ক’দিন বাদেই স্বাস্থ্যবিধি কোমায় রেখে চলবে বাড়ি যাওয়ার কাফেলা । পিয়ারা বেগম

  •  
  •  
  •  
  •  

ছোট বেলা মায়ের মুখে একটা গল্প শুনেছিলাম। এক ধনী গৃহস্থ হজ্ব পালন করতে যাবেন। তখনকার দিনে জাহাজে করে হজ্ব করতে যেতে হতো। প্রায় ছয়মাস সময় লাগত। গৃহস্থের ছিল যৌথ পরিবার। আট-দশ জন সন্তানের ভরা সংসার। নাতিনাতকুরে বাড়ি-উঠোন সব সময় থাকত সরগরম। এতদিন সংসারের দায়িত্ব ছিল নিজের হাতে। তার অবর্তমানে তিনি বড় ছেলের হাতে সংসারের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিচ্ছেন। সব ছেলেমেয়েদের উপস্থিতিতে তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত ছেলেকে বললেন – দেখ বাবা, আমার গোলার ধানও খালি কইর না, আমার নাতিনাতকুর গো উপোষ রাইখ না। অর্থাৎ গোলায় ধানও ভরা রাইখ আবার নাতিনাতকুর গো পেট ভইরা খাইতে দিও- এই গল্পটা বলার কারণ, একটু পরেই বলছি।

করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ে প্রতিদিন শনাক্তের ক্ষেত্রে রেকর্ড গড়েছে। মৃত্যুর ক্ষেত্রেও রেকর্ড। অথচ সবার মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজমান। কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার উদাসিনতায় কিন্তু তা প্রমাণ করে না। কারণ, আমাদের অনেকেরই মাস্ক পরায় অনাগ্রহ, হাত ধোয়ায় অনীহা। আর সামাজিক দূরত্বকে থোড়াই কেয়ার করে। কোয়ারেন্টাইনে আপত্তি। অথচ সংক্রমণের উর্ধ্বগতি লাগামহীন ভাবে বেড়েই চলেছে। মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে দেশের প্রথিতযশা, খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। এভাবে বুদ্ধিজীবীরা করোনার ছোবলে ঝরে পড়লে দেশ মেধাশূন্য হয়ে পড়বে। আর সাধারণ মানুষের মৃত্যুতেও পরিবারে নেমে এসেছে চরম হতাশা। কারণ, একমাত্র উপার্জনশীল মানুষের মৃত্যু পরিবারে দুর্ভোগের ভোগান্তি অত্যন্ত মর্মান্তিক! হাসপাতালে কোভিড রোগীদের সংকুলান হচ্ছে না। প্রথম ওয়েভের ভুল থেকে আমরা শিক্ষাকে কাজে লাগাই নি। স্বাস্থ্যবিধি পালনে ঢিলেঢালা মনোভাব আর চরম উদাসীনতাই দ্বিতীয় ঢেউয়ের জয়জয়কার।

সম্প্রতি ভারতের করোনার নতুন সংক্রমণের ধরন-ধারন ও ভয়াবহ পরিণতি দেখে বাংলাদেশে তৃতীয় ঢেউয়ের আশংকায় আতংকিত। এমনটি হলে কী হবে এটা ভেবে অন্তরাত্মা কেঁপে কেঁপে ওঠছে। তাই বলছি, করোনার শিক্ষা, ইতিহাসের দীক্ষা কখনো যেন ভুলে না যাই। ক্ষমতার দম্ভও রুখতে পারে নি করোনা বালাই। প্রতিরোধ একটাই, স্বাস্থ্যবিধি মেনে সংক্রমণ ঠেকাই।
কেন বলছি এই কথা। আমরা জানি, আমাদের শরীর একটি জৈব ইঞ্জিন। ইঞ্জিন নানা কারণে বিকল হতে পারে। বাইরে থেকে শত্রুরা তা আক্রমণ করতে পারে এবং তা করছেও। এগুলো এত ক্ষুদ্র যে, তাদেরকে খালি চোখে দেখা যায় না। যেমন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ফাংগাস, এলার্জেন ইত্যাদি। তবে এগুলো কিছু পানিবাহিত, কিছু বায়ুবাহিত। তবে করোনাভাইরাস মূলত মানুষ বাহিত। তাই মানুষই করোনার বাহক, মানুষই সংক্রামক। তাই কেউ সংক্রমিত করছি, কেউ বা সংক্রমিত হচ্ছি। তাই সন্দেহের উর্ধ্বে কেউই নই। তবে  আশার আলো এই যে, বাহিরের শত্রুর বিরুদ্ধে শরীর নামক সিস্টেমটি একটি ডিফেন্স সিস্টেম বা আত্মরক্ষা মূলক সিস্টেম হিসাবে ( ইমিউন সিস্টেম) কাজ করে। তাই তো লক্ষ-কোটি ইমিউন সেল বা সৈনিক কোষ শরীরের বিভিন্ন অংশে এইসব বহিরাগত অনুজীবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। শরীরের পুষ্টি ঠিক থাকলে, সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে আমাদের সৈনিকরাই জয়ী হয়। শত্রুরা শরীর আক্রমণ করে, এমনকি সারাক্ষণ শরীরে বাস করেও কিছুই করতে পারে না। কোন কারণে, শরীরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন বহিরাগত অনুজীবরা যুদ্ধে জয়ী হয়। তাহলে বলা যায় শরীর একটা যুদ্ধক্ষেত্র। এখানে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধে আমাদের শরীর মূলত একটা জোরদার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা ডিফেন্স সিস্টেম হিসেবে কাজ করছে। যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমাদেরকে সুস্থ রাখার চেষ্টা করছে। অথচ আমরা কজনই বা এই খবরটুকু রাখি! রাখতামই যদি, জানতামই যদি তবে শরীরের মর্যাদা বুঝতাম, এর কদর করতাম। এর প্রতি যত্নবান হতাম। জীবন যখন আমার সুতরাং দেহের সুরক্ষায় আমাকেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমার অস্তিত্ব এই দেহ না থাকলে কিচ্ছু নাই, জৈবিক অস্তিত্ব নাই।

