করোনাকালীন ঈদের পশুহাট, পরিবহন ও সরকার । রণেশ মৈত্র

  •  
  •  
  •  
  •  

বাংলাদেশে করোনা পরীক্ষার ফি ধার্যের পর থেকে ক্রমান্বয়ে পরীক্ষার সংখ্যা কমতে থাকে। দিন দিন তা কমতে কমতে বর্তমানে তা এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস পেয়েছে। হ্রাস পাওয়ার প্রক্রিয়াও অব্যাহত আছে। এভাবে কমতে থাকলে আগামী দুই তিন সপ্তাহের মধ্যে তা পূর্বের তুলনায় অর্ধেকে নেমে আসতে পারে। স্বভাবতই তার ফলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের নৈমিত্তিক ব্রিফিংয়ে সংক্রমণের সংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যাও কমে আসতে থাকবে। গত ১৫ জুলাই ৩৩ জনের মৃত্যু দেখানো হয়েছে, যা মানুষের মনে আনন্দ সৃষ্টি করার স্থলে করেছে গভীর উদ্বেগের ভীতি। এই ভয়াবহ রোগটির সংক্রমণ পৃথিবীজুড়ে। এমন কি আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী দেশ ভারতেও দ্রুত সংক্রমিত ও মৃত রোগীর সংখ্যা প্রতিদিন আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে কোন জাদুমন্ত্রবলে বাংলাদেশে প্রতিদিনই হ্রাস পাচ্ছে?

দু’মাস আগে এসেছিল এ বছরের প্রথম ঈদ-উদ-ফিতর। মাঠে নামাজ নিষিদ্ধ করা হলো। মসজিদে জামাত নিয়ন্ত্রণ করে আদেশ দেয়া হলো। গণপরিবহন বন্ধ রাখা হলো। তবু মানুষ নানা চ্যানেলে লাখে লাখে ঢাকা ছাড়ল নিজ বাড়িতে প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেয়ার আশায়।
কিন্তু যা কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল তা মানুষ কতটা পালন করেছিল, সে তথ্য কারও কাছে নেই। কিন্তু করোনা দিব্যি ছড়িয়ে পড়েছিল জেলায় জেলায়, গ্রামে-গ্রামান্তরে। তার ফলে জুন মাসে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেল। সরকারও তার স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিন্তু এবারের ঈদ-উল-আজহায় সরকারের পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত চিন্তাশীল ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মনে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। যেমন: এক. কোরবানির পশুর হাটের অনুমতি দেয়া হলো। তবে বলা হলো ঐ হাটগুলো যেন ঘন বসতিপূর্ণ এলাকায় না বসানো হয়। যেন বিক্রেতারা সবাই পরস্পর থেকে উপযুক্ত মাপের দূরত্ব বজায় রাখেন। ক্রেতারাও যেন পরস্পর থেকে পরস্পর নির্ধারিত দূরত্ব বজায় রেখে ঐ হাটগুলোতে চলাফেরা এবং কেনাকাটা করেন। হাটের ইজারাদারেরা যেন ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাটগুলোতে ঢুকবার এবং বের হওয়ার পথে
তাদের জন্য উপযুক্ত পরিমাণ হাতধোয়ার পানি ও সাবান মজুদ রাখেন। সকলেই যেন অধিকতার স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে যত্নবান হয়ে পকেটে হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখেন। সকলে বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক ও হ্যান্ডগ্লাভস পরে হাটে যাতায়াত করবেন।

পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সরকারের এই সিদ্ধান্ত করোনার ভয়াবহতা বিবেচনায় মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে আরও কোটি কোটি মানুষ একমত। কারণ, যতই সরকার বলুন না কেন, হাট বড় বড় সড়কের পাশেই বসবে। সরু রাস্তা দিয়ে তো পশুবাহী ট্রাক বা ভারি গাড়ি যাতায়াত করতে পারবে না। শুধু ঘনবসতি এলাকায় হয়তো হাট বসতো না, যদি স্পষ্ট করে সরকারীভাবে বলা হতো যে, নগর, জেলা ও উপজেলা শহরগুলোর রেকর্ডেড এলাকার মধ্যে পশুহাট বসানো যাবে না। কিন্তু সরকার তা না বলায় ঐ নির্দেশ যথাযথভাবে পালিত হবে না, একথা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়।
অপরাপর শর্তগুলো যেমন, ক্রেতা-বিক্রেতাদের পরস্পর পরস্পরের মধ্যে পশু হাটগুলোতে সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, প্রত্যেকে বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভস পরে যাওয়া, হাটগুলোতে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে উপযুক্ত পরিমাণ পানি ও সাবান রাখা এবং সকলেই হাটে ঢুকতে ও বের হওয়ার সময়ে যেন বিধি মোতাবেক হাত ধুয়ে নেন ও সকলে পকেটে স্যানিটাইজার রাখা যে আদৌ ঘটবে না, তা অগ্রিম বলে দেয়া যায়। উদাহরণ হিসেবে আমরা নৈমিত্তিক দেশব্যাপী যে সকল হাট-বাজার বসে তার অভিজ্ঞতাকে স্মরণে আনতে পারি। স্বাস্থ্যবিধিগুলো মানতে হবে একথা অন্তত টেলিভিশন চ্যানেলগুলো প্রতিদিনই দফায় দফায় প্রচার করে চলেছে। ওগুলো দেখছেন গ্রাম ও শহরের অসংখ্য মানুষ। কিন্তু তারা কি সেগুলো মেনে চলছেন?
তাই নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, সরকারের ঐ নির্দেশগুলো প্রতিপালিত হবে না দু’একটা ব্যতিক্রম ছাড়া। ফলে করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়বে বৈ কমবে না। স্বাস্থ্য বিধিগুলো মানার দায়িত্ব যেমন নাগরিকদের, তেমনই আবার তা মানানোর দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের ওপর নিশ্চিতভাবেই বর্তায়। ঐ কর্তৃপক্ষরা হলেন সরকার, সিটি কর্পোরেশনসমূহ, পৌরসভাসমূহ, জেলা ও উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদসমূহ। কিন্তু কার্যত হয়তো দেখা যাবে যেহেতু তাঁরা হাটগুলোর ইজারা দিয়ে ইজারাদের কাছ থেকে বিস্তর টাকা নিয়েছেন, তাই তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে সকল আয়োজন করা থেকে বিরত থাকবেন। এমতাবস্থায় পুলিশই একমাত্র ভরসা হতে পারে যদি সরকার পুলিশকে সকল পশুহাটে ক্রেতা-বিক্রেতা সকলকে স্বাস্থ্য বিধিগুলো দৃঢ়তার সঙ্গে মানাতে বাধ্য করার জন্য কড়া নির্দেশ দেন। এ যাবত অবশ্য হাটবাজার নিয়ন্ত্রণে বা বিভিন্ন রেডজোন এলাকায় লকডাউন কার্যকর করতে তেমন একটা কঠোরতা এমনকি খোদ রাজধানী শহরেও দেখা যায়নি।

এরপর আসা যাক গণপরিবহন চলাচল সম্পর্কিত সরকারী সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে। মাত্র কয়েক দিন আগে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত হতে দেখা গেল, এবারের ঈদে গণপরিবহন চলবে না। সরকারী-বেসরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কেউ নিজ এলাকায় যাবেন না। সকলকেই ঢাকা শহরে থেকেই ঈদ পালন করতে হবে। পরদিনই চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত হলো গণ-পরিবহন চলবে।
এখন প্রশ্ন জাগে, ঢাকা শহরে যারা বসবাস করেন তাদের বড় অংশই সরকারী-বেসরকারী কর্মকর্তা। এবারের ঈদে সরকারী ছুটি থাকবে মাত্র তিনদিন এবং কিছুতেই তা আর বাড়ানো হবে না বলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। যদি সকল সরকারী-বেসরকারী কর্মচারী-কর্মকর্তা ঢাকাতেই ঈদ করেন, তাহলে নিশ্চয়ই তারা ঢাকায় অবস্থানরত পরিবার-পরিজনসহ ঢাকাতেই ঈদ করবেন।-ঢাকার বাইরে কোথাও যাবেন না। আর থাকেন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্রছাত্রী এবং কর্মচারীবৃন্দ। এঁদের সংখ্যাও একেবারে কম নয়। কিন্তু যেহেতু সকল সরকারী-বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চার মাস যাবত বন্ধ এবং কত দিনে তা খুলবে তা অনিশ্চিত, তাই তাদের মধ্যে যাদের বাড়ি ঢাকার বাইরে তারা তো বহু আগে থেকেই নিজ নিজ শহর বা গ্রাম এলাকায় গিয়ে বসবাস করছেন। তাই তাদের মধ্যে খুব অল্প সংখ্যকই ঈদে ঢাকার বাইরে যাবেন।

