কবি এবং শব্দ বিন্যাস -রাজীব হাওলাদার

  •  
  •  
  •  
  •  

কবি এবং শব্দ বিন্যাস
রাজীব হাওলাদার

ভেবেছিলাম পুরো বই মেলা ঘুরে ঘুরে,
তোমাকে এনে দেব সেই সব শব্দ, যারা মেঘেদের পথে হেঁটেছে।
অথচ পলাতক সময় দিল ফাঁকি,
এসে দেখি বর্ণমালার বর্ণিল মেলা শেষ হয়ে গেছে।
বিষাদে নিমগ্ন চোখে চেয়ে আছি মেলার বন্ধ দুয়ারে,
বই বিতান গুলো সবে গোছাচ্ছে নিজেদের।
অস্থির মন, খোয়া গেছে সাজানো সব ভাবনা,
ভাবছি এবার না হয় মেঘদুত দেব হাতেতে তোমার।
চেয়ে দেখলাম শুধুই বাঁশের বেড়া আছে মেলার মাঠের প্রহরায়,
তবুও একটু এদিক অদিক ঘুরে ফিরে।
বেড়ার ফাঁকার ভেতর দিয়ে পুরো শরীর ঠেলে দিলাম,
মেলার মাঠের ধুলো ভরা ঘাসের পরে।
ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়াতেই দেখি অদূরেই কবি দাঁড়ানো।
হাতে সিগারেট, শান্ত – স্থির, দাঁড়িয়ে আছে আলোর ছায়াতে ।
চোখেতে বিস্ময়, আর অযাচিত স্বপ্নসুখ ঘিরিল আমায়।
যেন মহাশূন্যের সব সুখ এইক্ষণে মোর হাতের মুঠোতে।

অলংকরণ: আসমা সুলতানা মিতা

চোখের একটু দুরেই শব্দ মানব, তবুও যেন আকাশ ছোঁয়া দূরত্ব,
হাজারো বিভাজন আত্মার ভেতরে, কি কথা যে তাকে শুধাই।
ঝড়ের মত সব দূরত্ব ঠেলে দিয়ে মুখোমুখি এসে দাঁড়ালাম।
এক নিঃশ্বাসে বললাম স্মারক স্বাক্ষর চাই, তোমার স্মারক স্বাক্ষর চাই।
তারপর নেশাগ্রস্থের মত অজস্র অক্ষর উঠে এল ঠোঁটে,
কবি তুমি কি জান! তোমার শব্দের ছায়া আমার পুরোটা শব্দ রাজ্যে।
সেথায় নিয়ে যেতে চাই তোমার উদ্ধৃতি চিহ্ন,
সেই বর্ণীল বর্ণ রাজ্যে নিয়ে যেতে চাই তোমার স্মারক স্বাক্ষর ।