লকডাউনেও থেমে নেই ঈদের কেনাকাটা।

করোনাভাইরাস এসে এতটুকু উপলব্ধি করেছি, দেহের যত্নায়নে আমরা মোটেও সচেতন নই। তাই তো করোনাভাইরাস এতটা ঘায়েল করার সুযোগ পাচ্ছে। আর এহেন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সামাল দিতে সরকার লকডাউন দিতে বাধ্য হচ্ছেন। মূলত কোন নিয়মনীতিই ফলপ্রসূ ও কার্যকরী করতে পারছে না। জানিনা কেন মানুষও অতীতের পথেই হাঁটছে। তাই করোনা সংক্রমণ আর মৃত্যুর লাগামহীন উর্ধ্বগতি ঠেকাতে জনস্বার্থে লকডাউন দেওয়াতে গরীবের চেয়ে বেশী আক্ষেপ ধনীদের। তাদের চাওয়া সেই গৃহস্থের মতোই। সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে চলুক আবার সংক্রমণও ঠেকানো হোক। মূলত প্রকান্তরে এটাই বুঝায়। এই যে প্রতিদিন এত্ত মানুষ মারা যাচ্ছে, আক্রান্তের সংখ্যাও দিনদিন বাড়ছে। রোগীর স্বজনরা হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরেও রোগী ভর্তি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এমন দূর্ভোগের ভোগান্তি শেষে স্বজনদের চোখের সামনে রোগীর করুন মৃত্যুর ঘটতে দেখতে হচ্ছে। তবুও আমাদের হৃদয়কে কেন নাড়া দেয় না? কেন বুঝতে চাচ্ছি না করোনা মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই করোনা প্রতিরোধের একমাত্র উপায়।
করোনার সুনামীর তোড়ে দেশ এখন টালমাটাল। এমতাবস্থায় কিছু  মানুষ বলেছেন, করোনা বলে কিছু নেই। দুঃখ হয় এই ভেবে যে, এমনিতেই সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি পালনে সচেতন করে তোলা যাচ্ছে না। তার ওপর তথাকথিত উচ্চ শিক্ষিত লোকেরা অনেকের মধ্যে অপরিসীম কুসংস্কার ও অবৈজ্ঞানিক চিন্তা-চেতনা বিরাজমান। শিক্ষাবঞ্চিত সাধারণ মানুষ হয় তো সংস্কারের নিগড়ে আবদ্ধ থাকে এটা স্বাভাবিক ভাবা যায়। কিন্তু শিক্ষিত লোকের যুক্তিহীন কথাবার্তার অর্থ ভেবে নিজেরাই লজ্জিত হই।

আসছে ঈদুল ফিতর। কেনাকাটায় শপিংমল খোলার জন্য এখনই তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। তারপর আসবে ঈদে গ্রামে যাওয়ার হিড়িক। কে শুনবে কার কথা, কে বুঝবে কার ব্যথা। স্বাস্থ্যবিধি কোমায় রেখে চলবে বাড়ি যাওয়ার কাফেলা। করোনাভাইরাস মজা লুটে  সংক্রমণ ছড়াবে এটা নিঃসন্দেহ বলা যায়। তাই তো বলছি, সেই গৃহস্থের মতো চাওয়া, সবকিছুই চলুক আগের মতই আবার করোনাও নিয়ন্ত্রণ হোক। ভাবছি, এই কোন দেশে বাস করছি আমরা?

পিয়ারা বেগম
কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক
বাংলাদেশ।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments