করোনার দিনগুলোতে দু:স্বপ্ন, হতাশা বা আশা জাগানিয়ার হাতছানি -নাদেরা সুলতানা নদী

  •  
  •  
  •  
  •  

কোভিড১৯ বা করোনাভাইরাস মহামারিতে বিশ্বজুড়ে প্রায় প্রতিটা দেশের মানুষআক্রান্ত হচ্ছে। এই লেখাটি প্রকাশ কালে সর্বশেষ করোনা আক্রান্তের তথ্য:

বিশ্ব: মৃতের সংখ্যা ৩২১৩৭, মোট আক্রান্ত ৬৮৫৬২৩জন, সুস্থ ১লাখ ৪০ হাজার।

অস্ট্রেলিয়া: মৃতের সংখ্যা ১৮; মোট আক্রান্ত ৪১৬৩; ক্যানবেরা তাসমানিয়ায় আশি উর্ধ দুজনের মৃত্যু।

বাংলাদেশ: মৃতের সংখ্যা , আক্রান্তের সংখ্যা ৪৮, সুস্থ ১৫ জন। গত ২৪ ঘন্টায় টেস্ট করা হয়েছে ১০৯ জনকে।নতুন রোগী সনাক্ত হয়নি। (সূত্র: আইইডিসিআর এবং জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটি)

করোনা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশান্তিকায় লিখছেন চিকিৎসক, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং সচেতন নাগরিক এবং নিয়মিত লেখকেরা আজ লিখেছেন প্রশান্তিকার সহযোগী সম্পাদক নাদেরা সুলতানা নদী।

নাদেরা সুলতানা নদী

ফেবরুয়ারীর কোন একটা সময় থেকেই বোধ হয় আমরা জানতে পারি। করোনা নামে একটা ভাইরাসের সাথে অবিরাম যুদ্ধ করছে চীন। আমাদের প্রতিদিন মন খারাপ হতে থাকে কিন্তু ভয়াবহতা তখনও পুরো বিশ্ব ওভাবে টের পায়নি। তারপর প্রতিটা দিন, সকাল আসে অনাকাঙ্ক্ষিত হয়ে।

মার্চের শুরু থেকে অস্ট্রেলিয়া এবং বাংলাদেশের খন্ড চিত্রে উঠে আসতে থাকে এবং বুঝতে না বুঝতেই চোখের সামনে প্রেক্ষাপট যায় বদলে।

একদম শুরুতে অবস্থা যা ছিল তা থেকে আজকের এই সময় শেয়ার করছি আমার অভিজ্ঞতায়। আজ থেকে কয়েক যুগ পর বা কে জানে কালই হয়তো এই সময়গুলোই হয়ে উঠবে ইতিহাস।

একটু বলে নেই, মানুষ হিসেবে কিছু সময় আমি খুব নির্লিপ্ত টাইপের। প্রাকৃতিক কোন বিপদে খুব ভয় পেয়ে যাওয়াটা কেন যেন নেই আমার ধাঁতে। মরে যাচ্ছি এখনই, এমন অবস্থা হলে পরে (দুই/একবার হয়েছেও এমন) নিজের প্রিয় মুখগুলোকে মিস করতে করতে একটূ অসহায় যে লাগেনা তা অস্বীকার করছিনা, ওইটুকুই!
মার্চের শুরু থেকে ‘করোনা’ ভয়ে আতংকের অবস্থা চতুর্দিক থেকে উঠে আসছে। আমি আমার কাজ, সংসার, একান্ত জগত নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত ছিলাম, লম্বা সময় ধরে এই আতংক নিয়ে যে বসে থাকবো সে উপায় সে সময় অবদি ছিলোনা।
শুরুতে অস্ট্রেলিয়াতে অবস্থা ভয়াবহ না হলেও আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে জানলাম, চিকিৎসা হচ্ছিলো। তবে মিডিয়া বরাতে যে খবর বারবার উঠে আসছিল তা হচ্ছে, কিছু প্রোডাক্ট ক্রাইসিস দেখা দিয়েছে পুরো অস্ট্রেলিয়ায়।
অস্ট্রেলিয়ার বাইরে আছেন আত্মীয় পরিজন, বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে ফোনে কথা হলে বা ইনবক্সে অনেকেই জানতে চান, কেমন আছি, টিস্যু আছে কিনা, আমার বাসায়, পর্যাপ্ত।

আসলে অনেকের মত আমি ও আমার পরিবার দুই/তিন বেলা যেমন খাবারের চাহিদা, ঠিক তেমন লাইফ স্টাইলের সাথে সব রকমের টিস্যু চাহিদা জড়িয়ে আছে ওতঃপ্রোত। মাসে স্বাভাবিকভাবে যা লাগে অল্প কিছু বেশীই কেনা থাকে। গত মাসেও তাই ছিল তাই বাড়তি কিনে আনার প্রয়োজন বোধ করিনি তখনও।
এর মাঝেই দেখলাম, চলতি সপ্তাহ না হলেও আগামী সপ্তাহে লাগবেই। একটা সুপার স্টোরে পার্ট টাইম কাজ করি উইকেন্ডে তাই ভাবছিলাম যখন সপ্তাহান্তে যাব, নিয়ে আসবো।
এর আগে খেয়াল করিনি, হঠাৎ স্টোরে ঢুঁকে দেখি টিস্যু এবং সব রকমের ক্লিনিং প্রোডাক্ট প্লেস একদম ফকফকা। মনটা একটু খারাপ হল।
এর আগের শুক্রবার অফিসেও এইচ আর থেকে এসেছে ইমেইল প্রথমবারের মত সতর্কবিধি। ওটা পড়ে যখন আমি আমার টিমকে শেয়ার করতে গেছি, টিমের সবার মুখে ছিল মিশ্র অনুভূতি। না প্যানিক কেউই না, একজন তো বললো সরি নাদেরা খুব বিজি এই মুহূর্ত ‘করোনা’ নিয়ে পড়ার সময় নেই, পরে পড়ছি। ওকে নিয়ে বাকি সবাই একটু হালকা রসিকতাও করলাম। বললাম, হায় বাস্তবতা কারো কারো মরারও সময় নেই।

অফিস শেষে চলে আসার সময় উইকেন্ডে সবাই যেভাবে হাগ দেই, এই নিয়েও তুমুল মজাই করলো সবাই, মানে না কিছুদিন নো হাগ, ওয়ান মিটার ডিস্টেন্স প্লিজ (একশো হাত দূরে থাকুন)।

মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ, কাজ শেষে, স্টোর থেকে এক প্যাকেট টয়লেট (২৪) রোল আর তিন প্যাক পেপার টাওয়েল নিয়ে এলাম। স্টোর বন্ধ, ওটা নিয়ে পার্কিং এ হাঁটছি। আমার আশেপাশে থাকা দুই চারজন ক্রেতা এমন দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে এই প্রথম আতঙ্কিত হলাম। এক কৃষ্ণকায় কিশোর দেখি উল্টো দিক থেকে দৌড়ে আসছে ভেতর থেকে চুপসে গেলাম, হায় আল্লাহ‌ হচ্ছেটা কী, না ও আমার দিকে তেড়ে আসছেনা, স্টোর বন্ধ হয়ে গেছে কিনা তাই জানতে চাইছে ।
(গাড়িতে উঠার আগে কিছুটা বিধ্বস্ত তারপরও মনে হল এই অনুভবগুলো শেয়ার করবো সময় পেলেই, তাই করা, ফেসবুকেই রেখেছিলাম ছবিসহ আপডেট)

মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে অবস্থা প্রতিদিন পুরো বিশ্ব জুড়েই খারাপ হতে লাগলো। লিখবো কিছু মনকে স্থির করে উঠতে পারছিলামনা। যে যার মত করে সীমিত করছি জীবন, পৃথিবী জুড়েই।

এই সময়ে নিজের অজান্তেই প্রায় সবার মনই বিক্ষিপ্ত হতে থাকে। মনে হচ্ছিলো, বেঁচে আছি সুস্থ আছি, এটাই যেন একটা ব্লেসিংস, প্রতিদিন এই ভাবছি নুতন করে, অনুভব করছি প্রিয় মুখগুলোকে ভীষণ করে, মনে প্রাণে প্রার্থনা… ‘হে পৃথিবী’ আর নির্দয় হইয়োনা, কোন ভাইরাস লাগবেনা এমনিতেই যে যেখানে আছি নি:শ্বাস বন্ধ করে মরে যাব।

বিশ্ব মিডিয়া বরাতে প্রতি মুহূর্তেই আমরা জানতে পারছি করোনা ভাইরাসে আতংকে আছি সবাই পৃথিবীর যে যেখানে। সব জায়গা থেকে শুধু খারাপ খবরই উঠে আসছে, চীন কাটিয়ে উঠছে তো, ইতালী, স্পেন,  লন্ডন, কানাডা, আমেরিকায় প্রতিদিন আরো খারাপ কিছুই, বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল।

যাদের জানা নেই, আমি আছি অস্ট্রেলিয়ার, ভিক্টোরিয়ার মেলবোর্ন শহরে।
খবর দেখে শুনে মন অনেক বেশীই বিমর্ষ হয়ে উঠছে। সময়ের প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে নিজের লাইফ স্টাইল বদলে দিলাম। বিশেষ করে মিডিয়ায় করোনা নিয়ে সকল খবর পড়া বাদ দিয়ে। তবে এর মাঝেই বাংলাদেশে মা, স্বাশুরী মায়ের সাথে কথা হলে অনেক কিছু জানি। আম্মা একদিন বলছিলেন অস্ট্রেলিয়া আপডেট বাংলাদেশের টিভি খবরে যা দেখছেন, যা অস্ট্রেলিয়া বসে থেকে আমিও জানতামনা।

অস্ট্রেলিয়া এসে করোনায় আক্রান্ত হন হলিউড স্টার টম হ্যান্কস ও তার স্ত্রী

সব সময়ই পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিয়ম বিধি যা মেনে চলতাম তাই চলছিলাম, তারপরও একটু বেশী সাবধানতা। ট্রেনে ট্রামে চড়তে হয়, একটু দম আঁটকে চলছিলাম, যে কদিন চলেছি। ধারে কাছে কেউ কাশি দিলে চারপাশে সবাই এক ধরণের অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে কিংবা দেখেনা হয়তো মনে হয় সবাই দেখছে।
অস্ট্রেলিয়াতে প্রথমবারের মত মিডিয়াতে উঠে আসা হলিউড তারকা টম হ্যাঙ্কস এবং তাঁর স্ত্রী রিটা ভাইরাসে আক্রান্ত শুনে বেশ দমে গেলাম। মনে হল পৃথিবীটা কী আসলেই এতোটা অসহায় হয়ে আসছে! কে কোথায় নিরাপদ, আদৌ কি কেউ নিরাপদ আজ, কে জানে?
মার্চের তৃতীয় সপ্তাহের সোমবার অফিস ট্যুর ছিল আমার, টিকেট কনফার্ম করার আগ মুহূর্তে মনে হল একটু অপেক্ষা করি । এর আগের শুক্রবার সবাই মন মেজাজ ভালো নিয়েই অফিস শুরু করলাম, কাজ শেষ করবো তাড়াতাড়ি ফিরবো বাড়ি এই মোটিভেশনে। এর মাঝেই বেশ কিছু ব্রেকিং নিউজ, কানাডা প্রধানমন্ত্রীর উয়াইফ এবং দিনশেষে অস্ট্রেলিয়ান একজন মন্ত্রী। অফিস ট্যুর সিডনী আপাতত যাচ্ছিনা করলাম ক্যান্সেল ট্যুর!
অফিসে খুব বিজি ছিলাম, কাজের মাঝে থাকতে সব সময়ই ভালো লাগে। কিন্তু কেমন যেন অজানা একটা উৎকণ্ঠা কাবু করছিল। বিভিন্ন অফিসিয়াল কমিউনিকেশনে চলেও আসছিল এই করোনা প্রসঙ্গ।
কাজ শেষে বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় ট্রেনে ফিরছি, কেন যেন কান্না পাচ্ছিলো। আমার একমাত্র ছেলে, নভঃ, কাছে দূরের প্রিয় প্রিয় ভালোবাসার মুখগুলো, মিছিলের মত মাথায় এসে জড় হতে থাকলো, অজানা আশঙ্কায় দুলছিলো বুক।
এই জীবনে এমনিতেই কত কাছের মানুষের সাথে আর দেখা হবেনা। তারপরও কেন যেন মন হঠাৎ খুব বেশীই কেমন করে উঠলো এই ভেবে।
বাসায় ফিরে, আমার ১৫ বছরের ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বললাম, বাবা অবস্থা যেকোন সময় যে কারো খারাপ হতেই পারে, হলে পরে অনেকদিন জড়িয়ে ধরা যাবেনা আজ একটু বসে থাকি আয় বাবা, ছেলে মুখ কেমন কেমন করে বসে পাশে, কী ভাবে জানিনা, আমি বসে থাকি।