কলকারখানা তো বেশির ভাগই বন্ধ। সুতরাং সেগুলোতে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীরা গ্রামের বাড়িতে অনেক আগেই চলে গেছেন। কয়েকটি কল-কারখানা খোলা আছে, সেগুলোর শ্রমিক-কর্মচারীরা যদি হাল বকেয়া বেতন- বোনাস পান, তবেই তো ঈদ করতে বাড়ি যাবেন। যেহেতু বেতন-ভাতা প্রাপ্তি অনিশ্চিত, তাই নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যায় না। তবে সব কিছু প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও কিছু সংখ্যক ঢাকার বাইরে অবশ্যই যাবেন।
আর যাবেন ব্যবসায়ীদের পরিবারপরিজন। তাই ওপরে বর্ণিত হিসাব যদি মোটামুটি সঠিক হয়, তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় যাত্রী চলাচল কম ঘটার কথা। যেহেতু যাত্রী কম হবে এবং তদুপরি স্বাস্থ্য বিধি মেনে অর্ধেক সংখ্যক যাত্রী নিয়ে চলতে হবে-তাই মালিকরা যে ভাড়া তিনগুণ বাড়িয়ে দেবেন, তাতে সন্দেহ নেই। সরকার এ ব্যাপারে প্রতিবারেই হুঁশিয়ারি দিয়ে থাকে। এবারও দেবে। কিন্তু ফল ফলবে না তাতে অতীতের মতই।

যে সংখ্যক যাত্রী এবার চলাচল করবেন তাদের ঘড়ে বাড়তি ভাড়া বহনের বোঝা না চাপিয়ে এবং বেসরকারী পরিবহনগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মানার নিশ্চয়তা না থাকায় যে বাড়তি ঝুঁকি,-তা এড়াতে বেসরকারী সড়ক পরিবহন বন্ধ রেখে বিআরটিসির সকল একতলা-দোতলা বাস বিভিন্ন রুটে ঈদের এক সপ্তাহ আগে থেকে এক সপ্তাহ পর পর্যন্ত চালানো হোক। তাতে যাত্রীরা বাড়তি ভাড়া বহন এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার সুযোগ পাবেন। না হলে, যদি বেসরকারী পরিবহনই সার্বিক দায়িত্ব পালন করে তবে ঐ স্বাস্থ্যবিধির বিড়ম্বনা বাদ দিয়ে গাড়ি ভর্তি যাত্রী নিয়ে মার্চের আগের ভাড়ায় চলার ব্যবস্থা করা হোক,-যাত্রীদের স্বার্থে।

এবারে আসা যাক করোনা প্রসঙ্গে। সংক্রমণ ও মৃত্যু কমছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক রেড ক্রস বার বার উদ্বেগ প্রকাশ করছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে করোনার অবনতি ঘটতে পারে। তাই সৌদি আরবে হজ সীমিত করার মতো এবার ঈদে কোরবানি সীমিত করলে এবং গণপরিবহন বন্ধ রাখলে কি করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধ সহজ হতো না? এর ফলে সরকারের করোনা নিয়ন্ত্রণের কাজগুলোর মধ্যে একটা সমন্বয় সাধিত হতো। মানুষও হতো শঙ্কামুক্ত।

রণেশ মৈত্র
কলামিস্ট ও লেখক
সাংবাদিকতায় একুশে পদকপ্রাপ্ত
raneshmaitra@gmail.com