষ্ট করে আব্বু আমাদের মানুষ করেছেন তার বিনিময়ে তিনি শান্তি ও স্বস্তি পান আমৃত্যু। তিনি যেনো আম্মি হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেন। আপনারা দোয়া করবেন আমার ফেরেশতার মতো আব্বুর জন্য। প্রশান্তিকাকেও ধন্যবাদ আমাদের কথাগুলো শুনবার জন্য।