না বুঝতে পারছিলাম, শরীর ঠিক থাকলেও মন এলোমেলো হয়েই যাচ্ছে। খারাপ সময় এসেছে, সবাই মিলে সবটুকু মায়া মমতা ভালোবাসার পরশ অন্তত থাকুক। যতটুকু যেভাবে পারা যায়। এই পরবাসে, ফেসবুকের জন্যেই উঠে আসছিলো একে অপরের পাশে দাঁড়ানো সময়ের টুকরো চিত্র, আশা জাগানিয়া, চোখে পানি এনে দেয়ার মত।
আমাদের এক পারিবারিক বন্ধু, অস্ট্রেলিয়ান। এর মাঝেই কথা প্রসঙ্গে বললাম বাসায় টিস্যু বক্স শেষ, ধারে কাছে পাচ্ছিনা, দূরে খুঁজতে যাব সে সময়ও নেই। সে এক রাতে এসে দিয়ে গেল কিছু।

অফিসে ঢুঁকেই দেখি ফ্রন্ট ডেস্ক অফিসার কলিগ স্পেশাল ক্লিনিং টিস্যু দিয়ে টেবিল, পিসি ক্লিন করে হ্যাপি মেসেজের চিরকুট রেখে দিয়েছে এবং অন্য সবার ডেস্কও ক্লিন।
মন খারাপ থাকলেও ভাবছিলাম, বেঁচে থাকলে এমন এই সময়ের এই ছোট্ট ভালোবাসার সব রকমের গল্পগুলো এক সময় লিখবো।
মার্চের ১৫তে এসে দেখা গেল, পুরো পৃথিবী ছড়িয়ে গেছে এই করোনা ভাইরাস এবং তার আতংক। সময়টা খারাপ, কোথাও কোথাও একটু বেশীই খারাপ।
উঠে এল বাংলাদেশ চিত্র।
এ আমাদের অজানা নয়, বাংলাদেশের মানুষের আবেগ প্রকাশ, বিশেষ করে রাগ, দুঃখ, কষ্ট, হতাশা প্রকাশে, মানুষ কি ভীষণ অসহিষ্ণু। কখনও কখনও অবিবেচক বা স্বার্থপরও মনে হয়। আমাদের বেড়ে উঠাটাই এমন যে পরিবার বা সমাজ রাষ্ট্র আমাদের মস্তিষ্ক বা চেতনাকে সেভাবে গড়ে উঠতে সহায়ক না। এ আমরা জানি, কিন্তু মানতে পারিনা মাঝে মাঝেই।
এই সময়ে বিশেষ করে ইতালী ফেরত বা অন্য প্রবাসী যারা দেশে ফিরছেন তাঁদেরকে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে একটা নিদৃষ্ট নিয়মের মাঝে যেতে হবে, এই বিষয়টি কিছু প্রবাসী মানতে পারছেননা বা যেভাবে রিএক্ট করছিল, অনেকেই নানানভাবে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে.. সব দেখে শুনে জেনে খুব মন খারাপের চূড়ান্ত হতে লাগলো।
পুরো বিশ্বের মত বাংলাদেশেও সময়টা যে খারাপ হচ্ছে বুঝতে পারছি। ভীষণ ধৈর্য এবং সাহস নিয়ে কঠোর নিয়ম কিছু সময়ের জন্যে মানতেই হবে এর কোন বিকল্প নেই! পুরো জাতি সেটা রাতারাতি বুঝবেনা নিশ্চয়ই। চাইছিলাম, বাংলাদেশের যে বা যারা এই প্রক্রিয়াটিতে থাকবেন তাঁদের জন্যে খুব খুব মানসিক শক্তি দিয়ে এটা মোকাবেলা করুক।