কবি বলল – হয়ত তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম আমি,
তুমি এলে, তোমার খাতায় ঠুকে দেব আমার উত্তরাধিকারী নাম।
তারপর অট্টহাসিতে বলল না না খাতা নয়, বই কিনে আন।
জান তো! বিক্রি বিহীন শব্দ গুলোর কপালে থাকে অজস্র বদনাম !
ব্যস্ত পা গুলো আমাকে নিয়ে গেলো কাছের বই বিতানে,
খুঁজতে হলনা, কবির নতুন বই হৃদয়ের শব্দ বিন্যাস ধরা দিল চোখেতে।
অর্থের লেনদেনে হাতের মুঠোতে চলে এল শব্দ বিন্যাস,
মোড়কে বন্দী শব্দ রাশি দিলাম শব্দ স্রস্টার হাতে।
কিছুক্ষন মলাটে হাত বুলিয়ে, বইয়ের পাতা খুলল।
তারপর অজানা কোন ভাবনাতে থমকে গেল ছোট্ট দীর্ঘশ্বাসে ।
সেইক্ষনে আমার বুক পকেটের কথাগুলো বেপরোয়া হয়ে বলল,
কবি তোমার কাছে আমার আরও কিছু চাইবার আছে।
চোখ তুলে তাকাল সে, কি দিতে পারি তোমায় ?
আছে কি সেসব আমার সাধ্য সীমায়! যেসব তুমি চাইবে!
বললাম – চাই অলৌকিক বীজমন্ত্র কিংবা সমীকরণ,
যে বীজমন্ত্রে অফুরন্ত এবং অপার্থিব বর্ণমালা জন্মাবে।
যে বর্ণমালা শূন্যতার শরীরের গল্প বলে দেবে,
বলে দেবে কি কথা বিনিময় হয় – গভীর রাত্রির তটিনী তরঙ্গ আর নীলিমায়।
জন্ম দেবে অলীক রঙের সেই সব শব্দ,
যারা বিরহের জলের ধারা মুছিয়ে দেবে অসীম মমতায়।
যে বীজমন্ত্রে অন্তহীন শব্দ জন্মাবে, থামাতে অন্তহীন যুদ্ধ।
প্রেমময় শব্দ রাশি জন্মাবে, থামাতে ধরিত্রির সব রক্তক্ষয়।
জটিল সমীকরণ আশা যোগাবার আষাঢ়ে গল্প দেবে,
বাঁচার পথ দেখাবে, যেথায় জীবনের রেখা বন্দী থাকে দীনতায়।
এমন সমীকরণ চাই, যে বিভেদের রাত মুছে দেবার শব্দ দিতে পারে,
বলে দিতে পারে অভিমানের শব্দ, আছে যাহা চোখের আড়ালে।
এমন বীজমন্ত্র চাই, যে অন্ধকারের জীবন-কথা বলে দিতে পারে,
এমনকি বলে দিতে পারে, যা কিছু আছে তোমার দীর্ঘশ্বাসের আড়ালে।
কিছুক্ষনের নীরবতা শেষে কবি চোখে চোখ রেখে বললেন,
নিস্তব্দ করে তোমার পৃথিবী মুছে ফেল মায়া, ভালবাসা কিংবা তোমার তুমিকে।
তারপর মনের চোখ রাখো মনের গভীরে,
দেখতে পাবে বিচিত্র সব শব্দ আলগোছে ঘিরে আছে এই তোমাকে!
খটকা লাগলো! সত্যিই কি তাই!
আবার কবি বাক্যে বিশ্বাস টা অন্ধত্বের ঊর্ধ্ব সীমায়।
সংশয় ঘোচাতে, নিমিষে ডুব দিলেম নিজের ভেতরে,
খুঁজে পেতে চাই, কি আছে হৃদয়ের গহীন ঠিকানায়।
বিস্ময় কেড়েছে চোখ,
অজস্র শব্দ বিচিত্র আলপনায় দাঁড়িয়ে আছে।
যে সব শব্দ রাশির ভেতর হেঁটেছি এতটা বছরে,
বিচিত্র সব রঙে তারা যেন পূনর্বার জন্ম নিয়েছে।
আত্ম ধ্যান ভেঙ্গে ফিরে দেখি কবির ঠোঁটে ঈষৎ হাসি,
আর সেইক্ষনে কি এক অজানা প্রলোভন ডাক দিল আমায়।
অতৃপ্ত অন্তর বলে উঠল আরও কিছু চাই যে আমার,
মাতৃগর্ভের মত সুর চাই, বল কবি – দেবে কি আমায়!
অজস্র সুরের জন্ম হবে যে সুরের ধারায়,
জননীর মত সেই সুর দিতে পার কি আমায়!
যে সুর ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে সব জীর্ণতা,
মুছে দিতে পারে সেই গান, যা লেখা হয় হিংসার ছায়ায়।
অলৌকিক মায়া থাকবে সেই সুরের গভীরে,
সুরের মায়ায় বারুদের গন্ধ মুছে যাবে।
সে সুরের মায়ায় বন্দুকের নল বাঁশির মত বাজবে বিচিত্র ভঙ্গিতে,
আর প্রেমের তরঙ্গে সৈনিকের মন দোলাবে।
চাইছি যখন এই অদ্ভুত সুর,
কবি তখন অন্যমনে লিখছে কিছু হৃদয়ের শব্দ বিন্যাস এর উপরে।
চোখ না তুলেই বলল, যদি শব্দ সন্ধানে যাও তবে কান পেত হৃদয় গগণে।
অবিন্যস্ত সুর পেতেও পার আপন অন্তরে।
এবার সংশয় নেই আছে প্রলোভন, শুধালাম তাকে – কোন রং নেই
অথচ আঁকতে চাইছি একটা জলপদ্ম, জল দীঘির ক্যানভাসের উপরে।
সামনের দিকে পা বাড়িয়ে বলল – যা কিছু চাইছ সবই আছে তোমার নিজের ভেতরে।
তারপর কবি যেন মিলিয়ে গেল নিয়ন আলোর গভীরে।
আমার চোখ চেয়ে রইল কবির চলে যাবার পথে ,
আর তার উদ্ধৃতি চিহ্ন রইল বইয়ের পাতার উপরে।
সেথায় লেখা – পদ্ম দীঘিতে স্নান সেরে তোমার পদ্মের চোখে চাহিও,
তোমার হৃদয়ের শব্দ বিন্যাস আছে সে চোখের গভীরে …