১৮ মার্চ থেকে আমি ”ওয়ার্ক ফ্রম হোম” ডে – ওয়ান গেল আমার। অভিজ্ঞতা ওভাবে এই প্রথম। প্রথমদিন, সকাল ৯ টা থেকে ৬টা, মোটামুটি এক বসাতেই কাটিয়ে দিলাম, মাঝখানে টিভি আর চা পান ছাড়া! ৬টার পর, ফিলিং লাইক আউট অব দ্যা ওয়ার্ল্ড…
সন্ধ্যায় ভীষণ করে আরো একবার চাই, মহান স্রষ্টার কাছে । আমাদের সকলের কিছুদিনের নির্বাসিত জীবনের মধ্য দিয়ে হলেও এই পৃথিবী আবার মুখরিত হয়ে উঠুক, আবার মানুষ মিলুক মানুষের স্রোতে।

১৯ মার্চ বোধ হয়, প্রথম জানলাম, করোনায় প্রথম মৃত্যু বাংলাদেশে। অবস্থা ক্রমেই মনে হচ্ছে নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছে।

২০ মার্চ থেকে, বুঝলাম যে যেখানে আছি একটা যুদ্ধ পরিস্থিতিতেই আছি।

পৃথিবীর যে যেখানে আছে আমার আত্মীয় বন্ধু পরিজন, সত্যি বলতে কাউকে জিজ্ঞেস করবো, কে কেমন আছে বা ফোন দেবো সে সাহস বা শক্তি পাচ্ছিনা। মা-বাবা ছাড়া কাউকেই কল দেয়া হচ্ছেনা। আমার এইটুকুন জীবনে সব সময় সব অবস্থায় চেয়েছি পৃথিবী ভালোবাসাময় থাকুক, মানুষের পাশে মানুষ থাকুক প্রাণের পরশ নিয়ে।

সেই মানুষের পৃথিবী সময়ের হাতে কেমন অসহায় হয়ে উঠেছে আজ… জানিনা কতদিন লাগবে, আবার সব স্বাভাবিক হয়ে উঠতে।

জীবদ্দশায় এমন একটা সময় দেখছি, শারীরিক, মানসিক এবং মনোস্তাত্বিক এক যুদ্ধ। কে আমরা কিভাবে এই সময় কাটিয়ে উঠবো জানিনা তবে স্নায়ুযুদ্ধের সাথে একেবারেই অনর্থক ধর্ম/রাজনীতি/ক্ষমতার লোভ এমন সব বৈরীতাগুলো যারা নিয়ে আসছে, তাদের উপর ঠিক রাগ না কেমন একটা অসহায়ত্ব অনুভব করছিলাম, এই অবস্থায়ও চিন্তার দৈনতা দেখে।
সবকিছু দেখছিনা মানে দেখতে চাইনা, ফেসবুকে যেটুকু না আসলেই নয় সেটুকু সময়ই আসছি, ভোঁতা অনুভূতি নিয়ে যখনই হিংসাত্বক ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক মতামত চোখের সামনে উঠে আসছে, নিজের মনেই কবিতা পাঠ করছি…
”কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর?
মানুষের মাঝে স্বর্গ-নরক, মানুষেতে সুরাসুর।
রিপুর তাড়নে যখনই মোদের বিবেক পায় গো লয়,
আত্মগ্লানির নরক অনলে তখনই পুড়িতে হয়।
প্রীতি ও প্রেমের পুণ্য বাঁধনে যবে মিলি পরস্পরে,
স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখন আমাদেরই কুঁড়েঘরে।”
– কবি শেখ ফজলুল করিম

২০ মার্চ প্রশান্তিকায়ই উঠে আসে নিউজ,
আজ রাত ৯টা ডেটলাইন অস্ট্রেলিয়া। কোন বিদেশী নাগরিক আসতে পারবেনা।
ব্যাংকগুলো ৬ মাস পর্যন্ত মর্টগেজ পেমেন্ট স্থগিত ঘোষণা করছে।
আজকের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী ভাড়াটে থাকা নাগরিকদের সম্পর্কেও বলেছেন। তারাও রেহাত পেতে পারেন। এজন্য রিয়েল এস্টেট এজেন্টের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন যারা ভুক্তভোগী। তবে সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক বা এজেন্টের সাথে যোগাযোগ করে সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে।
ইতালীতে মৃতের সংখ্যা সবচে বেশি এখন।
বাংলাদেশে আক্রান্ত ১৭ জন।
এপর্যন্ত বিশ্বে ৯ হাজার মৃত্যু।

২১ এ মার্চ মাঝ রাতে আবার লিখতে বসি,
আমি একটু বেশীই স্পর্শকাতর মানুষ, সেটা আমার পরিবার এবং কাছের মানুষদের অনেকেই জানে। মানুষের সুখ দুঃখ আজও ছুঁয়ে যায়, একটু বেশীই যায়। নাটক সিনেমা দেখে আজও চোখ ভিজে, মন কাঁদে হু হু! তাই এই রকম একটা সময় আমার জন্যে একটু বেশীই কষ্টকর!
গত বুধবার থেকে, বাসায় বসে অফিস করছি। আমি যেখানে আছি, একদম কাছের প্রতিবেশী কারো বাসায় যাওয়া আসা নেই। যারা আছে সবাই ড্রাইভিং দূরত্বে।
এমনিতেই বেশ নির্জন এলাকা, এখন সব মিলে পুরোপুরি শূন্যতা। জনমানবহীন, যেন আছি এক নির্বাসিত জীবনে। কাজের সময়গুলো ছাড়া নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনেও কেমন যেন দম বন্ধ একটা অনুভূতি হচ্ছে।
আজও অনলাইনে অফিসের কাজে সকাল ৯টা থেকে ৬টা বেশ ব্যস্ত ছিলাম। ৬টার পর হঠাৎ মনে হচ্ছিলো আমি তো মানুষ নিয়েই থেকেছি সারা জীবন, মানুষের আবেগ অনুভব অবলোকন করা আমার অন্যতম প্রিয় কাজের একটি। চাই তো কাছের সব মানুষকে কাছেই নিয়ে থাকতে। আর কী হবেনা দেখা!
যখনই ভাবছি, অনেকদিন আর ওভাবে মানুষের মাঝে যাওয়া যাবেনা, কেমন একটা চাপ লাগছে, মন খারাপ হচ্ছে, কখনও কখনও কান্নাও পাচ্ছে।
অফিসের কাজটা আছে, তাই একটু ব্যাস্ততা। যদিও কাজটা করতে যেয়ে খুব মানসিক শক্তি সঞ্চয় করতে হচ্ছে… কিন্তু দিনশেষে কেমন যেন ক্লান্ত শ্রান্ত এবং বিষণ্ণতটা এসেই যায়।
বাংলাদেশে ফোন করি। মা বাবা আত্মীয় পরিজন ভালো আছেন শুনি, দেখি ভিডিওতে মায়ের হাসিমুখ এবং বুঝি কিছু মুহূর্তের জন্যেই বুঝি আমাদের এই বেঁচে থাকা, এইটুকুন সুখ অনুভবই মানুষকে আগামী কালকের স্বপ্ন দেখায়।

অবস্থা চরম থেকে চরমতম হচ্ছে, ২২ মার্চ ২০ এ এসে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি ঠিক কেমন অনেকের জানা নেই। শারীরিক মানসিক এবং মনোস্তাত্বিক যে চাপ আসে এটার জন্যেই আমরা অনেকেই হয়তো প্রস্তুত নেই বা থাকিনা, সে শক্তি নেই!
সবার সাথে যোগাযোগ মাধ্যম বলতে এখন শুধুই ফোন এবং এই ফেসবুক। যখনই ফেসবুকে আসছি, প্রচণ্ড বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে, দৈনন্দিন যে ফেসবুকিং করতাম, লেখা, পোস্ট, ছবি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই মনকে সে জায়গায় আনাটাও কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে প্রতিদিন।
এর মাঝে যেমন আছি বা থাকতে পারছি, দিনশেষে যা ভাবনা নিয়ে ঘুমাতে যাচ্ছি এবং ঘুম থেকে উঠছি খুব ইচ্ছে করছিল লিখি, বিশেষ করি ফিরি প্রিয় প্রশান্তিকায়।
আজ আছি কাল নেই এমন বিশ্বাস আমার মাথায় সব সময়ই ছিল, থাকে, এখনও আছে। তাই বেশী বেশী কাজ করতে চাই, না বলা অনুভব লেখায় আসি নিয়ে প্রতিদিন কোন বা কোনভাবে।
এই লেখালিখি নিয়ে ভাবছি আজ থেকে প্রতিদিনই কিছু লিখবো, যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণই আশ,
কেউ কেউ পড়েন, তাদের কাছে শেয়ার করা, কোন একটা শব্দ বা লেখা যদি কাউকে এতটুকু উদজীবিত করে… মন খারাপটা চাপা দিয়ে হলেও বলি।
যা করছি, যা করছিনা…
টিভি বা নিউজ লম্বা সময় ধরে ফলো করছিনা।
লম্বা সময় ধরে কাছের মানুষ তো বটেই গোটা পৃথিবীর জন্যে শুভ কামনা করছি (ঘুমাতে যাওয়ার আগে বা চোখ খুলেই, যদিও ঘুমুতে পারছিনা ওভাবে অনেকদিন)।
পরিচিত দুই একজন ছাড়া সবাইকে ক্ষমাও করে দিচ্ছি মন থেকে (দুই একজন মানুষ খুব খারাপ সময়ে আমার জীবনে এসে দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ভীষণ দাগা দিয়ে গেছে এমন দুই একজনকে মনে করে কান্না পায় কেবল এই যা)।

মানসিকভাবে সুস্থ থাকাটা এখন ভীষণই কষ্টের এক কাজ। আমরা যে যেখানে আছি, সেটা কম আর বেশী সবার জন্যেই রীতিমত যুদ্ধ সময় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মাঝে পরিবারের সবাইকে চাঙ্গা রাখা।

অনেকের মত এই সময় আমার দিন রাত্রি পুরোপুরিই এলোমেলো। খাওয়া, ঘুম, রেস্ট কিছুই ঠিক নেই। শরীর খারাপ নেই কিন্তু এমন রুটিনের জন্যেই দিনশেষে ক্লান্তি নামে, মন খারাপ বেশী হলে কিছু না কিছু করে চেষ্টা করছি ঘুমুতে। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৬টা, সোম থেকে শুক্র এখনও বাসা থেকে অফিসের কাজ করছি তাই মনকে রাখতে হচ্ছে চাপমুক্ত…

কোন কোন দিন পারছি অল্প বিস্তর, কোন কোন দিন একদমই না।
মার্চের শেষ সপ্তাহে আছি।
আমি সুস্থ আছি, হয়তো তুমি, হয়তো যে আপনি পড়ছেন সেও, কিন্তু অনেকেই ভালো নেই। তাই আমি আমার ভালো থাকা নিয়েও এক ধরণের গভীর বিষণ্ণতায় আছি, প্রায়ই বিষণ্ণ হয়ে উঠছি!
সকালটা কোন না কোন ভাবে চাপমুক্ত শুরু করলে দুপুর পর্যন্ত তা ধরে রাখা কষ্টকর। সকাল দুপুর বিকেল এখনও কাজ থাকায় কোন না কোনভাবে পার হয়ে গেলেও সন্ধ্যা নেমে রাতে পৌঁছানোর সাথে সাথে একসাথে সকল মন খারাপ এসে কাবু করে ফেলছে।
হায় জীবদ্দশায়ই এমন পৃথিবী দেখে যাচ্ছি। আমাদের বাচ্চারাও এই সময়ের সাক্ষী। পৃথিবীর আজ এমন এক অসুখ হলো, কী ভীষণ স্বার্থপর হয়ে কাটাতে হচ্ছে আমাদের এইসব দিনরাত্রি।
আজকাল সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর কিছু সময় চোখ বুজে খুব খুব করে ভাবি, একটা দুঃস্বপ্ন দেখছিলাম, এই বুঝি তা শেষ হয়ে এলো।
আজকের সকাল থেকেই শুনবো, ইতালী, স্পেন, চীন, আমেরিকা সহ সকল দেশ কাটিয়ে উঠেছে এই কালো সময়। মানুষ আবার জীবনের জয়গান গাইছে, বেঁচে থাকাকে ভালোবেসে আবার জড়িয়ে ধরছে এই পৃথিবীর মা, মাটি, আকাশ, বাতাস, সবুজ বন!
নিশ্চয়ই এমন হবে, হয়তো আমরা কেউ কেউ থাকবোনা তাতে কী ই বা যায় আসে বিপুলা এই ধরণীর, কিচ্ছু না।

চলে গেল ২৬ মার্চ, না ওভাবে এবার স্বাধীনতা দিবস নিয়ে বাংলাদেশ কোন উৎসবে মেতে উঠতে পারিনি। সেদিন ফেসবুকে দেখছিলাম একটা পোস্ট ‘’সময়ের প্রয়োজনে যুদ্ধ বদলায়, বদলায় তার যোদ্ধা’’!
আজ শেষ করি, বেঁচে থাকলে আবার ফিরবো।
মিরাকেল এই পৃথিবীতে প্রতিদিনই ঘটে, কত রকমভাবে,
প্রতিদিন এই বিশ্বাস নিয়ে ঘুমাতে যাই, আবার নূতন এক সকাল আসবে করোনা মুক্ত পৃথিবী হবে!

আজ এটাই বিশ্বাস করে ঘুমুতে যাচ্ছি, আমার বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়াসহ পুরো বিশ্ব কাটিয়ে উঠুক এই অসহায় অনিশ্চিত সময়গুলো। বিশেষ করে ইতালী, স্পেন, আমেরিকা…

ভোর আসুক, আলো নামুক, উঠুক রোদ। এক পৃথিবী ভালোবাসা, শুভকামনা যে আপনি ধৈর্য নিয়ে আমার এই করোনা দিনলিপি পড়লেন।
৩০ মার্চ ২০২০, মেলবোর্ন।

নাদেরা সুলতানা নদী
সহযোগী সম্পাদক, প্রশান্তিকা

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments